ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

ডিসকভারি টিভি চ্যানেল এ ইদানিং ‘আই ‘শুডন’ট বি এলাইভ’’ নামে একটা টিভি ধারাবাহিক প্রদর্শিত হচ্ছে। সময় সুযোগ হলে মাঝে মধ্যে এ প্রামান্য-ছবিটি আমি দেখে থাকি। এটি আমার বউয়ের কাছেও বেশ প্রিয়। সেও চেষ্টা করে সিরিজটি আমার সাথে বসে দেখতে।

প্রামান্যটি অনেকেই হয়তো দেখে থাকবেন।এতে মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিক ভাবে বেঁচে আসা লোকজনের সত্যিকার কাহিনীকে তুলে ধরা হয় দক্ষতার সাথে। এ জন্য যুক্তরাজ্যের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘’ডারলো স্মিথসন’’ এতই সজাগ যে তারা ঘটনা সংঘটনের স্থান বা পরিবেশকে বেঁছে নেয়া এবং কাছাকাছি চেহারার লোকজনকে দিয়ে অভিনয় করানোর চেষ্টা করে থাকে। এতে দর্শকরা প্রামান্যটিতে বেশ বাস্তবতার ছৌঁয়া অনুভব করেন।

কিছুদিন আগে দেখা পর্বের একটি ‘ট্র্যাপড্ ইন দা ক্যানিয়ন’ এ ‘ড্যানেলি ব্যালেন্জি’ নামে একজন বিশ্ববিখ্যাত এথলেট এর মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসার কাহিনী দেখানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের মোব শহর থেকে দূরে নির্জন একটি ক্যানিয়নের ৬০ ফুট খাদে পড়ে যান ড্যানিলি। তিনি প্রকৃতির নির্জনতায় জগিং করতে পছন্দ করতেন। তাই গাড়ি চালিয়ে অতদূরে চলে গিয়েছিলেন কাউকে কিছু না জানিয়ে। সংগে সঙ্গী হিসেবে ছিলো তার প্রিয় কুকুর ‘ট্যাজ’। দুর্ঘটনায় তার মেরুদন্ডের নিচের ও নিতম্বের মধ্যকার অস্থি কাঠামো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তিনি অসহায় হয়ে পড়ে থাকেন খাদের গভীরে। নির্জন জায়গাটায় একাকী তিনি কয়েকদিন পড়ে থাকেন। চরম অসহায় অবস্থায় তিনি যখন তার জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলছিলেন, কুকুর ট্যাজও হঠাৎ করে তাকে ছেড়ে চলে যান। এর পর তিনি মানসিক ভাবে আরো ভেঙ্গে পড়েন। ভাবেন মৃত্যুই তার অবধারিত নিয়তি। কিন্তু ট্যাজের এই গমন যে তাকে উদ্ধার করার প্রচেষ্টাই ছিলো তা পরে বুঝতে পারেন, যখন ট্যাজ অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে উদ্ধারকারী দলকে পথ দেখিয়ে নিয়ে তার কাছে এসে পৌঁছেন। এভাবে তার প্রিয় কুকুর তার জীবনটাকে বাঁচিয়ে দেন। কুকুরটির এ কান্ডকে কী করে ব্যাখ্যা করি বলুনতো। কুকুরের চরম মানবীয় আচরণ প্রদর্শণ?

যাক সেটা, এবার ধারাবাহিকের আর একটি পর্ব ‘অ্যালোন ইন আমাজান’ এর ঘটনা বলছি।

ব্রিট বেনেডিক্ট নামে একজন অভিযাত্রী আমাজান নদীর অববাহিকা ধরে গভীর জঙ্গল পাড়ি দিতে অভিযানে নামেন। অভিযাত্রার সময় তার সাথে ‘ক্যাশো’ নামে একটি কুকুর ছিলো। আর তাকে পথ দেখিয়ে নেবার জন্য দুজন স্থানীয় আদিবাসী ছিলো। নৌকা করে অজানা জঙ্গল পাড়ি দেবার শেষ পর্যায়ে তার সাথে দেখা হয় ভয়ন্কর অবৈধ স্বর্ণ-কারবারীদের সাথে। কিন্তু তার সাথে স্বর্ণ-ব্যবসায়ীরা ভালো ব্যবহার করে এবং রাতে থাকার ব্যবস্থা করে। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে তিনি কান পেতে শুনতে পান, ব্যবসায়ীরা তাদের মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছেন। এ শুনে তিনি কাল বিলম্ব না করে চুপি চুপি নৌকাতে উঠে পড়েন। এতো দ্রুত ও চুপিসারে কাজটি করেন যে ব্রিট তার দুই আদিবাসী সঙ্গীদেরকেও ডাকেননি। নৌকাতে আগে থাকতেই তার কুকুরটা ছিলো। তিনি তার সে কুকুরকে নিয়ে আস্তে আস্তে নৌকা বেয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। কিন্তু কিছু পথ যাওয়ার পর স্রোতে তার নৌকা তলিয়ে যায় আর তিনি তার দরকারী খাদ্য-পানীয় সহ সব জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলেন আর হারিয়ে ফেলেন তার প্রিয় কুকুর ক্যাশোকেও। তিনি ক্যাশোকে হারিয়েই বেশ মুষড়ে পড়েন। তার সাথে একটি ছুরি আর দেশলাই ছাড়া আর কিছু নেই। অনুমান করে তিনি হাটতে শুরু করেন জঙ্গল দিয়ে। এমনই জঙ্গল সেখানে কোন ফলজ বৃক্ষ বা খাবার যোগ্য কিছু পান না। নদী থেকে অনেক দূরে থাকায় কোন পানির চিহ্ন নেই আর কোন প্রাণিও খুঁজে পান না যা খেয়ে তিনি বাঁচতে পারেন।বাধ্য হয়ে কিছু পোকা-মাকড় আর পাতা থেকে শিশির দিয়ে জিহ্বা ভেজান। এর মধ্যে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। তারপরও তার পথ চলা থেমে নেই। শুধু রাতে কোন গাছের নিচে আশ্রয় নেন।এভাবে কিছুদিন যাবার পর হঠাৎ করে বুঝতে পারেন, জঙ্গলে কেউ তাকে অনুসরণ করছে।তিনি ভয় পেয়ে যান। ভাবেন কোন বন্য প্রাণি তাকে অনুসরণ করছে।কিন্তু হঠাৎই তিনি আবিস্কার করেন তার সেই কুকুর ‘ক্যাশো’কে । কুকুরটি মাইলের পর মাইল দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে পাড়ি দিয়ে ব্রিটকে খুঁজে বের করেছে। কুকুরটি তার মনোবল বাড়িয়ে দেয়। কুকুরকে নিয়ে তিনি আরো পথ হাটতে থাকেন। কোন এক পর্যায়ে তিনি পানির সন্ধান পান এবং সে পানি দুজনে মিলে পান করেন । প্রচুর অসুস্থ শরীর নিয়েও হাটা থামান না ব্রিট। আর প্রভুর সাথে নিঃশ্চিন্তে হাটছে কুকুর ক্যাশোও। কিন্তু প্রভু বেচারা ব্রিট এতো দিন ধরে না খেয়ে, রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। তার বাঁচতে হলে কিছুতো খেতে হবে। কিন্তু কি খাবে? তার মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। সে হঠাৎ তার ছুরি দিয়ে ক্যাশোকে পেছন দিক থেকে মেরে ফেলে। ক্যাশো টেরও পেলো না তার সেই মনিবই তাকে মারলো, যাকে সে মাইলের পর মাইল খুঁজে বের করেছে দিনের পর দিন ধরে। ক্যাশোর মাংস পুড়িয়ে খেতেও তিনি পারলেন না। বমি করলেন ম্যালেরিয়ার কারণে। কি আর করা, তিনি আবার হাটা শুরু করলেন। দিন তিনেক পরই তিনি হেটে জঙ্গলের কিনারে এসে একটি মানুষ বসতির কাছে পৌঁছৈন। স্থানীয় অধিবাসীরা তাকে উদ্ধার করে শহরে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। এবং তিনি বেঁচে উঠেন।

ব্রিট কুকুরটিকে মারার সময়ই আমার বউ প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে টিভি দেখা ছেড়ে উঠে গেলো। আমি ও নিশ্চুপ। ওকে বুঝাতে চাইলাম ওরকম পরিস্থিতি হলে যে কেউই হয়তো এমনটা করতো। এছাড়া তার তো আর কোন উপায় ছিলো না। একটা মানুষ না খেয়ে আর কতোদিন বাঁচতে পারে?

প্রথম গল্পটায় ট্যাজের কর্মকান্ডকে কুকুরের মানবীয় আচরণ বলা যায় কিনা সে প্রশ্নটা করেছিলাম। এবার দ্বিতীয় গল্পটার ক্ষেত্রে কী বলবো? মানুষের কুকুরীয়(!) আচরণ?

আমি অবশ্য এতে আশ্চর্য হইনি। ব্রিট তার ক্যাশোকে হত্যা করেছে তার বেঁচে থাকার জন্যই (যদিও এটা মানতেও কষ্ট হচ্ছে)। চরম পরিস্থিতিতে সে বাধ্য হয়েছিলো। ক্যাশোর প্রতি তার ভালোবাসা তার জীবনের চেয়ে ক্ষুদ্র হয়ে গিয়েছিলো । কিন্তু ক্যাশোর ভালবাসা মনিবের প্রতি এমন ছিলো যে সে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে মনিবের কাছে ধরা দিয়েছে। সে যেন অজান্তেই বলে উঠেছে , আমার জীবন নিয়ে বেঁচে থাকো, তুমি হে মানুষ।

আমরা তো ব্রিটের মতো অত অসহায় নই। তারপরও নির্বিচারে হত্যা করছি আমাদের বিবেক, মূল্যবোধ, অপরের অধিকার, চেতনা সহ সব কিছু। আপনি কী বলেন?