ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

বেশ কয়েকদিন ধরে সংবাদপত্র, টিভি, ব্লগ সহ বিভিন্ন মিডিয়াতে ডেসটিনি’র প্রতারণা নিয়ে মহা তোলপাড় হচ্ছে। হঠাৎ এমন কী ঘটলো যে এ নিয়ে এতো কথা, এতো আলোচনা, মন্ত্রীদের মন্তব্য, তদন্ত কমিটি গঠন ইত্যাদি সব কান্ড-কারখানা হচ্ছে ! আমরা কী এটা হঠাৎ করেই আবিস্কার করে ফেললাম যে ‘ডেসটিনি’ নামক একটা কোম্পানী আমাদের দেশের লোকজনের সাথে প্রতারণায় লিপ্ত?

একযুগের বেশি সময় ধরে ‘এমএলএম’ নামক বিতর্কিত একটি মার্কেটিং ধারণাকে সম্বল করে এক ধরনের অদ্ভূত মার্কেটিং কৌশল দ্বারা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষ জনকে সর্বস্বান্ত করে যাচ্ছে এক শ্রেনীর প্রতারকগোষ্ঠী । বুজরুকি তৈল, গাছ, শক্তি-বর্ধক ঔষধ, থেকে শুরু করে শেয়ার, মিডিয়া কিংবা ব্যাংকিং কার্যক্রম; কোথায় নেই এই এমএলএম কোম্পানিগুলো!

কেন এতো এমএলএম কোম্পানি এদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো দিনের পর দিন গড়ে উঠলো এবং বহাল তবিয়তে কোন বাঁধা-বিঘ্ন ছাড়াই তাদের ইচ্ছানুযায়ী ব্যবসা করে যেতে পারলো?

এমএলএম কোম্পানি করার জন্য সব ধরনের অনুকুল উপাদান এ দেশে আছে বলেই তার প্রসার এখানে হয়েছে। আমাদের দেশে একটি এমএলএম কোম্পানি করার জন্য দরকার একটা সফটওয়্যার, কিছু অপ্রচলিত পন্য আর কিছু নির্বোধ জনসাধারণ। কিন্তু সবচেয়ে জরুরী দরকার প্রশাসনকে হাত করা। এটা ঠিক থাকলেই সব সম্ভব এ দেশে। এটাই হলো এ ধরণের ব্যবসার আসল উপাদান।

এমএলএম ব্যবসায়ীরা পুরো ফায়দা আমাদের দেশ থেকে তুলে নিয়েছে বিগত দিনে। তাদের সম্পদের পরিমান কতো হবে, তাদের দ্বারা কি পরিমান লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কি পরিমান টাকা তারা বিদেশে পাচার করেছে তা নির্ণয় করাটা সরকারের জন্য কঠিন হবে নিঃসন্দেহে।

এক যুগ পর এসে এমন উপলব্ধি হলো আমাদের? সংবাদপত্র গুলো কেন এতোদিন চুপচাপ ছিলো? টিভি সহ অপরাপর মিডিয়াও কেন এ নিয়ে সরব হয়নি? ? (টুকটাক কিছু সংবাদ ও ডেসটিনির বৃক্ষরোপণ নিয়ে কিছু প্রতিবেদন পত্রিকায় এসেছিলো। কিন্তু পরে তা নিয়ে আর বেশি কথা শোনা যায়নি)

এক যুগে সরকার পরিবর্তন হয়েছে কয়েকবার, তারাও তেমন উচ্চবাচ্য করেনি ! আমি অবশ্য আমাদের দেশের বাংলা ব্লগগুলোকে এবং ব্লগারদের ধন্যবাদ দেব। ব্লগাররা বরাবরই এ নিয়ে সোচ্চার ছিলো। ডেসটিনি, নিউওয়ে সহ অপরাপন এমএলএম কোম্পানি নিয়ে অনেক ব্লগারই তাদের জন সচেতনতা মূলক পোষ্ট বিভিন্ন সময়ে দিয়েছিলেন এবং দিয়েও যাচ্ছেন।

আমার এক বিদেশী বন্ধু এশিয়া কাপ দেখে বাংলাদেশের জার্সিতে লেখা ‘নিউওয়ে’ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো। একটি এমএলএম কোম্পানির জার্সি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের গায়ে জড়ানো দেখে বিস্মিত হয়েছিলো সে।

খেলাতে বা কোন অনুষ্ঠানে টাকা বা স্পন্সর কোথা থেকে আসবে সেটা ভাবিনা আমরা। টাকা আসলেই হলো। কিন্তু জাতীয় দলের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার একটু চিন্তা ভাবনা করা উচিত ছিলো বলে আমার মনে হয়। আমাদের জাতীয় দল জাতীয় পতাকার ধারক। তাদের দেহে প্রতারক কোম্পানি গুলোর জার্সি বড় বেমানান।

বিপিএল এ দেখা গেছে এমএলএম কোম্পানি গুলোর জয় জয়কার। টাইটেলই কিনে নিয়েছিলো ডেসটিনির মতো হালের আলোচিত এমএলএম কোম্পানিটি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন মন্ত্রী মহোদয়গন, সরকারী আমলা, প্রশাসনের কর্মকর্তারা উদ্বোধন/সমাপনী অনুষ্ঠানে গিয়েছেন , তাদের সাথে এক স্টেজ এ বসে খেলা দেখেছেন, খোশ-গল্প করেছেন, প্রতি খেলাতে খেলা শেষে তাদের ব্যাকড্রপ/প্লাকার্ড সমেত মঞ্চে দাড়িয়ে তাদেরই দেয়া পুরস্কার খেলোয়ারদের হাতে তুলে দিয়েছেন।

‘ডেসটিনি মাল্টিপারপাস’ এর অবৈধ কার্যকলাপ সম্পর্কে মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আল মুহিত কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, তিনি নাকি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না। বানিজ্য মন্ত্রনালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক বললে নাকি ব্যবস্থা নেবেন তিনি। আজ অবশ্য সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, এ রকম প্রতিষ্ঠান যাতে তাদের সম্পদ ট্রান্সফার করতে না পারে সেজন্য যুবকের মতো একটি কমিশন করা হবে।

তার কয়েকদিন আগে করা বক্তব্য যাতে তিনি ডেসটিনির বিষয়ে কিছু জানেন না বলেছিলেন, নিঃসন্দেহে বক্তব্যটি ছিলো অবাক করার মতো। আজকের দেয়া বক্তব্য আমাদেরকে কিছুটা আশার বানী শুনালেও তা ভবিষ্যতে কতটা কার্যকরী হবে সেটাই প্রশ্ন। কেননা বিগত এক যুগ এ বিভিন্ন সরকারের বিভিন্ন সময়ে ডেসটিনি সহ অপরাপর এমএলএম কোম্পানিগুলো নিয়ে বিভিন্ন রিপোর্ট বিভিন্ন সময়ে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক সহ বিভিন্ন সরকারী সোর্স থেকেও অর্থ মন্ত্রনালয় সহ বিভিন্ন মন্ত্রনালয় প্রেরণ করা হয়েছিলো। তাহলে এতোদিন বানিজ্য বা অর্থ মন্ত্রনালয় সহ বিভিন্ন মন্ত্রনালয় কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিলো?

বানিজ্য মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সম্প্রতি ১৭ টি এলএমএল কোম্পানির বিরুদ্ধে স্পষ্ট বিদেশে অর্থ-পাচার এবং অবৈধ ব্যাংকিং এর অভিযোগ করেছেন। ‘জিজিএন’ ও ‘নিউওয়ে’র এমএলএম কার্যক্রম সম্পর্কে ২০০০ সালে আন্তঃমন্ত্রনালয় সভায় এ ধরনের সকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৪ সালে তখনকার অর্থসচিবের কাছে ডেসটিনি’র কার্যক্রমকে প্রতারণামূলক বলে চিঠি পাঠায়। ২০০৫ সালেও এমএলএম কোম্পানিগুলোর অপতৎপরতা নিয়ে একটি চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থমন্ত্রনালয়কে। তাহলে আমরা কি বলবো যে অর্থমন্ত্রনালয় এর দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় এসবের কোন খোঁজ খবর রাখেন না?

এতো সব অভিযোগ এর পরও দিনে দিনে ডেসটিনি, নিউওয়ে সহ আরো অনেক কোম্পানি তাদের ব্যবসা সম্প্রসারিত করলো তা কেউই খেয়াল করলো না!

এদিকে ডেসটিনি গ্রুপের আয়কর ফাইল তলব করেছে জাতীর রাজস্ব বোর্ড। তারা নাকি প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে তদন্ত করে দেখবেন কোন অনিয়ম করেছে কিনা। বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জনসাধারণকে এর মধ্যে জানিয়েছে, তারা যেন অনুনোমদিত কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে লেন দেন না করে।

কতো রকম মাল্টিপারপাস, কতো রকম সমবায় সমিতি দেশজুড়ে বিরাজমান। বড়ো বড়ো করে লেখা ‘বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত’। সরকারী রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার উল্লেখ করে বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড দেখা যায়। ভেতরে ঢুকলে সাজ-সজ্জায় ব্যাংক গুলোকেও যেন পেছনে ফেলে দেবে। তাহলে সাধারণ মানুষ কি করে সিদ্ধান্ত নেবে যে কোনটি বাংলাদেশ ব্যাংক এর অনুমোদিত বা কোনটি নয়! জনগনকে শুধু এটুকু জানিয়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যায় না।

অবশ্য এমনই আমাদের দায়িত্ববোধ যখন সব শেষ হয়ে যায় তখনই যেন আমাদের টনক নড়ে। এর আগে যুবক, ইউনিপের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত হয়েছে জনসাধারণ প্রতারণার শেষ পর্যায়ে যখন পৌঁছে গিয়েছিলো। ইদানিং অনলাইন এ টাকা উপার্জন নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সক্রিয়। লোক জন ঠকে যাচ্ছে প্রতিদিন। এখন প্রশাসন থেকে এ বিষয়েও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা জানা যায় নি। কিন্তু একদিন এ নিয়েও তোলপাড় হবে, অনেক কাহিনী বের হয়ে আসবে কিন্তু তখন করার কিছু থাকবে না।

বিদ্যমান বিভিন্ন কোম্পানিগুলো তাদের ফায়দা উঠানোর শেষ পর্যায়ে যেন আমাদের টনক না নড়ে, এ বিষয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে । শুধু ডেসটিনি নয় সকল এমএলএম কোম্পানি ও অনলাইন এ টাকা উপার্জন করার কোম্পানিগুলোর বিষয়ে সরকারকে এখনই একটি সঠিক নীতি প্রনয়ণ ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে জনগনকে নিয়ে প্রতারণার খেলায় আর মেতে উঠতে না পারে এবং জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে আমাদের পতাকা বহনের দুঃসাহস না দেখাতে পারে।

***
ফিচার ছবি: http://www.dainikdestiny.com থেকে সংগৃহিত