ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

রেলওয়েতে যারা ভ্রমন করেন তারা সবাই “টিটি” নামক একটি শব্দ এবং সাদা পোষাকধারী রেলের একটি বিশেষ শ্রেণীর কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সাথে পরিচিত। আমিও তাই। তবে আরও অনেকের মত এই “টিটি’ নামক শব্দটির ডিএভ্রিভিয়েশন কি, সেটা অবশ্য আমি আজ সকাল পর্যন্ত জানতাম না। গুগলে সার্চ দিয়ে বেশ কয়েকটা অর্থ পেলাম, কোনটা সঠিক জানি না। তবে এটা জানি তারা হলেন সাদা পোষাকধারী দেবতা। চাইলে তারা আপনাকে যা খুশী তাই করতে পারেন।

20140415_105949

রেলের বরখাস্তকৃত জিএম, মৃধা সাহেবের গল্প এখন সবার জানা। তার সুবাদেই আমাদের একটা আইডিয়া হয়ে গেছে, রেলের দুর্নীতিবাজ উর্ধতন কর্মকর্তারা চাইলে কি পরিমান টাকার মালিক হতে পারেন। টিটি’রা খুব একটা উর্ধ শ্রেণীর কর্মকর্তা নন। তবে তারাও কি পরিমান টাকার মালিক হতে পারেন তার একটা ম্যাথম্যাটিক্যাল ধারণা আজ আপনাদেরকে দেবার চেষ্টা করবো।

১৫ এপ্রিল ২০১৪। সকাল ৯টা ২০। চারটা প্রথম শ্রেণীর টিকিট কেটে ঢাকার কমলাপুর ষ্টেশন থেকে স্বপরিবারে ট্রেনে চেপে বসেছি। গন্তব্য ময়মনসিংহ। এর আগে গত ২৬ মার্চ ২০১৪ তারিখে ময়মনসিংহ থেকে বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে আমার কি অবস্থা হয়েছিল সেটা আপনারা অনেকেই জেনে থাকবেন। তাই এবার একটু ভিন্ন পথ অর্থাৎ ট্রেনে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর যাই হোক হাইড্রলিক হর্ন এখনো আমার কাছে মুর্তিমান আতংক। অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস। ময়মনসিংহ পর্যন্ত টিকেট নেই তাই জামালপুরের টিকেট নিয়েছি, ময়মনসিংহে নেমে যাবো। প্রথম শ্রেণীর ‘খ’ বগিতে তিনটি ভিন্ন জায়গায় চারটি টিকেট। ভাবলাম অন্য কারো সাথে আসন বদল বা সমন্বয় করে নিব। ট্রেনে বসে আছি। আস্তে আস্তে লোকজনে ভরে যাচ্ছে। প্রচুর যাত্রী দেখে খুব অবাক হলাম। আসন শেষ হয়ে আস্তে আস্তে দাঁড়ানো যাত্রীর সংখ্যা বাড়তে আরম্ভ করলো। আমি প্রমাদ গুনতে শুরু করলাম। ৯ টা ৪০ এর ট্রেন ১৫ মিনিট দেরীতে ছাড়লো। বিভিন্ন পেশা – শ্রেণীর সারি সারি যাত্রী দাঁড়ানো। এত লোক ময়মনসিংহ বা এই লাইনে যাতায়াত করে? মালিবাগ ক্রসিং এ যেতে না যেতেই সেই সাদা পোষাকধারী দেবতাদের আবির্ভাব। এত লোক দাঁড়ানো কিংবা বসা, কিন্তু বেঁছে বেঁছে অল্প কয়েকজনকে টিকিট দেখাতে বলছেন। বলাই বাহুল্য এদেরকারো কাছে টিকেট নেই। এরা টিকিট দেখানো মত করে হাত খানা জামা অথবা প্যান্টের পকেটে, লুংগির কোঁচড়ে ঢুকিয়ে যা বের করে আনছিলেন সেগুলি টিকেট নয়। নতুন – পুরাতন টাকা। ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০, ১০০ যার যার গন্তব্য অনুযায়ী দিয়ে দিলেন। তিনিও হাত বাড়িয়ে চুপটি করে টাকাটা মুঠোবন্দি করে আবার নিজ পকেটে চালান করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু সবার কাছে তিনি টিকিট চাইছিলেন না। আমি বিষয়টা নিয়ে একটু কৌতুহল প্রকাশ করায় সিভিল এভিয়েশনের একজন এয়ারপোর্টগামী চাকুরীজীবি জানালেন, যারা ট্রেনে উঠার সময়ই রফা করে পেমেন্ট করে দিয়েছেন তাদের কাছে সাদা দেবতা টাকা চাইবেন না। যারা বোকার মত রফা করে উঠেন নি, তারাই প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। আমার কামরায় প্রায় ৩০ জনের কাছ থেকে টাকা নিলেন। সর্বনিম্ন ১০, সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত নিতে দেখেছি। গড়ে ২৫ টাকা করে হলেও ৩০ জনের কাছ থেকে আয় হল আনুমানিক ৭৫০ টাকা! যারা আগে টাকা দিয়ে উঠেছেন তাদেরটা গণনায় ধরলাম না।

ক্যান্টনমেন্ট রেল ষ্টেশনে এসে ট্রেন থেমে রইলো ১৫ মিনিট, কোন কারন ছাড়াই। আবারও যখন ছাড়লো, তখন বিনা টিকিটের যাত্রী বেড়েছে বই কমেনি। এয়ারপোর্ট ষ্টেশনে আসতেই গড় গড় করে অনেক লোক নেমে গেল, অনেকেই যারা বসে ছিলেন তারাও নেমে গেলেন। ট্রেন একেবারেই ফাঁকা। আমি স্বস্তির নিঃস্বাস ফেলতে না ফেলতেই হুড়মুড় করে আবার লোকজন উঠতে শুরু করলো। এবার আরো গাদাগাদি। কার টিকেট আছে, কার নেই বোঝা মুশকিল। জিজ্ঞেস করাটা বিপদ জনক। ঘড়িতে সময় দেখলাম। কমলাপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আসতেই সময় লেগেছে ৪৫ মিনিট। মোট দুরত্বের ১০ ভাগের একভাগ হয়তো পার হয়েছি। যাই হোক আবার ট্রেন ছেড়ে দিল। টঙ্গীতে যেতে না যেতেই আবার সেই পুরনো দেবতার আবির্ভাব। আবার প্রশ্ন। এবার আমার টিকেটগুলো দেখলেন। আমি এরই মধ্যে অন্য আর দুই যাত্রীর সাথে আসন বদল করে নিয়েছি কোন ঝামেলা ছাড়াই। টিকিটে একটা ক্রস দাগ দিয়ে ফেরত দিলেন। পাশে দাঁড়ানো জামালপুরগামী এক অতি দরিদ্র এক মহিলা, আর তার সন্তানের কাছে টিকিট না থাকার অপরাধে নিলেন ১৫০ টাকা। লুঙ্গি পরিহিত একজন এবং তার মেয়ের কাছ থেকে নিলেন ৪০ টাকা করে ৮০ টাকা, গন্তব্য ময়মনসিংহ। এভাবে প্রায় ২০-৩০ জনের কাছ থেকে বিনা রসিদে জরিমানা আদায় করলেন। সর্বনিম্ন ২৫ টাকা। আমার মনে হল রেট সবার জানা। তাই টাকার পরিমান কমবেশী নিয়ে দেবতা বা যাত্রী কারও ওজর আপত্তি দেখলাম না। এবারের ধাপে আদায় হল প্রায় ১০০০ টাকা। এই দেবতা সম্ভবতঃ পাশের কামরায়ও দায়িত্ব (!) পালন করেছেন। কারন মাঝপথে আমি একবার বগির ছোট্ট (?) ঘরে যাওয়ার সময় তাকে খুঁজে পেলাম না। মাঝে বেশ কয়েকটি ষ্টেশনে থামার পর গফরগাঁও। এখানে অনেক অনেক যাত্রী নেমে গেলেন। নতুন করে তেমন আর যাত্রী এলেন না। দুই একজন তরকারী ওয়ালা, ডিম মুরগী ব্যবসায়ী উঠতে দেখলাম। তারা কত করে জরিমানা দিয়েছেন বোঝা গেল না। আমি ময়মনসিংহে নামলাম দুপুর ১ টা বেজে ৫০ মিনিট।

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, ৩ ঘন্টা ৫৫ মিনিটের যাত্রায়, একটি বগিতে সাদা পোষাকধারী টিটি দেবতা ঘুষ আদায় করলেন প্রায় ২ হাজার টাকা। দুই কামরা মিলেয়ে ৪ হাজার !! একই দিন ফিরতি যাত্রায় যদি একই পরিমান ঘুষ আদায় করেন তাহলে এক দিনে তার আয় ৮ হাজার টাকা। মাসে কত আসে? কমপক্ষে ২ লক্ষ টাকা !!!!!!

বাংলাদেশের প্রধান সর্বোচ্চ নির্বাহী অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর বেতনও ২ লক্ষ টাকা নয়। রেলের সামান্য এক টিটি মাসে আয় করছেন ২ লক্ষ টাকা। তাই তো বলি, ঢাকা শহরের হাজার হাজার ফ্লাট কারা কেনে? সারা দেশে জমির দাম আকাশ ছোঁয়া হয়ে যাচ্ছে কাদের জন্য? কাদের জন্য মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্রতিবার বাজেটে কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা করেন? কাদের জন্য REHAB প্রতি বছর বাজেটের আগে কালোটাকা সাদা করার ব্যবস্থা অব্যহত রাখার জন্য সরকারের (পড়ুন অর্থমন্ত্রী) উপর চাপ সৃষ্টি করেন? রেলের মৃধা একক কোন ব্যক্তি নন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক দুর্নীতির প্রতিবিম্ব মাত্র। সেখানে ঠগ বাছতে গেলে হয়তো গ্রাম উজার হয়ে যাবে।

কমলাপুর থেকে অগ্নিবীনা এক্সপ্রেসে এয়ারপোর্টের কোন টিকিট দেয়া হয় না, অথচ যাত্রী আছে। আমার ধারনা অন্য সকল আন্তঃনগর ট্রেনেও এই গন্তব্যের জন্য কোন টিকিট নেই। অথচ যাত্রী আছে। তাহলে অন্ততঃ স্ট্যান্ডিং টিকিট দিতে আপত্তি কোথায়? যাত্রীরা সবাই ১০-২০ টাকা করে ঘুষ দিচ্ছেন, সেটা বৈধভাবেই টিকিটের মাধ্যমে নেয়া হচ্ছে না কেন? কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি আন্তঃনগর ট্রেনে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত টিকিট দেয়া হলে রেলের আয় বাড়বে, টিটিদের ঘুষ বানিজ্য কমবে। ঢাকার রাস্তায় যানজট এবং মানুষে ভোগান্তি কমবে। যদি অন্য কোন হিসাব নিকাশ না থেকে থাকে, তাহলে অন্তত এই একটি সিদ্বান্তের দ্বারা রেলের প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আয়ও হতে পারে!

ঢাকা – চট্টগ্রাম রুটে প্রথম শ্রেণীতে এমন কি শোভনেও কোন টিটি, টাকার বিনিময়ে বিনা টিকিটের যাত্রী পরিবহনের সুযোগ দেয়ার কথা চিন্তায় বা কল্পনায়ও আনবে না। তাহলে ঢাকা – ময়মনসিংহ – জামালপুর রুটে সাহস পায় কিভাবে?

আমি জানি এসব লিখে কোন লাভ নেই। রেলের কর্তাদের ঘুম ভাংবে না । আজ যদি আমি সরকারে বিরুদ্ধে কিছু লিখি, বা জামাত শিবিরের পক্ষে কিছু লিখি (নাউজু বিল্লাহ), তাহলে হয়তো ব্লগ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমার আইপি এড্রেস, তারপর সেই আইপির সুত্র ধরে আমার নাম ঠিকানা বের করে সরকারের কোন সংস্থা/বাহিনী কালই আমাকে সাইজ করে দেবে। কিন্তু গনপরিবহনে মানুষের ভোগান্তির কথা কেউ শুনবে না। তাই আজও বাসে – ট্রাকে অবৈধ হাইড্রলিক হর্নে হাজার হাজার লোক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেখার কেউ নেই। রেলের টিটিরা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘুষ বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। বলার কেউ নেই। হায় সেলুকাস , কি বিচিত্র এই দেশ!!!!!