ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

চন্দ্রমল্লিকা বিশ্বের জনপ্রিয় মৌসুমি ফুলগুলোর অন্যতম। জনপ্রিয়তার দিক থেকে গোলাপের পরই এর স্থান। এর বিচিত্র গড়ন, বর্ণ, রূপ, সব মিলিয়ে ফুলটিকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে স্থান করে দিয়েছে। চন্দ্রমল্লিকা জাপানের জাতীয় ফুল। বাংলাদেশেও মৌসুমি ফুল হিসেবে এর চাষ হয়। সারা পৃথিবীতে চন্দ্রমল্লিকার বিস্তর জাত রয়েছে। বিভিন্ন জাতের ফুলের আকার, রঙ ইত্যাদির প্রকারভেদ আছে। এর মধ্যে তামাটে, সোনালি, হলুদ, বেগুনি, লাল, খয়েরি এবং “গ্রিন গডেস” নামের সবুজ চন্দ্রমল্লিকা অত্যন্ত জনপ্রিয়। চন্দ্রমল্লিকা ফুলের বাজারে চাহিদা থাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে একই জমিতে সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন জাতের চন্দ্রমল্লিকা লাগিয়ে বছরে ২-৩ বার ফুল তোলা সম্ভব। চন্দ্রমল্লিকা ফুল গাছ থেকে তোলার পর অধিককাল সজীবতা রক্ষা করে এবং এজন্য গৃহসজ্জায় ফুলদানিতে রাখায়, ফুলের তোড়া ও মালা নির্মাণে ফুলটি বিশেষ উপযুক্ত।

জলবায়ু ও মাটি
চন্দ্রমল্লিকা চাষের জন্য আবহাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গাছের দ্রুত বৃদ্ধি এবং ভালো ফুল পাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত আলো প্রয়োজন। ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা চন্দ্রমল্লিকা উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। চন্দ্রমল্লিকা ফুলের জন্য দিনের চেয়ে রাতের তাপমাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। গাছের বৃদ্ধি ও ভালো ফুলের জন্য বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭০-৯০ শতাংশ হলে ভালো হয়। চন্দ্রমল্লিকা গাছের জন্য অল্প পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়। তবে এ গাছ অতিরিক্ত পানি বা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। এ জন্য জমি রৌদ্রময় ও সুনিষ্কাশিত হওয়া প্রয়োজন।

চারা তৈরি
চন্দ্রমল্লিকার সাকার বা শিকড় থেকে অথবা শাখাকলমের মাধ্যমে সাধারণত চারা তৈরি করা হয়। শাখাকলম বা সাকারের মাধ্যমে চারা তৈরি করলে উৎকৃষ্টমানের ফুল পাওয়া যায়। বড় ফুলের জন্য সুস’, সবল চারা সংগ্রহ করা প্রয়োজন। শিকড় যথেষ্ট মাত্রায় হলে ৩-৪ সপ্তাহ পর কলমগুলো উঠিয়ে টবে লাগানো যায়। বর্ষার সময় অর্থাৎ জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে শাখাকলম করার উত্তম সময়। গাছের বয়স এক বছর হলে, সে গাছ থেকে শাখাকলম করা যায়। কাণ্ড তেড়চাভাবে কেটে তার গোড়ায় “সেরাডক্সিন-বি” নামক হরমোনে ডুবিয়ে নিয়ে মাটিতে বসিয়ে দিলে তাতে শিকড় গজায়। হরমোন ব্যবহার করলেও চলে তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন মাটির নিচে অন্তত একটি গিঁট থাকে। এক মাস বয়স হলেই চারা রোপণের উপযুক্ত হয়।

সার প্রয়োগ ও চারা রোপণ
জমি তৈরির শেষ চাষের সময় হেক্টরপ্রতি ৫-১০ টন গোবর, ২০০-২৫০ কেজি ইউরিয়া, ২০০-২৫০ কেজি টিএসপি এবং ৩০০-৩২০ কেজি মিউরেট অব পটাশ সার প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। এ ছাড়া গাছে ফুলের কুঁড়ি দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে পটাশিয়াম নাইট্রেট ৪ গ্রাম, ফসফেট ও ইউরিয়া ৩ গ্রাম গুলে সেপ্র করলে ফুলের রঙয়ের ঔজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। গাছে ফুল ফোটার পর সেপ্র না করাই ভালো। চন্দ্রমল্লিকার অনেক জাতই বীজ উৎপাদন করে না। এজন্য সাধারণত শাখাকলম ও গুড়ি চারা দিয়ে বংশবিস্তার করা হয়। চন্দ্রমল্লিকার চারা সারি করে লাগানো উত্তম। চন্দ্রমল্লিকা গাছে ফুল ফুটলে ফুলের ভারে গাছ হেলে পড়তে পারে। গাছ হেলে পড়লে ফুলে পর্যাপ্ত সূর্যকিরণ পায় না। ফলে ফুলের রঙ উজ্জ্বল হয় না। তাই গাছের হেলে পড়া এড়াতে গাছে বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঠেকা দিতে হয়।

টবে গাছ লাগালে রাসায়নিক সারের বেশি প্রয়োজন হয় না। প্রতি ১০ ইঞ্চি টবের মাটি তৈরির জন্য দুই ভাগ পরিমাণ দো-আঁশ মাটি, এক ভাগ পচা গোবর সার, ১৫-২০ গ্রাম টিএসপি, ৮-১০ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ সার এবং পরিমাণমতো সরিষার খৈল মিহিভাবে গুঁড়া করে একত্রে ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে ৬-৭ দিন ভেজা অবস’ায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।

তারপর টবের তলার ফুটোর উপরে এক টুকরা পাথর কিংবা টবের ভাঙা অংশ দিয়ে ঢেকে টবে মাটি দিতে হবে। গাছের গোড়ায় যাতে পানি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চন্দ্রমল্লিকা ফুলের কলি ফোটার সময় প্রতি লিটার পানিতে ২ চা চামচ ইউরিয়া এবং মিউরেট অব পটাশ সার মিশিয়ে সেই তরল সার গাছে সেপ্র করলে গাছের চেহারা ভালো হয়। গাছে ফুল ফোটার সময় হলে এই তরল সার প্রয়োগ করলে ফুল ভালো হয়। তবে গাছে ফুল ফোটার পর সেপ্র না করাই ভালো।

রোগবালাই দমন
চন্দ্রমল্লিকা গাছের পাতায় “লিপ স্পট” রোগ দেখা দেয়। এজন্য ৭-১০ দিন পর প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম ডায়াথেন এম-৪৫ গাছে সেপ্র করলে আক্রমণ সফলভাবে দমন করা যায়। “ভার্টিসিলিয়াম উয়িল্ট” নামক ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণও দেখা যায়। এ রোগ হলে গাছের পাতা হলুদ ও বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায়। এ রোগে আক্রান্ত গাছ উপড়ে ফেলতে হবে, যাতে সুস’ গাছ আক্রান্ত না হয়। তবে নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো থাকলে এবং জমিতে অতিরিক্ত পানি না জমতে দিলে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এ রোগ দমনের জন্য রিডোমিল এম জেট ৭৮ সেপ্র করতে হয়। এ ছাড়াও চন্দ্রমল্লিকার গাছে জাব পোকার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এ পোকা দমনে ১ লিটার পানিতে ২ মিলি ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি এমনভাবে সেপ্র করতে হবে যেন ফুলে না লাগে। এছাড়াও থ্রিপস নামের কীটও দেখা যায় এবং এর আক্রমণে ফুলের বাইরে অংশের পাঁপড়িগুলো কুঁচকে যায়। এ পোকা দমনে ম্যালাথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ১৫ দিন অন্তর সেপ্র করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

ফুল সংগ্রহ ও ফলন
ফুল তোলার জন্য কাঁচির সাহায্যে পুষ্পবৃন্ত কাটা উচিত। মোটামুটিভাবে ১১০-১৩০ দিনের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকা ফুল ফোটে এবং ফুল ফোটার পর ৩০-৪০ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। ভোর বেলা ফুল তোলার উপযুক্ত সময়। বাজারজাত করার জন্য ফুলের উপর সামান্য পানি ছিটিয়ে কালো পলিথিন মুড়ে বাজারে পাঠানো ভালো। গাছ থেকে চন্দ্রমল্লিকার ফুল তোলার পর ফুলে সূর্যালোক যত কম লাগে ততই ভালো। কারণ সূর্যালোকে ফুলের প্রকৃত রঙ ও উজ্জ্বলতা বজায় থাকে না।

অনেক উন্নত দেশে ফুল চাষ করে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। আমরা একটু সচেতন হলেই সব ফুলের চাষ করতে পারি। সেজন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশে চন্দ্রমল্লিকা ফুলের চাষ করলে অনেক বেকার যুবক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। অপরদিকে এ ফুল বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

***
তথ্যসূত্র: ড. শামীমা নাসরীন, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, মৃত্তিকা ও পানি ব্যবস্থাপনা শাখা, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বারি, জয়দেবপুর, গাজীপুর