ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

দাবী আদায়ের গুরুত্ব বোঝাতে ‘হরতাল’ নামক গুজরাটি ভাষার একটি শব্দের সাথে পৃথিবীর মানুষের পরিচয় শত বছরেরও অধিক কাল ধরে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ওরফে মহাত্মা গান্ধী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এ হরতাল কর্মসূচিকে অহিংস আন্দোলনের একটি উপাদান হিসেবে যুক্ত করেন। তারপর থেকে হরতাল বেশ কার্যকর একটি আন্দোলন হিসেবে এ উপমহাদেশ স্থান করে নেয়।

মহাত্মা গান্ধী হরতালকে কেন বেছে নিয়েছিলেন? এর প্রধান কারণ অহিংসতার মাধ্যমে বিশাল বড়ো এক প্রতিবাদের ভাষা বৃটিশদের জানিয়ে দিতে। প্রথম দিকে এটি ভালো কার্যকরী একটি পদ্ধতি হিসেবে পরিগনিত হলেও পরবর্তিতে গান্ধীজি নিজেই এ নিয়ে প্রবল হতাশা ব্যাক্ত করেছিলেন, বিশেষ করে হরতালের অহিংস রূপটি যখন ক্রমে সহিংসতার দিকে যাচ্ছিলো।

বৃটিশ শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৪৮ সালে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবীতে প্রথম হরতালটি পালিত হয়। তারপর ৫২ এর ২২,২৩,২৪ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন এর অংশ হিসেবে স্বতস্ফুর্ত ভাবে হরতাল পালিত হয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের ভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে হরতাল হয়েছিল মাত্র ছয় দিন। এ ছয়টি হরতাল দিয়েই পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীকে ব্যাপক চাপে ফেলে দিয়েছিলো বাঙালীরা। এভাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ব পর্যন্ত হরতাল গুলো ছিলো স্বতস্ফুর্ত। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা শহরে এবং ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সমগ্র বাংলাদেশে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। জনগন সে হরতালে অংশ নিতো স্বেচ্ছায়। জনগন এ হরতালের মাধ্যমে যেন তাদের ইচ্ছাটাকেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে জানিয়ে দিতো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে হরতাল এক অসাধারণ অস্ত্র, পাকিস্তানি শোষকদের বিরুদ্ধে হরতাল ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাঙালী আপামর জনতার সম্মিলিত বিদ্রোহের প্রকাশ।

স্বাধীন বাংলাদেশে হরতাল ১৯৭৯ সাল থেকে ব্যাপক আকারে রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ এবং এরশাদ আমলে এটা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ঘন ঘন হরতালে জীবন যাপন এবং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মানুষের মাঝে এর গ্রহনযোগ্যতা বা স্বতস্ফুর্ততার কমতি দেখা যায় নি। স্বৈরশাসকের পতন এর জন্য মানুষ হরতালকে যেন মন থেকেই মেনে নিয়েছিলো।

এরশাদ গন-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যূত হলে ৯১ এ খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেন। তখন আওয়ামীলীগ ছিলো বিরোধী দলের কাতারে। হাসিনা হরতালকেই বেছে নিলেন সরকার বিরোধী আন্দোলনের অস্ত্র হিসেবে। ক্ষমতায় থাকা খালেদা হরতাল করাটা অনৈতিক বলে গেলেন এবং বিটিভি সহ সরকারী মাধ্যমগুলোতে এর ভয়াবহতা নিয়ে প্রচারনা চালালেন রীতিমতো । হরতালের স্বতস্ফুর্ত রূপ এর মধ্যে হারাতে চলেছে। মানুষ এরশাদকে হটিয়েছে। জনগন ভাবলো সে সাথে তারা বোধহয় হরতালকেও হটাতে পেরেছে। কিন্তু হরতাল এ দেশ থেকে এতো সহজে চলে যা্ওয়ার নয়। হরতাল তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হারালেও রয়ে গেলো স্ব-মহিমাতে।

এরপর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলো আর হাসিনা হলেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধী দলে এবার বিএনপি। এখন খালেদা জিয়াও শুরু করলেন হরতাল। তার কাছে মনে হলো হরতালই হাসিনার জুলমবাজ সরকারের হাত থেকে এ দেশকে বাঁচানোর একমাত্র অস্ত্র। আর হাসিনা তখন প্রথম বারের মতো ভাবতে লাগলেন হরতাল জাতির জন্য অভিশাপ।

এভাবে পালাক্রমে ক্ষমতায় একদল যায় আরেক দল আসে কিন্তু হরতাল থেকে যায় সব বিরোধী দলের কাছেই। আর হরতাল অচ্ছুৎ হয়ে যায় সরকারে থাকা দলটির কাছে। এভাবে হরতাল ক্রমে পরিণত হয় ক্ষমতায় যাবার নোংরা একটি অনুশীলনে । জনগনের কাছে হরতালের গ্রহনযোগ্যতা কতটুকু সে কথা ভাবেনা কেউ। বিদেশী শাসকদের শোষনের বিরুদ্ধে, স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক জান্তার অপশাসনের বিরুদ্ধে যে হরতাল কর্মসূচি যুগ যুগ ধরে মানুষের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছিলো, নির্বাচিত গনতান্ত্রিক সরকারের সময় এসে সেই কর্মসূচি মানুষের কাছে গুরুত্ব হারিয়ে ফেললো অথচ বিরোধী দলের কাছে তা আরো পূজনীয় হয়ে উঠলো।

আর এদিক দিয়ে বাংলাদেশে হরতাল বৈধতা পায় আইনের মাধ্যমেই। ১৯৯৯ সালে হাইকোর্ট এর একটি বেঞ্চ হরতালকে একটি রাজনৈতিক অধিকার বলে রায় ঘোষণা করে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে হরতাল চলাকালে এর বিরুদ্ধে বা পক্ষে কোনো রকম সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংঘটিত হলে তার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমের বিধান জারি করার কথাও বলেন উভয় আদালত।

অথচ জনগনের প্রয়োজনে হরতাল নেই। রাস্তা-ঘাটের বেহাল দশা নিয়ে, পরিবহন খাতের নৈরাজ্য পরিস্থিতি নিয়ে, জিনিস পত্রের দাম বৃদ্ধি নিয়ে, জ্বালানীর মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংকট থেকে উত্তরণের দাবীতে হরতাল হয় না, হরতাল হয় নেতাদের বাড়ী রক্ষার জন্য, নেতাদের মুক্তির জন্য, গুম হয়ে যাওয়া নেতার জন্য।

প্রতি হরতালে কেবল পরিবহন খাতেই প্রায় পৌনে এক কোটি মানুষ ক্ষতির শিকার হন। পরিবহন এ পণ্য সরবরাহ এর ব্যাঘাত ঘটায় স্বাভাবিক ভাবেই বেড়ে যায় দ্রব্যমূল্য। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হন প্রায় ৩ কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও খেটে খাওয়া মানুষ । কমে যায় সরকারি ব্যাংক, বীমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন। গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা সময় মত অর্ডার সরবরাহ করতে পারেন না, বিদেশি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা বিরক্ত হয়ে ব্যবসা অন্য দেশে স্থানান্তরের চিন্তা করেন, কমে যায় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যও নেমে যায় আশঙ্কাজনকভাবে। লেখাপড়া ব্যাহত হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। জন দুর্ভোগের অন্ত থাকে না।

হরতালের আগের দিন রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পিকেটারদের যানবাহনে আগুন দেয়াটা এখন রেওয়াজ হয়ে দাড়িয়েছে। এর ফলে যানবাহনই পুড়ছে না অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা পড়ছে অনেক নিরীহ জনসাধারন।এখন জনগনকে ভয় দেখিয়ে হরতাল কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়। এবং এ কাজটা করে থাকে উভয় দলই যখন তারা বিরোধী শিবিরে থাকে।

বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের হরতালের বিরুদ্ধে পুলিশি ও আইনী কার্যক্রম অতীতের যে কোন সরকারের হরতাল বিরোধী কার্যক্রম এর চেয়ে সফল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাদের এ হরতালের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থাটা ভবিষ্যতে তাদের উপরও এভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে বলে ধারণা করা যায়।

গত বছরের জুলাই মাসে খালেদা জিয়া যখন গণ-অনশন কর্মসূচি পালন করেন তখন অনেকেই আশান্বিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে হরতালের মতো গণ বিরোধী কার্যক্রম দেশ থেকে দূর হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। খালেদা জিয়া নিজেই সে সময় বলেন, ‘আর জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর-ধ্বংসের রাজনীতি নয়, হরতাল নয়। মানুষকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মতো শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে এই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটানো হবে’।

কিন্তু তিনি কিছুদিন পরেই শুরু করেন তার সেই জ্বালাও-পোড়াও ভাঙচুর-ধ্বংসের হরতাল কর্মসূচির। এভাবে তিনি ভুলে যান তার সেই সংকল্প। ইলিয়াস আলী নিখোঁজকে কেন্দ্র করে হরতালের ভোগান্তি যেন প্রতিদিনের সাধারণ চিত্র হয়ে দাড়িয়েছে এখন।

বেশ কিছু দিন হরতালে দেশ যাবার পর কিছুটা সুসংবাদ দেখা যাচ্ছ। বিরোধী দল ফিরে এসেছে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে।

১৮ দলীয় জোট নেত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আজ রোববার রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গণ-অনশন কর্মসূচি চলছে। এ ছাড়া ২৩ মে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর স্মারকলিপি প্রদান এবং ২৭ মে সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করারও ঘোষণা দিয়েছেন তারা ।

ধন্যবাদ খালেদা জিয়াকে তার এ বোধোদয়ের জন্য। শেষ হরতালটি নেতৃত্বের অভাবে ফ্লপ হলে তাদের বিকল্প চিন্তার অনুসন্ধান করতে হয়েছে কি না সেটা বড়ো বিষয় নয়, তারা যে পথে হাটতে শুরু করেছে তাকে আমাদের স্বাগত জানানো দরকার। জনগনের ক্ষতি না করে কিভাবে প্রতিবাদ জানাতে হয়, দাবি আদায় করতে হয় সে চিন্তাটা করা দরকার আগে। নিঃ সন্দেহে অনশন, বিক্ষোভ ইত্যাদি যুৎসই রাজনৈতিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হতে পারে।

উপমহাদেশে হরতাল এর মতো অনশন কর্মসূচীরও মহাত্মা গান্ধী অন্যতম পথ প্রদর্শক। মহাত্মা গান্ধী সহ অনেক বিখ্যাত নেতারা অনশন করেছিলেন তাদের প্রতিবাদ প্রকাশ বা দাবী আদায়ের পন্থা হিসেবে। সে ক্ষেত্রে অনশনের কষ্টটা গণ ভাবে অনুসারীদের অনুভব করাতে চান নি তারা। ঢাক-ঢোল পেটানো ছাড়াই নিজেরা তা করে গেছেন দিনের পর দিন এবং জেলখানাতেও প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এটিকে তারা ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন সময়ে।

নেতা কর্মীদের নিয়ে গণঅনশন করতে যেয়ে অনশনের ভারটা বেশি না হয়ে উঠে এবং দাবী আদায়ের এমন মোক্ষম অস্ত্রটা যেন হাস্যকর না হয়ে উঠে সেটা দেখতে হবে।

একজন খালেদা জিয়া নিজে অনশন করলে এবং ডিভিশন নিয়ে জেলখানার রাজকীয় সেল ‘’কাঁঠালচাঁপা’’ ও ‘’চম্পাকলি’’তে থাকা নেতারা একযোগে অনশন করলে অনেকগুলো হরতালের চেয়েও শক্তিশালী প্রতিবাদের অস্ত্র হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে।

(বিঃদ্রঃ ভ্রাম্যমান চা ওয়ালা মফিজ ভাই আমার কাছে খালেদা জিয়ার গণঅনশনের জায়গার ঠিকানাটা জানতে চাইছিলেন ।
আমি তাকে বললাম, হঠাৎ অনশনের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছেন যে মফিজ ভাই, কি অনশনে শরীক হবেন নাকি?
তিনি হেসে বললেন, হরতালের ক্ষতিটা একটু পোষাইয়া আসি।
আমি বললাম, বুঝলাম না আপনি কি বলছেন?
উত্তরে মফিজ ভাই বললো, আমাগো কলিমের (আরেক চা বিক্রেতা) কাছে শুনছি বিএনপির গত অনশনে হে বুলে অনেক চা-বিস্কুট-কলা ব্যাচছে, আমি এই সুযোগটা মিস্ করতে চাই না।)