ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ঢাকায় জন্ম, বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া। চাকুরী জীবনের বেশীর ভাগ ঢাকার বাইরে কাটালেও ঢাকার সাথে যোগাযোগটা সব সময়ই ছিল, আছে। বিভিন্ন উৎসব – পার্বণে প্রায় সবাই ঢাকার বাইরে যায়, আমাকে আসতে হয় ঢাকায়। যাকগে সেসব কথা।

সেই শৈশব থেকেই দেখছি ঢাকার টঙ্গী অঞ্চলে বিশ্ব এজতেমা অনুষ্টিত হচ্ছে। কখনও যাইনি। যেতে ইচ্ছাও করেনি কোন দিন। ছোট বেলায় যতটুকু দেখেছি বা মনে পড়ছে, এখনকার তুলনায় বিশ্ব এজতেমা অনেক ছোট পরিসরে হত। পুরনো ঢাকায় আমার বাসার আশে পাশে খুব কম লোককেই যেতে দেখেছি। গেলেও ততটা সারম্বরে নয়। যে যার মত চুপ-চাপ গেছে, আবার ফিরেও এসেছে। ইদানিং বিশ্ব এজতেমা নিয়ে মনে হয় উন্মাদনাটা বেশী। উন্মাদনা বললাম একারনে যে, আজকাল আখেরী মোনাজাত সরাসরি টিভিতে দেখানো হচ্ছে। সেই দৃশ্য টিভিতে দেখে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের লক্ষ কোটি মানুষ একইসাথে মোনাজাতে সামিল হচ্ছে।

অনেকবছর ধরেই লক্ষ করছি এজতেমা শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার এবং রবিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে সেটা শেষ হচ্ছে। উন্মাদনা আরো বলেছি একারনেই যে, রবিবার লক্ষ লক্ষ মানুষ টঙ্গী অভিমুখে ছুটছে আখেরি মোনাজাতে সামিল হতে। সরকারী অফিসে সেদিন অঘোষিত ছূটি। কর্মকর্তা – কর্মচারী সবাই ছুটছে বিশ্ব এজতেমায়। এছাড়া ব্যবসায়ী, ছাত্র, যুবক রিক্সা ওয়ালা, কুলি মজুর সবার গন্তব্য এক। পুরো ব্যাপারটা কল্পনাকেও হার মানাবে।

সকাল থেকেই কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বিমান বন্দর অভিমুখে গাড়ী চলাচল বন্ধ থাকবে । ঢাকা শহরের মানুষ যারা শুধু মোনাজাতে অংশ নেবেন তারা কুরিল থেকে পায়ে হেটে যান। সেকি মানুষের স্রোত! এরকম মানুষের স্রোতকে তুলনা করা যায় ১৯৭১ সালের সাথে। পার্থক্য এটুকু যে, ১৯৭১ সালের সেই স্রোতে নারী-পুরুষ, শিশু, নাবালক সহ সব বয়স, লিঙ্গ ও ধর্মের মানুষ ছিল। বিশ্ব এজতেমার মানুষের স্রোতে নারী আর শিশুরা নেই। তবে সদ্য কিশোর দেখেছি হাজার হাজার। উদ্দেশ্য একটাই – আখেরী মোনাজাতে শরীক হবে।

ইসলাম ধর্মে বেশ কিছু (সম্ভবতঃ ১৩০ টি) ফরজ কাজের কথা বলা আছে। সবগুলো ফরজের মধ্যে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করেই আছে ১৭ টি ফরজ। বিশ্ব এজতেমার আখেরী মোনাজাতে অংশ নিতে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ কয়েক মাইল পায়ে হেটে তুরাগ তীরে পৌছেছেন তাদের মধ্যে শতকরা কতজন সেদিনের ফজর নামাজের ফরজ অংশটুকু আদায় করেছেন? তাদের মধ্যে কতজন সেদিনের মোনাজাতের আগে বা পরে জোহরের নামাজটুকূ পড়েছেন?
সেদিন যত সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস ফাকি দিয়ে তুরাগ তীরে ছুটে গেছেন মোনাজাতে অংশ নিতে, তাদের সেদিনের উপার্জন কি হালাল হয়েছে?

যে সব লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন ট্রেনের ছাদে চড়ে বিনা টিকিটে টঙ্গী অবধি আসা যাওয়া করেছেন তারা লোকসানে জর্জরিত রাষ্ট্রীয় রেল বিভাগের লোকসান আর কতটুকু বাড়িয়েছেন?
সেদিন ঢাকার অধিকাংশ স্কুলে ছিল অঘোষিত ছুটি। কোন ক্লাস হয়নি। এসব স্কুলের শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদেরকে ঠিক কোন শিক্ষাটা দিয়েছেন?

ইজতেমা মাঠের পাশে তুরাগের দক্ষিন তীরে উত্তরা আবাসিক এলাকার মানুষ, ইজতেমা মাঠের উত্তরের এলাকায় দিন-রাত ভর মাইকের অতি উচ্চ ভলিউমে বয়ান শুনতে শুনতে (যার ৮০% অবোধ্য) ক্লান্ত এবং অতিষ্ঠ শিশু, বৃদ্ধ্ব, কিংবা অসুস্থ হাজারো মানুষ আল্লাহর কাছে ঠিক কি প্রার্থনা করেছিল আখেরি মোনাজাতের সময়?

শুক্র -শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। ৫২ সপ্তাহে ১০৪ দিন সরকারী অফিস বন্ধ। সেই সাথে ঈদ, এই দিবস, সেই দিবস মিলিয়ে আরো ২০-৩০ দিন বাদ যায়। ইদানিং বোনাস হিসেবে থাকছে বিরোধী দলের হরতাল। এই অভাগা দেশে পুরো বৎসরে মোট কর্ম দিবস কয়টিই বা পাওয়া যায়? সেই সাথে ইজতেমার আখেরী মোনাজাত। আগে তাও একটি ছিল, এখন দুটি আলাদা ভাগে ইজতেমা, দুটি আলাদা আখেরী মোনাজাত। ১০ বছর পর যখন দেশের জনসংখ্যা ২৫ কোটি হবে তখন কি ৪ ভাগে হবে ইজতেমা? তার মানে ৪টি মোনাজাত? আরো ৪টি কর্ম দিবস কমবে?

কেন ইজতেমা শুক্রবারে শুরু করে শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনের মধ্যেই শেষ করা যায় না? যদি জায়গার অভাবে ইজতেমা ২ বারে করতে হয়, তাহলে এটাকে ঢাকায় রাখার দরকার কি? ঢাকার বাইরে (যেমন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া) এই এজতেমা স্থানান্তর করতে কি অসুবিধা?

ওয়াজ মাহফিল বা বয়ানে কেন চিৎকার করে কথা বলতে হয়? মাইকের ভলিউম কমিয়ে বোধগম্য মাত্রায় বয়ান শুধুমাত্র ইজতেমা মাঠ এলাকার মধ্যে প্রচারে কি অসুবিধা?

ঢাকার বিভিন্ন সরকারী অফিসের করকর্তা কর্মচারী যারা সেদিন শুধুমাত্র মোনাজাতে শরীক হতে গিয়েছিলেন, তারা ফিরে এসে জনগনকে আরো ভাল সেবা দিবেন, ঘুষখোররা ঘুষ ছেড়ে দেবেন, আল্লাহর কাছে কি এই প্রার্থনা করেছেন?

একটা মজার ব্যাপার লক্ষ করেছি। ইজতেমা ফেরত অনেক লোকের খন্ড খন্ড সাক্ষাতকার দেখানো হচ্ছিল অনেক চ্যানেলে। কি দোয়া করেছেন – এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায় সবাই বলেছেন “ যেন সবাই মিলে ভাল থাকতে পারি, আল্লাহ যেন আমাদের দেশের মঙ্গল করেন এসব দোয়া করেছি” ইত্যাদি, ইত্যাদি। কোন সাক্ষাতকারে কেউ একটি বারও বলেন নি যে, তিনি নিজে যেন ভাল মানুষ হিসেবে চলেন, নিজের পরবর্তী প্রজন্মকে ভাল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন সেই দোয়া করেছেন।

প্রথমে আমি, তারপর আমার পরিবার, সমাজ, তারপর দেশ। আমি ভাল না হলে দেশ কিভাবে ভাল হবে? “আল্লাহ কোন জাতির ভাগ্য ততক্ষন পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না যতক্ষন পর্যন্ত না ঐ জাতি নিজেদের ভাগ্য নিজেরা পরিবর্তন করে।“ এই ভাগ্য তো টাকা , পয়সা, ক্ষমতা, লুটপাট, হানাহানি, ট্যাক্স ফাকি দেয়ার ক্ষমতা কিংবা সরকারী ব্যাংকের বা সাধারণ মানুষের টাকা মেরে দেয়ার ভাগ্য নয়।

কোথায় আজ সভ্যতা? যখন ইজতেমার ময়দানে আখেরী মোনাজাতে সামিল হতে কাজ ফাকি দিয়ে ছুটে গেছে লক্ষ লক্ষ সরকারি-বেসরকারী কর্মজীবী, সাধারন মানুষ, যখন আরো কয়েক কোটি মানুষ টিভিতে মোনাজাত দেখে মোনাজাতে সামিল হয়ে দেশ উদ্ধারে গায়েবী হস্তক্ষেপের স্বপ্নে বিভোর, তখন রাজবাড়ীতে শিশুকে ধর্ষন চেষ্টার মামলায় জামিন পাওয়া রইচ শেখ একই শিশুকে পুনরায় ধর্ষন করে তারপর শ্বাসরোধে হত্যা করছিলো!!!

কোন প্রতিবাদ নেই! মোনাজাতে অংশ নিতে গিয়ে আমরা ক্লান্ত সবাই। কোন আফসোস নেই! আল্লাহ সব ঠিক করে দিবেন। মোনাজাতে ঠিক সেরকমই দাবি দাওয়া পেশ করা হয়েছে “মাওলার দরবারে”।
আসছে ইজতেমার দ্বীতিয় পর্ব। আবার মোনাজাত হবে। আবার সবাই কাজে ফাকি দিয়ে চলে যাবো মোনাজাতে অংশ নিতে। সেই ফাকে আবার ধর্ষিত হবে আমার অন্য কোন মা, মেয়ে বা বোন।