ক্যাটেগরিঃ কৃষি

ইন্দো-মায়ানমার মুগের উৎপত্তি স্থল। বিশ্বের মোট মুগ উৎপাদনের ৮০ শতাংশ ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, চায়না এবং ইন্দোনেশিয়ায় উৎপন্ন হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে বর্তমানে আয়তন এবং উৎপাদনের দিকে বিবেচনায় ডালের মধ্যে মুগের অবস্থান তৃতীয়। সাধারণত খরিফ-১, খরিফ-২ এবং বিলম্ব রবিতে এর চাষ করা হয়ে থাকে। তবে খরিফ-১ মৌসুমেই মুগের চাষ বেশি হয়ে থাকে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব : দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি স্বল্পতা দূর করতে, মাটির হারানো উর্বরাশক্তি ফিরে পেতে, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে মুগ চাষের গুর্বত্ব অপরিসীম। মানুষের খাদ্য তালিকায় আমিষের উৎস হিসেবে মুগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুগ সিমবায়োসিস প্রক্রিয়ায় বাতাসের নাইট্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে, যা মাটিতে পর্যাপ্ত ইউরিয়া সার সরবরাহ করে থাকে। গম কাটার পর থেকে আমন ধান রোপণের পূর্ব পর্যন্ত অধিকাংশ জমি পতিত থাকে। কিন্তু মুগ চাষের মাধ্যমে অতি সহজেই এসব পতিত জমি ব্যবহার করা সম্ভব।

মাটি ও জলবায়ু : সব ধরনের মাটিতেই মুগ ডালের আবাদ করা যায়। তবে সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ মাটিতে এ ফসল ভালো হয়ে থাকে। যদি পানি জমে না থাকে তবে কাদামাটিতেও এর চাষ করা যেতে পারে। মুগ সাধারণত উষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলে ভালো জন্মে থাকে। মুগ চাষের জন্য ২৫-৩০ সে. তাপমাত্রা সবচেয়ে উপযোগী। সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ২০-২২ সে. এবং ভালো ফসলের জন্য কাঙিত গড় তাপমাত্রা হলো ২৮-৩১ সে.। এ ফসলকে কিছুটা খরা সহিষ্ণু ফসল বলা হয়ে থাকে। তবে মুগডাল উজ্জ্বল রোদ ও অপেৰাকৃত কম আর্দ্রতাপূর্ণ পরিবেশে ভালো হয়। আবার মাটিতে আর্দ্রতার পরিমাণ খুব কমে গেলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং ফুল ও ফল কম হয়ে থাকে।

জমি তৈরি : ২-৩টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়, যাতে সহজেই বীজ গজিয়ে চারা ওপরে উঠে আসতে পারে এবং ফসলের বৃদ্ধি ভালো হয়।

জাত : এ পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ৬টি, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ৭টি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৪টি মুগের জাত উদ্ভাবন করেছে। বীজের আকারের ভিত্তিতে বাংলাদেশে ছোট এবং বড় এ দুধরনের মুগের জাত চাষ হয়ে আসছে। তবে কৃষি প্রক্রিয়াকরণের চাহিদায় বড় দানার মুগই বেশি জনপ্রিয়। আবাদের জন্য সুস্থ, সবল, রোগমুক্ত এবং উন্নত জাতের বিশুদ্ধ মানের ভালোবীজ ব্যবহার করতে হবে।

সারের মাত্রা : জমি অনুর্বর না হলে সার প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। তবে অনুর্বর জমিতে হেক্টরপ্রতি ৫ টন পচা গোবর বা কম্পোস্ট, ৪৫ কেজি ইউরিয়া, ৯০ কেজি টিএসপি এবং ৩৫ কেজি এমপি শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে। নতুন এলাকা হলে প্রতি কেজি বীজের সাথে ৫০ গ্রাম জীবাণু সার ভাতের মাড় বা চিটাগুড়ের সাথে মিশিয়ে বপন করতে হবে। তবে বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও তৎসংলগ্ন এলাকাসহ যেখানে বোরণের অভাব আছে সেখানে মুগ চাষ করতে হলে অন্যান্য সারের সাথে হেক্টরপ্রতি ১০-১২ কেজি রবিক এসিড বা বোরাঙ প্রয়োগ করতে হবে।

বপন সময় : সাধারণত তিন মৌসুমে মুগ চাষ হয়ে থাকে তাহলো-

খরিফ-১ : দেশের মধ্য-পশ্চিম অঞ্চলের জেলাগুলোতে ফেব্র্বয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ পরে বপন করতে হলে বারিমুগ-৬ জাতের চাষ করতে হবে।
খরিফ-২ : এ সময় মুগচাষ হয় আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। উত্তর-পশ্চিম জেলাগুলোতে এ মৌসুমে বেশি মুগ চাষ হয়ে থাকে।
লেট রবি : মধ্য জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্র্বয়ারি পর্যন্ত চাষ করা যায়। দৰিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ মৌসুমে মুগ চাষ হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে গম এবং আলু সংগ্রহের পর খরিফ-১ মৌসুমে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মুগের চাষ করা হচ্ছে।

বীজের পরিমাণ ও বপন পদ্ধতি : সারি করে বীজ বপন করলে হেক্টরপ্রতি ২৩ কেজি এবং ছিটিয়ে বপন করলে ২৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।
ছিটিয়ে ও সারি উভয় পদ্ধতিতেই বীজ বপন করা যায়। আন্তঃফসল বা মিশ্র ফসল হিসেবে মুগ চাষ করলে সাধারণত ছিটিয়ে বপন করা হয়। তবে সারি করে বপন করলে আন্তঃপরিচর্যাসহ ফল সংগ্রহে সুবিধা হয় এবং ফলনও বেশি হয়। সারি করে বপন করলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেমি. এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৭-৮ সেমি. বজায় রাখতে হবে।
আন্তঃপরিচর্যা
সেচ ও নিষ্কাশন : সাধারণত রবি ফসল সংগ্রহের পর জমিতে রস থাকে না বললেই চলে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল এবং দৰিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ সমস্যা আরো বেশি প্রকট। এমতাবস্থায়, জমিতে হালকা সেচ দিয়ে পরিমিত রস তৈরি করে মুগ বপন করতে হবে। এতে বীজের অঙ্কুরোদগম ভালো হয়। পরবর্তীতে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি থেকে ফুল পর্যন্ত একটা হালকা সেচ এমনভাবে দিতে হবে যাতে কোথাও পানি জমে না থাকে। কারণ মুগ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে তৎৰণাৎ বের করে দিতে হবে। শুষ্ক অঞ্চলে পরিমিত সেচ দিয়ে মুগের চাষ করলে ৩০-৪০ শতাংশ ফলন বেশি পাওয়া যায়।

আগাছা দমন ও গাছ পাতলাকরণ : মুগের ভালোফলন পেতে হলে ফসলের বৃদ্ধির প্রাথমিক অবস্থাতেই আগাছা দমন করতে হবে। জমিতে আগাছা থাকলে ফসল গজানোর ২০-২৫ দিনের মধ্যে নিড়ানি দিয়ে আগাছা তুলে ফেলতে হবে। আর বীজ সারিতে বপন করলে দু’সারির মাঝে একবার কোদাল দিয়ে কুপিয়ে দিলেই জমির আগাছাও পরিষ্কার হয় এবং মাটিও ঝুরঝুরা হবে। গাছ ঘন থাকলে ফুল ও ফল কম হয় এবং রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়। তাই প্রতিবর্গ মিটারে ৩৪-৩৫টি গাছ থাকলে মুগের ভালো ফলন পাওয়া যায়।

রোগবালাই দমন : মুগে যেসব রোগ হয়, তার মধ্যে হলুদ মোজাইক ভাইরাস, পাতায় দাগ ও পাউডারি মিলডিউ বেশি ৰতিকারক। হলুদ মোজাইক ভাইরাস রোগে আক্রান্ত গাছ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুলে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। সাদা মাছি নামক এক প্রকার পোকা এ রোগের ভাইরাস বহন করে। তাই এ পোকা দমনে অনুমোদিত মাত্রার কীটনাশক নিয়মিত সেপ্র করতে হবে। পাতায় দাগ রোগের আক্রমণ হলে ব্যাভিষ্টিন বা ডাইথেন এম-৪৫ প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর সেপ্র করতে হবে। পাউডারি মিলডিউ রোগ হলে টিল্ট-২৫০ ইসি. ০.৫ মিলি. বা থয়োভিট ২ গ্রাম প্রতি ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পরপর সেপ্র করতে হবে।

পোকামাকড় দমন : মুগে যেসব পোকার আক্রমণ হয়, তাদের মধ্যে বিনফাই, জাবপোকা, সাদামাছি, বিছা পোকা, ফল ছিদ্রকারী পোকা এবং থ্রিপস বেশি ৰতিকারক। কোনো কোনো সময় চারা গজানোর পর পরই বিনফাই ও জাবপোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। সে ৰেত্রে, এসব পোকার আক্রমণে প্রতিরোধক হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে সুমিথিয়ন বা মেলাথিয়ন ২.০০ মিলি. ওষুধ মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে। বিছা পোকার আক্রমণ হলে গাছের পাতার নিচের দিকে ডিম পাড়া অবস্থায় বা ডিম থেকে শুঁককীট বের হয়ে চলাচল শুর্ব করার আগেই আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পা দিয়ে চেপে মেরে ফেলতে হবে। থ্রিপস ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ হলে সাইপার মেথ্রিন গ্র্বপের যেমন রিপকর্ড ১০ ইসি প্রতিলিটার পানিতে ১.০ মিলিলিটার ওষুধ মিশিয়ে ছিটিয়ে দিলে এ পোকা সহজে দমন করা যায়।

ফল সংগ্রহ ও গাছের পরবর্তী যত্ন : শুঁটি বা পড বাদামি বা কালচে রঙ ধারণ করলে বুঝতে হবে মুগ পরিপক্ব হয়েছে। তখন পরিষ্কার সূর্যালোকের দিনে মুগের ফল সংগ্রহ করে শুষ্ক ও পরিষ্কার স্থানে রৌদ্রে শুকিয়ে মাড়াই করতে হবে। প্রথমবার ফল সংগ্রহের পর গাছের বৃদ্ধি যদি কম থাকে এবং মাটিতে রসের অভাব থাকে, তাহলে মাটিতে হালকা সেচ দিয়ে বিঘাপ্রতি ৫ কেজি ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিলে গাছের বৃদ্ধিও ভালো হয় এবং প্রচুর পরিমাণে ফল ধরে। মুগের ৰেত্রে এভাবে তিনবার ফল বা শিম সংগ্রহ করা যায়।

বীজ শুকানো

মাড়াই করার পর ঝেড়ে পরিষ্কার করতে হবে। তারপর রৌদ্রে ভালোভাবে শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে।
ফলন

জাত ও আবাদের ব্যবস্থাপনার পার্থক্যের কারণে মুগের ফলনের তারতম্য হয়ে থাকে। তবে এ নিবন্ধে বর্ণিত পদ্ধতিতে মুগের ফলন হেক্টরে ১২০০-১৫০০ কেজি হয়ে থাকে।

গোলাজাতকরণ

সংগৃহীত বীজ পুর্ব ছিদ্রবিহীন পলিথিন ব্যাগ কিংবা চটের বস্তার মধ্যে রেখে পরিমাণমতো বীজ ভর্তি করে প্রথমে পলিথিন ব্যাগের মুখ ভালো করে বাঁধতে হবে, যাতে ভেতরে বাতাস প্রবেশ করতে না পারে। পরিশেষে বস্তার মুখ বেঁধে মাটিতে না রেখে ঘরে মুক্ত বাতাসযুক্ত স্থানে যেকোনো রকমের মাচার উপরে রাখতে হবে। ইঁদুরের আক্রমণ হতে সতর্ক থাকেতে হবে। উলিৱখিত পদ্ধতি অনুসরণ করে মাটির কুঠিতেও বীজ সংরৰণ করা যায়। এ ছাড়া টিন ও ড্রামেও বীজ রাখা যায়।

তথ্যসূত্র: কৃষিবিদ মো. ওমর আলী, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা