ক্যাটেগরিঃ কৃষি

পাহাড়ি এলাকার জন্য পটল একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। পাহাড়ের ঢালু জমি অর্থাৎ ভেলীর জমি বেলে দো-আঁশ হওয়ায় পটল চাষের উপযোগী। গত চার বছর ধরে সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বারি, বান্দরবানের উদ্যোগে পরীক্ষামূলক পাহাড়ের ঢালু জমিতে পটল চাষ করে আশানুরুপ ফলন পাওয়া যায়। এর ফলে পাহাড়ি কৃষকের মাঝে পটল চাষের আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পটলের উৎপাদন অনেক সবজি অপো অধিক এবং প্রাপ্তিকালও দীর্ঘ। মার্চ থেকে নভেম্বর (ফাল্গুন-অগ্রহায়ণ) পর্যন্ত পটল উৎপাদন করা যায়। ফলে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে সবজির চাহিদা মেটাতে পটল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একবার পটলের কাটিং লাগালে পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত মুড়ি ফসল থেকে পটলের উৎপাদন আরো ভালো হয়।

পটলের জাত পরিচিতি

বাংলাদেশে জানা অজানা অনেক জাতের পটল আবাদ করা হয়। এগুলো বিভিন্ন সহানীয় নামে পরিচিত। ঈশ্বরদীর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যানতত্ত্বের বিজ্ঞানীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এ পর্যন্ত ৬৪টি পটলের জাত সংগ্রহ ও এদের গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয়। সংগৃহীত জাত থেকে পিজি-০২০ ও পিজি-০২৫ নামে দু’টি উচ্চফলনশীল ও রোগবালাই সহনশীল লাইন বাছাই করে বান্দরবানসহ বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। পরবর্তীতে উক্ত লাইন দু’টি বারি পটল-১ এবং বারি পটল-২ নামে ২০০৬ সনে সারাদেশে চাষাবাদের জন্য অনুমোদন পায়।

বারি পটল-১

বারি পটল-১ জাতটির ফলের আকার মাঝারি, বেলুনাকৃতি ও দু’প্রান্ত ভোতা। ফলের রঙ গাঢ় সবুজ, গায়ে ৯-১০টি হালকা সবুজ রঙয়ের ডোরা থাকে। ফল ৯-১০ সেমি. লম্বা এবং বেড় ৪-৫ সেমি. প্রতিটি ফলের ওজন ৫০ গ্রাম। শাখা কলম লাগাবার ৯০ দিনের মধ্যেই ফল সংগ্রহ করা যায়। প্রাত গাছে সর্বোচ্চ ৩৮০টি ফল ধরে যাদের মোট ওজন প্রায় ১৪ কেজি। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৩৮ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।

বারি পটল-২

এ জাতটির ফলের আকার বড়, সিলিন্ডারাকৃতি ও দু’প্রান্ত সুচালো। ফলের রঙ হালকা সবুজ গায়ে ১০-১১টি সাদা রঙের ডোরা থাকে। ফল ১১-১২ সেমি. লম্বা এবং বেড় ৩.৫-৪ সেমি. প্রতিটি ফলের ওজন ৫৫ গ্রাম। শাখা কলম লাগাবার ৯৫ দিনের মধ্যেই ফল সংগ্রহ করা যায়। প্রতি গাছে সর্বোচ্চ ২৪০টি ফল ধরে যাদের মোট ওজন প্রায় ১০ কেজি। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ফলন পাওয়া যায় ৩০ টন।

জলবায়ু ও মাটি

উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এবং বেশি তাপমাত্রা ও প্রখর রোদ পটল আবাদের উপযোগী। তবে বেশি বৃষ্টি হলে এর পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হয় ও ফলন হ্রাস পায়। পলি দো-আঁশ এবং বেলে দো-আঁশ মাটি পটল চাষের জন্য ভালো। যেসব জমিতে পানি জমে না তেমন উঁচু জমিতে পটল চাষ করে একাধিক বছর ফলন পাওয়া সম্ভব।
চাষ পদ্ধতি

ক. জমি তৈরি ও চারা রোপণ

মাদা তৈরির পর অক্টোবর থেকে মার্চ ( আশ্বিন – ফাল্গুন) পর্যন্ত যেকোনো সময় জমিতে পটলের চারা/কাটিং লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে ডিসেম্বর-জানুয়ারি (পৌষ-মাঘ) মাসে লাগালে পটলের গাছ ভালো হয় না। তাই এ সময় কাটিং না লাগানোই ভালো। অক্টোবর-নভেম্বর (আশ্বিন – কার্তিক) মাসে লাগালে গাছ থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ (ফাল্গুন -চৈত্র) মাসের ১ম সপ্তাহে ফসল সংগ্রহ করা যায় এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে লাগালে মে-জুন (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) মাসে ফল ধরে।

খ. মাদা বা পিট তৈরি

মাদা বা পিটের আয়তন ৫০ সেমি. ৫০সেমি. ৫০সেমি. (এক হাত করে) দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীর হতে হবে। মাদার মাটি খুঁড়ে এক পার্শ্বে রেখে তাতে নির্ধারিত মাত্রায় জৈব ও রাসায়নিক সার ভালোভাবে মিশিয়ে মাদা পূরণ করে ২-৩ দিন পর তাতে চারা বা কাটিং রোপণ করতে হয়।

গ. মাদায় সার প্রয়োগ

জৈব ও রাসায়নিক সার পটলের জমিতে প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। সার প্রয়োগের হার হলো- সার প্রয়োগ পদ্ধতি

মাদা তৈরির পর ইউরিয়া ছাড়া উক্ত ৫ কেজি গোবর, ৫০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমপি সার একত্রে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে ২-৩ দিন পর চারা বা কাটিং রোপণ করতে হয়। এর পর চারা গজানোর বা রোপণের ১৫-২০ দিন পর ১ম কিস্তি, ৩০-৩৫ দিন পর ২য় কিস্তি এবং ৪৫-৫০ দিন পর ৩য় কিস্তি সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি হেক্টর জমিতে ২৪৩০-২৫০০টি পর্যন্ত মাদা বা গর্ত তৈরি করা যায়। সে হিসাবে হেক্টরপ্রতি ১২ টন গোবর, ১৭০ কেজি ইউরিয়া, ১২২ কেজি টিএসপি এবং ৯৭ কেজি এমপি সারের প্রয়োজন হয় ।

মাচা তৈরি ও অন্যান্য পরিচর্যা

তুলনামূলকভাবে মাচায় পটলে ফলন ভালো হয়। পটল একটি লতানো উদ্ভিদ বিধায় বাঁশের কাঠির সাহায্যে চারা গাছকে মাচায় তুলে দেয়া হয়। এক মিটার বা দু’হাত উচ্চতার বাঁশের মাচায় পটলের ভালো ফলন পাওয়া যায়। প্রতিবার ফসল সংগ্রহের পর মরা পাতা ও শাখা ছাঁটাই করা প্রয়োজন। এতে ফলধারী নতুন শাখার সংখ্যা বেড়ে যায় এবং ফলন বেশি হয়। সময়মতো সেচ দিয়ে অনুমোদিত মাত্রায় সার প্রয়োগ ও নিড়ানি দিতে হবে। যদি জমিতে স্ত্রী গাছের তুলনায় পুরুষ গাছের সংখ্যা কম থাকে তা’হলে হাত দিয়ে পরাগায়নের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

পটলের রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন

আগাছা ও মরা লতাপাতা নিয়মিত পরিষ্কার করে রাখলে পটলের জমিতে তেমন পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয় না। তারপরও নিম্নোক্ত রোগবালাই দেখা দিলে তা সঠিকভাবে দমনের ব্যবস্থা করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।

পটল কচি অবস্থায় হলুদ হয়ে পচে গেলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম মিপসিন পাউডার মিশিয়ে ১০-১৫ দিন অন্তর ২-৩বার সেপ্র করতে হবে এবং ফলের মাছি পোকা দমনের জন্য এডমায়ার (১ মিলি. লিটার পানি) সেপ্র করতে হবে।

পটলের পাতা ঝলসানো ও পাতা মরে যাওয়া রোগ দমন করতে হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কুপ্রাভিট ওষুধ সেপ্র করতে হবে এবং এর সাথে যদি প্রতি লিটার পানিতে এডমায়ার ১ মিলি. প্রতিলিটার পানির সাথে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পরপর সেপ্র করা হয় তাহলে অন্যান্য তিকারক পোকামাকড়ও কমে যাবে এবং ওষুধও সাশ্রয় হবে।

পটলের নেমাটোডজনিত রোগ অর্থাৎ শিকড় গিঁট বা গিঁট কৃমি রোগ যেমন পটল ধরা শুরু হলে ডগা ও পাতা মরে যাওয়া দমনের জন্য চারা রোপণের পূর্বে প্রতি গর্তে বা মাদায় ১৫-২০ গ্রাম ফুরাডান ৫ জি মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। পটল লাগানোর ৩ মাস পরে বা গাছে ফলন আসার ৩-৪ সপ্তাহ আগে দ্বিতীয়বার ১০-১৫ গ্রাম ফুরাডান ৫ জি

প্রতি গাছের গোড়ায় প্রয়োগ করতে হবে এবং মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। প্রথম বছরের ফসল তোলা শেষ হলে পুরনো লতার গোড়ায় নতুন করে নভেম্বর মাসে বা শীতের আগে প্রতি গাছে ২০-২৫ গ্রাম ফুরাডান ৫ জি প্রয়োগ করতে হবে।

পটলের ফুল ফল ঝরা রোধ ও ফলের আকার সুন্দর করতে হলে প্রতি হেক্টর জমিতে ১০-১২ কেজি (প্রতি মাদায় ৫-৬ গ্রাম) বোরিক এসিড মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়াও গাছের ফলন বৃদ্ধির জন্য পটলের ফুল আসার পূর্বে দিনের ২য় ভাগে বেফুলান অথবা ভঙলসুপার পরিমিত পরিমাণ ১০-১২ দিন পর পর সেপ্র করতে হবে।

পটলে আঁইশপোকা বেশ তি করে, তদুপরি উঁইপোকা, লাল কুমড়া বিটল ও ফলের মাছি প্রভৃতি পোকার আক্রমণ হয়ে থাকে। আঁইশপোকা দমনের জন্য প্রতি ১০ দিন অন্তর অন্তর অল্প মাত্রায় স্পর্শক জাতীয় যেকোনো কীটনাশক প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। যেমন- পটলের ফুল বা ফল আসার পর পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিলে প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা মিষ্টিকুমড়া থেঁতলিয়ে অথবা পাকা সাগর কলা থেঁতলিয়ে ১ মিলি. মিপসিন অথবা ১ মিলি পরিমাণ সবিক্রণ ৪২৫ ইসি ওষুধ মিশিয়ে প্রতি ১৫-২০টি মাদার জন্য একটি বিষটোপ তৈরি করা যেতে পারে, যা পোকা দমনে খুবই কার্যকর। তবে ল রাখতে হবে বিষটোপের ১-১.৫ ফুট উপরে ঢাকনা দিতে হবে এবং প্রতি ৭-৮ দিন পর পর নতুন বিষটোপ তৈরি করে দিতে হবে। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও পোকামাকড় ও রোগবালাই আক্রমণ সহজে প্রতিহত করা যায়।

রেটুন (মুড়ি) ফসল থেকে পটল উৎপাদন

যেসব ফসল একবার সংগ্রহের পর একই গাছ হতে পরবর্তী বছর পরিচর্যার মাধ্যমে ফলন পাওয়া যায়, সেসব ফসলকে মুড়ি ফসল বলে। পটল গাছ একাধিক বছর বেঁচে থাকে। সুতরাং একবার লাগানোর পর ২-৩ বছর ধরে ফসল সংগ্রহ করা যায়। পটল গাছে প্রথম বছর ফলন কম হয়, দ্বিতীয় বছর ফলন বাড়ে, কিন্তু তৃতীয় বছর থেকে আবার ফলন কমতে থাকে। সুতরাং তিন বছরের বেশি সময় ধরে ফলন নেয়া উচিত নয়। প্রথম বছর ফসল সংগ্রহের পর নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে মাটির উপরিভাগ বরাবর গাছ কেটে দিতে হবে।

ফসল সংগ্রহ

পটল সংগ্রহ মৌসুম বেশ দীর্ঘ। কচি অবস্থায় সকাল অথবা বিকেলে পটল সংগ্রহ করা উচিত। সাধারণত জাতভেদে ফুল ফোটার ১০-১৫ দিনের মধ্যে পটল সংগ্রহের উপযোগী হয়। প্রতি ৪-৬ দিন অন্তর অন্তর অথবা সপ্তাহে কমপ একবার ফল সংগ্রহ করা যায়।

তথ্যসূত্র: জামাল উদ্দিন, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, বারি, বান্দরবান ও আশিষ কুমার সাহা, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ, কৃষি গবেষণা উপকেন্দ্র, আলমনগর, রংপুর