ক্যাটেগরিঃ কৃষি

বাংলাদেশের বন্যা-বিমুক্ত জমিগুলোর অধিকাংশ যে শুষ্ক মৌসুমের প্রায় সবটুকু পানি ব্যয় করে বোরো ধান উৎপাদনে নিয়োজিত করা হচ্ছে, এটা কি সঠিক কাজ হচ্ছে? দেশের বন্যামুক্ত জমিগুলোর অপর এক অংশ যে, সারাবছর ধরে নিয়োজিত রাখা হচ্ছে ইু উৎপাদনে, এটা কি সঠিক কাজ করা হচ্ছে? দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফল উৎপাদন উপযোগী জমিগুলোর অধিকাংশ প্রায়-ই পতিত অবস্থায় রাখা হচ্ছে এটা কি ঠিক হচ্ছে? চা বাগানগুলোর বেশ কিছুটা এলাকা পতিত অবস্থায় রাখা হচ্ছে, এটা কি ঠিক হচ্ছে? এমন কি দেশের বনাঞ্চলের বহুস্থানে যে কাষ্ঠ প্রদানকারী বৃড়্গের স্থানে ফল উৎপাদক বৃড়্গ জন্মিয়ে যুগপৎ দেশের পরিবেশ সংরড়্গরণ ও দেশবাসীর পুষ্টি উন্নয়ন ও অর্থার্জনের পথ সুগম করা সম্ভব, এমনটি না ভেবে আমরা কি অন্যায় করে ফেলছি না? উপরোক্ত পাঁচটি প্রশ্নের শেষের চারটির সদুত্তরগুলো এসে যাবে দেশজুড়ে ফল উৎপাদন কর্মকাণ্ড চালু করে দেয়ার সপড়্গে। প্রথম প্রশ্নের সদুত্তর যাবে দেশে অর্ধেক পরিমাণ ডাল, তেলবীজ জাতীয় শস্য, গম, আলু ও রবি শাক-সবজি, মসলা উৎপাদনের পড়্গে। আমি শেষে চারটি প্রশ্নের কথা বিবেচনা করেই আমার এই প্রবন্ধের শিরোনামরূপে লিখেছি “বাংলাদেশ হোক একটি ফল উৎপাদক দেশ।”

যারা বাংলাদেশের কৃষি নিয়ে কিছুটা হলেও চিনত্মাভাবনা করে থাকেন, তারা সম্ভবত আমার এই লেখার উক্ত অংশেই আমার বক্তব্যের কার্যকারণ বা তাৎপর্য লড়্গ করে ফেলেছেন।

ফল উৎপাদনের পড়্গে উৎসাহ উদ্দীপনা
সামপ্রতিক সময়ে খবরের কাগজে প্রায়ই আমরা কৃষি উৎপাদন এলাকাতে নানা ধরনের সাকসেস স্টোরি তথা সফলতাপূর্ণ কার্যকলাপের বিবরণ লড়্গ করছি। এগুলোর বেশ কিছুটা হচ্ছে নতুন নতুন ফলের বাগান স্থাপন করা সম্পর্কিত। উদ্যোক্তাদের মধ্যকার বেশিরভাগ শিড়্গিত।

বাংলাদেশে বর্তমানে আছেন এমন অসংখ্য শিড়্গিত ব্যক্তি যারা ফল বাগানের বিষয়ে অতিশয় উৎসাহী; কিন্তু কৃষক তালিকাভুক্ত হতে অনুৎসাহী। তারা গরম্নর কাঁধে লাঙ্গল-জোয়াল জুড়ে দিয়ে যে জমি চাষ করা সেটি জানে না, ধানড়্গেতে পদযুগলের নিম্নভাগ কাঁদায় ডুবিয়ে দিয়ে ধানের চারা-রোপণের কাজ করতে জানে না অথবা করতে চান না; ধান-পাটের ড়্গেত নিড়াতে পারেন না; ড়্গেতে সার প্রয়োগ করতে কিংবা কীটনাশক প্রয়োগ করতে পারেন না।
বলতে গেলে, তারা হয়তো নিজেদেরকে তথাকথিত চাষাভুষারূপে পরিচিত করতে কুণ্ঠাবোধ করেন। অথচ তারা ফলবাগান করার ড়্গেত্রে অতিশয় উৎসাহী। বিষয়টা কী? এই প্রসঙ্গে এ কথা বলা যেতে পারে যে, ফল বাগান স্থাপন করতে যে কাউকে একজন লব্ধ-প্রতিষ্ঠ কৃষক হতেই হবে এমন নয়। কারণ অতীতে কখনো চাষবাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন না এমন মানুষও প্রায় অনায়াসেই ফল বাগান নিয়ে কাজ করতে পারবেন; কখনোই লাঙ্গল-জোয়াল হাতে নেননি এমন মানুষও ফল বাগানের কাজে সিদ্ধহসত্ম হতে পারবেন।

আমার কৃষিবিদ-কাম-উদ্যানতত্ত্ববিদরূপী ভূমিকা

আজ আমার জীবনের প্রায় সায়াহ্নবেলায় উপনীত হওয়ার পর আমার কোনো দ্বিধা নেই একটি স্বীকারোক্তি করতে। আমি ছিলাম চাঁদপুরে জন্মগ্রহণকারী পিতামাতার সনত্মান। তবে আমার জন্মটি হয় ঢাকা নগরীতে; শহরের পার্শ্ববর্তী কোনো শহরতলীতে নয়; একেবারে নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বংশাল এলাকাতে। প্রাইমারি পর্যায়ের শিড়্গা গ্রহণ করার পরে নবাবগঞ্জের জগৎমোহন মিউনিসিপাল প্রাইমারি স্কুলে; হাইস্কুলের প্রথমাংশ (৫ম-৭ম শ্রেণী) অতিবাহিত হয় আজিমপুর ওয়েস্ট অ্যান্ড হাইস্কুলে এবং দ্বিতীয়াংশ (৮ম-১০ম শ্রেণী) অতিবাহিত হয় তদানীনত্মন ট্রেনিং কলেজের ল্যাবরেটরি স্কুলরূপে ব্যবহৃত আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। তৎপরবর্তী আইএসসি পর্যায়ের দু’টি বছর অতিবাহিত হয় কলকাতা মহানগরীর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। অর্থাৎ আমি প্রায় সম্পূর্ণরূপেই ছিলাম একটি ‘টাউনস বার্ড তথা শহুরে কাক।

এরূপ এক শহরে ব্যাকগ্রাউন্ড বা পটভূমি বিশিষ্ট একটি কিশোর যখন তার বিএ পাস পিতার (যার চাকরিজীবন কার্যে সম্পূর্ণরূপে ঢাকা ও কলকাতা মহানগরীতে) ইচ্ছানুসারে ঢাকার শহরতলী তেজগাঁওস্থিত কৃষি কলেজে ভর্তি হন, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন হয়েছিল? আর তার পরই যখন প্রায় এক মাসব্যাপী একটি ট্রায়েল কেবলমাত্র প্র্যাকটিক্যাল কর্মকাণ্ডবিশিষ্ট কোর্সের মধ্য দিয়ে তাকে তার কৃষিতে অধ্যয়নের উপযুক্ততা পরীক্ষা করা হয়, তখন তার মানসিক ও দৈহিক অবস্থা কিরূপ পর্যায়ে উপনীত হয়ে? বলাবাহুল্য, প্র্যাকটিক্যাল কাসগুলো নেয়া হয় শুধু এগ্রোনমি ও এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি বিষয়ে। এটা বলার অবকাশ রাখে না, যে আমি অবশ্যই কোনোমতে ঐ অর্ডিয়েন বা অগ্নিপরীক্ষায় উতরিয়ে গিয়েছিলাম। নতুন আমার ‘কৃষিবিদরূপী পরিচিতি আসে কেমন করে? তারপর কৃষি কলেজের গ্রাজুয়েশন লাভের পর হর্টিকালচার ডিভিশনে নিয়োগ প্রাপ্তি আমার জন্য কেবল যে হয় একটি মধুর-চমক, শুধু তাই নয়; এটি আমার সমগ্র জীবনকে পরিচালিত করে হর্টিকালচার তথা উদ্যান এলাকার মধ্য দিয়ে। সেটি বজায় রয়েছে আজ অবধি। আজ যে লিখতে বসেছি এমন একটি প্রবন্ধ যার শিরোনাম বাংলাদেশকে দেখতে চাই একটি অগ্রবর্তী ফল উৎপাদক দেশ রূপে, তার ভিত্তিতে রয়েছে উদ্যান এলাকাতে আমার প্রভূত পরিমাণ লেখাপড়া, গবেষণা, শিড়্গাদান এবং সামগ্রিকভাবে কৃষি উন্নয়ন নিয়ে চিনত্মাভাবনা।

শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র হচ্ছে ফলবাগান

মনে হতে পারে, আমি ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইতে শুরু করেছি। ঠিক তা নয়। আমি যে হাঁসের মতো পুকুরের পানির কাদাময় এলাকা পর্যন্ত ডুব দিয়ে দিয়েও পানির উপরিভাগে উঠে এসেছি গায়ে কাঁদা না লাগিয়ে কিংবা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে; অনেকটা তেমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে এ দেশের হাজার হাজার শিড়্গিত বেকার-যুবকদের সম্মুখে।

তারা অনেকটাই শর্টকাট পদ্ধতিতে উদ্যান এলাকায় অবতীর্ণ হতে পারবেন কৃষির আপাতদৃষ্টিতে কাঁদাময় স্থানগুলোতে অবগাহন না করেই। এমন এক পরিস্থিতি বিশেষভাবে বিরাজ করছে ফলোদ্যান এলাকাতে।

এই এলাকার জমিগুলোতে ফল বাগানে রূপানত্মরিত করার যৌক্তিকতা
বর্তমান দেশের চিনি উৎপাদনকে নাকি বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। লোকসান দিয়ে দিয়ে। যতই দিন যাচ্ছে এবং দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে, ততই যেন অধিকতর পরিমাণ চিনি আমদানি করা হচ্ছে। কারো কারো মতে, দেশের চিনি উৎপাদনের কর্মকাণ্ডটি নাকি নিরর্থক হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ বলেন, ইুতে নিয়োজিত সোয়া ৪ লাখ একর জমিতে ইুর পরিবর্তে ফল উৎপাদন করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত হবে। কেউ কেউ বলেন, এগুলোতে ইু চাষ বন্ধ করে দিয়ে এগুলোর একাংশকে ব্যবহার করা হোক তিন ফসলি জমিরূপে, যেখানে উৎপাদন করা হবে ডাল, তেলবীজ, মসলা, শাকসবজি ও ফলমূল আর অপরাংশকে পরিণত করা হবে দীর্ঘস্থায়ী বৃক্ষজাতীয় ফলের বাগানে।

বলাবাহুল্য, দেশের মোট ইু উৎপাদনের জমির প্রায় অর্ধেক অংশ রয়েছে রাজশাহী বিভাগে, যার প্রধানতম অংশ অবস্থিত বৃহত্তর রাজশাহী ও দিনাজপুর জেলায়। তৎপরবর্তী স্থান বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, ঢাকা ও পাবনা জেলায় এটা সর্বজনবিদিত যে, এসব জেলার প্রধানত বন্যা বিমুক্ত ও উচ্চ জমিগুলোই ইু উৎপাদনে নিয়োজিত। এসব জমির অধিকাংশ দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি ফলবান গাছের জন্য সবিশেষ উপযোগী। অপরদিকে বৈজ্ঞানিকভাবে নাকি এটা প্রমাণও হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশের জলবায়ু ও মাটি ইুর উচ্চফলনশীলতা অর্জন এবং এখানে উৎপাদিত ইু থেকে তৈরি চিনির পরিমাণ সনেত্মাষজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই। সুতরাং সংশিস্নষ্ট কর্তৃপড়্গ হয়তো সব দিক থেকে ভালোভাবে বিচার-বিবেচনা করে, ইুর এলাকাগুলোকে ফলবাগানে রূপানত্মরিত করার পড়্গে মত দেবেন।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি জমিগুলোকে ব্যবহার করা হোক ফল উৎপাদনে

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার প্রায় সবটা, চট্টগ্রাম জেলার অনেকাংশ এবং বৃহত্তর সিলেট জেলার বেশ কিছুটা বিভিন্ন প্রকার ফল উৎপাদনের উপযোগী। কয়েক যুগ আগেও আমি অনেকটা এভাবে লিখেছিলাম; বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল হচ্ছে এ দেশের ভবিষ্যৎ ফল বাগান। এত দিন পরে লড়্গ করছি যে, আমার ঐ কথায় কেউ কান দেননি। অন্যেরা যা-ই করম্নন না কেন, আমি বলে যাব আমার কথা। দেশের সংশিস্নষ্ট নীতি-নির্ধারকরা যেন আমার কথায় মত দেন, সেজন্য কৃষিকথা মারফতে আমার কথার পুনরাবৃত্তি করছি। উলেস্নখযোগ্য যে, আমি আমার প্রণীত সমপ্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষির জন্য চাই একটি মাস্টার পস্ন্যান’ শিরোনামযুক্ত গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশেষত ‘পূর্বাঞ্চলে আম উৎপাদনের অবস্থা ও সুযোগ-সম্ভাবনা’ নিয়ে বেশ কিছুটা আলোচনা উপস্থাপিত করেছি। মূল প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়েছিল এডাব সংবাদ নামক সাময়িকীর ১৯৮৭ সনে।

প্রকৃতপড়্গে, বাংলাদেশের শুধুমাত্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলটিও দেশের সাংবাৎসরিক ফলের চাহিদার ৪০-৫০% এরও অধিকাংশ পূরণ করার মতো সম্ভাবনা সম্পন্ন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, বর্তমানে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে এই অঞ্চলটি দেশের মোট ফল উৎপাদনের মাত্র ২৭% এর দাবিদার।

বিবিএস কর্তৃক পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী ২০০৩-০৪ সনে দেশের বিভিন্ন ফলের উৎপাদনের নিম্নরূপ অংশ ছিল বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের ভাগে যেমন- কলা-১.৫৭ লাখ টন (মোট কলা উৎপাদনে (২৮%), আম-৪৬ হাজার টন (১৯%), আনারস ১.১৩ লাখ টন (৫৩%), কাঁঠাল ৭১ হাজার টন (২৫%), পেঁপে-১১ হাজার টন (২২%), তরমুজ- ফুট ২৭ হাজার টন (৩০%), লিচু ৩ হাজার টন (২০%), পেয়ারা ২৭ হাজার টন (৩৩%), কুল ৯ হাজার টন (৩৯%), বাতাবিলেবু ৬.৩ হাজার টন (৩৪%), লেবু ৭ হাজার টন (৩৮%), অন্যান্য লেবুজাতীয় ফল ৪.৭ হাজার টন (৩৮%) এবং অন্যান্য ফল ৭.৭ হাজার টন (৩০%)। দেশের মোট ফল উৎপাদন যেখানে ছিল ১৭.৭৪ লাখ টন, সেখানে বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের ফলোৎপাদন ছিল ৪.৮৪ লাখ টন। সঠিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাসত্মবায়নের মাধ্যমে দেশের মোট ফল উৎপাদন পাঁচ বছরের মধ্যে উন্নীত হতে পারে ২৫-৩০ লাখ টনে, এর মধ্যে ১২-১৩ লাখ টন পরিমাণ বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগের অংশে।

চা-বাগানের এবং সরকারি খাস জাতীয় পতিতাংশের ব্যবহার

এখন সময় এসেছে বন্যামুক্ত পতিত জমিগুলোর খোঁজখবর নেয়ার, হিসাব-নিকাশ করার। ওয়াকেবহালদের মতে, বর্তমান চা-বাগানগুলোতে নাকি পড়ে রয়েছে হাজার হাজার একর জমি যা অনাবাদি অবস্থায়। বলাবাহুল্য এসব জমির প্রায় সবগুলোই কোনো না কোনো ফল উৎপাদনের উপযোগী। তবে আমাদের দেশের চা-এর ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনা করে এবং দেশকে চা-রফতানিকারক দেশের স্থলে চা আমদানিকারক দেশে রূপানত্মরিত হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে চা এস্টেটগুলোর দায়িত্ব হবে তাদের বাগানে কোনো জমি ফেলে না রাখা। কোনো কোনো ড়্গেত্রে বর্তমানে অব্যবহৃত জমিগুলোকে রূপানত্মরিত করা যেতে পারে ফলের আবাদে। উদাহরণস্বরূপ উলেস্নখ করা যায় আনারস, কমলালেবু, কাঁঠাল ও আম বাগানের কথা।

অনেকের ধারণা যে, বাংলাদেশের মতো এতটা ল্যান্ড-হাংগরী কান্ট্রি তথা জমির অপ্রতুল দেশেও রয়েছে হাজার হাজার একর সরকারি খাস জমি। এগুলোর কতকাংশ নাকি চলে গেছে বেআইনি দখলদারদের হাতে; আর কতকাংশ নাকি স্রেফ পতিত অবস্থায় রয়েছে। সম্ভবত এসব খাস জমির অধিকাংশই বন্যা বিমুক্ত এবং ফলোৎপাদনের কাজে নিয়োজিত করার উপযোগী। আমরা কি করতে পারি না উক্ত খাস জমিগুলো উদ্ধার করার যৌক্তিকতা নিয়ে চিনত্মাভাবনা এবং উদ্ধারকৃত জমিগুলোর সদব্যবহারের কথা! জমিগুলোকে কি লিজ দেয়া যায় না সম্ভাব্য ফলের আবাদকারীদের কাছে।
বনায়ন বনাম ফলায়ন

এই উপ-শিরোনামে আমি অতীতে কিছু কিছু আলোচনা করেছি-যা কৃষিকথায় বা অন্যত্র স্থান পেয়েছে। আবারো কথাটা উত্থাপিত করছি অন্যভাবে। বনায়ন-এর অনত্মর্ভুক্ত সেগুন, শাল, গামার, নাগেশ্বর, মেহগনি ইত্যাদি কাঠ উৎপাদক বৃড়্গগুলো যেমন পরিবেশবান্ধব, ফলায়নের অনত্মর্ভুক্ত আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, পেয়ারা, জামরম্নল, সফেদা ইত্যাদি ফল উৎপাদক বৃড়্গগুলোও তেমন পরিবেশবান্ধব। পার্থক্য এই যে, প্রথমোক্ত বৃড়্গগুলোর বেলায়, মালিককে অপেড়্গা করে বসে থাকতে হয় দীর্ঘকাল ধরে যতদিন না বৃড়্গগুলোর প্রধানকাণ্ড অর্থনৈতিক দিক থেকে ফলপ্রসূ কাঠ প্রদানকারী পর্যায়ে পৌঁছে না যায়। এটা হতে পারে কমপড়্গে ১০ বছর থেকে ৩০-৪০ বছর পর্যনত্ম। অপরদিকে শেষোক্ত বৃড়্গগুলোর বেলায়, কখনো কখনো বৃড়্গগুলো ফলপ্রসূ হতে শুরম্ন করে দেয় রোপণের দু-তিন বছরের মধ্যেই। যতই দিন যায় ততই বৃড়্গের আকার ও ফল উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এরূপ অবস্থা বিবেচনা করলে যে কোনো সাধারণ লোকই আমাদের দেশের স্বল্প পরিমাণ কিন্তু মহামূল্যবান জমিগুলোকে ফলবান বৃড়্গ জন্মানোতে নিয়োজিত করার পড়্গে মত দেবেন। অপরপড়্গে, বর্তমানে দেশের সর্বাধিক পরিমাণ বন্যামুক্ত জমি (লাখ লাখ একর জমি) ধরে রাখা আছে বন এলাকাতে।

এই যে, একটি পরস্পর বিরোধী পরিস্থিতি, এটা নিয়ে কি আমরা কোনো প্রকার চিনত্মাভাবনাই করব না? যদি করি, তাহলে অবশ্যই আমাদের বনাঞ্চলের ফল উৎপাদন উপযোগী একটি বৃহৎ অংশকে ফলবান বৃড়্গ রোপণে নিয়োজিত করতে এগিয়ে আসবো।

উপসংহার

পাঠক যদি আমার এই ুদ্র প্রবন্ধের সবটুকু পাঠ করেন, তবে তিনি প্রবন্ধটির শিরোনামের যথার্থতা উপলব্ধি করতে পারবেন। যেসব কাজগুলো করতে হবে তার সবগুলোই নীতিনির্ধারণী এবং নির্ধারণ করা নীতিগুলোর বাসত্মবায়ন ব্যবস্থা।
আবারো এ কথা জোর দিয়ে বলতে চাই যে, ফলোৎপাদনের কঠোর ও প্রচণ্ডরূপ কর্মকাণ্ডের মধ্যে থাকবে দেশের অসংখ্য শিড়্গিত বেকার যুবককে এ কাজে সম্পৃক্তকরণের ব্যবস্থা। অনেকড়্গেত্রে শিড়্গিত বেকার যুবতী, এমনকি মধ্যবয়সী বেকার জনসাধারণকেও এসব কাজে লাগাতে হবে।

সে ক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে দেশটিকে একটি মূলত ফল বাগানে পরিণত করা এবং সেভাবে বাংলাদেশ পরিণত হবে একটি ফল রফতানিকারী দেশে। আসুন না আমরা নীতিনির্ধারণ করে আমাদের মতো পরিকল্পনা করি এবং পরিকল্পনার বাসত্মবায়নও করি আমাদের মতো করে। কেননা বিশ্বের অপর একটি দেশের সঙ্গেও আমাদের পরিস্থিতির কোনোরূপ মিল নেই। অন্য কোনো দেশের পরিবেশের কথা ভেবে তাদের অনুকরণ করে যদি আমাদের পরিবেশের উন্নয়ন করতে ব্রত হই অবাসত্মবভাবে, তবে সেটা অবশ্যই আমাদের জন্য সুখকর হবে।

তথ্যসূত্র: কামাল উদ্দীন আহমদ, সদস্য-পরিচালক (অব), বিএআরসি; উদ্যানতত্ত্ববিদ, অসংখ্য কৃষি বিষয়ক পুস্তকের প্রণেতা