ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

খাদ্য সুস্বাদু করে রান্না করার জন্য মসলার ব্যবহার অতীব গুরুত্বপূর্ণ। রসুন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ। মসলাজাতীয় ফসল। মসলাজাতীয় ফসলের মধ্যে রসুন অনেক রান্নার জন্যই অত্যাবশ্যক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই তরকারির মসলা হিসেবে রসুন ব্যবহার করা হয়। কেবল মসলাই নয়, রসুনের ঔষধিগুণও রয়েছে। আদিকাল থেকে রসুন হেকিমি ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। উচ্চরক্তচাপে উপকারী বলে আজকাল উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রানত্ম রোগীদের নিয়মিত রসুন খেতে উপদেশ দেয়া হয়। রসুনে আমিষ, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-সি ও সামান্য লৌহ আছে।

রসুনে জীবাণুনাশক এবং কীটনাশক উপাদানও আছে। সঙ্গত কারণেই রসুনের বাজারের চাহিদা ও মূল্য বছর ধরেই থাকে।
জলবায়ু ও মাটি : সাধারণত রসুনের জন্য শীতল ও শুষ্ক পরিবেশ প্রয়োজন। এ ফসলটির নিম্নতাপমাত্রা সহ্যক্ষমতা শক্তি অনেক বেশি। রসুনের জন্য ১৫-২০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা উপযোগী। সাধারণত বেলে দো-আঁশ থেকে দো-আঁশ মাটিই রসুন চাষের জন্য ভালো। কিন্তু বিনাচাষে রসুন উৎপাদনের ক্ষেত্রে এঁটেল/এঁটেল দো-আঁশ প্রকৃতির ভিজা মাটিই উপযোগী। নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম ও গুরম্নদাসপুর উপজেলার চলন বিল এলাকায় বোনা আমন ধান কাটার পর ব্যাপক জায়গায় বিনাচাষে লাভজনকভাবে রসুনের আবাদ হচ্ছে। এরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মাটিতে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলেই লাভজনকভাবে বিনাচাষে রসুন উৎপাদন সম্ভব।

জাত : বাংলাদেশে রসুনের তেমন উলেস্নখযোগ্য জাত নেই। সাধারণত স্থানীয় জাতই ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়ভাবে দুটি জাত চাষ করা হয়, যাদের একটি আগাম হয় তাকে স্থানীয়ভাবে আউশা এবং যেটি একটু দেরিতে হয় এবং রসুনের ওপরের খোসা কিছুটা নীলচে তাকে ‘আমনা’ বলে।

উৎপাদন মৌসুম : কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত রসুন লাগানোর উপযুক্ত সময়।

উৎপাদন পদ্ধতি : বোনা আমন ধান কাটার পর বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই জমিতে কাদা কাদা থাকা অবস্থাতে জমি থেকে ধানের খড় নাড়া কেটে জমি পরিষ্কার করতে হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩-৪ ইঞ্চি এবং রসুনের কোষ/কোয়া থেকে কোয়ার দূরত্ব ৩ ইঞ্চি হিসেবে লাগাতে হয়। তারপর ধানের কর্তনকৃত খড়/নাড়া দ্বারা জমি ঢেকে দিতে হয়।

সার প্রয়োগ : জমি থেকে ধানের নাড়া কেটে পরিষ্কার করে রসুনের কোয়া লাগানোর আগেই হেক্টরপ্রতি টিএসপি ১৫০-১৮৫ কেজি এবং এমপি ৭৫-১১০ কেজি হারে ছিটাতে হয়। আর ইউরিয়া সার হেক্টরপ্রতি ২২৫ কেজি ২ কিসিত্মতে প্রয়োগ করতে হয়। প্রথমবার চারা গজানোর ২০-২৫ দিন পর ৭৫ কেজি এবং দ্বিতীয়বার চারা গজানোর ৪০ দিন পর ১৫০ কেজি ছিটাতে হয়।

অনত্মর্বর্তীকালীন পরিচর্যা : ভালো ফলন পেতে হলে রসুনে ২-৩ বার সেচ দিতে হয়। প্রথমবার ইউরিয়া সার প্রয়োগ করার পর একবার এবং দ্বিতীয়বার ইউরিয়া সার প্রয়োগ করার পর দ্বিতীয় সেচ দিতে হয়। সাধারণত জমিতে পস্নাবন সেচ দেয়া হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোথাও পানি জমে না থাকে। কারণ রসুন জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। জমিতে রসের অভাব দেখা দিলে প্রয়োজনে আরো সেচ দেয়া যেতে পারে। ধানের নাড়া দ্বারা জমি ঢাকা থাকার কারণে তেমন আগাছা হয় না। যদি সামান্য কিছু আগাছা থাকে তাহলে গাছ গজানোর ৩০-৪০ দিনের মধ্যে হাত দ্বারা আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।

রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন : রসুনের পারপল বস্নচ রোগ দেখা দিয়ে থাকে। এসব ছত্রাকঘটিত রোগ দমনের জন্য ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম হারে রোভরাল বা ডাইথেন-এম-৪৫ মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে। থ্রিপস ও জাবপোকা রসুনের পাতার রস চুষে খায়। এদের দমনের জন্য ম্যালাথিয়ন-৫৭ ইসি নামক কীটনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলি হিসেবে মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ ও সংরড়্গণ : সাধারণত রোপণের ১২০-১৪০ দিন পর রসুন সংগ্রহ করা হয়। গাছের পাতার রঙ হলুদ ও পরে বাদামি হয়ে ভেঙে পড়লে রসুন তুলে নিতে হবে। রসুন ঘরেই দু’ভাবে সংরক্ষণ করা যায়। গাছসহ রসুন সংরক্ষণ করলে কিছু দিন শুকনা, ছায়াময় ও অবাধে বাতাসে চলাচলের সুবিধাযুক্ত স্থানে রেখে দিলে গাছ শুকিয়ে যায়। গাছসহ রসুন ঘরে ঝুলিয়ে বা আলাদা করে মাচায় ছড়িয়ে রেখে বেশ কিছু দিন সংরক্ষণ করে বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যায়।

ফলন : এ পদ্ধতিতে রসুনের ফলন হেক্টরপ্রতি ৫৬-৬০ টন হয়ে থাকে।

তথ্যসূত্র: কৃষিবিদ মো. ওমর আলী