ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

স্বাধীনতার পর ঢাকার রাস্তায় যেসব প্রাইভেট গাড়ী দেখতাম তার অধিকাংশ ছিল টয়োটা (পাবলিকা), ডাইহাটসু, কিছু ছিল ভক্সওয়াগন আর নিশান। কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশের প্রাইভেট গাড়ির বাজার প্রায় একচেটিয়া ভাবে দখল করে নেয় টয়োটা। ‘৮০ – ‘৯০ দশকে টয়োটার অনেক মডেল বাংলাদেশের বাজারে জনপ্রিয়তা পায়। এসব গাড়ির অধিকাংশই ছিল রিকন্ডিশন্ড। উচ্চবিত্ত এবং বিশেষ করে মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে ছিল এসব রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম। স্পেয়ার পার্টস এর সহজলভ্যতা এবং সাশ্রয়ী মুল্য ভোক্তাদের মূল আকর্ষন ছিল। পাশাপাশি অলিতে-গলিতে যেসব গ্যারেজ বা মেরামতের ওয়ার্কশপ গড়ে উঠেছিল সেখানকার মেকানিক যারা ছিলেন তারাও সহজেই টয়োটার বিভিন্ন মডেলের কারিগরি দিক আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন ফলে যে কোন অসুবিধায় রিপেয়ার সার্ভিসও পাওয়া যেত তূলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে।

সেই সময়ে পুরনো গাড়ি বেচাকেনা হত ব্যাক্তিগত যোগাযোগ বা জানাশোনা অথবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। এরপর ‘৯০ এর দশকে ঢাকায় প্রথম খোলাবাজারে পুরনো গাড়ি বিক্রি শুরু হয়। একদল উদ্ভাবনী মেধাসম্পন্ন তরুন তরী-তরকারী, বা অন্য যে কোন পন্যের আদলে পুরনো গাড়ি কেনাবেচার বাজার চালু করেন। সংসদ ভবনের উল্টা দিকে রাজধানী উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সপ্তাহে একদিনের (শুক্রবার) সেই গাড়ি কেনাবেচার বাজার (যা “কারহাট” নামে অধিক পরিচিত) আজো চালু আছে। প্রথম দিকে এখানে গাড়ি’র মালিক বা তাদের প্রতিনিধিরা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দরদাম করে গাড়ি বিক্রি করতেন। কারহাটের দেখাদেখি লালমাটিয়ায় আরেকটি গাড়ি কেনাবেচার বাজার শুরু হয় এবং সেটা এখনও চালু আছে। এখান থেকে গাড়ি কেনার সুবিধা হল ক্রেতা দেখে শুনে কিনতে পারেন। আর কর্তৃপক্ষ গাড়ির কাগজপত্রের ব্যাপারে দায়িত্ত নিয়ে থাকেন ফলে চোরাই গাড়ি কিনে পরে হেনস্থা হবার ভয় থাকে না। সরাসরি যোগাযোগ বা পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে গাড়ি কিনলে অনেক সময় এসব বিরম্বনায় পড়তে হয়। তবে এই দুই জায়গাতেই এখন ব্যাক্তি মালিকানাধীন গাড়ি খুব কম পাওয়া যায়। গাড়ি ব্যবসায়ের সাথে জড়িত দালাল এবং ছোট ছোট গাড়ি ব্যাবসায়ীরা বাজারদুটি দখল করে নিয়েছেন।

ওয়েব সাইটে বিজ্ঞাপন দিয়েও গাড়ী কেনাবেচা করা যায় এবং এটা আরো সোজা। সেল বাজার (cellbazaar), বিক্রয় ডট কম (bikroy.com) বা ক্লিক বিডির (clickbd) মত ওয়েব সাইটগুলো ঘরে বসেই গাড়ি কেনাবেচার সূযোগ করে দিচ্ছে। তবে এখানেও চোরাই/ঝামেলাযুক্ত গাড়ির আধিক্য রয়েছে। তাই ক্রেতারা ঠকতে পারেন। কারবাজার বা কারহাটের মত এইসব ওয়েব সাইটে যে সব গাড়ি পাওয়া যায় তার অধিকাংশই গাড়ি ব্যাবসায়ীদের দখলে। কোন গাড়ির মালিক বিজ্ঞাপন দিলে গাড়ি ব্যাবসায়ীরা জোট বা আতাত করে সেই গাড়ী কম দামেই কিনে নেন এবং পরে নিজেরা বেশী দামে বিক্রি করেন। আমি নিজে এরকম দু/তিনটি ঘটনা দেখেছি।

আমার এই লেখার বিষয় ছিল টয়োটা প্রীতি নিয়ে। ধান বানতে শিবের অনেক গীত গেয়ে ফেলেছি। এবার আসল কথায় আসি। প্রাইভেট গাড়ির বাজার কতটা দখলে নিয়েছে TOYOTA ? এই মুহুর্তে সেল বাজার এ বিজ্ঞাপিত প্রায় ৯০০০ টি পুরনো গাড়ির মধ্যে ৭৫০০ ই TOYOTA। অর্থাৎ শতকরা ৮৩ ভাগ গাড়ি টয়োটার। পুরোনো গাড়ির বাজারে এর পরের অবস্থান গুলোতে আছে যথাক্রমে নিশান, মিতসুবিশি এবং হোন্ডা। এর পরের ধাপে রয়েছে মাজদা, মারুতি, হুন্দাই এবং সুজুকি। সবশেষ অবস্থান গুলোতে রয়েছে কিয়া, প্রোটন, মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, সুবারু ইত্যাদি। মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ শেষ সারিতে থাকার কারন এসব গাড়ির আকাশ ছোয়া মুল্য। সাধারন মধ্যবিত্তের দখলে যে মূল বাজার সেখানে টয়োটাই বেশি। নতুন গাড়ির বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে ৩২০০ গাড়ির মধ্যে ২৭০০ গাড়িই (৮৪%) টয়োটার! টয়োটার এহেন একচেটিয়া বাজার তার প্রস্তুতকারী দেশ জাপানেও আছে কিনা আমার সন্দেহ।

বাংগালীদের এহেন টয়োটা প্রীতির কারন কি? আমি অনেক গাড়ির মালিক এবং ব্যাবসায়ীদের এই প্রশ্নটা করেছি। সবার মোটামুটি একই উত্তর। স্পেয়ার পার্টস এর দাম কম এবং সহজ লভ্য। আর দেশের যে কোন জায়গায় মেরামতের সুবিধা পাওয়া যায়। তবে গোপন যে রহস্য লুকিয়ে আছে এই টয়োটা প্রীতির অভ্যন্তরে সেটা হল টয়োটার রিসেল ভ্যালু। ২০০৫-২০০৮ কিংবা তার পুর্বে কেনা টয়োটার মালিকরা ৫-৬ বছর নিজে গাড়িটি চালানোর পরেও কেনা দামের চেয়ে বেশী দামে এখন গাড়ি বিক্রি করে দিচ্ছেন বা চাইলে করতে পারবেন। ১০-১২ বছরের পুরনো গাড়ি হলে বেশী দাম না পেলেও কম পাবেন না। ১৯৯৮ মডেলের রিকন্ডিশন্ড একটি টয়োটা করলা ২০০০ সালে ক্রেতা যখন কিনেছেন তখন তিনি ৬ থেকে ৭ লাখে লাখে কিনেছেন। এখন বিক্রি করতে গেলেও এই দামের চেয়ে বেশী পাবেন। এসব আশ্চর্য ব্যাপার কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। আমি মনে করি টয়োটার এই রিসেল ভ্যালুর পেছনে বাজারে চাহিদা বা ক্রেতার স্বাচ্ছন্দ/পছন্দের চেয়ে সরকারের নীতিও অধিক দায়ী।
পাশের দেশ ভারতে অনেক কম দামে প্রাইভেট গাড়ী পাওয়া যায়। কিন্তু ভারতীয় গাড়ি কখনও এদেশে বাজার পায় নি। তাই ভারতীয় উৎপাদকদের এদেশীয় লবিষ্টদের চাপে বা অনুরোধে বিএনপি’র সাবেক অর্থমন্ত্রি সাইফুর রহমান প্রথমে জাপানী গাড়ি’র উপর বিভিন্ন কর আরোপ করা শুরু করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শর্তারোপের কারনে বছর বছর বাড়তে থাকে আমদানী করা রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম।
তারপরও সেটা মধ্যবিত্তের নাগালেই ছিল। ভারত বান্ধব সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ – ২০১০ সালে মাত্রাছাড়ানো আমদানীকর আরোপের কারনে রিকন্ডিশন্ড গাড়ির মুল্য বর্তমানে মধ্যবিত্তের ধরা ছোয়ার বাইরে চলে গেছে (গাড়ির ব্যাপারে এই কথাটা আগে ফিসফিসিয়ে বলা হত। ইদানিং বারভিডা বা রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানীকারক ব্যাবসায়ীদের সংগঠনের নেতারা এটা প্রকাশ্যে বলছেন)। জাপানের অকশন হাউজ গুলিতে যেই গাড়ির দাম ৫০০০ ডলার ( চারলক্ষ টাকা প্রায়), সেই গাড়ি ঢাকার বাজারে বিক্রি হয় ২২ থেকে ৩৪ লক্ষ টাকায় !!!! কারন পুরনো গাড়ি আমদানীতে সরকারের নীতি নতুন গাড়ির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় ।

ভারতীয়দের ধারনা ছিল জাপানী গাড়ির দাম বেড়ে গেলে এদেশের মধ্যবিত্ত ভারতীয় গাড়ির দিকে ঝুকে পড়বে। সুতরাং আস্তে আস্তে তারা ভারতীয় গাড়ি এদেশে বাজার জাত করা শুরু করে। মারুতি, সুজুকি জাতীয় এসব গাড়ির দাম কম হলেও এদেশের ভোক্তারা কখনও এসব গাড়ি পছন্দ করেন নি। এখানে বলে রাখা ভাল, ভারতীয় প্রতিটি ব্রান্ডের ও মডেলের গাড়ির দুই-তিনটি কোয়ালিটিতে তৈরি হয়। সবচেয়ে ভাল কোয়ালিটি’র গাড়িটি ভারতের আভ্যন্তরীন বাজার এবং কিছু সিলেক্টিভ দেশে রপ্তানী হয়। সব চেয়ে নিম্ন মানের গাড়ি গুলি বাংলাদেশ এবং আফ্রিকার কিছু দেশে রপ্তানী করা হয়। ইঞ্জিন মোটামুটি একই থাকলেও বডি তৈরীতে নিম্ন মানের মেটাল শিট ব্যবহার করে দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়। পাশাপাশি টায়ার, সাসপানশন, ব্যাটারী মোদ্দা কথা ইঞ্জিন বাদে বাকী সকল অংশের মান নিম্ন হয়ে থাকে। ক্রেতাদের ধারনাও এমনই। লক্ষ করে দেখুন ঢাকায় যেসব মারুতি ট্যাক্সি ক্যাব চলে সব গুলির বডি’র অবস্থা লক্কর ঝক্কর হলেও ইঞ্জিন কিন্তু ঠিকই চালু আছে। নিম্ন মানের কারনে গাড়ির বাজারে ভারতীয়দের ষ্ট্রাটেজি তেমন একটা কাজে এসেছে বলে মনে হয় না। তাই ১৬ লক্ষ টাকায় একেবারে আনকোরা নতুন ভারতীয় গাড়ি কেনার চেয়ে এদেশের ক্রেতারা একই দামে সেকেন্ড হ্যান্ড রিকন্ডিশন্ড টয়োটা, নিশান বা মিতসুবিশি অনেক বেশি পছন্দ করে। পত্র-পত্রিকা এবং ওয়েব সাইটগুলোতে দেয়া গাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন গুলো দেখলেই এর প্রমান পাওয়া যায় । আর চাহিদা যেহেতু বেশি, পছন্দের তালিকায় তাই টয়োটা এক নম্বরেই। তবে টয়োটার ক্ষেত্রে স্পেয়ার পার্টস এর কমদাম, সহজলভ্যতা এবং সার্ভিসিং এর সহজতার ব্যাপারটি কতদুর যুক্তি সংগত অথবা সত্য সেটা নিয়ে আরেকদিন লিখবো।

এবার আগে ভাগে একটি কথা উচ্চারিত হচ্ছে। আগামী জুনে এই সরকারের শেষ বাজেট যা “রাজনৈতিক বাজেট” হবে বলে সবার আগাম ধারনা, সেই বাজেটে সম্ভবত গাড়ির উপর বাড়তি করারোপ করা হবে না ফলে গাড়ির বাজার স্থিতিশীল (অর্থাৎ আকাশ ছোয়া) থাকবে। কিন্তু তাতেও কি আমাদের টয়োটা প্রীতি কমবে?