ক্যাটেগরিঃ কৃষি

লাক্ষা এক প্রকার অতি ক্ষুদ্র পোকা, ক্যারিয়া লাক্ষা কর্তৃক নিঃসৃত রঞ্জক জাতীয় পদার্থ। এটা প্রাণিজাত বহুমুখী-কর্মশক্তিসম্পন্ন এক প্রকার রঞ্জক যার অনুপম গুণাগুণের কারণে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। লাক্ষা পোকার ত্বকের নিচে সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা এক প্রকার গ্রন্থি থেকে আঠালো রস নিঃসৃত হয়, যা ক্রমশ শক্ত ও পুরু হয়ে পোষক গাছের ডালকে আচ্ছাদিত করে ফেলে। পোষক গাছের ডালের এই আবরণই ‘লাক্ষা বা লাহা নামে পরিচিত। পরবর্তীতে ডালের উক্ত শক্ত আবরণ ছাড়িয়ে ও শোধিত করে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।

পৌরাণিক যুগ হতেই বঙ্গভারত উপমহাদেশে লাড়্গা বহুবিধ কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে। এর উলেস্নখ রয়েছে মহাভারতের আদি পর্বে, যেখানে কৌরবগণ পাণ্ডবদের ধ্বংস করার জন্য লাক্ষা দিয়ে ‘জতু গৃহ’ তৈরি করেছিল। ১৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে আকবর লিখিত ‘আইন-ই-আকবরি’ পুস্তিকায় লাক্ষার ব্যবহারের উল্লেখ আছে। মুসলিম সাধু পুরুষ ইমাম আবু হানিফার লিখিত পুস্তকেও লাক্ষার নানাবিধ ব্যবহারের উল্লেখ আছে।

লাক্ষার চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

বর্তমান প্রেড়্গাপটে বাংলাদেশে লাড়্গা চাষ একটি অত্যনত্ম সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। সাধারণত লাক্ষা চাষের জন্য পৃথক কোনো জমির প্রয়োজন পড়ে না। লাড়্গার পোষক গাছগুলো জমির আইল, বসতবাড়ির আশপাশে, খালের পাড়, রাসত্মা ও রেললাইনের পাশে পরিত্যক্ত স্থানে লাগানো যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে বার্ষিক প্রায় ৪০০ হেক্টর জমিতে লাড়্গার চাষ হয়, সেখান হতে মাত্র ২৫০ টনের মতো ছাড়ানো লাড়্গা উৎপাদিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশেই এর চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৫০০ টনের অধিক। এ ছাড়াও লাক্ষার বহুবিধ ব্যবহারের কারণে পৃথিবীর অনেক দেশেই লাক্ষা রপ্তানির সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলোর বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় ও কাঠের আসবাবপত্র বার্নিশের কাজে ব্যাপকভাবে লাড়্গার ব্যবহার হওয়ায় উক্ত দেশগুলোতে একটি বড় ধরনের লাক্ষার বাজার রয়েছে। কেননা শীতপ্রধান দেশ হওয়ার কারণে ওইসব দেশে লাক্ষা চাষ সম্ভবপর নয়।

মোটামুটিভাবে সমগ্র বাংলাদেশের আবহাওয়া লাক্ষা চাষের উপযোগী। এ ছাড়াও অসংখ্য লাক্ষার পোষক গাছ অযত্নে অবহেলায় যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উক্ত গাছগুলোকে লাক্ষা চাষের আওতায় এনে প্রচুর পরিমাণে লাক্ষা উৎপাদনও একই সাথে বিশাল কর্মহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান করা সম্ভব। কেবলমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় বর্তমানে লাক্ষার যে পোষক গাছ রয়েছে সেখান হতেই প্রায় ৪০০ টন ছাড়ানো লাক্ষা উৎপাদন করা সম্ভব, যা বর্তমান বাজার মূল্যে প্রায় ৩ কোটি টাকার মতো এবং এর সাথে প্রায় ২০ হাজার ভূমিহীন প্রানিত্মক কৃষকের কর্মসংস্থান করাও সম্ভব।

বিভিন্ন পোষক গাছ থেকে প্রাপ্ত লাক্ষার আয়-ব্যয়ের একটি হিসাব তালিকা-১এ দেয়া হলো- বিভিন্ন দেশে লাক্ষা চাষ
বর্তমান বিশ্বে ভারত একচেটিয়াভাবে লাক্ষার উৎপাদন ও আনত্মর্জাতিক বাজার দখল করে রেখেছে। পৃথিবীর শতকরা ৭০ ভাগ লাক্ষাই ভারতে উৎপাদিত হয়। ভারতের পশ্চিম বাংলা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও আসাম প্রদেশই বেশির ভাগ লাক্ষা উৎপাদন করে। ভারতের পরেই লাক্ষা উৎপাদনে থাইল্যান্ডের স্থান। লাক্ষার আন্ত র্জাতিক বাজারে থাইল্যান্ড ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এ ছাড়াও সমগ্র বার্মায়, দক্ষিণ, চীনে, পাকিসত্মানের সিন্ধু প্রদেশে লাক্ষা চাষ করা হয়। তাইওয়ানের কিছু অঞ্চলে অল্প পরিমাণে লাড়্গার চাষ হয়। লাক্ষার আন্তর্জাতিক চাহিদা লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি দেশ নতুনভাবে লাড়্গা উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে। এর মধ্যে ভিয়েতনাম অন্যতম।

লাক্ষার ব্যবহার

* কাঠের আসবাবপত্র বার্নিশ করা, বিভিন্ন ধরনের বার্নিশ, পেইন্ট ইত্যাদি তৈরি ও পিতল বার্নিশ করার কাজে।
* অস্ত্র কারখানায়, রেলওয়ে কারখানায়।
* বৈদ্যুতিক শিল্প কারখানায় অপরিবাহী বার্নিশ পদার্থ হিসেবে।
* বিভিন্ন অটোমোবাইল ইঞ্জিন মেরামত ও রড়্গণাবেড়্গণে আঠালো, বন্ধনকারী পদার্থ হিসেবে।
* চামড়া রঙ করার কাজে।
* ফাঁপা অংশ পূরণে।
* লবণাক্ত পানি হতে জাহাজের তলদেশ রড়্গা করার কাজে বার্নিশ হিসেবে।
* লাক্ষার উপাদান, আইসো এমব্রিটেলিডি পারফিউম শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
* লাক্ষা হতে নির্গত আরেকটি উপাদান অ্যালুরিটিক এসিড পারফিউম শিল্পে, পোকার যৌন আকৃষ্টকরণ পদার্থ তৈরিতে এবং অনেক ওষুধ প্রস্তুতের রাসায়নিক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। * লাক্ষার আবরণমুক্ত কয়লা অত্যনত্ম উঁচুস্থানে রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়।
* ডাকঘরের চিঠি, পার্সেল ইত্যাদি সীলমোহর করার কাজে।
* পুতুল, খেলনা, আলতা, নখরঞ্জন, শুকনা-মাউন্টিং টিস্যু পেপার ইত্যাদি তৈরির কাজে। লাক্ষা উৎপাদনের কলাকৌশল

লাক্ষার চাষের উপযোগী আবহাওয়া : নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া লাক্ষার চাষের উপযোগী। যেসব অঞ্চল গ্রীষ্মকালে অত্যন্ত গরম ও শীতকালে অত্যধিক ঠাণ্ডা এবং বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৭৫ সেমি. থেকে ১২৫ সেমি. পর্যন্ত হয়, সেসব অঞ্চলে লাক্ষার চাষ ভালো হয়। গ্রীষ্মকালে যদি তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রি সে. এবং শীতকালে ১৫ ডিগ্রি সে. এর নিচে নেমে যায় তবে স্ত্রী পোকা ডিম পাড়া বন্ধ করে দেয়, যদিও লাড়্গা নিঃসরণ বন্ধ হয় না। লাক্ষা কীটের পোষক গাছ : যেসব প্রজাতির গাছে লাক্ষা ভালো জন্মায় সেগুলোকে লাক্ষার পোষক গাছ বলে। যদিও প্রায় ১০০ প্রজাতির গাছে লাড়্গা জন্মাতে পারে তবুও মাত্র কিছু প্রজাতিতে লাক্ষার পোকা ভালোভাবে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। বাংলাদেশে কুল, শিরিষ, বট, পাকুড়, পলাশ, খয়ের, বাবলা, ডুমুর, অড়হর, কুসুম প্রভৃতি গাছে লাক্ষার ভালো জন্মে।

বিভিন্ন ধরনের লাক্ষার পোকা ও ফসল : দুই ধরনের লাক্ষার পোকা বিভিন্ন ধরনের লাক্ষা ফসল উৎপাদনের সাথে জড়িত। কুল, পলাশ, বাবলা ইত্যাদি পোষক গাছগুলোতে যেসব পোকা লাক্ষার উৎপাদন করে তাদের রঙ লাল বলে তাদের রঙ্গিনী পোকা বলে। অন্যদিকে আর এক ধরনের লাক্ষা কীট কেবল কুসুমগাছে ভালোভাবে বৃদ্ধিলাভ ও বংশবিস্তার করতে পারে এবং যে লাড়্গা উৎপাদন করে তাদের রঙ হলদে বা কুসুমি বলে এরা কুসুমি পোকা নামে পরিচিত। প্রতি বছর প্রত্যেক প্রকারের লাড়্গা পোকা দুবার ফসল দিতে পারে। এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশে কুসুমি পোকার অপর্যাপ্ততার কারণে সাধারণত রঙ্গিনী পোকা দ্বারা লাড়্গার চাষ করা হয়। যে মাসে লাড়্গা ফসল কাটা হয় সে মাসের নাম অনুসারেই ফসলের নামকরণ করা হয়ে থাকে। রঙ্গিনী পোকা থেকে বছরে দুবার, বৈশাখ ও কার্তিক মাসে ছাড়ানো লাড়্গা পাওয়া যায়। বৈশাখী ফসল পেতে প্রায় ৮ মাস সময় লাগে, অন্যদিকে মাত্র ৪ মাসেই কার্তিকী ফসল পরিপক্বতা লাভ করে। মাটিতে রসের অভাব ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বৈশাখী ফসলে বীজ লাক্ষা উৎপাদন একটি বড় সমস্যা।

পোষক গাছ ছাঁটাইকরণ : লাক্ষার কীটগুলো কেবল গাছের কচি ডগা বা ডাল হতে রস শোষণ করতে পারে। সেজন্য যে পোষক গাছে লাক্ষাকীট সংক্রমণ করা হবে তা আগেই ছাঁটাই করা উচিত। কার্তিকী ফসলের জন্য মধ্য ফেব্রুয়ারি এবং বৈশাখী ফসলের জন্য মধ্য এপ্রিল গাছ ছাঁটাইয়ের উপযুক্ত সময়।

শিশু কীট সংক্রমণ : ভালো লাক্ষার ফলন কীট সংক্রমণের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সে কারণে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতে হবে: ১) যতদূর সম্ভব ¯^-msµgY এড়িয়ে চলা অত্যাবশ্যক। ২) শক্রু কীটমুক্ত, পরিপক্ব ও বীজ লাক্ষা ব্যবহার করা উচিত। ৩) বীজলাক্ষার গাছ হতে কাটার পর পরই সংক্রমণ করা উচিত। ৪) সংক্রমণের জন্য সঠিক পরিমাণ বীজলাড়্গা ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত একটি পরিপক্ব বীজলাক্ষার টুকরা নিজস্ব দৈর্ঘ্যের প্রায় ১৫-২০ গুণ পরিমাণ অধিক স্থান সংক্রমণ করতে পারে। ৫) বীজলাক্ষা সমেত টুকরাটি এমনভাবে পোষক গাছের ডালে বাঁধতে হবে যেন সেটা গাছের ডালের সাথে বেশ ভালোভাবে লেগে থাকে। বীজলাক্ষা টুকরাগুলো কচি ডালের যত কাছাকাছি বাঁধা যায় ততই ভালো। ৬) বীজলাক্ষার লাগানোর পর শিশু কীটগুলো পোষক গাছের কচি ডালের সমসত্ম স্থানে বসে গেলে যত শিঘ্র সম্ভব বীজলাড়্গার টুকরাগুলো সরিয়ে নেয়া উচিত। ৭) বীজলাক্ষা গাছ হতে কাটার পর পরই যত শিঘ্র সম্ভব নতুন পোষক ডালে সংক্রমণ করা উচিত।

ফসল কাটা : লাক্ষার সমপূর্ণ পরিপক্ব হওয়ার পরই ফসল কাটা উচিত। নিম্নলিখিত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে ফসল পরিপক্ব হওয়ার সঠিক সময় সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব : ১) স্ত্রী কোষগুলোর ভেতরের পদার্থেও দানাবদ্ধ ভাব : যদি একটি স্ত্রী কোষ দুটি আঙুলের সাহায্যে পিষে দেয়া যায় তাহলে বৈশাখী ও কার্তিকী উভয় ফসলেই ৩-৪ সপ্তাহ পূর্ব হতেই ভেতরের পদার্থের একটি দানা দানাভাব লড়্গ করা যায়। ২) লাড়্গার আবরণে ফাটল ধরা : বৈশাখী ও কার্তিকী উভয় ফসল পরিপক্বতা লাভের ২-৩ সপ্তাহ আগে লাক্ষার আবরণে একটি ফাটা দাগ লক্ষ্য করা যায়। ৩) লাক্ষার ফসলের আবরণের শুষ্কাকৃতি ভাব : শিশু কীটের ঝাঁক বেঁধে বের হওয়ার প্রায় ২ সপ্তাহ আগ থেকেই লাড়্গার আবরণ শুষ্ক হয়েছে বলে মনে হয়। ৪) স্ত্রী কোষের পেছনের অংশ হলুদবর্ণ ধারণ : স্ত্রী কোষের পেছনের দিকে ৩টি ছিদ্র থাকে। একেবারে নিচের দিকের ২টি শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার জন্য এবং অন্যটি একটু উঁচুতে। উক্ত ছিদ্রটি হতে একগুচ্ছ সাদা আঁশ বের হতে দেখা যায়। ঐ ছিদ্রের কাছে কোষের রঙ কমলা রঙের থাকে। কিন্তু শিশুকীট বের হওয়ার আগে উক্ত কমলা রঙ পরিবর্তিত হয়ে হলুদাভ বর্ণ ধারণ করে ।

সাধারণত লাক্ষার ফসল দু’ভাবে উত্তোলন করা যায়। যদি সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই তা কাটা হয় অর্থাৎ ঝাঁক বেঁধে শিশুকীট বের হওয়ার আগেই কাটা হয়ে থাকে এবং তাতে জীবনত্ম কীট থাকে তখন তাকে বলা হয় ‘আরি’। অন্যদিকে শিশুকীট বের হয়ে যাওয়ার পর তা কাটা হলে অর্থাৎ যাতে কেবল মৃত পোকাই থাকে তখন ঐ লাক্ষারকে ‘ফুংকি’ বলে। লাক্ষার ফসল যদি ‘আরি’ অবস্থায় কাটা হয়, তা হলে তাতে জমাট বাঁধার সম্ভাবনা ‘ফুংকি’ লাক্ষার অপেক্ষা বেশি থাকে। লাড়্গা ফসল ‘আরি’ হিসেবে সংগ্রহ করলে বীজলাড়্গার অপ্রতুলতা দেখা দেয়। পোষক ডাল হতে পরিপক্ব দা বা কাঁচির সাহায্যে ছাড়ানো হয় যা ‘ছাড়ানো লাক্ষার নামে পরিচিত। ছাড়ানো লাক্ষার ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে গুদামজাত করা বা প্রক্রিয়াজাতকরণ করা উচিত।

তথ্যসূত্র: মো. এনায়েত আলী প্রামাণিক