ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

গোলমরিচ চাষ এক লাভজনক ব্যবসা। এর চাষ নিয়ে ইদানীং সরকারের কৃষিবিভাগ গ্রামীণ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চাষি ভাইদের উৎসাহ দিয়ে আসছে। এর ফলে বিভিন্ন জায়গায় গোলমরিচ এক অর্থকরী ব্যবসায় পরিণত হচ্ছে। আজকাল গ্রামীণ কৃষি পরিকাঠামোর অবস্থান অনুযায়ী সচেতন শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত চাষিরা গোলমরিচ চাষে অধিক যত্নশীল হচ্ছেন। কৃষকদের গ্রামীণ অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় ও কম সময়ে অধিক উপার্জন পেতে গোলমরিচ এক অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচিত হয়।

তাই গোলমরিচ চাষ করতে কৃষকের ক্ষেত্র প্রস’ত, চারা উৎপাদন ও রোপণ প্রণালী, রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত চারা উৎপাদন পদ্ধতি এবং ব্যবসায়িক ভিত্তিতে গোলমরিচ চাষ নিয়ে আজকের এ প্রতিবেদন। গোলমরিচ লতাজাতীয় উদ্ভিদ। পান গাছ, ওদাল, বেত ইত্যাদির মতো গোলমরিচ এক পরাশ্রয়ী গাছ। এ জন্য গোলমরিচের অন্য গাছের আশ্রয় প্রয়োজন। আম, সুপারি, কাঁঠাল, মান্দার, তেঁতুল, নারিকেল, তাল, সিলভার, খেজুর ইত্যাদি গাছ গোলমরিচের আশ্রয়ী হিসেবে ব্যবহার হয়। এ ছাড়া অমসৃণ ছাল বিশিষ্ট গাছে গোলমরিচ গাছ ওঠার জন্য সুবিধা হয়।

গোলমরিচের চারা উৎপাদন পদ্ধতি

সাধারণ গোল মরিচের চারা ডালের কলম থেকে তৈরি করা হয়। গোলমরিচের গাছের গোড়ার অংশকে ‘রানার’ বলা হয়। ‘রানার’-এর প্রতিটি গিঁট থেকে শিকড় বের হওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে। রানারের প্রতি ৩টি গিঁটের একটি অংশ কেটে নিয়ে বিশেষ ব্যবস’ায় পলিব্যাগে চারা তৈরি করতে হবে। পলিব্যাগে চারা রোপণের পূর্বে বাঁশের কাঠি দিয়ে পলিথিন ব্যাগের মাটিতে গর্ত করে নিয়ে শিকড়যুক্ত কাটিং লাগাতে হয়। ৪৫-৬০ দিনের মধ্যে একটি সুন্দর চারা তৈরি হবে। সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাস চারা উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত সময়।

ব্যবসায়িক ভিত্তিতে গোলমরিচের চারা উৎপাদনের জন্য দ্রুত চারা উৎপাদন পদ্ধতি বেশি কার্যকর। একটি গাছ থেকে বছরে অন্তত ৩০-৩৫টি চারা উৎপাদন করা সম্ভব। এ জন্য একটি ছায়াঘর তৈরি করতে হবে। প্লাস্টিকের তৈরি বিশেষ ধরনের শেডনেট ব্যবহার করে ছাউনিও তৈরি করা যায়।

ঘরের বাঁশের খুঁটির সারির উচ্চতা হবে ৩ মিটার এবং দুই পাশের খুঁটির উচ্চতা হবে ২ মিটার। ঘরের মধ্যে ১ মিটার দূরত্ব বজায় রেখে ৭৫ সেন্টিমিটার গভীর এবং ৩০ সেন্টিমিটার প্রসে’র নালা তৈরি করতে হবে। নালাগুলো বালিমাটি, কম্পোস্ট, কাঁঠালের গুঁড়ো এবং সারমিশ্রিত মাটি সমানভাগে মিশিয়ে ভর্তি করতে হবে। এখন ওই নালার এক ফুট অন্তর অন্তর ভালো জাতের সুস’ চারা ‘মাতৃগাছ’ হিসেবে রোপণ করতে হবে। দুই নালার মধ্যবর্তী জায়গার দুই মাথায় খুঁটি পুঁতে মাটির সঙ্গে আনুভূমিকভাবে একটি লম্বা বাঁশ বেঁধে দিতে হবে।

গোলমরিচের গাছ প্রতিটি গিঁট মাটির সংস্পর্শে বেঁধে দিতে হয়, এর ফলে প্রতি গিঁট থেকে শিকড় বেরিয়ে আসবে। ৩-৪ মাসের মধ্যে গোলমরিচের লতা আধাখানা বাঁশের মাথা পেরিয়ে যাবে। এ সময় লতার আগা কেটে নিন এবং গাছের গোড়ার তিনটি গিঁটের উপরে লতা থেঁতলে দিন। তখন পাতার অঙ্কুর বাড়তে আরম্ভ করবে। ১০ দিন পর থেঁতলানো অংশটুকু কেটে ফেলুন।

বংশ বিস্তার

গোলমরিচের বীজ থেকে বংশবৃদ্ধি করা যায়। কিন’ এতে উৎপাদন পেতে অনেক বেশি সময় লাগে। গোলমরিচের গুণাগুণ মাতৃগাছের মত নাও হতে পারে। সেজন্য সাধারণত অঙ্গজ প্রজননের দ্বারা গোলমরিচের বংশবৃদ্ধি করা হয়। সাধারণত এক মুকুল একপত্রী কাটিং দ্বারা বংশবৃদ্ধি করা হয়। ওই পদ্ধতি দ্বারা অতি সহজেই গোলমরিচের চারা প্রস’ত করা যায়।

চারা রোপণ পদ্ধতি

গোলমরিচের চারা দুই প্রকারে রোপণ করা যায়। যদি বাগানে সুপারি, নারকেল, আম, মান্দার, কাঁঠাল ইত্যাদি আশ্রয় গাছ হিসেবে ব্যবহারের গাছ থাকে, তখন ওই গাছ থেকে দেড় হাত দূরে, দেড় হাত দৈর্ঘ্য, দেড় হাত প্রস’ এবং দেড় হাত গভীর গর্ত করতে হয়। গোবর, পচনসার, বালুযুক্ত মাটি দিয়ে গর্তটি পূর্ণ করে চারা রোপণ করা হয়। গাছ ওঠার সুবিধার জন্য বাঁশের অবলম্বন দেয়া প্রয়োজন।

সার প্রয়োগ

প্রতি গাছে নিম্ন হারে সার প্রয়োগ করা উচিত। সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় চৈত্র-বৈশাখ মাস। প্রতিপালন গোলমরিচের লতাগুলো দ্রুত বৃদ্ধির জন্য যথাসময়ে আশ্রয়ী গাছে বেঁধে দিতে হয়। গাছের গোড়া থেকে ৩ হাত ওপর পর্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা প্রয়োজন। গোলমরিচ গাছ যাতে ৯ হাত উপরে উঠতে না পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

মাটি

অব্যবহৃত বা পতিত জমিতে উচ্চ জৈবসার বিশিষ্ট পানি জমে না থাকা, পাহাড়ের লালমাটি গোলমরিচ চাষের জন্য বেশি উপযোগী। বন্যা কবলিত অঞ্চল ছাড়া বেলে দো-আঁশ মাটিতে গোলমরিচের চাষ করা যায়। আর্দ্রতাহীন মাটি গোলমরিচ চাষের জন্য অনুপযোগী।

জাত
পানিউর-১ (হাইব্রিড), কারিমুণ্ডা, বালানকাট্টা, কল্লুভেল্লি, আরকুলাম মুণ্ডা প্রভৃতি গোল মরিচের জাত।

রোপণের সময়

গোল মরিচ ভালো জাতের চারা বৈশাখের ১০-১৫ দিন থেকে আষাঢ়ের ১০-১৫ দিন পর্যন্ত রোপণের উপযুক্ত সময়।

রোগবালাই

ফলছিদ্রকারী পোকা

গোলমরিচে এক প্রকার ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ দেখা যায়। শ্রাবণ ও কার্তিক মাসে প্রতি ৫ লিটার পানিতে এক চা চামচ ‘এন্দোসালফার ৩৫ ইসি’ বা ‘কুইনলফস বা ডাইমিথয়েট ৩০ ইসি প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া যায়।
ঝরে পড়া রোগ

গোলমরিচ ধরা শুরু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে বীজগুলো ঝরে যায়। বর্ষাকাল আরম্ভ হওয়ার কিছুদিন পূর্বে এক শতাংশ বোর্দো মিশ্রণ গোলমরিচ গাছে প্রয়োগ করতে হয়। এছাড়া খরার সময়ে পানি, খুব গরমে ছায়া এবং নিয়মিত সার প্রয়োগ করে এ রোগের প্রতিরোধ করা যায়।

ফসল কাটা ও সংরক্ষণ

গোলমরিচের ছড়িতে যখন দু-একটি গোলমরিচ হলুদ রঙের হয় তখন মই দিয়ে ওপরে উঠে ফসল কেটে নিয়ে ছড়াগুলো মেলে রাখতে হয়। গোলমরিচ ভালোভাবে শুকিয়ে গেলে কালো ও আকারে ছোট হবে। এরপর পরিষ্কার করে ছোট বড় পৃথক করে নিয়ে বাজারজাত করা যায়।

ফলন

গোলমরিচ রোপণের তিন বছর থেকে উৎপাদন শুরু হয়ে যায় যদিও ৭-৮ বছর থেকে পূর্ণ উৎপাদন পাওয়া যায়। প্রতি গাছ থেকে ৫-৬ কেজি কাঁচা গোলমরিচ উৎপন্ন হয়। কাঁচা গোলমরিচ থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ শুকনো গোলমরিচ পাওয়া যায়। অর্থাৎ একটি গাছ থেকে গড়ে দেড় থেকে দুই কেজি শুকনো গোলমরিচ পাওয়া যায়। ৎ

তথ্যসূত্র: আফতাব চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, এ ব্লক, শাহজালাল উপশহর, সিলেট