ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

এ দেশে জন্ম লাভ করাকে পরম সৌভাগ্য বলিয়া মনে করিতাম। হত দরিদ্র এ দেশের অতি সাধারণের কাতারে দাড়াইয়া যাপিত জীবন লইয়া আক্ষেপ থাকিলেও জন্ম পরিচয় লইয়া কখনো কোন আক্ষেপ বিন্দু পরিমান ছিলো না। এ ভূখন্ডে জন্ম লইয়া বলিতাম , ‘ধন্য আমি জন্মেছি এ দেশে’’। এ দেশের মাটি-বায়ু-জল সবকিছুই নিজের বলিয়া মনে হইতো। জন্ম সূত্রে একটি এলাকার বাসিন্দা আমাদেরকে হইতেই হয়। দেশের চাইতে তাহাকে প্রাধান্য অনেকেই দিয়া থাকিলেও আমি কেন জানি দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করিতাম না। আমি এই বাংলাদেশের, তাহাই ভাবিতাম।

আমার ব্লগে নাম ‘জাগো বাহে জাগো’ দেখিয়া অনেকেই আমাকে উত্তরাঞ্চলের মানুষ বলিয়া ভ্রম করিয়া থাকেন। অনেকেই প্রশ্ন করিয়া থাকে, আপনি এক এলাকার মানুষ হইয়া কেন ভিন্ন এলাকার শব্দ চয়ন করিয়াছেন? তাহাদের আমি বিপরীত ভাবে প্রশ্ন করিয়া বলি, রংপুর/ নীলফামারীর মানুষেরা কি বাংলাদেশের বাহিরে? আমি তাহাদের প্রশ্নেই আশ্চর্যান্বিত হই।

সে যাহাই হউক, ইদানিং আমার ধারণার বিস্তর পরিবর্তন হইয়াছে। এই পরিবর্তন আমূল। আমার উপলব্ধি, আমি যাহা মনে মনে পূর্বে ভাবিয়াছি বা যাহা লইয়া গর্ব করিয়াছি এখন মনে হইতেছে তাহা ছিলো সম্পূর্ণই ভুল। আমার বাংলাদেশের নাগরিক না হইয়া একটা নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দা হওয়াটাই উচিত ছিলো। ফেনী, বগুড়া বা গোপালগঞ্জ এ জন্ম লাভ করিবার মতো সৌভাগ্য আমার হয় নাই কেন? বা আমার পূর্ব পুরুষ ইরান-তুরান বা ভারত হইতে আসিয়া কেন গোপালগঞ্জ বা ফেনীর মতো জায়গায় বসত-ভিটা গড়িয়া তুলিতে পারে নাই তাহার জন্য আফসোস রীতিমতো আমাকে তাড়াইয়া বেড়াইতেছে।

কিন্তু আমার হঠাৎ এইরূপ উপলব্ধির কারণ কী? ইহা হঠাৎ করিয়া উদয় হয় নাই। ক্ষমতায় উপবিষ্ট পক্ষের দাপট এর সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনেকেই পরিচিত। মানুষের পক্ষ টান নাকি তার চরিত্র গত বৈশিষ্ট্য। পছন্দের ব্যক্তির প্রতি টান, দলের প্রতি টান, গোত্রের প্রতি টান, নিজের পরিচিত জনের প্রতি টান এইসব মানুষের থাকিবেই। ইহাতে দোষের কিছু নাই।

কিন্তু এই টান যখন পক্ষ পাতে দুষ্ট হইয়া যাইবে, মানুষকে অন্ধ করিয়া ফেলিবে, মানুষের বিবেককে দুমড়াইয়া মুচড়াইয়া ফেলিবে তখন আর তাহাকে কোন ভাবেই স্বাভাবিক বলা যাইবে না।

বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জের সন্তান। এই গোপালগঞ্জ তাই জেলা হিসেবে আলাদা মর্যাদায় আসীন। এই গোপালগঞ্জের প্রতি আপনার-আমার টান থাকিবে, একটা ভালো লাগা থাকিবে। কিন্তু এ ভালো লাগার পর্ব যখন গোপালগঞ্জের প্রতি একতরফা হইয়া যাইবে তখন আপনি কী বলিবেন?

যেখানে যাইবেন, গোপালগঞ্জ এর জয়জয়কার। ‘বাড়ি আমার গোপালগঞ্জ’ এ কথাটি অন্ধকার নির্জন রাস্তায় ছুঁড়িয়া দেখুন, আমি আপনাকে গ্যারান্টি দিয়া বলিতে পারি সেইখানে হাওয়া হইতে আলো লইয়া আপনার সেবায় লোকজন হাজির হইবে। আমি আগে ভাবিতাম, গোপালগঞ্জ লইয়া সংবাদ-মাধ্যমগুলি বোধহয় কিছু অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করিতেছে। কিন্তু আমার বর্তমান অভিজ্ঞতায় হলফ করিয়া বলিতে পারি, গোপালগঞ্জ এর কৃতি সস্তানদের বেশিরভাগ কৃত-কর্মের খবরই অজ্ঞাতই রহিয়া যায়।

যেথায়ই যাইবেন এখন, বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে যাইবেন সেবা পাইবেন একরকম আর যদি গোপালগঞ্জ এর হইয়া যান পাইবেন আর এক রকম। সমাজে বাস করিতে গেলে কাহারো সাথে আপনার সম্পর্কের অবনতি ঘটিতে পারে, আপনার অধিকারে কেউ ব্যাঘাত ঘটাইতে পারে, খামাকাই আপনাকে হয়রানিতে পতিত করিতে পারে কোন দুষ্ট চক্র।

কম-বেশি আদি কাল হইতেই মানুষে মানুষে বিভিন্ন রকম সমস্যা চলিতেছে। কিন্তু বর্তমানে সমস্যা না চাইলেও আপনার ঘাড়ে আসিয়া পড়িবে।এভাবে আপনি যতই সঠিক অবস্থানে থাকুন আপনি যতোই স্বচ্ছ থাকুন আর আপনার বিরোধটা যদি স্বয়ং গোপালগঞ্জ এর সাথে হয় তাহা হইলে ভোগান্তির ষোলকলা কাহাকে বলে ও তাহা কতো প্রকার উহা সহজেই জানিতে পারিবেন। কোন কিছু লইয়া কোথাও অভিযোগে যাইবেন, বিচার চাহিবেন? যান। দেখিতে পারিবেন যে অভিযোগ আপনি করিতে যাইতেছেন তাহার চাহিতেও কঠিন অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে হাজির। যে স্বাক্ষীদের আপনি লইয়া আসিয়াছেন তাহারাও গোপালগঞ্জ এর সম্মুখে পড়িয়া বলিয়া উঠিবে, আমি কিছু দেখি নাই, কিছু শুনি নাই। তখন আপনি নিজ হইতেই বলিয়া উঠিবেন, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, ওরে বাবারে! আপনি নেতা খুঁজিবেন? বহু কষ্ট করিয়া ক্ষমতায় থাকা দলের দূরসম্পর্কের আত্মীয় নেতাকে বাহির করিলেন। তিনি আপনার কথা শুনিয়া বিগলিত হইলো আপনার জন্য কিছু করিবার জন্য সে ওয়াদাও করিলো। কিন্তু যেই মাত্র আপনার প্রতিপক্ষ গোপালগঞ্জ শুনিবে, সে নিশ্চিত আপনাকে নানা অজুহাত দেখাইয়া রনে ভঙ্গ দিবে। গোপালগঞ্জ নামটির এখন এমনই দাপট!

এ সময় আমার চরম উপলব্দি, আমার জন্ম কেন গোপালগঞ্জ এ হইলো না বা আমার পিতামহ বা পূর্বপূরুষ কেন গোপালগঞ্জ এ আসিয়া নিবাস করিলো না? আর তা না হইলে অন্তত ফেনী বা বগুড়ায় হইলেও চলিত। কিছুদিন কষ্ট করিয়া চলিতে পারিলে আবার সারাদেশে তাহাদেরই রাজত্ব শুরু হইবে বলিয়া আশা করা যায়। জনগন বার বার তো গোপালগঞ্জ বা ফেনীর কাছেই ফিরিয়া যায়!

(বি:দ্র: এই লেখাটিতে গোপালগঞ্জ, ফেনী, বগুড়ার সাধারণ মানুষদের কথা বলা হয় নাই, বলা হইয়াছে ঐ সমস্ত এলাকার তথাকথিত কৃতি সন্তানদের (!) প্রভাব প্রতিপত্তি এবং তাহাদের এলাকা ভিত্তিক রাজনীতির অপ প্রয়োগ সম্পর্কে।)