ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

এই ঢাকা শহরে ১০-২০ হাজার ভিক্ষুক রয়েছে যাদের স্থায়ী পেশা ভিক্ষাবৃত্তি। সংখ্যাটা আরো বেশীও হতে পারে। এই ভিক্ষুকদের আপনি এলাকা ভিত্তিতে সারা বছরই দেখতে পাবেন। এরা কেউ স্বাধীন ভিক্ষুক, কেউ মহাজনের চুক্তিভুক্ত ভিক্ষুক। যারা স্বাধীন, তাদেরকেও কোন এলাকায় ভিক্ষা করতে হলে বিশেষ ব্যাক্তিবর্গকে নজরানা দিতে হয় যার পরিমান খুব নগন্য। নজরানা বাদ দিয়ে দিনের শেষে যা থাকে সেই নিয়ে ডেরায় ফিরে স্বাধীন ভিক্ষুক। আর যারা মহাজনের চুক্তি ভিত্তিক ভিক্ষুক, তাদের কোন সেলামী বা নজরানা দিতে হয় না, মহাজনি সেই ব্যবস্থা করেন। তারা দিনের শেষে যা আয় করেন তার পুরোটাই তুলে দিতে হয় মহাজনের হাতে। বিনিময়ে মহাজন খাওয়া, দাওয়া, ক্ষেত্র বিশেষে চিকিতসার ব্যবস্থা করেন। বছর শেষে ছুটিও দেয়া হয় । ১৫ দিন, এক মাসের ছুটি। তখন হাতে কিছু ধরিয়ে দেয়া হয়।

স্থায়ী এই ভিক্ষুকদের পাশাপাশি রমজান মাসের একটু আগে থেকে আস্তে আস্তে ঢাকার রাস্তায় ভিক্ষুক বাড়তে থাকে। মধ্য রমজানে ঢাকা’র রাস্তা -ঘাট, পাড়া -মহল্লা ভিক্ষুকে সয়লাব হয়ে যায়। আগে যে কোন পয়েন্টে ১-২ জন থাকলেও এই সময়ে সেখানে পাবেন ১০-১৫ জন। এরাই হল মৌসুমী ভিক্ষুক। রোজার শুরুতে এসেছেন – ঈদ শেষ করে হাতে টাকা পয়সা নিয়ে বাড়ী যাবেন। আসার সময় বাসের ছাদে বা বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়েই এসেছেন, যাবার সময়ও একই ব্যবস্থা। তবে মৌসুমী ভিক্ষুকদের সবাই অবশ্য রোজার ঈদের পরেই চলে যাবেন না। কিছু থেকে যাবেন যাদের টার্গেট থাকবে কোরবানী’র ঈদ। ফলে বছরের এই সময়টাতে ঢাকা’র রাস্তা-ঘাটে কয়েক লক্ষ ভিক্ষুক দেখতে পাবেন আপনি। এছাড়া অনেকেই স্থান নিয়েছেন পাড়া মহল্লার অলিতে গলিতে। দলবদ্ব বা পারিবার নিয়ে যারা এসেছেন তাদের পুরুষ সদস্যদেরকে পাড়ার মসজিদে আপনি পাবেন ইফতারের সময়। মসজিদে ইফতার দেয়া আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতির একটা অংশ। এরা অনেকেই সেখানে ইফতার করেন। ঢাকার সবগুলি গোরস্থানে স্থায়ী ভিক্ষুক আছে। অনেক মৌসুমী ভিক্ষুক সেখানেও স্থান নিয়েছেন, তবে অনেক কিছু ম্যানেজ করতে হয়েছে কারন গোরস্থানের সকল ভিক্ষুকই স্থায়ী এবং সঙ্গবদ্ধ। তাই মৌসুমী ভিক্ষুকদ্র অনেককেই স্থায়ী একটা চুক্তি মত করতে হয়েছে। দিনের শেষে ভিক্ষার একটা অংশ তুলে দিতে হচ্ছে বিশেষ কাউকে।

গত কয়েকদিনে আমি ঢাকার বেশ কয়েকটি পয়েন্টে এরকম কিছু ভিক্ষুকের সাথে কথা বলেছি। আশ্চর্যের বিষয় হল এদের সবার অবস্থা খুব একটা খারাপ নয়। গ্রামে কিছু জমি জিরাত আছে, কাজ কর্ম আছে। কিছুটা শখ বা হেয়ালী, কিছুটা অতি অল্প সময়ে নগদ টাকা আয়ের লোভে এরা ঢাকায় এসেছেন। অনেকেই এসেছেন পরিবার পরিজন নিয়ে। ২ থেকে ৮ জনের পরিবার। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য সংখ্যা যত বেশী, আয়ও তত বেশী। থাকেন রাস্তা-ঘাটে , মার্কেটের বারান্দায় এবং কেউ কেউ বাস বা রেল ষ্টেশনে আশ্রয় নিয়েছেন। খাবার খাচ্ছেন ২ বেলা। ইফতারি চেয়ে চিনতে – ফ্রি। সেহরি অনেকে রান্না করে খাচ্ছেন। অনেকে হোটেলের ফেলে দেয়া খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছেন। কেউ কেউ কিনে খাচ্ছেন। সেহরীতে আমি ২-১ জনকে খাবার ভিক্ষা করতে দেখলাম আনন্দ সিনেমা হলের পেছনে পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকায়।

এলাকা বুঝে এদের এক মাসের আয় (রমজান মাস) ৬ থেকে ১২ হাজার টাকা ! কিছু কিছু এলাকায় এর চেয়েও বেশী !! তবে যেসব এলাকায় আয় বেশী সেখানে জায়গা দখলের প্রতিযোগীতা বেশী। সেজন্য অনেক আগেই ঢাকা আসতে হয়। তা না হলে ভালো জায়গা পাওয়া যায় না। ভিক্ষার জন্য সব চেয়ে ভাল জায়গা হল দামী অথবা ব্যাস্ত মার্কেট এলাকা, রাস্তার জংশন যেখানে সারাক্ষন ট্রাফিক জ্যাম লেগেই থাকে। এছাড়া বাস ও রেল ষ্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল ও ভাল জায়গা। সারাক্ষন রমরমা ব্যাবসা। হ্যাঁ, ব্যাবসাই বটে। এই মৌসুমী ভিক্ষুকদের অনেকেই রোজা’র পরে বা কোরবানীর ঈদের পরে বাড়ী চলে যাবেন, ফের আসবেন আগামী বছর। আর ৫-১০ ভাগ হয়তো কখনই যবেন না, ঢাকাতেই ঠিকানা করে নিবেন।

ভিক্ষা চাইতে লজ্জা লাগে না? এই প্রশ্নে সদ্য আগত একজন জানালেন , প্রথম ১-২ দিন লাগতো, এখন লাগেনা। লজ্জার চেয়ে সংকোচ ছিল – যদি গ্রামের কেউ দেখে ফেলে? কারন গ্রামে অনেকেই জানে না তারা ঢাকায় এসে ভিক্ষা করছেন। কিন্তু ঢাকায় লক্ষ মানুষের ভিড়ে কে কার খোজ রাখে? তাই আস্তে আস্তে সংকোচ ও কেটে গেছে। সাধারনঃত শুক্রবার বেশী আয় হয়। তবে পাড়া ভিত্তিক ভিক্ষুকেরা সবচে বেশী আয় করেছেন শবে কদরের রাতে। তারপর লক্ষ্য আছে জুমাতুল বিদা এবং ঈদের জামাতের দিকে। তাই এখন শুধু অপেক্ষার পালা। ঈদ শেষ করে বাড়ি চলে যাওয়া।