ক্যাটেগরিঃ অন্যান্য

 

১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারীর রাতটা একটু চিন্তা করুন তো, কিংবা ২১ ফেব্রুয়ারীর উত্তপ্ত দুপুরটা। ভাবুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হোস্টেলে আপনিও আছেন এবং টগবগে ফুটন্ত রক্ত নিয়ে কিছু সদা উজ্জীবিত যুবক আপনার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানের আবেগের উষ্ণতা টুকু অনুভব করার চেষ্টা করুন। হ্যাঁ ইতিমধ্যে আপনার মনটা কিছুটা সিক্ত হয়েছে, আপনার মনটা এখন বাঙ্গালীয়ানা আবেগে ভেসে যাচ্ছে ,যদি আপনার মাঝে দেশপ্রেম এবং ভাষাপ্রেম থাকে তাহলে তো আপনি খুবই আবেগাপ্লুত অবস্থায় আছেন। এবার আপনাকে যদি কিছু অফার দেয়া হয়, অমুক প্রডাক্ট কিনলে ২১ সংখ্যাযুক্ত কিছু একটা ফ্রি বা অমুক জিনিস ব্যবহার করলে আপনি ২১ সংখ্যাযুক্ত কিছু সুবিধা পাবেন তাহলে হয়ত অফার শুনে হয়ত আপনি আরো একটু আবেগাপ্লুত হয়ে সেই প্রডাক্টটির ভক্ত হয়ে যাবেন এই ভেবে যে এর সাথে আমাদের গৌরব জড়িত।

বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমরা খুবই সমৃদ্ধশালী এটা হয়ত আমাদের চেয়ে বাহিরের বিশ্বই বেশি জানে। আমাদের মত এত বড় গৌরব-অহঙ্কার নিয়ে আর কোন জাতি পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁডিয়ে আছে তার উদাহরন দেয়া খুব কষ্টের। বাঙ্গালী জাতি যে সময়ের প্রয়োজনে জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে তা নয় বরং ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে সুপ্রাচীন কাল হতেই বাঙ্গালী জাতি প্রতিবাদী জাতি,বিপ্লবী জাতি। ইংরেজ শাসনামল থেকেই বাঙ্গালীদের মাঝে জাতি সত্ত্বার এক অপূর্ব নিদর্শন পাওয়া যায়। অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে যেকোন সময় গর্জে উঠাই বাঙ্গালী জাতির বৈশিষ্ট্য আর সে কারনেই বোধহয় এত বিশাল বিশাল অর্জন আমাদের পাওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এত ছোট একটা জাতি পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকবে তা বোধহয় অনেকেরই পছন্দ নয়, আর তাই আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-গৌরব সবকিছুকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করার লোকেরও অভাব নেই। হয়ত সে কারনেই আমাদের আবেগগুলোকে ধ্বংস করার এক নির্মম উল্লাসে নেমেছে কিছু বহুজাতিক এবং বিদেশী প্রতিষ্ঠান আর সে সাথে এই অপচেষ্টাকে ট্রেন্ড বা প্রচলন বানিয়ে দিয়েছে তারা আর এর সাথে যে ব্যবসায়িক চিন্তা-ধারার সংমিশ্রণ ঘটেনি তা বলা যাবে না কোনভাবেই। আর দেশীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেও একই কায়দা শিখিয়ে দিচ্ছে সেইসব ভিনদেশীরা।

গত বছরের একটি মোবাইল ফোন কোম্পানীর “৩০ মিনিট’ এর সেই প্রচারণার কথা মনে আছে? বাঙ্গালীর এত বিশাল একটা আবেগকে ৩০ মিনিটে বন্দী করে সেটাকে নিয়ে ব্যবসা করাটাই কি মূল কথা ছিল সেখানে নাকি সেখানে বাংলাদেশের গুনী ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করে কোম্পানীর প্রচারের উদ্দেশ্যটাই মূখ্য ছিল? না । আমাদের এত বিশাল একটা আবেগকে, এত বিশাল একটা ঘটনাকে ৩০ মিনিটের মাঝে বন্দী করাটাই মূখ্য ছিল, নতুন প্রজন্মকে ভুল ইতিহাস শিক্ষা দেয়ার এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হতে পারে না। কারনটা ছিল আরো সুদূরপ্রসারী। এত বড় একটা বিষয়কে ৩০ মিনিটে বন্দী করতে পারলে সেই ৩০ মিনিটকে ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেয়া খুব সহজ কাজ আর সেই ৩০ মিনিটে বন্দী নতুন প্রজন্মকে তো ভুলিয়ে দেয়া আরো সহজ কাজ। ফেব্রুয়ারীর সেই উত্তাল সময়ের আবেগ এবং ২১ শে ফেব্রুয়ারির আবেগকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য পুরো বিষয়টিকে ৩০ মিনিটে বন্দী করার বুদ্ধিটা নিসন্দেহে দারুন। এবারো তারা একই কাজ করবে হয়ত, কিন্তু গতবার যেহেতু বিষয়টি কিছুটা স্বীকৃতি পেয়ে গেছে তাই এবার তারা ১৬ ডিসেম্বরও একই কায়দায় এগিয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে তারা ১৬ ডিসেম্বরের পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনের সময়টা নিয়ে মাতামাতি করে পুরো নয় মাসের আবেগকেও ঐ কিছুটা সময়ে বন্দী করে ফেলবে এবং নতুন প্রজন্মকে তাতে অভ্যস্ত করার জন্য হয়ত বিকেল চারটার আশে-পাশে কিছু সময়ের জন্য এসএমএস ফ্রী করে দিবে বা ১৬ পয়সা ( ইতিমধ্যে সেটি করা হয়েছে) করে দিবে আর তখন দেখা যাবে তরুন প্রজন্ম ঐ সময়টাতে সবাইকে এসএমএস দিচ্ছে “শুভ বিজয় দিবস” আর ভাবছে সে খুব দেশপ্রেমিক। কিন্তু এটাই কি আমাদের আবেগ? এটাই কি আমাদের এত গৌরবময় অহঙ্কার? এটাই কি আমাদের উদযাপনের উপায়? ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে কালো পোশাক আর বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসে লাল-সবুজ পোশাকে দিবসগুলোকে উদযাপন করাই এখন ২১ শে ফেব্রুয়ারীর অর্থ,১৬ ই ডিসেম্বরের কিংবা২৬ মার্চের অর্থ। হ্যাঁ,এটা অবশ্যই একটা ইতিবাচক দিক যে এ দিনগুলোতে মানুষ উদযাপন করছে, কিন্তু সেটাকে যদি কেউ ঐ উদযাপনের মাঝে বন্দী করে দেয়, সেই চেতনাকে বা আবেগকে উপলব্ধি করা থেকে বিমুখ করার চেস্টা করে তাহলে সেটা বাঙ্গালী জাতির জন্য অশনি সংকেত।

মূলত কিছুদিন ধরেই একটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বলছে যে তাদের মডেম কিনলে ২১২১ মেগাবাইট ফ্রী দেয়া হবে।( শুধু ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নয় আরো বহু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীও একই ধান্ধায় আছে) এর অর্থটা কি দাঁড়ায়? আমাদের ২১ শে ফেব্রুয়ারির আবেগটা নিয়ে কি তারা ব্যবসা করছে না? বাঙ্গালীর এক অতি আপন অহঙ্কার নিয়ে তারা ধান্ধাবাজির ব্যবসা করছে না? তারা কি সত্যিই এই গৌরবকে শ্রদ্ধা দেখাচ্ছে? এটাই কি শ্রদ্ধা দেখানোর উপায়? এতই যদি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-গৌরবকে শ্রদ্ধা দেখানোর ইচ্ছা থাকে তাহলে হয় নিজেদের কোম্পানীর লোগোতে ২১ এর মূল থিম ব্যবহার করুক কিংবা তাদের কোম্পানীতে বা তাদের ওয়েবসাইটে ২১ এর চেতনাকে প্রচার করুক, কিন্তু কেন এ আবেগকে বিক্রী করে ব্যবসা করা? কেন এ আবেগকে নিয়ে এত নোংরা ধান্ধা করা? এ কি আমাদের চেতনার উপর আঘাত নয়? আমাদের চেতনা আমাদের আবেগকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য এক অপচেষ্টা নয়? তবে আমরা কেন এর বিরুদ্ধে সোচ্চার নই? আমাদের এই চেতনাকে আমাদের এই আবেগকে বাঁচিয়ে রাখা, সমুন্নত রাখা কি আমাদের উপর বর্তায় না?

আসুন রুখে দাঁড়াই এসব ব্যবসাকে, সবাই একসাথে সোচ্চার হই নিজের জায়গা থেকে, আমাদের আবেগ-ঐতিহ্য-অহঙ্কার নিয়ে কেউ যাতে ব্যবসা করতে না পারে সে দিকে সজাগ হই। তাত্পর্যপূর্ণ দিবসগুলোকে উদযাপনের দিন না ভেবে উপলব্ধি করার দিবস ভাবি, অনুপ্রাণিত হবার এবং করার দিবস ভাবি, দেশের প্রতি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতাকে স্মরণ করি, নতুন প্রজন্মে দিবসের চেতনাকে ছড়িয়ে দেই,তাদেরকে নব-চেতনায় উজ্জীবিত করি।

ধন্যবাদ।