ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

পাট বাংলাদেশের একটি অর্থকরী ফসল। আঁশের গুণাগুণের ওপর পাটের মূল্য নির্ভর করে। ভালোমানের আঁশের দাম বেশি এবং নিম্নমানের আঁশের দাম কম। কি কারণে পাট আঁশের গুণাগুণ খারাপ হয়, এ ব্যাপারে অনেক পরীড়্গা-নিরীড়্গা করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। দেখা যায়, বিশেষ করে পাট পচন পদ্ধতির তারতম্যের জন্যই পাট আঁশের গুণাগুণের তারতম্য হয়। যদি উন্নত ও উৎকৃষ্ট শ্রেণীর আঁশ উৎপন্ন করা যায় তবে পাট রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৩০-৪০ কোটি টাকারও বেশি আয় করতে পারবে।

পাটের পচন

পানি এবং পানিতে বসবাসকারী অসংখ্য জীবাণুর মিলিত প্রচেষ্টায় পাট গাছের বাকল থেকে আঁশ পৃথক হওয়ার প্রক্রিয়াকে পচন প্রক্রিয়া বলা হয়।

ভালো বীজ যেমন ভালো গাছের পূর্বশর্ত; তেমনি পাট আঁশের গুণাগুণ অনেকাংশে পাট পচনের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। পাট আঁশের গুণাগুণের ওপর ভিত্তি করে পাটের গ্রেডিং করা হয়। পাট আঁশের গ্রেডিং সাধারণত পাট আঁশের শক্তি মসৃণতা, ঔজ্জ্বলতা, রঙ, পরিচ্ছন্নতা এবং দৈর্ঘ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়। পাট পচন পদ্ধতি যদি সঠিকভাবে না হয় তবে পাট আঁশের শক্তি, রঙ ও ঔজ্জ্বলতার পরিমাণ কমে যাবে। আবার পাটের জাগ যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দিন পানিতে থাকে তবে পাট আঁশ তার শক্তি তথা রঙ ঔজ্জ্বলতা হারাবে। আবার পাটের জাগ যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম দিন পানিতে পচে তা হলে পাটের আঁশ পাটকাঠি থেকে আলাদা করতে কষ্ট হবে এবং পাটের আঁশগুলো ঠিকমতো আলাদা না হলে এই আঁশ দ্বারা সুতা পাকানোর বিভিন্ন মেশিনারি দ্বারা প্রসেসিংয়ের আগে আঁশগুলো আলাদা করার জন্য বেশি পরিমাণ তৈলাক্ত পদার্থ প্রয়োগ করতে হবে; যার ফলে একদিকে যেমন খরচ বেশি হবে অন্যদিকে সুতার মানও তেমন ভালো হবে না। কাজেই অধিক সময় জাগ দেয়া এবং প্রয়োজনের চেয়ে কম সময় জাগ দেয়া উভয়ই বর্জনীয়।

যেসব জমির কাছে পাট পচানোর জন্য পানি পাওয়া যাবে, পাট চাষের জন্য সেসব জমি নির্বাচন করা উচিত যাতে করে পরে পাট পচাবার জন্য পানির সমস্যা দেখা না দেয় ও পরিবহন খরচ কমানো যায়। সঠিক সময় পাট কাটার সঙ্গে আঁশের গুণাগুণের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। দেখা গেছে যে, গাছে ফুল আসার আগে পাট কাটলে আঁশের মান খুব ভালো হয় কিন্তু ফলন কিছু কমে যায়। আবার ফল ধরার সময় পাট কাটলে আঁশের গোড়ার শক্ত ছাল বা কাটিংসের পরিমাণ বেশি হয় এবং আঁশের মানও খারাপ হয়। কাজেই অন্য কোনো অসুবিধা না থাকলে গাছে যখন কেবল ফুলের কুঁড়ি আসতে শুরু করে তখন পাট কাটলে আঁশের মান ভালো হয় এবং ফলনও তেমন কমে না।

পাট পচনের শেষ সময় ঠিক করা অর্থাৎ পচন সমাপ্তি নির্ণয় অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ। পাট খুব বেশি পচলে আঁশ নরম হয় আবার খুব কম পচলে আঁশের গায়ে ছাল লেগে থাকে। কাজেই এমন সময়ে পচন থামাতে হবে যখন আঁশগুলো একটার সাথে আরেকটা লেগে না থাকে কিন’ শক্ত থাকে। জাগ দেয়ার ৮-১০ দিন পর থেকেই জাগ পরীড়্গা করা উচিত। এ জন্য পাট জাগ দেয়ার ১০-১২ দিন পর থেকেই জাগ পরীড়্গা করা উচিত। ২-৩টা পাট জাগ থেকে বের করে ধুয়ে যদি দেখা যায় যে, আঁশগুলো পরস্পর পৃথক হয়ে গেছে, তখন বুঝতে হবে যে পচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে পাট বেশি পচানোর চেয়ে একটু কম পচানো ভালো।
বদ্ধ পানিতে অর্থাৎ ছোট পুকুর বা ডোবায় পাট পচালে ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে পাট তাড়াতাড়ি পচে এবং আঁশের রঙও ভালো হয়। প্রতি ১০০ আঁটি কাঁচা পাটের জন্য প্রায় ১ কেজি ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হবে। ইউরিয়া সার কোনো পাত্রে গুলে পচনের পানিতে মিশিয়ে দিতে হবে অথবা সরাসরি জাকের আঁটির সারিতে ছিটিয়ে দিতে হবে।

বাংলাদেশের ব্যাপক এলাকায় পাট চাষ করা হয়। এর মধ্যে কোথাও কোথাও পাট গাছ কাটার সময় পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যায় না আবার কোথাও কোথাও পাট পচানোর সময় পানি থাকে না বা থাকলেও খুবই অপর্যাপ্ত এবং ঘোলা থাকে। এসব স্থানের জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট দুটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। যথা: রিবন বা ছাল ছাড়ানো পদ্ধতি এবং পলিথিন ট্যাংক পদ্ধতি।

রিবন রেটিং পদ্ধতি

রিবন পদ্ধতি হলো কাঁচা থাকা বস্থায় পাটগাছ থেকে ছাল পৃথক করে নেয়া। এই ছালগুলোকে তিনভাবে পচানো যায়:

ক) বড় মাটির চাড়িতে ছালগুলোকে গোলাকার মোড়া বেঁধে সাজিয়ে রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে চাড়িটি ভরে দিতে হবে। একটি বড় চাড়িতে প্রায় ৩০ কেজি ছাল পচানো যায়।

খ) যদি আশপাশে ছোট ডোবা বা পুকুর বা কম গভীরতা সম্পন্ন জলাশয় থাকে তবে ছালগুলোকে গোলাকৃতি মোড়া বেঁধে একটি লম্বা বাঁশের সঙ্গে জুলিয়ে পানির মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে পচানো যাবে।

গ) বাড়ির আশপাশে অথবা ক্ষেতের পাশে ১৫-১৬ ফুট লম্বা, ৬-৮ ফুট প্রস’ এবং ২ ফুট গভীর (পলিথিনের মাপ অনুসারে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা কম বেশি করা যেতে পারে) গর্ত খুঁড়ে গর্তের তলা ও কিনারা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিয়ে যে কোনো স’ান থেকে পরিষ্কার পানি দিয়ে গর্তটি ভরে সেখানে ছালগুলো পচানো যায়। সম্ভব হলে কচুরিপানা দিয়ে ছালের মোড়াগুলো ঢেকে দেয়া যেতে পারে। এ পদ্ধতিকে পলিথিন ট্যাংক পদ্ধতি বলা হয়। এ গর্তে কিছু পচন ইনোকুলাম অর্থাৎ পাট পচানো পানি দিয়ে পচন দ্রুত এবং নিশ্চিত হয়।কাজেই পাট ক্ষেতের ধারে কাছে পচানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকলেও রিবন রেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে সহজেই পাট পচানো সম্ভব।

আঁশের শ্যামল রঙ দূরীকরণ

অপরিষ্কার বা অনুপযুক্ত পানিতে আঁশ ধোয়ার পর যদি দেখা যায় আঁশের রঙ কালো বা শ্যামলা হয়ে গেছে তবে একমণ পানিতে প্রায় ১ কেজি তেঁতুল গুলে সেই তেঁতুল গোলা পানির মধ্যে আঁশগুলোকে ৪-৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখলেই আঁশের রঙ উজ্জ্বল হয়ে যাবে। তবে তেঁতুল এক প্রকার এসিড, তাই আঁশগুলোকে সাথে সাথে খুব ভালো করে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে যাতে তেঁতুলের রস আঁশের সাথে লেগে না থাকে।

পাটের কাটিংস

পাটের নিচে শক্ত, কালো ছালযুক্ত এবং অনমনীয় অংশ থাকে, এই অংশকে নরম করার জন্য অতিরিক্ত বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজন হয়। পাট শিল্পে এই অংশকে কাটিংস নামে অভিহিত করা হয়। দুই উপায়ে এই কাটিংস সমস্যা দূর করা সম্ভব- ১) পাতা ঝরানোর পর পাটগাছের গোড়ার দিকে প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট পরিমাণ অংশ ৩-৪ দিন পানির নিচে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এতে গোড়ার অংশ অনেক নরম হয়ে যাবে। অথবা, ২) পাটগাছের গোড়ার প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার বা দেড় ফুট পরিমাণ অংশ একটি কাঠের হাতুড়ির সাহায্যে সামান্য থেঁতলানোর পর আঁটিগুলোকে পানির নিচে ডুবিয়ে রাখতে হবে। পাটের আঁশ ধোয়ার পর খুব ভালো করে শুকানো উচিত। আঁশ কখনো মাটির ওপর ছড়িয়ে শুকানো উচিত নয়। কারণ তাতে আঁশে ময়লা, ধুলা-বালু, কাদা ইত্যাদি লেগে যায়।

বাঁশের আড়ায়, ঘরের চালে, ব্রিজের রেলিং বা অন্য কোনো উপায়ে ঝুলিয়ে শুকানো উচিত। এ শুকানো আঁশ ভেজা অবস’ায় কখনোই গুদামজাত করা উচিত নয়, কারণ এতে আঁশের মান নিম্নমানের হয়ে যায়। পাট আঁশের পচন ঠিকমতো না হলে নিম্নমানের আঁশ নিম্নমানের গ্রেডিং হিসেবে বাজারে কম দামে বিক্রি হয়। কাজেই পাটের কাটিংস একটি বড় সমস্যা। আমাদের দেশে বছরে প্রায় ৫০ লাখ বেল (১ বেল=১৮০ কেজি) পাট আঁশ উৎপাদিত হয়, তার প্রায় ২০-৪০ শতাংশ পরিমাণ কাটিংস হিসেবে নষ্ট হয়। অর্থাৎ প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ কাটিংস। পাট আঁশের চেয়ে কাটিংসের মূল্য অনেক কম। কাটিংসের পরিমাণ কমিয়ে ভালো মানের আঁশ উৎপাদন করতে পারলে পাট রপ্তানির আয় অনেকাংশে বাড়ানো সম্ভব হবে।

পাট আঁশের শক্তি, রঙ, ঔজ্জ্বলতা ও দৈর্ঘ্য

আঁশের শক্তির ওপর ভিত্তি করে গ্রেডিং করা হয়। আঁশ কত শক্ত বা কতটুকু টান সহ্য করতে পারে তা হাত দ্বারা টেনে বা মেশিনের সাহায্যে নির্ণয় করা যায়। গ্রেডিংয়ের ড়্গেত্রে রঙ একটি গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয়। তোষা ও দেশী পাটের একটি নির্দিষ্ট রঙ আছে। যেমন- তোষার জন্য সোনালি এবং দেশী পাটের জন্য মাখন সাদা। তবে রঙের তারতম্য নির্ভর করে কী প্রকার এবং কী ধরনের পানিতে পাট পচানো হয় তার ওপর। ঔজ্জ্বলতার পরিমাপ করা হয় আঁশ কতটা আলো প্রতিফলন করতে পারে তার ওপর। ঔজ্জ্বলতা সাধারণত মেশিন দ্বারা পরিমাপ করা হয়। সাধারণত সাদা পাটের ঔজ্জ্ব্বলতা তোষা পাটের থেকে বেশি হয়ে থাকে। আঁশের দৈর্ঘ্য নির্ভর করে আঁশের গোড়া থেকে কতটা কাটিংস বাদ দেয়া যেতে পারে তার ওপর। সাধারণত কাটিংস বাদে আঁশ ৪ থেকে ১০ ফুট দৈর্ঘ্য বা তারও বেশি হতে পারে। আঁশের দৈর্ঘ্য, পাটের জাত, জমির প্রকৃতি, স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

তথ্যসূত্র: এম এম আলমগীর সাঈদ, প্রধান  বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ড. জাকারিয়া আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক, প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়