ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

বাংলাদেশ রবি মৌসুমে প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন সবজি উৎপন্ন হয়। রবি মৌসুমে যেসব বাহারি সবজি বাজারে পাওয়া যায় সেগুলো সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। একজন শ্রমজীবী বা কর্মঠ মানুষের দৈনিক ২৮০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়া উচিত। এর মধ্যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২২০ গ্রামের মতো সবজি খাওয়া প্রয়োজন। কিন’ আমাদের দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদিত সবজির পরিমাণ অনেক কম। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে মৌসুমে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত সবজি চারার অভাব। বাজারে যে চারা পাওয়া যায় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমানের। ফলে সবজির ফলন কম হয় এবং কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস- হয়। রোগাক্রান্ত বা দুর্বল চারা থেকে ভালো ফলন আশা করা যায় না। অনেক সময় বিভিন্ন সবজির হাইব্রিড চারা কিনে কৃষক প্রতারিত হয়। এর জন্য কৃষকরা মৌসুমে ভালো ও উন্নতজাতের বীজসংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চারা তৈরি করে নিলে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিম্নরূপ

বীজতলার জন্য স্থান নির্বাচন :
বীজতলার মাটি ও পরিবেশে বীজের সুষ্ঠু অঙ্কুরণ ও চারার সুসমন্বিত বৃদ্ধির উপযোগী হওয়া প্রয়োজন। পরিচর্যা ও অন্যান্য কারণে বীজতলা খামারবাড়ির কাছে আলোবাতাস এবং সেচ ও নিকাশ সুবিধাজনক জায়গায় করা উচিত। তাছাড়া পোকামাকড়, রোগবালাই, পশুপাখির আক্রমণ, আগাছার উপদ্রব এবং প্রতিকূল ভূপ্রাকৃতিক পরিবেশমুক্ত নিরাপদ স্থান বীজতলার জন্য নির্বাচন করা উচিত। বাণিজ্যিক বীজতলা বিপণন সুবিধাযুক্ত স্থানে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বীজতলা তৈরি :
বীজতলার জন্য স্থায়ী বা পাকা বীজতলা তৈরি করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। সাধারণ কৃষকদের জন্য তা বেশ ব্যয়সাধ্য। তারপরও যদি কোনো অবস্থা সম্পন্ন কৃষক স্থায়ী পাকা বীজতলা তৈরি করতে চান সে ক্ষেত্রে ৩ মিটার দৈর্ঘ্য, ১ মিটার প্রস’ ও ২-২.৫ ফুট উচ্চতা এ আকারের বীজতলা তৈরি করতে হবে। সাধারণত বীজতলা তৈরির জন্য বীজতলার মাটি প্রথমে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ঝরঝুরে ও নরম করতে হবে যাতে মাটির ভেতর খুব সহজেই বাতাস ও পানি চলাচল করতে পারে এবং চারার শিকড় সহজে মাটিতে প্রবেশ করে এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যরস পায়।  তারপর বীজতলার উপরের স-র সমান করে বীজ বপন করতে হবে।

বীজতলা শোধন :
বীজ বপনের আগে বীজতলার আগাছা পরিষ্কার করে মাটিতে ২-৩% ফরমালিন অথবা ডাইথেন এম-৪৫ বা কুপ্রাভিট ১-২ গ্রাম প্রতি লিটার পানি দিয়ে বীজতলায় সেপ্র করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রেখে ১০-১২ দিন পর বীজ বপন করতে হবে। এ ছাড়া খড় পুড়িয়ে বীজতলা শোধন করা যায়।

বীজতলায় সার প্রয়োগ :
৩ মি.ঢ ১ মি. আকারের বীজতলা তৈরির সময় ১০-১২ কেজি গোবর ও ৩০০-৩৫০ গ্রাম হারে টিএসপি মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। আর মাটির উর্বরতা কম হলে ৮০০-১০০০ গ্রাম হারে টিএসপি দিতে হবে। অল্পসংখ্যক চারা উৎপাদন করতে মাটির টবে, কাঠের বাক্সে অথবা এর ট্রেতে নদী/খালের দো-আঁশ পলিমাটি ও পচা গোবর ৫০:৫০ মিশ্রণ অনুপাতে ব্যবহার করা যেতে পারে। টবে ভরার আগে মিশ্রণের সাথে ৫০০ গ্রাম/১ ঘন মিটার মাটি হারে টিএসপি ও কিছু চুন যোগ করতে হবে।

বীজতলায় বীজবপন :
বীজতলায় মাটি ঝুরঝরে করে যাতে বীজ গজানোর জন্য পর্যাপ্ত রস থাকে সে দিকে লক্ষ রেখে বীজ বপন করতে হবে। বীজ ছিটিয়ে বুনলে ১-১.৫ সেমি. ওপরের মাটি সরিয়ে নিয়ে বীজ বোনার পর সে মাটি দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে। সারিতে বুনলে কাঠের ফালি দিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে খাদ্য তৈরি করে তাতে বীজ ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। বীজ বপনের আগে বীজ কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে নিলে অঙ্কুরোদগম দ্রুত হয়।কয়েকটি শীতকালীন সবজির অঙ্কুরোদগম হার হলো- টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, চীনাকপি, বরবটি, শিম ৭৫%, বেগুন ৬০%, মরিচ ৫৫%, লেটুস ৮০%।উপরে বর্ণিত হারে হিসাব করে প্রয়োজনীয় বীজ বপন করতে হবে।

বীজ শোধন :
ভিটাভেক্স-২০০ অথবা প্রোভেক্স ৩ গ্রাম/কেজি হারে বীজ নিয়ে শোধন করে বীজবপন করলে ভালো হয়। তাছাড়া তুঁতে, ডাইথেনএম-৪৫, থাইরাম ৭৫% ডাস্ট ইত্যাদি বীজ শোধন কাজে ব্যবহার করা যায়। বীজ বপনের আগে বীজতলাকে পোকামুক্ত করতে হলে বীজতলার চারদিকে সেভিন পাউডার/ডিডিটি ছিটিয়ে দিলে পিঁপড়া ও অন্যান্য পোকামাকড় বীজতলায় ঢুকতে পারে না।

চারার যত্ন :
বীজ বোনার পর বীজতলার মাটি দ্রুত শুকিয়ে না যায় এ জন্য হাপরে চাটাইয়ের তৈরি ঝাঁপ দিয়ে ঢেকে রাখা দরকার। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া চারা গজানোর আগে হাপরের মাটি ভেজা থাকায় সেচ না দেয়া ভালো। চারা গজানোর পর মাঝে মাঝে ঝাঁপ তুলে দিতে হবে এবং কিছুদিন আংশিক ছায়া প্রদান করতে হবে। চারার শিকড় যথেষ্ট বৃদ্ধি পাওয়ার পর রোদে যেন কোনো ক্ষতি না করে। চারা গজানোর অব্যবহিত আগে ও পরে বৃষ্টি থেকে চারা রক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য সাদা পলিথিন শেড ব্যবহার করতে হবে।

চারায় সার প্রয়োগ :
চারার আসল পাতা মেলতে শুরু করলে ইউরিয়া ও পটাশ (এমওপি) সার প্রয়োগ করতে হবে। এ সার দু’টি মাটিতে সরাসরি না দিয়ে সেচের পানির সাথে হালকা করে মিশিয়ে প্রয়োগ করা উত্তম। প্রথম দিকে এগুলো ১-২ গ্রাম/লিটার পানির সাথে এবং পরে ৪-৫ গ্রাম/লিটার পানির সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

কয়েকটি শীতকালীন সবজির হেক্টরপ্রতি বীজহার (গ্রাম) :
ফুলকপি ১২৫-১৫০ গ্রাম, বাঁধাকপি ১৫০-১৮০ গ্রাম, ওলকপি ৮০০-১০০০ গ্রাম, ব্রোকলি ১৪০-১৬০ গ্রাম, চীনাকপি ২২৫-২৫০ গ্রাম, বেগুন ২৫০-৩০০ গ্রাম, টমেটো ২৫০-৩০০ গ্রাম, মরিচ (দেশী) ২০০-২২৫ গ্রাম এবং লেটুস ২০০ গ্রাম।

চারার রোগ দমন :
চারা গজানোর পর কচি চারা রোগাক্রান- হতে পারে। অঙ্কুরোদগমরত বীজ আক্রান্ত হলে তা থেকে আদৌ চারা গজায় না। বীজ থেকে চারা গজানোর পর কাণ্ডের মাটি সংলগ্ন স্থানে পচে গিয়ে নেতিয়ে পড়াকে ড্যাম্পিং অফ বলে। বীজতলার মাটি সব সময় স্যাঁতসেঁতে থাকলে ফাইটোপথোরা, পিথিয়াম, ফিউজেরিয়াম ইত্যাদি ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। রোগ দমনের জন্য চারা গজানোর পর সেচের পানির সাথে মারকিউরিক ক্লোরাইড, ক্যাপটান অথবা কপার অক্সিক্লোরাইড প্রতি লিটারে ১ গ্রাম হারে বিভিন্ন ছত্রাকনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।বীজতলার পরিচর্যা : সকাল-বিকেল বাঁশের চাঁটাইয়ের ঢাকনা সরিয়ে পর্যাপ্ত আলোবাতাসের ব্যবস’া করতে হবে। সেচের প্রয়োজন হলে ঝরনা দিয়ে সেচ দিতে হবে। চারার বয়স ১ সপ্তাহ হলে ঘন জায়গা থেকে দুর্বল চারাগুলো তুলে পাতলা করতে হবে। অনেক সময় বৃষ্টিতে মাটিতে চটা ধরলে সেগুলো কাঠ বা নিড়ানি দিয়ে খুব সতর্কতার সাথে আলগা করতে হবে।

রোপণের জন্য চারা তোলার সময় :
একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চারা বীজতলায় রাখা যায়। এর বেশি সময় ধরে চারা রাখলে ঐ চারা থেকে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না।

চারা তোলার পদ্ধতি :
বীজতলা থেকে চারা তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে বীজতলায় একটি হালকা ধরনের সেচ দিতে হবে। এতে চারা তোলার সময় শিকড় ছেড়ার ঝুঁকি কম। চারা তোলার জন্য সূক্ষ্মমাথা কাঠি দিয়ে মাটিতে আলতোভাবে চাপ দিলে চারাগুলো খুব সহজেই উঠে আসবে।

চারা সংরক্ষণ ও পরিবহন :
বীজতলা থেকে চারা তোলার পরপরই রোপণ করা সম্ভব না হলে চারা ঠাণ্ডা অন্ধকারযুক্ত স্থানে ২৪-৩৬ ঘণ্টা পর্যন- সংরক্ষণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে চারাগুলো গাদাগাদি না করে ছড়িয়ে রাখা ভালো। মাঝে মাঝে পাতায় পানির ছিটা দিয়ে বা নরম কাদাযুক্ত স্থানে গোড়া রেখে দিলে ভালো হয়। শীতকালীন মৌসুমে বীজ থেকে চারা উৎপাদন একটি লাভজনক প্রক্রিয়া। এ সময় কৃষকরা ভালো চারা উৎপাদন করে এক দিকে যেমন ভালো ফলন পাবে অন্য দিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। হিসাব করে দেখা গেছে, শীতকালীন সবজির চারা তৈরি করে মৌসুমে ১ঃ৫ অনুপাতে অর্থাৎ ১০০০ টাকা খরচ করে কৃষকরা ৪০০০ টাকা লাভ করতে পারবেন।

তথ্যসূত্র: মো. রফিকুল ইসলাম, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক গম গবেষণা কেন্দ্র, শ্যামপুর, রাজশাহী