ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

বাংলাদেশে আখ খাদ্য হিসেবে শিল্পে ব্যবহার্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরি ফসল। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চাষিদের কাছে আখই প্রধান অর্থকরি ফসল। এ দেশে প্রায় ১.৮ লাখ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হয়। যার প্রায় ৭০ ভাগই বৃষ্টিনির্ভর। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল, যা প্রায় ১৪ মাস জমিতে থাকে। তাই ক্ষুদ্র ও মধ্যম চাষির পক্ষে এ দীর্ঘ সময়ে একটি ফসলের জন্য অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আবার অন্যদিকে জায়গার অভাবে গমের আবাদ দিন দিন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫.৬ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ৮.৫ লাখ টন গম উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ টনের চাহিদা রয়েছে। ফলে আখ চাষ অপেক্ষাকৃত অনুর্বর চর অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে। তাই উর্বর জমিতে আখের আবাদ টিকিয়ে রাখার জন্য একই জমিতে আখের সাথে একাধিক ফসল আবাদ করে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সাথী ফসল হিসেবে আখের লাইনের ভেতর এক সারি অথবা জোড়া লাইনের ভেতর ৩-৪ সারি মসুর, মুগ, কলাই, গম, তিসি, তিল, আলু, ছোলা, মটরশুঁটি, পেঁয়াজ রসুন, বাদাম ও টমেটো ইত্যাদি চাষ করা সম্ভব।

জোড়া সারি আখের মধ্যে সাথি ফসল চাষ

উত্তমরূপে জমি চাষের পর ১২০ থেকে ১৪০ সেমি. দূরে দূরে ৪৫ থেকে ৬০ সেমি. নালাতে দুই সারি কাটিং রোপণ করে জোড়া সারি পদ্ধতিতে আখ চাষ করা হয়। এ পদ্ধতিতে সনাতনী তিন চোখ বিশিষ্ট আখ রোপণ বা রোপা পদ্ধতিতে আখ চাষ করা যায়। দুটি জোড়া সারি আখের মধ্যবর্তী ১২০-১৪০ সেমি. প্রশ্বস্ত স্থানে সাথী ফসলের চাষ করা যায়। এ পদ্ধতিতে সাথী ফসলের একরপ্রতি গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আখ গাছের সংখ্যা এক সারি পদ্ধতির সমান থাকে। সাথী ফসলের জন্য প্রশ্বস্ত জায়গাটি উত্তমরূপে চাষসহ মাটি ঝুরঝুরে করে অনুমোদিত মাত্রায় সার প্রয়োগ করে সাথী ফসল বপন করা হয়। জোড়া সারি পদ্ধতিতে প্রথম সাথী ফসল হিসেবে শীতকালীন সময়ের সব ফসলই চাষ করা যায়। তবে দ্বিতীয় সাথী ফসল হিসেবে পেঁয়াজ, মুগডাল, গিমাকলমি, তিল, বাদাম, পাটশাক, পুঁইশাক, শসা, ডাঁটা, ঢেঁড়স ইত্যাদি চাষ করা যায়।

আখের জোড়া সারির মাঝে গমচাষ পদ্ধতি

কার্তিক মাসে জোড়া সারির মাঝে বীজ বপন যন্ত্রের সাহায্যে ৪ লাইন গম বোনা সম্ভব এবং এক সারির মাঝে একটি লাইন বপন করা যায়। এতে ফলন প্রায় ৮ মণ প্রতি বিঘায় পাওয়া সম্ভব।

আধুনিক জাত নির্বাচন

এজন্য সৌরভ, গৌরভ, শতাব্দী, প্রদীপ, বিজয়, সুফি প্রভৃতি গমের জাত নির্বাচন করা হয়।
উপরোক্ত জাতগুলো উচ্চফলনশীল, তাপ সহিষ্ণু এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। বর্তমানে শতাব্দী, প্রদীপ, বিজয় ও সুফি জাতগুলো কৃষকের মাঠে ভালো ফলন দিচ্ছে এবং কৃষকের কাছে সমাদৃত হয়েছে। তাই পুরাতন জাত কাঞ্চনের পরিবর্তে উলিস্নখিত জাতগুলো সঠিক সময়ে আবাদ করা প্রয়োজন।

বপনের উপযুক্ত সময়

অগ্রহায়ণ মাসের ১ম সপ্তাহ থেকে ৩য় সপ্তাহ গম বপনের উপযুক্ত সময়। অর্থাৎ ১৫ থেকে ৬ পর্যন্ত গম চাষের উপযুক্ত সময়। দেরিতে গম আবাদ করার ফলে গমে বইট রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই রোগ প্রতিরোধের জন্য বপনের ৬০ দিন ও ৮০ দিনের সময় দুইবার টিল্ট সেপ্র করে ভালো ফলন পাওয়া যায়।

বীজের মাত্রা

বীজ গজানোর ক্ষমতা ৮০-৯৫ ভাগ হলে হেক্টরপ্রতি ১০০-১১০ কেজি অথবা একরপ্রতি ৫০ কেজি বীজ বপন করতে হবে।

আখের জোড়া সারিতে গমবীজ বপন
যন্ত্রের সাহায্যে চাষ করা জমিতে বেড তৈরি এবং একই সাথে গমবীজ লাইনে বপন করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে সব রাসায়নিক সার শেষ চাষের আগে মাটিতে ছিটিয়ে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে। তারপর মেশিনের সাহায্যে বেড  তৈরি ও বীজ বপন একই সাথে করতে হবে। এ পদ্ধতিতে হেক্টরপ্রতি বীজের পরিমাণ ১০০ কেজি।

অনুমোদিত সারের মাত্রা

গমের আশানুরূপ ফলন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক সারের গুণগত মান যাচাইপূর্বক মাটি পরীক্ষা করে সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। গমের অধিক ফলন লাভের জন্য রাসায়নিক ও জৈব সারের পরিমাণ নিম্নে দেয়া হলো-

সার প্রয়োগ পদ্ধতি
০ বীজ বপনের আগে আখের জোড়া সারির মাঝে গোবর/কম্পেস্ট সার প্রয়োগ করতে হবে।
০ বীজ বপনের আগে আখের জোড়া সারির মাঝে সব রাসায়নিক সার ও ইউরিয়া সারের ২-৩ অংশ প্রয়োগ করতে হবে।
০ ইউরিয়া সারের বাকি অংশ (১/৩ অংশ ) ১ম সেচের পর মাটিতে রস থাকা অবস্থায় উপরিপ্রয়োগ করতে হবে।

সেচ প্রয়োগ

সেচ প্রয়োগ গম চাষের জন্য খুই প্রয়োজন। কারণ সেচ ছাড়া গমের ভালো ফলন আশা করা যায় না, তাছাড়া পানি মুকুট শিকড় গজানো ও দানা বাঁধার সময় বিশেষ প্রয়োজন। সেচ প্রয়োগের জন্য জমি সমান থাকা প্রয়োজন। জমি থেকে বৃষ্টি অথবা সেচের অতিরিক্ত জমা পানি সহজে নেমে যেতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত পানি নেমে যাওয়ার জন্য বপনের সাথে সাথে ঢাল বুঝে ২০-২৫ ফুট দূরে নালা কেটে রাখতে হবে।

সেচ প্রয়োগের সময়

০ ১ম সেচ চারার ৩ পাতার সময় (বপনের ১৭-২১ দিন পর) বেডের নালায় পানি সেচ দিতে হবে।
০ ২য় সেচ শিষ বের হওয়ার সময় (বপনের ৫৫-৬০ দিন পর)
০ ৩য় সেচ দানা গঠনের সময় (বপনের ৭৫-৮০ দিন পর)
মাটির প্রকার ও আবহাওয়াভেদে সেচের সংখ্যা কম বা বেশি হতে পারে।

আগাছা দমন

আগছা গমের ফলন মারাত্মভাবে ব্যাহত করতে পারে। এর মধ্যে বথুয়া, বিষকাটালি, মুথা, দূর্বা ও অন্যান্য আগাছা বিশেষ উলেখযোগ্য। গম বপনের ২৫-৩০ দিন আগে রাউন্ডআপ আগাছানাশক সেপ্র করে চাষে গমবীজ বপন করা যেতে পারে।

০ বপনের ২০-২৫ দিনের মধ্যেই একবার নিড়ানি দিয়ে আগাছা দমন করতে হবে।
০ চওড়াপাতা জাতীয় আগাছা (বথুয়া, বিষকাটালি, কাকরি ইত্যাদি) দমনের জন্য ২-৪ডি এমাইন আগাছানাশক
(প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৩৫ মিলি.) মেঘমুক্ত দিনে ৩-৪ পাতা অবস্থায় সেপ্র করলে আগাছা দমন করা সম্ভব।
০ আগাছা দমনের শতকরা ১২ ভাগ ফলন বৃদ্ধি পায়।

পোকামাকড়, পাখি ও ইঁদুর দমন

পাখি ও ইঁদুরের আক্রমণের ফলে গমের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে থাকে।

০ বীজ বপনের পর চারা গজানো শুরু থেকে ১০-১২ দিন পর্যন্ত পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
০ গাছের বয়স যখন ৪০-৪৫ দিন তখন থেকে মাঠে ইঁদুরের আক্রমণ শুরু হয়। তাই আক্রমণের আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে এবং ফাঁদ পেতে বা বিষটোপ (যেমন-জিংক ফসফাইড বা লানির্যাাট) দিয়ে ইঁদুর দমন করা সম্ভব।
০ পেঁচা ইঁদুরের চরম শত্রু, তাই রাতে যাতে পেঁচা বিচরণ করতে পারে তার জন্য গর্তের পাশে বাঁশের আড়া বা খুুঁটি পুঁতে রাখলে সহজে ইঁদুর শিকার করতে পারে।

রোগবালাই দমন

দেরিতে গমবীজ বপনের ফলে পাতায় বইট রোগ দেখা দেয়, তাই টিল্ট-২৫০ ইসি ছত্রাকনাশক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। শিষ বের হওয়ার আগে ফুল ফোটার পরে দানা গঠনের সময় এক লিটার পানিতে ০.৫ মিলিলিটার ওষুধ মিশিয়ে সেপ্র মেশিনের সাহায্যে প্রয়োগ করলে শতকরা-২০ ভাগ ফলন ও বীজের মান বৃদ্ধি পায়।

শস্য কর্তন ও মাড়াই ও বীজ সংরক্ষণ

০ ফসল খড়ের রঙ হলেই মেঘমুক্ত দিনে গম ফসল কাটতে হবে।
০ পরিষ্কার রোদে গম মাড়াই যন্ত্রের সাহায্যে মাড়াই খুবই সহজ ও লাভজনক
০ ঝাড়াইকৃত গমবীজ সংরক্ষণের জন্য কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে নিয়ে খোলা জায়গায় ঘরের মেঝেতে রাখতে হবে।
০ সংরক্ষণের সময় বীজের আর্দ্রতা শতকরা ১২ ভাগের নিচে থাকা উত্তম।
০ দানা দাঁতের নিচে দিয়ে চাপ দিলে কট শব্দ হলে উক্ত বীজ মজুদের উপযুক্ত হবে।
০ মোটা পলিথিন ব্যাগ বা পস্নাস্টিক ড্রাম বীজ সংরক্ষণের জন্য উত্তম।
০ পাত্র বীজ দিয়ে পরিপূর্ণ করে মুখ ভালোভাবে বন্ধ করে মেঝে থেকে উঁচুতে রাখতে হবে।
০ সংরক্ষণের জন্য বিস্কুটের টিন, পস্নাস্টিকের ড্রাম, তেলের ড্রাম ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে।
০ ধাতব পাত্র ছাড়া অন্য যেকোনো পাত্রে বীজ সংরক্ষণের জন্য রৌদ্রে শুকানো বীজ ছায়ায় ঠাণ্ডা করে নিতে হবে।
০ মাঝে মাঝে গমবীজ রৌদ্রে শুকিয়ে পোকর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে হবে।

আখের আন্তঃফসলের সুবিধাগুলো

০ জোড়া সারি পদ্ধতিতে আখ রোপণ করে সাথী ফসলের জন্য অতিরিক্ত জায়গা পাওয়া যায়। একই মৗসুমে একাধিক সাথী ফসল আবাদ করা সম্ভব হয়।
০ এ পদ্ধতিতে অধিকসংখ্যক সাথী ফসলের আবাদ করে প্রচলিত এক সারি পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি ফলন পাওয়া যায়।
০ আখ ও পর পর দুটো সাথী ফসলের আবাদ করে চাষি আর্থিকভাবে অধিক লাভবান হয়
একই জমিতে আখের সাথে একাধিক ফসল চাষ  করে চাষিগণকে আখ চাষে আকৃষ্ট করা যায়। 
০ দুটো সাথী ফসল চাষ করলে আখের জমি আগাছামুক্ত থাকে।
০ জোড়া সারি পদ্ধতিতে একাধিক সাথী ফসল চাষ করেও আখের ফলনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় না।

তথ্যসূত্র: ড. এম এ খালেক, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং ড. খালেদ সুলতান, মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, জামালপুর