ক্যাটেগরিঃ কৃষি

বেগুন বাংলাদেশে সবচেয়ে গুর্বত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় সবজি। এখন যে বেগুন চাষ করা হয় তার উৎপত্তিস্থল ভারত-মিয়ানমার অঞ্চলে হলেও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশকেও বেগুনের উৎপত্তিস্থল হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। বহু বছর ধরে এ দেশে বেগুনের চাষ হচ্ছে। বর্তমানে যশোর, চট্টগ্রাম, কুমিলৱা, নরসিংদী, রাজশাহী এবং ঢাকা জেলায় বেগুনের ব্যাপক চাষ হয়। বাংলাদেশে যে পরিমাণ জায়গায় সবজি চাষ হয় তার প্রায় শতকরা ১৫ ভাগ জায়গায় বেগুনের চাষ হয়ে থাকে। এ দেশে সারাবছরই বেগুনের চাষ হয়।

বেগুনের পোকামাকড় :
এ দেশে কমপৰে ১৬ প্রজাতির পোকা এবং একটি প্রজাতির মাকড় বেগুন ফসলের ৰতি করে থাকে। এর মধ্যে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকাই প্রধান। এ পোকা ফসলের ব্যাপক ৰতি করে থাকে। কোন কোন এলাকায় কৃষকরা এ পোকাকে মাজরা পোকাও বলে থাকেন। অন্যান্য পোকামাকড় বেগুন ফসলের তেমন ৰতি করে না। বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনের জন্য কোনো ব্যবস্থা না নিলে এ পোকার আক্রমণে প্রায় ৫০-৭০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়ে থাকে। কাজেই এ পোকার কার্যকরি দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।

কৃষক পর্যায়ে বর্তমান দমন ব্যবস্থা :
বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক এখন পর্যন্ত এ পোকা দমনের জন্য কীটনাশকের ওপর নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু এ পোকা সঠিকভাবে দমন করা আজো সম্ভব হয়নি। ক্রমাগতভাবে বেগুনের জমিতে কীটনাশকের বির্বদ্ধে প্রতিরোধ ৰমতা অর্জন করেছে। ফলে এ পোকা দমনে প্রকৃতপৰে কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। অপরদিকে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কৃষকের নিজের এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্য ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সমীৰায় দেখা গেছে যশোর অঞ্চলের অনেক কৃষক এক মৌসুমে বেগুন/ফসলে ৮৪ বার পর্যন্ত কীটনাশক ব্যবহার করে থাকেন। পোকার প্রাকৃতিক শত্র্বর ভূমিকা ও পরিবেশের কথা চিন্তা না করে বেগুন ৰেতে নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের যে ধারা আজো এ দেশে চলে আসছে তার পরিবর্তন একান্ত জর্বরি।

বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা :
কীটনাশকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রৰাকারী, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং ভোক্তার জন্য কম ৰতিকর এমন দমন ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। বিজ্ঞানীদের মতে একাধিক দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফসলের ৰতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, যা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা নামে পরিচিত। সমপ্র্রতি বাংলাদেশে এ পোকা দমনের জন্য অত্যন্ত সহজ, কার্যকরি এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয় সম্পন্ন একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা সুপারিশ করা হয়েছে।

বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ধাপগুলো হলো

১. সহনশীল জাতের চাষ :
বেগুনের যেসব জাত এ দেশে চাষ করা হয় তার কোনোটিই ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার প্রতিরোধ ৰমতাসম্পন্ন নয়। তবে বিভিন্ন জাতের মধ্যে এ পোকা দ্বারা আক্রমণের তারতম্য দেখা যায়। যেমন- বারি বেগুন-১ (উত্তরা), বারি বেগুন-৫ (নয়নতারা), বারি বেগুন-৬, বারি বেগুন-৭-এসব জাতে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ কম হয়। এসব জাত চাষ করে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ থেকে ফসলকে রৰা করা যায়।

২. পোকার আক্রমণমুক্ত চারা ব্যবহার :
পোকায় আক্রান্ত চারা রোপণ করলে সারা মাঠে পোকা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। কাজেই বেগুনের চারায় এ পোকার আক্রমণের লৰণ দেখা গেলে সে চারা রোপণ না করাই ভালো।

৩. সুষম সার ব্যবহার :
বেগুনের ৰেতে সুষম সার ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু আমাদের দেশের বেগুনচাষিরা অধিকাংশ ৰেত্রেই শুধু ইউরিয়া সার ব্যবহার করে থাকেন। তাও আবার অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। এতে বেগুন গাছ নরম হয়ে যায় এবং এ পোকা দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়। কাজেই এ পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ করতে হলে জমিতে সঠিক মাত্রায় সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।

৪. বেগুন ৰেত পরিষ্কার রাখা :
মাটিতে ঝরে পড়া বা গাছের সাথে লেগে থাকা বেগুনের শুকনো পাতা, আবর্জনা এবং ঘাস জমি থেকে সরিয়ে জমি পরিষ্কার রাখতে হবে। কারণ এসবের আশ্রয়ে কীড়া পুত্তলিতে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ হয়ে ফসলে আবার আক্রমণ করে।

৫. শস্যপর্যায় অনুসরণ করা :
বছরের পর বছর একই জমিতে বেগুনের চাষ করলে ওই জমিতে পোকার জীবনচক্রের বিভিন্ন স্তর থেকে যায়। ফলে এ পোকাদমন কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই শস্যপর্যায় অনুসরণ করলে অর্থাৎ একই জমিতে বারবার বেগুন চাষ না করে মাঝে মধ্যে অন্য ফসল চাষ করলে পোকার জীবনচক্র ব্যাহত হয় এবং পোকার আক্রমণ অনেক কমে যায়।

৬. পোকা আক্রান্ত ডগা ও ফল ধ্বংস করা :
প্রতি সপ্তাহে কমপৰে একবার বেগুন ৰেত পরিদর্শন করতে হবে। ফল ধরার আগে পোকার কীড়া বেগুনের ডগার ভেতরে খেয়ে ফেলে এবং আক্রান্ত ডগা শুকিয়ে যায়। কীড়া সমেত আক্রান্ত ডগা কেটে ধ্বংস করে ফেললে পোকার বংশবৃদ্ধি অনেকটা কমে যায়। আক্রান্ত ডগা কেটে নেয়ার ফলে বেগুন গাছের কোনো ৰতি হয় না। বরং কাটা স্থান হতে প্রচুর পরিমাণ নতুন ডগা গজায় এবং যা থেকে প্রচুর ফুল ও ফল হয়। পোকা আক্রান্ত ডগার মতো ফল আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথেই সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। পোকা আক্রান্ত ডগা ও ফল বেগুনের জমির আশপাশে ফেলে রাখা যাবে না। এসব হয় মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে নতুবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত ডগা ও ফল গর্বকে খাওয়ানো যেতে পারে।

৭. সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা :
পুর্বষ পোকাকে আকৃষ্ট করার জন্য স্ত্রী মথ এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে যা সেক্স ফেরোমন নামে পরিচিত। সেক্স ফেরোমন প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ তাই এটি পরিবেশের জন্য ৰতিকর নয়। এই ফেরোমন শুধু বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পুর্বষ পোকা আকৃষ্ট করতে সৰম।

তিন লিটার পানি ধারণ ৰমতাসম্পন্ন ও প্রায় ২২ সেন্টিমিটার j¤^v চার কোণাকৃতি বা গোলাকার পৱাস্টিকের পাত্র দিয়ে এই ফাঁদ তৈরি করা যায়। পৱাস্টিকের পাত্রের উভয় পাশে ১০-১২ সেন্টিমিটার চওড়া এবং ১০-১২ সেন্টিমিটার উঁচু পরিমাণ অংশ ত্রিভুজাকারে কেটে নিতে হবে। পাত্রের তলা হতে কাটা অংশের নিচের দিকে কমপৰে ৩-৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত সাবান মিশ্রিত পানি ভরে রাখতে হবে।
সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত পৱাস্টিকের ছোট টিউবে ২-৩ মিলিগ্রাম পরিমাণ ফেরোমন ভরে টিউবটি একটি সর্ব তার দিয়ে পৱাস্টিকের পাত্রের মুখ হতে এমনভাবে ঝুলিয়ে রাখতে হবে যেন টিউবটি পানি হতে মাত্র ২-৩ সেন্টিমিটার উপরে থাকে।

সেক্স ফেরোমনের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে পুর্বষ মথ পৱাস্টিক পাত্রের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ফেরোমনসহ টিউবটির চারপাশে উড়তে যেয়ে সাবান পানিতে পড়ে মারা যায়।

ফেরোমন ফাঁদ সাধারণত ১০ মিটার দূরে দূরে বেগুন গাছের ঠিক উপরে পাততে হয়। বেগুন গাছ যত বড় হবে ফাঁদের উচ্চতাও সে হারে বাড়াতে হবে। বেগুনের চারা লাগানোর ৩-৪ সপ্তাহ হতে শুর্ব করে শেষবার ফসল উঠানো পর্যন্ত ফেরোমন ফাঁদ পেতে রাখা দরকার।

সেক্স ফেরোমন ভরা পৱাস্টিকের টিউবটির মুখ সব সময়ই বন্ধ রাখতে হবে। পাত্রের তলায় রাখা সাবান পানি যেন শুকিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৮. কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করে প্রাকৃতিক শত্র্ব সংরৰণ :
বাংলাদেশে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার বেশ কয়েকটি পরজীবী ও পরভোজী পোকা শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাথালা ও ফ্লেভো-অরবিটালিস উলেৱখযোগ্য। এরা বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার কীড়া ধ্বংস করে থাকে। বেগুনের জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ রাখলে এসব পরজীবী পোকা দ্র্বত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার কীড়া ধ্বংস করে থাকে। কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করলে কেবল এসব পরজীবীই নয় বরং আরো অনেক পরজীবী ও পরভোজী পোকামাকড় যেমন- ম্যানটিড, ইয়ার উইগ, লেডি বিটল, মাকড়সা এসবের সংখ্যা দ্র্বত বেড়ে থাকে। এরা বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা ছাড়াও অন্যান্য ৰতিকর পোকা যেমন- জ্যাসিড, সাদামাছি এসবের সংখ্যাও স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করে।

৯. সীমিত আকারে কীটনাশক ব্যবহার করা
উপরে বর্ণিত পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করার পরেও যদি বেগুন ৰেতে ব্যাপক আকারে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ দেখা যায় কেবল তখনই সঠিক কীটনাশক সঠিক সময়ে সঠিকভাবে অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। গাছে বড় বেগুন থাকলে বেগুন সংগ্রহ করে কীটনাশক সেপ্র করতে হবে। কীটনাশক সেপ্র করার পরপরই বেগুন তুলে বাজারজাত করা যাবে না। কারণ এসব বিষাক্ত ফসল জনস্বাস্থ্য জন্য খুবই ৰতিকর। কীটনাশক সেপ্র করার আগেই বিষক্রিয়ার মেয়াদ কতদিন তা জেনে নিতে হবে এবং বিষক্রিয়ার মেয়াদ শেষ হলে ফসল তুলে বাজারজাত করতে হবে।

সবশেষে বলতে হয়- এককভাবে গ্রহণ করে কোনো দমন ব্যবস্থাতেই ভালো ফল পাওয়া যায় না। কাজেই এলাকার সব কৃষককে সম্মিলিতভাবে দমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে।

তথ্যসূত্র: ড. জে .সি পণ্ডিত, কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ