ক্যাটেগরিঃ চারপাশে, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

সোমবার গভীর রাতে ৩ শতাধিক যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জ এর গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে ডুবে গেলো শরিয়তপুর থেকে ঢাকার দিকে আসা এমভি শরিয়তপুর-১ লঞ্চটি। এ পর্যন্ত ৬৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যথারীতি তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। একটি নয় তিনটি। তাদেরকে আগামী ৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করার জন্য বলা হয়েছে। আর নৌমন্ত্রী ক্ষতিপূরণ (!!!) দেবার ঘোষণা দিয়েছেন। এক পরিবারের একজনের জন্য ৩০ হাজার আর একাধিক সদস্যদের জন্য ৪৫ হাজার করে। তার হিসাব জ্ঞানও প্রখর। সরকারকে কত টাকা বাঁচিয়ে দিচ্ছেন!

এখন একটু পেছনে ফিরে তাকাই । ১৯৭৩ সালে পদ্মা নদীতে এমভি গাজী আর এমভি দিঘিরপীর নামে দুটি লঞ্চে মুখোমুখি সংঘর্ষ পরবর্তী নিমজ্জনে ২৫০ জনের মৃত্যু, ১৯৮০ সালে পদ্মা নদীতে এমভি রুশি লঞ্চ ডুবিতে ২৩০ জনের মৃত্যু, ১৯৯৬ সালে মেঘনাতে এমভি সামিয়ার নিমজ্জনে ৬০০ যাত্রীর মৃত্যু, একই বছর ধলেশ্বরী নদীতে এমভি এটলাস ষ্টার লঞ্চ ডুবিতে ৫০০ জনের মৃত্যু, ১৯৯৪ সালে দিনার-১ নামে লঞ্চটি ৩০০ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায়, এর মধ্যে ২৫০ জনেরই মৃত্যু হয় । ২০০২ এ সালাউদ্দিন-২ লঞ্চটি ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায় । এতে ৩৪০ জনের মৃত্যু ঘটে। ২০০৩ এ এমভি মিতালী-৩ লঞ্চটি প্রায় এক হাজার যাত্রী সহ একটি কার্গো লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যায়। ১৩০ জনের মৃত্যু ঘটে সে দুর্ঘটনায়। ২০০৩ সালে এমভি নাসরিন-১ নামে একটি লঞ্চ প্রায় আড়াই হাজার যাত্রী নিয়ে চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে ডুবে যায়। সরকারী হিসাব মতেই ৫২৮ জনের মৃত্যু ঘটে এ লঞ্চ ডুবিতে। ২০০৪ এ মেঘনা নদীতে এমভি লাইটিং সান ডুবে মারা যায় ৮৬ জন যাত্রী। ২০০৫ সালে বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি মহারাজ ডুবে মারা যায় ১৫০ জন এবং একই বছর যমুনা নদীতে এমভি রায়পুরা লঞ্চ ডুবে মারা যায় ১১৫ জন। ২০০৯ এর ২৭ শে নভেম্বর ঈদের আগের রাতে নাজিরপুরের তেঁতুলিয়ায় ডুবে যায় এমভি কোকো-৪ লঞ্চ । প্রায় দুহাজার যাত্রী সহ এ লঞ্চটিতে ১০০ জনের বেশি যাত্রী মারা যায়। এগুলো কিছু বড় দুর্ঘটনার হিসাব এবং মৃতের সংখ্যা সরকারীভাবে দেয়া তথ্য উপাত্ত থেকেই প্রাপ্ত। বেসরকারিভাবে এ সংখ্যা অনেক অনেক বেশি হবে যে তাতে কোন সন্দেহ নেই ।

উপরের একটা হিসাব থেকে সহজেই অনুমেয় কী পরিমান যাত্রী প্রতিবছর লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে আমাদের দেশে। লিস্ট অব শিপ্ রেক্স এর আন্তর্জাতিক তালিকাতে জাহাজডুবিতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাটিতে এগিয়ে আছে আমাদের এ দেশটি। কী দারুণ আমাদের সফলতা!

প্রতিটি নৌ দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি হয় এবং তা একটি নয় একাধিক হয়ে থাকে। তারপর তদন্ত কমিটি যথারীতি তাদের রিপোর্ট ও পেশ করে। কিন্তু তা জনসমক্ষে আসে না। রিপোর্ট সে রিপোর্টেই থেকে যায় আর তার মধ্যে যে সমস্ত সুপারিশ থাকে তাও লঞ্চ ডুবির মতো ডুব দেয় অনন্তকালের জন্য।লঞ্চ দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে বেশ কিছু কিন্তু মজার বিষয় এ নিয়ে কাউকে গ্রেফতার বা জেলে প্রেরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায় না। আরো চমকপ্রদ তথ্য হলো অনেকক্ষেত্রে রিপোর্টই গায়েব করে ফেলে কুচক্রী মহল।

ত্রুটিপূর্ণ নৌ-যান, চালকের অদক্ষতা ইত্যাদি কারনে যে সব দুর্ঘটনা তার দায় কোন ভাবেই বিআইডব্লিউটিএ কিংবা সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর এড়াতে পারে না । আর সর্বোপরি নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয় এর দায়িত্ব বা গাফিলতি কোনভাবেই কাম্য নয় । অথচ বছরের পর বছর এভাবেই চলে আসছে এবং ভবিষ্যতেও বোধহয় এভাবে যাবে । আর প্রতি বছর এমন ভাবে শত শত মানুষ মরবে তারপর প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, বিরোধী দলের নেত্রীর শোক প্রকাশ চলবে, নৌ-মন্ত্রীর মানুষের জীবনের ক্ষতিপূরণের (!!!) ঘোষণা আসবে, পত্রিকায়-টিভিতে হেডলাইন হবে, ছবি আসবে মৃত মানুষের লাশ উঠিয়ে আনার, লাশের অপেক্ষায় থাকা প্রিয়জনদের অপেক্ষা আর আহাজারির আর তারপর এক সময় সব কিছু চুপচাপ নীরবতায় ডুবে যাবে । সবাই ভুলে যাবে সব কিছু যতক্ষণ না আর একটা জাহাজ ডুবি হবে । কিন্তু ভুলবে না এক মা তার ছেলেকে হারানো কথা, ভুলবে না এক মেয়ে তার বাবাকে হারানোর কথা, এ থেকে যাবে তাদের হৃদয়ে আজীবন। এ কষ্ট দেখবে না কেউ বুঝবে না কেউ ।

***
ছবি: ইন্টারনেট থেকে নেয়া ।

***
ফিচার ছবি: [http://www.bijoynews24.com, http://bdnews24.com] থেকে সংগৃহিত