ক্যাটেগরিঃ কৃষি

ভোজন বিলাসী জাতি হিসেবে আমাদের সুনাম আছে। ভূরিভোজের অনিবার্য অনুসঙ্গ বিভিন্ন প্রকার ব্যঞ্জন। আর ব্যঞ্জনের অপরিহার্য উপকরণ হরেক রকম মসলা। প্রকৃতপক্ষে ব্যঞ্জনের রঙ, স্বাদ, সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন খাদ্য উপাদানকেই মসলা বলে অভিহিত করা হয়। কখনো বা খাবার মনলোভা রঙের রাঙানো তথা মাছ-মাংসের অবাঞ্ছিত গন্ধ দূর করার জন্যও মসলার ব্যবহার হয়। স্বল্পায়ু লতাগুল্ম থেকে শুরু করে বহুবর্ষজীবী বৃক্ষ বিভিন্ন প্রকার মসলার উৎস।

গাছের ছাল, কাণ্ড, পাতা, ফল ফুলসহ বিভিন্ন অংশ মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল মসলা উৎপাদনের জন্য বিপুল সম্ভাবনাময়। আমাদের দেশেও বিভিন্ন প্রকার মসলা উৎপাদনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। দেশে উৎপাদিত মসলা ফসলের অন্যতম মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ ও আদা। এ ছাড়া কালোজিরা, ধনিয়া, মেথি, মৌরি, রাঁধুনি ও সলুফা কোনো কোনো এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে উৎপাদিত হয়। দেশে চার লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৫ লাখ টন মসলা উৎপন্ন হয়, যা চাহিদার তুলনায় কম। ব্যঞ্জনে ও অন্যান্য খাদ্যে মসলার ব্যবহার সম্পর্কে প্রায় সবারই জানা থাকলেও প্রতিটি মসলার স্বতন্ত্র ভেষজগুণ তথা রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা রয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা অস্পষ্ট। তাই সংক্ষেপে বিভিন্ন মসলার ঔষধিগুণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

মরিচ : মরিচ সারা বছর জন্মিলেও শীত মৌসুমে বর্ষজীবী খাটো গাছে অপেক্ষাকৃত লম্বা মরিচই মোট উৎপাদনের প্রায় নব্বই ভাগ। যদিও আমাদের দেশে নানা আকার আকৃতি ও রঙের মরিচ দৃশ্যমান এবং তার ঝালের পরিমাণও অনেক তারতম্য রয়েছে। পরিপক্ব শুকানো মরিচের গাঢ় লাল রঙ ‘ক্যাপসানথিন’ নামক রঞ্জন পদার্থের জন্য, আর ক্যাপসিনিন ও সোলমাইন ঝাঁঝালো গন্ধ ও ঝালের উৎস। মরিচে আমিষ, শর্করা, আঁশ ও খনিজ লবণ ছাড়াও ভিটামিন এ বি ও ই রয়েছে। কাঁচা মরিচের নির্যাস ক্ষুধা বৃদ্ধি করে। পাকস্থলীর রস নিঃসরণ বাড়িয়ে হমজে সহায়তা করে। মরিচ চূর্ণের প্রলেপ অস্থ্থিসন্ধির ব্যথা উপশম করে।

পেঁয়াজ : পেঁয়াজ প্রায় সারা পৃথিবীব্যাপী মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশী জাতগুলো আকারে ছোট কিন্তু বেশি ঝাঁঝালো, বিদেশী জাতগুলো আকারে বড় কিন্তু ঝাঁঝ কম। উদ্বায়ী তেলজাতীয় এলিল প্রপাইল ডাই সালফাইডের পরিমাণের ওপর পেঁয়াজের ঝাঁঝের তারতম্য হয়; পক্ষান্তরে অ্যানথোসায়ানিন বা কোয়েরাসিটিন নামক রঞ্জক পদার্থের জন্য কন্দের রঙ লাল কিম্বা হলুদ হয়ে থাকে। পেঁয়াজে শর্করা, আমিষ, খনিজ লবণ, আয়োডিন ও ভিটামিন বি এবং সি বিদ্যমান। এ ছাড়াও জৈব গন্ধক যৌগ সংক্রমণরোধী পদার্থ, এমাইনো অ্যাসিড ও উপকারী তেল রয়েছে। উদ্বায়ী তৈল মূত্রবর্ধক ও সর্দি কাশিতে উপকারী। নির্যাস অশ্বরোগ ও কানপাকা উপশমকারী। কিঞ্চিত লবণ মিশ্রিত রস চোখে প্রয়োগে রাতকানা রোগ প্রশমিত হয়। রস সারিষার তেল সংযোগে মালিশ করলে বাতের ব্যথা নিরাময় করে। কীটপতঙ্গের দংশিত স্থানে রস প্রয়োগে ব্যথা ও ফোলা কমে। পেঁয়াজের গন্ধ সাপকে ঘরে ঢুকতে বিরত রাখে।

রসুন : মসলা হিসেবে রসুনের ব্যবহার প্রায় পৃথিবী জুড়েই প্রচলিত। রসুনের আমিষ, শর্করা, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিন ছাড়াও ভিটামিন এ, বি, সি, ডি বিদ্যমান। এলিল ও ডাই এলিল ডাই-সালফাইডের ফলে রসুনের ঝাঁঝালো গন্ধ অনুভূত হয়। পক্ষান্তরে এক্রোলিন ও এলিল সালফাইড জীবাণুনাশক রূপে কাজ করে। রসুনের ২-৩টি কোয়া চিবিয়ে খেয়ে এক কাপ দুধ খেলে স্মরণ শক্তি বৃদ্ধি পায়, দেহকে সতেজ করেও জীবনকাল দীর্ঘায়িত হয়। চুল ও দাড়ির বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং দৃষ্টিশক্তি প্রখর হয়, কাশি ও শ্বাসকষ্ট লাঘব হয়। রসুনের নির্যাস কানের ব্যথা উপশম করে, ক্ষত নিরাময় করে, এমন কি কুষ্ঠু রোগেও উপকারী। নির্যাস পাতলা পায়খানা ও কৃমি দমন করে। উচ্চ রক্তচাপ, অর্শ্ব ও গলার ব্যথা প্রশমিত করে। নিয়মিত ২-১টি দানা সেবনে রক্তনালীর সম্প্রসারণশীলতা বৃদ্ধি করে ফলে বার্ধক্যজনিত উচ্চরক্তচাপ দমন হয়। রসুনের নির্যাস সরিষার তেল সংযোগে মালিশ করলে বাতের ব্যথা উপশম হয়। রসুনের জৈব রাসায়নিক যৌগগুলো টাইফয়েড ও সাদা আমাশয় নিরাময় করে।

আদা : মসলা ছাড়াও আদা কাঁচা ও শুকনো তথা সংরক্ষিত অবস্থায় ওষুধ প্রস্তুতে ও মদ্যজাতীয় পানীয় তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আর্দ্র জমিতেও জন্মে বলে সংস্কৃতে একে ‘আদরক’ বলে। শুকানো আদায় ৫০% শর্করা ছাড়াও আঁশ, আমিষ ও উদ্বায়ী তেল রয়েছে, যে জন্য ঝাঁঝালো গন্ধ বের হয়। আদা ক্ষুধামন্দা দূর করে, নির্যাস মধু সংযোগে ভক্ষণে সর্দি, কাশি ও জ্বর নিরাময় করে। আখের গুড়ের সাথে মিশিয়ে খেলে অ্যালার্জিজনিত চামড়ায় দাগ দূর করে। শুকানো আদা গরম পানিসহ সেবনে আমাশয়, পেট ব্যথা ও অর্শের ব্যথা উপশম হয়।

হলুদ : হলুদের অত্যুজ্জ্বল রঙ উদীয়মান সূর্যের আলোর রেখার সঙ্গে তুলনীয়। হলুদের মনলোভা রঙের উৎস কারকিউমিনো নামক রঞ্জন পদার্থ। তরকারিতে সুগদ্ধ ও আকর্ষণীয় রঙ ছাড়াও প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুত ও রঙ তৈরির কাজে হলুদ ব্যবহৃত হয়। গাঢ় রঙের হলুদের কদর বেশি। প্রাচীনকাল থেকে মহিলাদের রূপ চর্চার অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে হলুদ সমাদৃত। মসুর ডাল ও দুধ সংযোগে বেঁটে ব্যবহার করলে চামড়ার উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে ও কুঁচকানো রোধ করে। লবণ ও গুড় সংযোগে খেলে আমাশয় ও কৃমি দমন হয়। শীতকালে যাদের সর্দিকাশি লেগেই থাকে তারা শীতের শুরুতে কাঁচা হলুদ বেঁটে গুড় ও লবণ সংযোগে মার্বেল আকৃতির বড়ি তৈরি করে সকাল-বিকেল একটি বড়ি দু’সপ্তাহ ধরে খেলে উপকার পাবেন।

ধনিয়া : ধনিয়ার সুগন্ধি পাতা ও বীজ উভয়ই ব্যবহার উপযোগী তাই সালাদ, ব্যঞ্জন ও ডালে বহুল ব্যবহৃত। এর কোরিয়ানড্রেলি নামের উপকারী তেলের জন্যই বীজের নির্যাস চামড়ার জ্বালাপোড়া, পাতলা পায়খানা ও কাশিতে উপকারী, পিপাসা নিবারক ও পেটের গ্যাস নিঃসরণকারী। তিল তেল ধনিয়ার নির্যাসে মিশিয়ে ব্যবহারের চুল পড়া বন্ধ করে ও খুসকি দূর করে।

কালোজিরা : বীজের মিশকালো রঙের জন্যই নাম কালজিরা, কিন্তু স্বাদ ও গন্ধ ও উপকারিতায় সেরা। ব্যঞ্জন, ডাল ও আচারের সুগন্ধ ও স্বাদ বৃদ্ধি করে। কালজিরায় আমিষ, টেইননসহ বেশ কিছু উপকারী জৈব রাসায়নিক যৌগ বিদ্যমান থাকায় ঔষধি গুণে শ্রেষ্ঠ, যা পবিত্র হাদিসেও উল্লেখ আছে (বোখারি শরিফ পৃঃ ৮৪৮)। মাথাব্যথা, কফ-কাশি, কৃমি, জণ্ডিস ও অর্শরোগ নিরাময় হয়। মহিলাদের মাসিক নিয়মিতকরণ এবং শিশুকে বুকের দুধ দানরত মায়েদের দুধ নিঃসরণ বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘকাল থেকে গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত আছে (৫০০ মিলিগ্রাম কালোজিরা চূর্ণ ৭-৮ চা চামচ গরুর দুধের সঙ্গে মিশিয়ে দিনে দু’বার দুই সপ্তাহ ধরে খেতে হবে)। কালোজিরা চূর্ণ সেবনে মস্তিষ্কের রক্তনালী ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে। মধুসংযোগে কালোজিরা চূর্ণ (১ঃ১) সেবনে শরীরকে সবল করে, রোগ প্রতিরোধ, শক্তি বৃদ্ধি করে তথা অকাল বার্ধক্য রোধ করে। মস্তিষ্কের নিউরনের আন্তঃসংযোগ দৃঢ় করে স্মৃতিভ্রষ্টকে বিলম্বিত করে। কালোজিরা চূর্ণের সাথে সরিষার তেল মিশ্রিত প্রলেপ মাথাব্যথা, সর্দি, চুলকানি উপশম করে (১০০ গ্রাম সরিষার তেল+২৫ গ্রাম কালোজিরা)। ভাজা বীজের গন্ধ শুকলে মাথাব্যথা নিরাময় হয়।

মেথী : শুধু মেথীর বীজ মসলারূপে ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও গাছের বাড়ন্ত অবস্থায় নরম সবুজ পাতা পালংশাকের মতোই ভক্ষণযোগ্য এবং বহুমূত্রে উপকারী বলে কথিত। বীজ চূর্ণ বহুমূত্রে উপশমকারী। মেথী হজম শক্তি বৃদ্ধি, উচ্চরক্তচাপ, বাতব্যথা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

অন্যান্য মসলা যেমন রাঁধুনি, মৌরি, সলুফা জোয়ান প্রভৃতির সুগন্ধি পাতা ও বীজ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় কার্যকর। অধিকাংশ মসলাজাতীয় ফসল শীতকালে জন্মে, তাই তুলনামূলকভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগমুক্ত। একক ফসল হিসেবে ও জমির আইলের ধারে বা আখ, ভুট্টা, আলু ও এলাকা বিশেষে সম্ভাব্য অন্য ফসলের সাথী ফসল হিসেবে চাষ করার সুযোগ ও সম্ভাবনা যথেষ্ট। সেই সাথে উন্নতজাত, পরিচ্ছন্ন চাষ ও ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করে উচ্চফলন নিশ্চিত করে মসলা তথা ঔষধি গাছের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। তাতে মসলা আমদানিতে ব্যবহৃত কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। দেশী মসলার ভেষজগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেলে প্রাকৃতিক রোগ নিরাময় পদ্ধতি বহুলভাবে অনুসৃত হবে। যা সার্বিক বিবেচনায় কল্যাণকর। তা ছাড়া এসব গাছ-গাছড়া প্রাকৃতিক বলে এর কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই এবং শরীরের কোনো ক্ষতি করে না।

তথ্যসূত্র: মো. ওসমান গনী, বিভাগীয় প্রধান (অবসরপ্রাপ্ত), প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিভাগ, বিএসআরআই, ঈশ্বরদী, পাবনা।