ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

আগেকার দিনের চাষবাস শুধু স্থানীয় জাতের বীজ ব্যবহার করেই করা হতো এবং একই জমিতে বারবার চাষ করারও প্রয়োজন হতো না। তখন কোনো প্রকার রাসায়নিক সারের ব্যবহারও করতে হতো না। কারণ, স্থানীয় জাতের ফসলের খাদ্য উপাদানের চাহিদা মিটে যেত মাটিতে মজুদ খাদ্য ভাণ্ডার থেকেই এবং পরবর্তী সময়ে যখন এ জমি বিশ্রামে থাকত তখন এ জমি প্রকৃতিগতভাবে পরবর্তী ফসলের জন্য চাষ উপযোগী হয়ে যেত। জৈব পদার্থের পচনক্রিয়া এবং খাদ্যভাণ্ডার হয়ে উঠত পরিপূর্ণ।

কিন্তু দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসে গেছে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবিত হয়েছে উন্নত ও শঙ্করজাতের বীজ। এসব জাতের বীজ নিয়ে চাষ শুরু হওয়াতেই সম্ভব হয়েছে এ বিপুলসংখ্যক জনগণের খাদ্যের জোগান দেয়া। দেখা গেছে, অধিক ফলনদায়ী গাছের খাদ্যের চাহিদাও প্রচুর, যা মাটির মজুদ খাদ্য ভাণ্ডারের দ্বারা সংকুলান করা সম্ভব নয়। তাই শুরু হয়েছে রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং দেশের সব জমিতে এজন্য আনা হলো লাগাতার চাষবাসের আওতায়।

রাসায়নিক সার ব্যবহারের গবেষণালব্ধ ফল থেকে জানা গেছে, সঠিক পরিমাণে ও সুষম উদ্ভিদ খাদ্য উপাদানের প্রয়োগ কৃষি উপাদানের ধারাবাহিকতা এবং জমির উর্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রয়োজনীয় কোনো একটি উদ্ভিদ খাদ্য উপাদানের অভাব ফসলের মান ও উপাদানকে ব্যাহত করে। জমিতে সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে এ ধরনের অসামঞ্জস্য চলতে থাকলে কৃষকরা ভবিষ্যতে তাদের ফসলের প্রার্থিত ফলন ও উপযুক্ত আর্থিক লাভ হতে বঞ্চিত হবেন বলেই আশা করা যাচ্ছে।

উৎপাদিত ফসল মাটি থেকে বিপুল পরিমাণ উদ্ভিদখাদ্য উপাদান তুলে নেয়। রাসায়নিক সারসহ অন্যান্য উৎস থেকে আমরা যে পরিমাণ উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদান জমির মাটিতে সরবরাহ করে থাকি, এ অপসারণের পরিমাণ তার থেকে অনেক বেশি। তাই আমাদের দেশের মাটিতে সঞ্চিত উদ্ভিদ খাদ্য ভাণ্ডার ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে চলেছে। অদূর ভবিষ্যতে এ কৃষি উৎপাদনের হারও হ্রাস পেতে পারে। আবার দেখা গেছে, উপর্যুপরি জমিতে কয়েক বছর জৈব বা জীবাণুসার বা সবুজ সার ইত্যাদি ব্যবহার না করে শুধু রাসায়নিক সার প্রয়োগ করে গেলে জমির মাটি তার পানি ধারণ ক্ষমতা এবং আয়ন বিনিময়ের নিয়ন্ত্রণ হারায়। মাটিতে জৈব পদার্থ থেকে উৎপাদিত হিউমাসের পরিমাণ ক্রমে কমতে থাকে যার ফলে উপকারী জীবাণু সংখ্যা দ্রুত নির্মূল হয়ে শেষে জমি অনূর্বর ও পাথরে জমিতে পরিণত হয়। তাই এ অবস্থার মোকাবেলার জন্য প্রতিটি চাষে রাসায়নিক সারের সঙ্গে পরিমিত পরিমাণে জৈব জীবাণুসার প্রয়োগ করে গেলে জমির ভৌত অবস্থার অবনতি ঘটার সম্ভাবনা থাকে না, মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখা দরকার সেগুলো হচ্ছে- উন্নত মাটির গঠন,মাটিতে বায়ু চলাচলের পরিমাণ বৃদ্ধি, পানি ধারণক্ষমতার বৃদ্ধি, সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা, মাটিতে হিউমাসের পরিমাণের বৃদ্ধি এবং যথেষ্ট পরিমাণ উপকারী জীবাণুর উপস্থিতি। মাটিতে উপকারী জীবাণু সংখ্যা বৃদ্ধিতে একদিকে যেমন উদ্ভিদ খাদ্যের জোগান হবে, অন্যদিকে অজৈব সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং মাটিতে উপস্থিত উদ্ভিদ খাদ্যও গাছের গ্রহণযোগ্য অবাস্থায় আসবে। তাই, যে মাটিতে অধিক পরিমাণ উপকারী জীবাণু থাকে সে মাটিই উর্বর মাটি বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। কারণ, জৈব কার্বনের উপস্থিতিসহ উন্নত ভৌত অবস্থা মাটিতেই অধিক পরিমাণ উপকারী জীবাণুর অবস্থান হয়ে থাকে। ফলে মাটির জৈব কার্বনের পরিমাণ বৃদ্ধিতে জৈব সার ব্যবহার এবং মাটিতে উপকারী জীবাণুর সংখ্যা বৃদ্ধিই হচ্ছে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার মূল চাবিকাঠি।

সুসংহত উদ্ভিদ খাদ্যোপাদানের ব্যবস্থাপনার মূল অর্থই হচ্ছে উদ্ভিদ খাদ্য উপাদান সরবরাহ ও বিভিন্ন উৎসের ব্যবহার। যার লক্ষ্যমাত্রাই হচ্ছে মাটির বজায় রেখে অধিক ফসল ঘরে তোলা। কৃষকরা এ তত্ত্বে সহমত পোষণ করেছেন এবং তাদের নিজেদের জমিতেও এ অবস্থা উপকৃত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন আসছে, মাটিতে সার প্রয়োগের উৎসগুলো কী কী। সেগুলো হচ্ছে রাসায়নিক সার গোবর সার, আবর্জনা, সার, খৈল, প্রাণিজ সার এবং জীবাণু সার। এগুলো নিয়ে এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

রাসায়নিক সার : উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও ফলন পর্যন্ত প্রয়োজন হয় ২০টি বিভিন্ন মৌলের। তারমধ্যে বিশেষ কার্যকারী মৌলগুলো হচ্ছে কার্বন, অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, সালফার, লোহা, তামা, দস্তা বোরন, মলিবডেনাম ইত্যাদি। যখন এ মৌলগুলো সরবরাহের জন্য সরল অজৈব পদার্থ প্রয়োগ করা হয় তখন তাকে আমরা বলি রাসায়নিক সার। এ সার অতি সহজেই বাজারে পাওয়া যায় এবং এদের প্রয়োগে খুব কম সমেয়ই তার ফল পাওয়া সম্ভব হয়। রাসায়নিক সার মাটিতে প্রয়োগের পর এদের বিবর্তনের প্রযোজন হয়, মাটিতে উপস্থিত জীবাণু দ্বারাই সম্পন্ন হয়ে থাকে। নতুবা তা গাছের গ্রহণযোগ্য অবস্থায় আসতে পারে না।

গোবর সার : বেশি ব্যবহৃত জৈব সার হল গোবর সার। বায়োগ্যাস পস্ন্যান্টে থেকে যা অবশেষে পাওয়া যায়, সেটি খুব ভালো জৈব সার। তাছাড়া, গর্ত করে তাতে গোবর পচিয়ে জৈব সার প্রস্তুত করাও বহুল প্রচলিত। বর্তমানে পাওয়ার টিলারের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বহু কৃষক গবাদিপশু পালন করা ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে গোবরের অভাব সর্বত্র এবং দামেও বেশি। গোবর সারের প্রয়োগ মাটির ভৌত অবস্থার উন্নতি ও উপকারী জীবাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটিয়ে মাটিকে উর্বর করে তুলতে পারে এবং গাছকে অল্প পরিমাণে প্রায় সব পুষ্টি উপাদানই সরবরাহ করতে পারে।

সবুজ সার : এটি দু’ভাবে করা যেতে পারে। একটি হলো অ্যাজোলা, ধঞ্চে, শন ইত্যাদি শস্যের চাষ করে কচি অবস্থায় ফুল আসারসময় লাঙ্গল দিয়ে জমিতে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া যেতে পারে। অন্য উপায়টি হলো, বাবুল, ধঞ্চে, বক, গস্নাইরিসিডিয়া, ক্যাসিয়া প্রভৃতি গাছের পাতা নরম ডালসহ সংগ্রহ করে কিংবা চৌবাচ্চায় অ্যাজোলা চাষ করে সে এ্যাজোলা মাটিতে মেশাতে হবে এবং পচে যাওয়ার পর চাষের কাজ শুরু করা। খালি জমির অভাব এবং প্রয়োজনের তুলনায় কম পাওয়া যায় বলে এ সার ব্যবহারের প্রচলন ততটা হয়নি।

আবর্জনা সার : এ সার অল্প চেষ্টায়ই করা যায়। এর জন্য দরকার একটি গর্ত খোঁড়া ও উপরে একটি ছাইনির ব্যবস্থা করা। বাড়ির আশপাশে যত ধরনের আবর্জনা পাওয়া যায় যেমন সবজির খোসা, মাছের আঁশ ও কাঁটা থেকে শুরু করে উঠোন ঝাঁটানো গাছের পাতা পর্যন্ত সবই এ গর্তে ফেলতে হবে। এ জমানো আবর্জনার পচনক্রিয়া করতে কিছু ইউরিয়া ছিটিয়ে দেয়া যেতে পারে। এ সার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পাওয়া যায় বলে এর প্রচলন ব্যাহত হয়ে গেছে।
খৈল : বিভিন্ন তেলবীজ তৈল নিষ্কাশন করার পর যা থাকে তা হলো খৈল। জৈব সার হিসেবে খৈলের ব্যবহার খুব ভালো। নিম, করঞ্জ ও মহুয়ার খৈলও বিশেষ উপযোগী। এতে পোকার উপদ্রবও কমানো যায়। খৈলের দাম বেশি হওয়ার দরুন এর ব্যবহার খুব একটা হয় না।

প্রাণিজ সার : হাড় গুঁড়া বা বোন মিল, মিল, ফিশমিল ইত্যাদি ভালো জৈব সার। এ সারও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পাওয়া যায়, তাই এর ব্যবহারের প্রচলন কম।

জীবাণু সার : জীবাণু সার হচ্ছে গাছের ব্যবহার উপযোগী নানা জাতীয় জীবাণুর জীবন্ত কোষসমৃদ্ধ বস্তু যা গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদনগুলোকে নানারকম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সহজলভ্য অবস্থায় গাছকে জোগান দেয় ও গাছের পুষ্টি সাধনে সাহায্য করে। জীবাণু সার চাষিদের সবচেয়ে কম দামি উপকরণ।

জীবাণু সার ব্যবহারের উপকারিতা :

* এ সার ব্যবহারের ফলে নাইট্রোজেনসারের ব্যবহার কমানো যাবে। মাটির ফসফেট সহজলভ্য হবে।
* মাটিতে গাছের পুষ্টি বজায় থাকবে।
* মাটির জীবাণুর বৃদ্ধি ফলে উদ্ভিদ খাদ্যের আয়ন-ব্যয়ন প্রক্রিয়া বাড়বে।
* মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়বে।
* গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
* মাটির পানিরধারণ ক্ষমতা ও অন্যান্য ভৌত অবস্থার উন্নতি ঘটবে।
* ভিটামিন ও হরমোন নিঃসরণ করে গাছের বৃদ্ধি ঘটাতে সাহায্য করবে।
* একরপ্রতি গাছকে ১০-১২ কেজি নাইট্রোজেন জোগান দেবে।
* ফসলের ফলন ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং
* চাষের খরচ কম হবে।

উপরোক্ত  জৈব সারগুলোর মধ্যে জীবাণুসারই একমাত্র দামে পাওয়া সম্ভব যার উপকারিতা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেলেও দীর্ঘস্থায়ী এবং পরবর্তী চাষেও তার গুণাবলী লক্ষণীয়। তাছাড়া আছে কেঁচো সার যা সহজলভ্য। এর সরবরাহ কোথাও কোথাও শুরু হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে এটি একটি জনপ্রিয় জৈব সার হিসেবে গণ্য হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

জৈব কৃষিতে দু’টি কথা বলা হয়েছে- জৈব পদার্থের ব্যবহার ও রাসায়নিক পদার্থের পরিহার। কারণ, রাসায়নিক সারের দাম দিন দিন বাড়ছে এবং মাটি ও বায়ুমণ্ডলের পরিবেশ দূষণকারী হিসেবে কাজ করছে। কাজেই উদ্ভিদ খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে জৈবসার প্রয়োগ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াবে।

তথ্যসূত্র: আফতাব চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ব্লক-এ, শাহজালাল উপশহর, সিলেট