ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

২০১১ সালে প্রথম এই সিন্ডিকেট এর অস্তিত্ব লক্ষ্য করেছিলাম । গেল কোরবানী’র ঈদে সেই সিন্ডিকেট এর হাতে পড়ে সাধারণ মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা হয়েছিল। মিথ্যা প্রচার করে ভারতীয় গরু আমদানী হতে দেয়া হল না। তারপর সতর্ক পাহারা বসানো হয়েছিল যেন ঢাকায় দেশী বা ভারতীয় গরু ঢুকতে না পারে। সাথে ছিল মিডিয়া প্রপাগান্ডা। খুব কৌশলে ঢাকা’র প্রতিটি গরুর হাটে গরু আমদানী সীমিত রেখে লক্ষ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল সেই সিন্ডিকেট। ২০ হাজার টাকার গরু কয়েক হাত বদল হয়ে ৪০ হাজার, ক্ষেত্র বিশেষে ৫০-৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল । ঢাকাবাসী অনেকেই গেলবার কোরবানীর জন্য গরু কিনতে পারেন নি।

২০১১ সালের সেই গরু সিন্ডিকেট নিয়ে আমার লেখাটা এখানে – লিংক
এবার দেখছি অন্য কৌশল। সেটা দেখে প্রথমেই প্রপাগান্ডা শুরু করে দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলো। একের পর এক প্রতিবেদনে কিভাবে সীমান্ত পাড়ি দেয়ে ভারতীয় গরু আমদানী/পাচার হচ্ছে তা দেখানো শুরু করে । এক টিভির সাথে আরেক টিভি’র প্রতিযোগিতা। কে সীমান্তের কত কাছাকাছি যেতে পারে। অথচ তারা একটি বারও ভাবেনি এত হৈ চৈ এর ফলে ভারতীয় গরু আমদানী বন্ধ হয়ে গেলে – গরু বাজারের কি অবস্থা হতে পারে? বাংলাদেশে এমনিতেই সারা বছর গরুর যে চাহিদা – ভারতীয় গরু ছাড়া সে চাহিদা আদৌ মেটানো সম্ভব নয়। ভারতীয় গরু আমদানী বন্ধ হয়ে গেলে দেশী গরু একদিন যাদুঘরে ঠাই পাবে। আর ঈদ বাজার তো বিশাল বাড়তি চাহিদা তৈরী করে। যাইহোক দেশীয় টিভি চ্যানেল গুলোর ইলেক্ট্রনিক প্রপাগান্ডা সত্বেও বিজিবি ছিল সহনশীল। তারা অবৈধ পথে আনীত গরু সীমান্তের এপারে ট্যাক্স আদায় করে বৈধ করে দিয়েছে। যার ফল গরুর হাটে (ঢাকা শহ সারা দেশে) প্রচুর দেশী – বিদেশী গরু। এবার এখন পর্যন্ত কোথাও গরুর ট্রাক আটকিয়ে রাখার খবর পাওয়া যায়নি।

ব্যাপক মিডিয়া প্রপাগান্ডা’র ফলে চ্যানেল গুলো ভেবেছিল হাটে খুব একটা গরু আসবে না। সুত্রাং ধারনা প্রসুত হয়ে চলতি সপ্তাহের প্রথম ১-২ দিন বলা হল হাটে গরু আসছে না, তাই দাম খুব বেশি। কিন্তু তাদের সহ অন্য কয়েকটি মহলের আশংকা মিথ্যা প্রমান করে দিয়ে প্রচুর গরু উঠেছে এবারের হাটে। আবার গতবারের ধাক্কা সত্বেও ক্রেতারা এখন পর্যন্ত বিচলিত নন বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে। তাই তারা এবার রয়ে সয়ে গরু কিনছিলেন। অবশ্য বিশেষ করে ঢাকা শহরে ২-১ দিন আগে গরু কিনলেও বিপদ। কোথায় রাখবে? ছোট বেলায় দেখেছি ৪-৫ দিন, অনেক সময় ৭ দিন আগেও গরু কিনে ফেলা হত। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। বাসার আশে পাশে খালি জায়গা ভর্তি হয়ে সব ফ্লাট আর বিল্ডিং উঠে গেছে। তাই এখন গরু কিনতে হয় ঈদের ১-২ দিন আগে।

গতবার গরু শূন্য বাজারে গরুর দাম দিয়ে মানুষের পকেট শূন্য করেছিল ব্যবসায়ী, দালাল সহ পুরো সিন্ডিকেট। এবার হাটে প্রচুর গরু। অর্থনীতির নিয়মে চাহিদা’র চেয়ে যোগান বেশী হলে দাম অবধারিত ভাবে কমবে। কিন্তু অর্থনীতির এহেন সহজ সমীকরণকে পালটে দিতে সক্রিয় বিক্রেতা, দালাল এবং টিভি চ্যানেল গুলো। তাই হাট জমে উঠার আগে থেকেই আকাশ চুম্বী দাম হেকে বসে আছে বিক্রেতা। সেই দাম আর কমছে না। হাটে প্রচুর গরু দেখে বিচলিত হলেও বেশী দাম চেয়ে বাজার গরম রাখতে সচেস্ট তারা সকলেই। দাম হেঁকেই যাচ্ছেন। কিন্তু বিচলিত নন ক্রেতারা। মিডিয়া প্রপাগান্ডায় কাজ না হওয়াতে অন্যভাবে সক্রিয় হয়েছে মিডিয়াগুলো। এখন দেখানো হচ্ছে হাটে নাকি গরু’র দাম খুব সস্তা। অনেক ক্রেতা’র সাক্ষাতকারও দেখানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব আলাদা। এবার এখন পর্যন্ত গরু’র দাম গতবারের হাহাকার সময়ের চাইতেও বেশী। ফলে চুড়ান্তভাবে বিভ্রান্ত সাধারন ক্রেতা। যাদের বাসার আশে পাশে বা বাসার ভেতরে ২-৩ দিন গরু রাখার সুবিধা আছে তারা ২-৩ দিন আগে গরু সস্তা যাচ্ছে শুনে পড়ি-মরি করে হাটে গিয়ে বোকা হয়ে যাচ্ছেন। আমি নিজেও ধোঁকা খেয়েছি।

ঈদের আর মাত্র ২ দিন (৪৮ ঘন্টা’র ও কম) বাকী। এখনও বাজার বেশ চড়া। আজ বৃহস্পতিবার। শেষ অফিস। ধারনা করছি, হয়তো অর্ধ বেলা অফিস করে সবাই ছুটবেন হাটে। যা হবার আজকেই হবে। হয় দাম কমবে, নয়তো বিক্রেতা’র সীমাহীন লোভের কাছে ক্রেতা পরাজিত হবেন।

দাম যদি সত্যি সত্যি কমে তখন ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলো আবার হয়তো ভাষা পাল্টাবে। ভোল পাল্টাতে এদের সত্যি জুরি নেই। সত্যি সত্যি কি হবে সেটা আজ রাত ৮ -১০ টা’র মধ্যেই বোঝা যাবে । চলুন অপেক্ষায় থাকি।

পাঠক এবং ক্রেতাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ – দেখে শুনে, বুঝে গরু কিনবেন। কোন মিডিয়া প্রপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হবেন না। মিডিয়া সাধারন জনগনের স্বার্থ দেখে না। ওরা দেখে তার মালিকের স্বার্থ। গরুর দাম কমলে বা বাড়লে ওদের মালিকের কিছুই যায় আসে না। কিছুই যায় আসে না অতি উচ্চ বেতনভোগী বার্তা সম্পাদকদের। তাই এসি রুমে বসে অবলীলায় ওরা যা ইচ্ছা তাই প্রচার করে। আর একটা কথা। ঢাকার কয়েকটি হাট ঘুরে বেশ কিছু অসুস্থ গরু আমি দেখেছি যার অধিকাংশ খুরা রোগে আক্রান্ত। অনেক গরু বিষাক্ত মোটাতাজাকরন ট্যাবলেট খাওয়ানো, নড়াচড়া করতে পারছে না। তাই সুস্থ গরু কিনবেন।

আর সবশেষে বলতে চাই আসুন এই কোরবানীর ঈদে আমরা আমাদের লোভ, লালসা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা সহ সকল অন্যায় প্রবৃত্তি গুলোকে কোরবানী দেই। তবেই ঈদ সার্থক হবে আমাদের জীবনে। আসুন সকন অন্যায় সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে ভাল মানুষ তথা সু-নাগরিকের সিন্ডিকেট করে তুলি। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।