ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

সকালে ‘বিডি নিউজ’ খুলেই আঁতকে উঠলাম। জানা গেছে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি এম ইলিয়াস আলী মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে ‘নিখোঁজ’। তাহলে কি আর একটি অপহরণ আর একটি গুম এর কাহিনী ঘটতে যাচ্ছে? (আশা করবো, আমার এ আশংকা যেন সঠিক না হয় এবং দ্রুত তার খোঁজ পাওয়া যায়।)

আমি এ রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। রাষ্ট্র আমাকে যে সমস্ত নাগরিক সুবিধা দেয়ার কথা তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো আমার নিরাপত্তা। আমার নিরাপত্তা যখন রাষ্ট্র দিতে পারবে না তখন আমি কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো? ঘরে আমার নিরাপত্তা নেই, বাইরে আমার নিরাপত্তা নেই, নিরাপত্তা নেই আমার স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার। বেডরুমে আমি খুন হচ্ছি, রাস্তা ঘাটে খুন হচ্ছি, হঠাৎ করে আমি গুম হয়ে যাচ্ছি।

কিছুদিন আগে রিকশা দিয়ে ইস্কাটন হয়ে বাসায় ফিরছিলাম। কতগুলো লোক একটা লোককে জোর করে ধরে গাড়িতে ঢুকিয়ে ফেলল। লোকটি প্রাণপণ চিৎকার করে যাচ্ছে আর বলছে, বাঁচাও, আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
কেউ কিছু বলছে না। লোকটির কথা কেউ শুনছে না। সবাই যেন দৃশ্যটি উপভোগ করছে। অনেকে দ্বিধাগ্রস্ত। ওরা সাদা পোষাকের পুলিশ না সন্ত্রাসী বুঝে উঠতে পারিনি। আমি রিক্সা থেকে নেমে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি, আমার স্ত্রী হাত টান দিয়ে ধরলো, না তুমি যাবে না ( যেহেতু ওরা অস্ত্র সহ ছিলো)। বাচ্চাটা আমার কোলে। তারপরও আমি আশে পাশের লোকগুলোকে বললাম, রিকশায় থাকা মানুষগুলোকে বললাম, কেউ শুনছে না। বাচ্চাটা মা’য়ের কাছে রেখে নামতে নামতেই গাড়িটা ছেড়ে দিয়েছে। রিকশাওয়ালাকে জোড়ে চালাতে বললাম। সে বিরক্ত। নিজেকে অপরাধী মনে হলো। লোকটার বাঁচার আকুতি কানে আসছিলো। কিছুক্ষণ পর মগবাজার এর ট্রাফিকে এসে দেখলাম, অপহরণকারীদের গাড়িটি রাস্তার পাশে জনতার হাতে ধরা পড়েছে। অপহৃত লোকটিকে মুখ চেঁপে ধরা হয়েছিলো এবং প্রানপনে সে চিৎকার করার চেষ্টা করছিলো। জ্যামে পড়ায় কয়েকজন সাহসী লোক সহজে গাড়িটি ধরে ফেলে। পরে জনতা এসে যোগ দেয়। এ অপহৃত ব্যাক্তিটি সৌভাগ্যবান কেননা জ্যামে গাড়িটি আটকা না পড়লে এবং সাহসী কিছু লোক দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে তার কী পরিণতি অপেক্ষা করছিলো তা অনুমেয়।

দিনে দুপুরে আমাদের দেশে এরকম হয়। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। কতো অপহরণ, গুম আমাদের আশে পাশে হচ্ছে সব পত্রিকায় আসে না। প্রকাশ্যে মানুষগুলোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা আর ফিরে আসে না। আটককৃতদের স্বজনরা সম্ভাব্য সব স্থানে ধর্না দেন। কোথাও তাদের সন্ধান মেলে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে।

হয়তো বেশির ভাগ ঘটনাগুলো পেশাদার দুষ্কৃতিকারী করে থাকে। কিন্তু ইদানিং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই অভিয়োগ উঠেছে যে রাষ্ট্র নিজেই অপহরণ আর গুম এর পথ বেছে নিয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাবির মুখে রাষ্ট্র এমন কৌশল বেঁছে নিয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

সবচেয়ে কষ্টদায়ক, পরিবারের কেউ গুম হলে বাকি সদস্যদের জীবনধারণও দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। তারা অপেক্ষার পর অপেক্ষা করে যায় স্বজনের জন্য। এ অপেক্ষা যেন কোনো দিনও শেষ হয় না। তারাও আমৃত্যু কষ্ট ভোগ করে যান অপেক্ষার যন্ত্রনা নিয়ে। গুম প্রবণতা চালু হওয়ার আগে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার লোকজনের লাশ ফেরত পেতেন স্বজনরা। এখন আর তাও পাওয়া যায় না।

সরকার জনগণের নিরাপত্তার মালিক তাই । জনগন গুম এর মতো একটি বিষয় নিয়ে প্রচুর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তা নিয়ে সরকারের মাথা ব্যাথা নেই। অনেক সংস্থা ও ব্যক্তি গুম সম্পর্কে সরকারের বক্তব্য চেয়েছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি। সরকারের এই নীরবতায় সবাই হতবাক। এ কী রাষ্ট্র-ব্যবস্থা চলছে, মানুষ গুম হচ্ছে, অপহৃত হচ্ছে; তাদের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। একটি স্বাধীন দেশে মানুষের লাশের পর্যন্ত কোনো সংবাদ পাওয়া যাবে না, তা কিভাবে হয়। অনতিবিলম্বে সব ধরনের গুম, গুপ্তহত্যা, বিচারবহির্ভূত সব হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা উচিত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনোক্রমেই এ রকম অরাজকতা চলতে পারে না।

বর্তমানে যেভাবে লোকজন নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন তা উদ্বেগজনক। বলা হচ্ছে, এখন ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধারে নাকি আইন-শৃংখলা বাহিনীকে কাজে লাগানো হচ্ছে, সরকারী কিলার মিশন নাকি টাকা দিলেই পাওয়া যায় । এটা গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে বড় বাধা। এর আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এভাবে গুম হয়ে যেতো লোকজন। সেসব দেশের ফ্যাসিস্ট সরকারের স্থান আজ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ের পাতায়। জনগনের থেকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন সরকারের আচরণ যেন অলৌকিকভাবে হলেও পরিবর্তিত হয়ে যায়, তারা যেন জনগনের ভাষা, তাদের আশা-আকাঙ্খা বুঝতে সক্ষম হন এবং তাদের পরিণতি যেন ইতিহাসের সেই সব ফ্যাসিস্টদের মতো না হয়, সে প্রত্যাশায় বুক বেঁধে আছি।