ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আসসালামু আলাইকুম, শুরুতেই দ্বীপ জনপদ সন্দ্বীপের সাগর সংগ্রামী মানুষের পক্ষ থেকে রইল লাল গোলাপের শুভেচ্ছা।

হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত আর বাংলাদেশের প্রাচীন পরগনা খ্যাত দ্বীপ জনপদ সন্দ্বীপ। অতি প্রাচীন কাল থেকে বাংলাদেশের যে কয়টি অঞ্চল কৃষি শষ্য মৎস ও দেশীয় সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল তার মধ্যে সন্দ্বীপ আন্যতম। এক সময় এখানকার শষ্য আর মৎস সম্পদ বাংলাদেশের দক্ষিন পূর্বাঞ্চল তথা পুরো চট্রগ্রাম নোয়াখালী লক্ষীপুর বরিশাল এসব অঞ্চলে ব্যবসা বানিজ্য সম্প্রসারণে প্রচুর ভূমিকা রাখে। কিন্তু এক সময়কার প্রায় ৫২০ বর্গ মাইলের সন্দ্বীপ বর্তমানে প্রমত্ত মেঘনার করাল গ্রাসে সংকুচিত হয়ে ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ৭০-৭৫ বর্গ মাইলের একটি জনপদে পরিনত হয়েছে। কয়েক দশক আগেও সন্দ্বীপে ২০টি ইউনিয়ন ছিল। ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে এখন তা ১৬ টিতে এসে দাড়িয়েছে। পশ্চিমে রাক্ষসী মেঘনা, পূর্বে সন্দ্বীপ চ্যানেল আর দক্ষিনে উত্তাল বঙ্গোপসাগর যেন প্রতিনিয়ত ভাঙ্গনের খেলায় মেতে উঠেছে। আর এই ভাঙ্গনের করুন আর্তচিৎকারে ভারী হচ্ছে সন্দ্বীপের আকাশ বাতাস। প্রকৃতির নিরন্তন ভাঙ্গা গড়ার এক বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে হাজার বছরের প্রাচীন এই জনপদের মানুষ প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে নিজের পিতৃ বসত ভিটা আর জন্মভূমির কোলে বসবাস করার জন্য । হয়ত এই প্রচেষ্টায় কেউবা টিকে থাকছে আবার কেউবা সমুদ্রের ভাঙ্গনের খেলায় পরাজিত হয়ে চলে যাচ্ছে নতুন কোন আবাসনের খোঁজে। সেই সাথে হয়তো তাদের মন থেকেও চলে যাচ্ছে নিজের প্রানের ভূমি সন্দ্বীপের প্রতি মায়া মমতা। আজ এই বাস্তবতার মুখে দাড়িয়ে এই দ্বীপ জনপদের একজন গর্বিত অধিবাসী হিসেবে নিজের কাছে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন জাগে যে বিধাতার কি নিয়তি খেলা যেখানে বাংলাদেশের যেকোন অঞ্চলের মানুষ ইচ্ছে করলে যে কোন প্রয়োজনে যেকোন সময় তার নাড়ীর টানে ফিরতে পারে তার মাতৃভূমিতে, কিন্তু সাগর বেষ্টিত এই সন্দ্বীপের মানুষ ইচ্ছে করলে যে কোন সময় আসা যাওয়া করতে পারে না তার মাতৃভূমিতে। তার এইমাত্রই কারন যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম অন্ধকারচ্ছন্ন যুগে বাস করছে এই অঞ্চলের মানুষ। নির্দিষ্ট সময়ে কিছূ কাঠের ট্রলার আর চট্রগ্রাম সদর ঘাট থেকে পাকিস্তান আমলের দুই একটি স্টিমার সার্ভিস দিয়ে যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন টুকু নিয়ে আসা যাওয়া করছে হতভাগা মানুষ গুলো। বিশেষ করে বর্ষার মৌসুমে সমুদ্র যখন উত্তাল থাকে সাগরের গর্জন শুনে ভয়ংকর এক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে বিধাতার নিয়তিকে মেনে নিয়ে এক বুক সাহস নিয়ে এই সাগর পাড়ি দেয় এই অঞ্চলের সংগ্রামী মানুষ গুলো । যাদের মনের ভিতর থাকে এক কল্পনার উত্তাল সাগর, প্রতিনিয়ত সেই সাগর পাড়ি দেয় প্রচন্ড সাহসী এই মানুষ গুলো। এই গেল নিয়তির কথা। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে সারা বাংলাদেশ যখন ডিজিটাল উন্নয়নে ভাসছে সেই সাথে পিছিয়ে নেই এই সন্দ্বীপের মানুষ। শিক্ষা দীক্ষায় জ্ঞান বিজ্ঞানে সর্বক্ষেত্রে বিচরন রয়েছে সন্দ্বীপের মানুষ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি হয়ত জানেন বাংলাদেশের দক্ষিন পূর্বাঞ্চলের দ্বীপ সন্দ্বীপের মানুষ গুলো তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব বেশী নেতা দেখার সুযোগ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন অথবা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দুই একজন রাজনৈতিক নেতার পদ ধুলি পড়েছিল সন্দ্বীপে। তাও আবার হয়তো দেখার সুযোগ হয়নি অনেক বর্তমান প্রজন্মের। কিন্তু অতি সৌভাগ্যের বিষয় যে অতি সম্প্রতি আপনার বিশাল এক কর্মযজ্ঞময় সন্দ্বীপ সফরকে ঘিরে উৎসবের এক আমেজ ছিল সন্দ্বীপের ধর্ম বর্ন দল মত নির্বিশেষে সকল মানুষের। চারদিকে কলরব ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আসছেন অবহেলিত সন্দ্বীপে। তাও আবার বিশাল রাষ্ট্রিয় প্রোগ্রামে। এতে স্বপ্ন যেন আরো বিশাল হতে লাগলো। সুদীর্ঘকাল থেকে গড়ে উঠা সন্দ্বীপ বাসীর প্রানের দাবি গুলো এবার তারা সরাসরি অন্তত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে পারবেন। তারই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গিয়েছিলেন সন্দ্বীপে। দেখেছেন সন্দ্বীপের মানুষের উচ্ছাস আর ভালোবাসা। সেই সাথে দেখেছেন সন্দ্বীপের মানুষ গুলো কত অধির আগ্রহ নিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি হয়তো জানেন এই সন্দ্বীপ একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এলাকা এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের প্রানের দাবি এই অঞ্চলটিকে যেন মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করা হয়। আর এই দাবিটির পিছনে অবশ্যয় একটি কঠিন কারন রয়েছে তা হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের স্রোত ধারার ধকল আর রাক্ষসী মেঘনার কবল থেকে যেন রেহাই পায় এই অঞ্চলের সংগ্রামী মানুষ গুলো। আর তার জন্য একটি বিশাল সুযোগ রয়েছে এই এলাকার। সেটি হল ক্রসড্যাম । যেটির মাধ্যমে একদিকে সুযোগ হবে বিশাল ভূমিকে সাগরের বুক থেকে জাগিয়ে তোলা আর অন্য দিকে ভয়াল মেঘনার হাত থেকে এই অঞ্চলকে রক্ষা করা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি হয়ত জানেন সভ্যতার প্রারম্ভ থেকে মানুষ তার নিজের বসবাসের জায়গা করার জন্য পাহাড় বন জঙ্গল কেটে উদ্ধার করেছে ভূমি। আর তাতে প্রচুর পরিমানে অপচয় হচ্ছে আমাদের সবুজ বৃক্ষ আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য। কিন্তু অতি সুখের বিষয় হল সাগরের তলিয়ে যাওয়া ভূমি গুলোকে উদ্ধার করে বাংলাদেশের আয়তন ও সম্ভাবন কে জাগ্রত করার দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে এখানে বসবাস করছে প্রায় চার লক্ষ মানুষ। যাদের অধিকাংশ মানুষ জড়িত কৃষিকাজ, মৎস চাষ, আর নানা ধরনের উৎপাদনমুখী কাজে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি হয়ত জানেন ১৯৭০ সালের নির্বাচনত্তোর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক সফরে এসেছিলেন সন্দ্বীপে। সেই দিনে সন্দ্বীপের আপামর জনতার একটি দাবি ছিল সন্দ্বীপের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র অবলম্বন প্রানের দাবি একটি ক্রসড্যাম যেন নির্মান করা হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সন্দ্বীপের মানুষের আগ্রহ আর উৎসাহ দেখে বলেছিলেন সন্দ্বীপে একটি ক্রসড্যাম নির্মান করা হবে। সেই থেকে প্রচন্ড আশাবাদী এই সন্দ্বীপের মানুষ আশায় বুক বাধতে শুরু করল যে একদিন তাদের প্রানের প্রিয় জন্মভূমি সন্দ্বীপ রক্ষার একমাত্র অবলম্বন ক্রসড্যাম নির্মান হবে। কিন্তু তার পর থেকে অনেক সরকার আসল আর গেল কিন্তু এই ক্রসড্যামের ভাগ্যে কিছুই জুটলো না। হতাশ হয়েছে বুক বাধা মানুষ গুলো। নিজেদের হতাশার কথা যে কাউকে জানাবে হয়ত এমন কাউকে খুজে পায়নি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ভেবে বসে আছে নতুন কোন আশায়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সম্প্রতি আপনি নাকি জলবায়ু ফান্ড থেকে প্রাপ্ত বেশ কিছু অর্থ দিয়ে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে সন্দ্বীপের একটি অংশ উডিরচর পর্যন্ত একটি ক্রসড্যাম নির্মানের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । কিন্তু অতি দু:খের সাথে বলতে হচ্ছে যে যেখানে নোয়াখালী থেকে উড়িরচরের মতো একটি ছোট ইউনিয়নকে সংযুক্ত করতে এতো বড় একটি প্রকল্প নেওয়া যায় সেখানে সন্দ্বীপের মতো এমন একটি জনবহুল উৎপাদনমুখী অঞ্চলকে কেন বিবেচনা আনা হচ্ছেনা ? হয়ত সন্দ্বীপের আপামর জনতা জানতে চাই কেন তাদের প্রতি এতো প্রবঞ্চনা। আর হ্যাঁ আরেকটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন তা হচ্ছে আপনি সন্দ্বীপের মানুষের উদ্দ্যেশে বলেছেন সন্দ্বীপ- কোম্পানীগঞ্জ ক্রস ড্যামটির বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাই এর জন্য নেদারল্যান্ডের বিশেষজ্ঞ নিয়ে যে কমিটি করা হয়েছে তাদের রিপোর্টে যদি এই অঞ্চলের কোন ক্ষতি না হয় এমন রিপোর্ট আসে তাহলে এই ক্রসড্যাম বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু অতি দুঃখের বিষয় যে এই আশার বানী টুকু শুনিয়ে সন্দ্বীপের মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বিদেশী কিছূ বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নদী ভাঙ্গনের উপর একটি সমীক্ষা রিপোর্ট তৈরী যেখানে উল্লেখ করা হয় সন্দ্বীপসহ এই অঞ্চলের ভাঙ্গনকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য সবচেয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা হল এই অঞ্চলের সমুদ্র পৃষ্ট থেকে জেগে উঠা ভূমি গুলো উদ্ধার করা । অর্থাৎ মেঘনার মোহনায় যে চরাঞ্চল রয়েছে বিশেষ করে মেঘনার মোহনার বাহিরে সন্দ্বীপ- উডিরচর- নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ এই এলাকায় একটি ক্রসড্যাম নির্মান করা। যাতে বিস্তির্ণ এলাকা নদী ভাঙ্গনের কবল থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু তার পরেও কেন শূধুমাত্র একটি কারন “সম্ভাব্যতা যাচাই” এই অজুহাত দিয়ে প্রত্যেকটি সরকার সন্দ্বীপের মানুষের স্বপ্নটিকে দুরে সরিয়ে রেখেছে। আরো একটি কারন জনমহলে শুনা যায় তা হচ্ছে নোয়াখালী ও ভোলা অঞ্চলের কিছূ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের এই বিষয়ে বিরোধিতা। আর কেনইবা এই বিরোধিতা তা হয়তো বোধগম্য নয় সন্দ্বীপের মানুষের। সমীক্ষাটি রির্পোট দিয়েছিল এরকম যে শুধুমাত্র সন্দ্বীপ অঞ্চলে যে ভাঙ্গন কমবে তা নয় এক্ষেত্রে উপকূলীয় সব কয়টি দ্বীপের ভাঙ্গন কমবে এই ক্রসড্যামের মাধ্যমে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ছোট বেলায় পড়েছিলাম “ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকনা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল” ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিও একদিন মানবসভ্যতার বিকাশের জন্য এই বিশাল জলরাশির মাঝে জেগে তুলেছে বিশাল বিশাল দ্বীপ রাষ্ট্র। হয়তো প্রাকৃতিকভাবে সাগরের বিন্দু বিন্দু বালি দিয়ে সভ্যতার অনেক বয়স কাটিয়ে সন্দ্বীপের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকে গড়তে হবে যদি না এই সন্দ্বীপের মানুষ তাদের প্রানের দাবিটি বাস্তবে দেখতে না পারে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সন্দ্বীপের হতভাগা জনতার পক্ষ থেকে আকুল আবেদন নিজ জন্মভূমির অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে বেগবান মানুষ গুলোকে প্রকৃতির সাথে নিরন্তর যুদ্ধ করে বাঁচার অবলম্বন একটি ক্রসড্যাম যেন নির্মান করা হয়। হয়ত এই অবদান টুকুর জন্য সন্দ্বীপের মানুষ আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকবে।

কাজী কাইসার হামিদ (মেহরাজ) শিক্ষার্থী্, (বি.বি.এ) আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্রগ্রাম

***
ফিচার ছবি: http://sandwip.info/crossdam.htm থেকে সংগৃহিত