ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

প্রতিদিন বাসে চড়েন – বাংলাদেশে এমন লোকের সংখ্যা কোটি’র কাছাকাছি হবে বলে আমার ধারণা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটের মত বিভিন্ন মহানগরের আভ্যন্তরীন বাস সার্ভিস বাদে আন্তঃজেলা বাসে চড়েন লক্ষ লক্ষ লোক। জীবন – জীবিকার প্রয়োজনেই বাসে চড়া।

২৬ মার্চ ২০১৪। অনেক আশা নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে বাসে চড়েছি – যত দ্রুত সম্ভব ঢাকায় পৌঁছাতে হবে। জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে লক্ষ কন্ঠে গলা মিলিয়ে জাতীয় সংগীত গাইবো। বাসা থেকে নাস্তা করে যেতে পারিনি, তাই চড়পাড়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন রেষ্টুরেন্ট থেকে পরোটা – ডিম-ভাজি আর পাশের মুদি দোকান থেকে এক বোতল পানি কিনে নিয়ে বাসে উঠে গেলাম। ঠিক ৬টা ০২ মিনিটে বাস ছেড়ে দিল। টান দিয়ে ১০ গজ যেতেই হার্ড ব্রেক। একজন যাত্রী উঠবেন। তখনও আমি বুঝিনি সামনে কি অপেক্ষা করছে আমার জন্য।

একেবারে সামনের বাম দিকের আসনে বসা। সামনে পা-দানিতে বাসের হেল্পার, আড়াআড়ি ডানে চালকের প্রতিটি মুভমেন্ট দেখা যায়। স্পিডমিটারের দিকে খেয়াল করা আমার একটা পূরনো বদ অভ্যাস । আরো কিছুদুর যাওয়ার আগেই একটা পেট্রোল পাম্প। এখানে একটা নারিকেল গাছের সাথে লেগে দুমড়ে –মুচড়ে আছে এনা পরিবহনের একটি বাস। গত রাতের ঘটনা। প্রাথমিক ধারনায় যে কারো মনে হতে বাধ্য – এরকম দূর্ঘটনায় চালক এবং তার পেছনের ২-৩ জন যাত্রী’র বেঁচে বর্তে থাকার কথা নয়। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। আশ্চর্য যে, পরদিন টিভিতে কিংবা পত্রিকায় কোথাও সে খবর ছাপা হয়নি। আমিও এনা পরিবহনেরই যাত্রী। ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি ঢাকা যায় এনা পরিবহন এবং শামীম পরিবহনের (SEPL) গাড়ী গুলো।

বেশ সকাল। রাস্তায় তেমন গাড়ী নেই। মাঝে মাঝে দু- একটা কিছু নসিমন, ৩-৫ টনী ট্রাক, আর বাস আসছে- যাচ্ছে। রাস্তায় এখন ৪ লেন করার কাজ চলছে বেশ কিছু যায়গায়। প্রথম ধাক্কা খেতে বেশী সময় অপেক্ষা করতে হল না। চালক বোধ হয় আমার মনের আশা জানতেন। তাই অবলীলায় ৮০-১০০ কিলোমিটার গতিতে চালাচ্ছিলেন। পারলে উড়িয়ে নিয়ে যাবেন। সামনে একটা রিক্সা, হঠাৎ চালক হর্ন বাজালেন। আমার যা হবার হয়ে গেল। এত বিকট শব্দের হাইড্রলিক হর্ন – আমি গত কয়েক বছরে শুনিনি – দেখিনি। আমার ঘোর কাটতে না কাটতেই আবার সামনে টেম্পু, আবারও হর্ন। প্রতিবারে ৪-৫ বার করে বাজিয়ে রাস্তায় এক প্রকার আতংক সৃষ্টি করে চললেন আমাদের চালক। আমার মাথায় তখন যন্ত্রনা শুরু হয়েছে।

মনযোগ ঘুরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে নাস্তা খাবার দিকে মনোনিবেশ করলাম। দুই এক গ্রাস মুখে না দিতেই আবার ক্যাচ করে হার্ড ব্রেক, সাথে ফ্রি হিসেবে ভয়ংকর সেই হাইড্রলিক হর্ন। একটা রাস্তার পাশে রিক্সা দাঁড়িয়ে ছিল – সে যেন ভুল করে রাস্তায় ঊঠে না যায় তাই সতর্ক করে দেয়া হল। ব্রেকটাও আগাম সতর্ক কিনা ঠিক বুঝলাম না। খাবারের ইচ্ছা চূলোয় যাক। আমি তখন আর কত কিলোমিটার বাকী, সেটা ভেবে দেখছি। তখন পর্যন্ত ৪-৫ কিলোমিটার এসেছি। এরই মধ্যে কমপক্ষে ২০ বার সেই ভয়ংকর হর্ন। ১১৪-১১৫ কিলোমিটারের বাকী রাস্তায় আর কতবার হর্নের আওয়াজ শুনতে হবে – এই আতংকে আমার শরীরে ঘাম দেখা দিল। এসময় চালক সুপারভাইজার কে বললেন কোন একজনকে ফোনে মিলিয়ে দিতে। অপর প্রান্তে কেউ একজন ধরতেই বিশ্রী গালি আর সেই সঙ্গে অনুযোগ – অনুরোধ। আমাদের চালক অসুস্থ – শরীরে জ্বর নিয়ে গাড়ী চালাচ্ছেন। তার মাথা ঘুরাচ্ছে, শরীরে তীব্র ব্যাথা। কিন্তু বিকল্প চালক না থাকায় তাকেই বাস নিয়ে ঢাকা যেতে হচ্ছে। অপর প্রান্তের মানুষটিকে অনুরোধ করলেন যত দ্রুত সম্ভব মহাখালী বাস স্ট্যান্ডে পৌছে তার কাছ থেকে ফিরতি যাত্রার দায়িত্ব বুঝে নিতে। এসব শোনার পর আমার গায়ে কাপুনি দিয়ে জ্বর এসে গেল। জাতীয় সংগীত গাওয়ার অভিপ্রায় তখন উবে গেছে। কোনমতে নিরাপদে ঢাকা তো দুরের কথা ত্রিশাল- নিদেন পক্ষে ভালুকা পর্যন্ত যেতে পারবো কিনা সন্দিহান হয়ে পড়লাম।

নির্মানাধীন রাস্তায় এখন বাঁক কমে গেছে একেবারেই। তারপর ও নতুন রাস্তা – খারাপ রাস্তা – পূরনো রাস্তা – এই তিনের সমন্বয়ে চলছে। এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় উঠার জায়গাটি জঘন্য ( কেন সেটা একটা রহস্য) এবং কোথাও কোথাও তীব্র বাঁক নিতে হয়। সামান্যতম গতি না কমিয়ে বিকট হর্ন বাজিয়ে আমাদের চালক সেই সব বাঁক এবং ভাঙ্গা রাস্তা পার হয়ে চালাচ্ছিলেন। এভাবে চালালে আনকোড়া নতুন গাড়ির সাসপেনসন সিষ্টেমের বারোটা বাজতে সময় লাগবে বড়জোড় এক মাস। আমাদের বাসটি কত পুরনো জানা নেই। তবে তার সাসপেনসন সিষ্টেমের যে চৌদ্দটা অনেক আগেই বেজে গেছে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। ত্রিশাল পার হতেই আমি হর্নের সংখ্যা গুনতে শুরু করলাম। আগে মোট কতটি হতে পারে সেটা আন্দাজ করে ৫১ থেকে গণনা শুরু। বেশিক্ষন চালাতে পারলাম না। অপর দিকে ঠিক পাশে সিটে বসা ৭-৮ বছর বয়সী পরীর মত দেখতে ছোট্ট মেয়েটি বমি করতে শুরু করলো। আমারও মাথা প্রচন্ড ব্যাথা – যে কোন মুহুর্তে বমি হতে পারে। মেয়েটির সাথে দাদা-দাদী তাকে সামলাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। সুপারভাইজার নোংরা কালো পলিথিন ব্যাগ আর পকেট থেকে টয়লেট টিস্যুর (!!!) রোল এগিয়ে দিল। প্রায় আধঘন্টা ধরে চললো মেয়েটির এই কষ্ট। পুরো বাস তখন দুর্ঘন্ধে ভরা। অন্য সব যাত্রীরা নির্বিকার। আমি ভেতরে ভেতরে আগ্নেয়গিরি হয়ে জ্বলছি। যে কোন মুহর্তে বিস্ফোরিত হতে পারি। আবার ও হর্ন গুনছি। ভালুকায় আসা পর্যন্ত ২৪৩ হয়ে গেছে। শ্রীপুর চৌরাস্তার যেখানে ওভারব্রিজ বানানো হচ্ছে সেখানে হালকা যান জট যদিও তখন সকাল সাতটা মাত্র বাজে। গণনা চলছে ৩৯৯। আমি চার শ’র অপেক্ষায় আছি। সামনে থেকে একটা খালি ডিমের কার্টুন ভর্তি দেড় টনি ট্রাক আসছিল। আমাদের এনা – আরো ডান দিকে চেপে – ৪০০ তম হর্ন বাজিয়ে বেচারা ট্রাক চালককে এমন ভাবে ভয় দেখিয়ে দিল – তাল সামলাতে না পেরে সেটা পাশের কাঁচা রাস্তায় গিয়ে ছিটকে পড়লো। “ওস্তাদ এইটা কি করলেন” – হেল্পারের এহেন অনুযোগ-অভিযোগে চালক একটুও নড়লেন না। যে করেই হোক মহাখালীতে পৌঁছাতে হবে তাকে।

রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তায় ৪৭৯ চলছে। কিছু কম হলে হতেও পারে। আমি মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। এবার চালক হেল্পার কে বললেন সিগারেট ধরিয়ে দিতে। আমি হতবাক হবার ক্ষমতা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। আল্লাহ’র হাতে নিজেকে সপে দিয়েছি মাষ্টারবাড়ী এলাকাতে পৌছানোর অনেক আগেই। ভাবলাম সামনে হয়তো জ্ঞান হারাবো। তাই ঝটপট মোবাইল বের করে ধুমপান রত চালকের ছবিটা তুলে রাখলাম। যদি আমার ক্ষমতা এবং সাধ্য থাকতো – তাহলে ওই চালক আর তার মালিক/কোম্পানীর বিরুদ্ধে পরদিনই হাইকোর্টে অবহেলা, হত্যাপ্রচেষ্টা, মাদক দ্রব্য, হয়রানি সহ যত ধারা আছে সব ধারাতেই একটি করে মামলা (ক্ষতিপূরন সহ) করে দিতাম।

আমার গননা চলতেই থাকলো। চালকের বেপরোয়া চালনা, হার্ড ব্রেক, বিকট শব্দে হাইড্রলিক হর্নও থেমে নেই। জয়দেবপুর চৌরাস্তা – জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়- বোর্ড বাজার- চেরাগ আলী পার হয়ে যাচ্ছে। লোকজন তখন রাস্তায় নামতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকটি রিজার্ভ বাস স্কুল কলেজের ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে যাচ্ছে প্যারেড স্কায়ারের দিকে। আমাদের চালক কাউকেই পরোয়া করলেন না। জ্বরের ঘোরে গাড়ী চালাচ্ছে। তার হুশ নেই একেবারেই। দু-তিন বার মনে হল – এই বুঝি সব শেষ। তারপর কিভাবে যেন মুখোমুখি সংঘর্ষ গুলি এড়িয়ে গেল। আমি বোধ হয় জ্ঞান হারিয়েছিলাম কিছুক্ষনের জন্য। মহাখালীতে কখন এসে গেছে টের পাইনি। সর্বশেষ র্যা ব-১ এর অফিসের কথা মনে আছে – গণণায় তখন ৫৭০কি ৫৮০ চলছিল।

বাস থেকে নামার পর বমি শুরু হল আমার। হেল্পার বিদ্রুপের হাসি হাসছে। যেহেতু গন্তব্যে এসে গেছি তাই আমার বেলায় নোংরা কালো পলিথিন কিংবা টয়লেট টিস্যু জুটলো না। নিজের সাথে রাখা বোতলের পানি আর রুমাল দিয়ে হাত – মুখ মুছে রিক্সায় করে এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে ঊঠলাম। আমার আর প্যারেড স্কয়ারে যাওয়া হল না।

জীবনের ভয়ংকরতম বাস যাত্রার স্মৃতি হয়তো তাড়িয়ে বেড়াবে আরো কিছু দিন। গায়ে এখনও জ্বর। ঔষধ – পথ্য চলছে। হয়তো ভালো হয়ে যাবো। কিন্তু এতদুর গিয়েও লাখো কন্ঠে সুর মিলিয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে না পারার বেদনা ভুলতে পারবো না কোনদিন।