ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আজকাল প্রায় প্রতিদিন ঢাকার শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহামানত কিংবা সিলেটের ওসমানী বিমান বন্দরে চোরাচালানকৃত স্বর্ন ধরা পড়ছে। এই স্বর্নের বেশীর ভাগ আসছে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে দুবাই থেকে। এত ধরা ধরির পরেও কেন আসছে এত স্বর্ন? কারন বাংলাদেশ এবং দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্নের দামের আকাশ পাতাল পার্থক্য।

যখন এই লেখাটি লিখছি তখন দুবাইয়ে প্রতি গ্রাম ২২ ক্যারেট স্বর্নের দাম ৩৮.২০ ইউ এস ডলার , বাংলাদেশী টাকায় যার দাম মাত্র ২৯৬৮ টাকা। এক ভরি স্বর্ন সমান ১১.৬৬ গ্রাম প্রায়। সেই হিসেবে প্রতি ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্নের দাম দুবাইয়ে ৩৪৬২৬ টাকা। একই সময়ে ঢাকায় ২২ ক্যারেট স্বর্নের প্রতি ভরি বিক্রয় হচ্ছে ৪৮ হাজার টাকার উপরে !!!!। অর্থাৎ প্রতি ভরিতে লাভ ১৪০০০ টাকা !!!। আপনি যদি যে কোন ভাবে ২৪ ক্যারেট অর্থাৎ খাটি স্বর্নের ১০০ গ্রাম ওজনের একটা বার ঢাকায় আনতে পারেন, তাহলে কাগজ কলমের হিসেবে আপনার ৭০ হাজার টাকা লাভ হতে পারে। (দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশের স্বর্ন ব্যবসায়ীরা ২৪ ক্যারেটের খাটি স্বর্ন আপনার কাছ থেকে ২২ ক্যারেটের দামেই কিনবেন। বাকিটা তার লাভ)।

এখন আসি মূল কথায়। ঢাকার কোন অলংকারের দোকানেই স্বর্নের বার বিক্রয় হয় না। রেডিও-টিভি, পত্রিকায় যেখানেই যত নামী -দামী জুয়েলার্স হোক না কেন, কারো কাছে আপনি স্বর্নের বার পাবেন না। কারন স্বর্নের বার বিক্রি করে তেমন লাভ থাকে না। লাভ হয় অলংকার হিসেবে বিক্রি করলে। এই জুয়েলারির মালিকরা স্বর্নের বার কিনলেও অলংকার তৈরীর জন্য প্রায় সবাই তাতিবাজারের উপর নির্ভরশীল। সেখানে ২৪ ক্যারেটের বার দিয়ে ২২ ক্যারেটের অলংকার তৈরীর আদেশ দিলেও আদতে সেটা কত ক্যারেটের অলংকার হবে সেটা জুয়েলারি মালিক ঠিকই জানেন। অথচ পরবর্তীতে কোন কারনে ক্রেতা যখন তার অলংকার বিক্রয় করতে এই দোকানেই আসবেন তখন কিন্তু ২২ ক্যারেট দামই দিতে হবে? সুতরাং তারা কেন ইচ্ছে করে দ্বিগুন ক্ষতির বোঝা মাথায় নেবেন?

খুব সাধারণ ভাবেই বলি। স্বর্নের খাটিত্ব নির্ধারণ হয় “ক্যারেট” দিয়ে। ২৪ ক্যারেট স্বর্ন মানে ৯৯.৯৫ % খাটি স্বর্ন। ২২ ক্যারেট মানে ২ ভাগ খাদ, ২২ ভাগ স্বর্ন। ১৮ ক্যারেট মানে ৬ ভাগ খাদ, ১৮ ভাগ স্বর্ন। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ২২ ক্যারেট বলে যে স্বর্নালংকার বিক্রয় করেন সেটা আন্তর্জাতিক বাজারে ১৮ ক্যারেট বা তার সমপর্যায়ের। সামান্য কমবেশী হতে পারে। তার মানে একদিকে দামের পার্থক্য থেকে প্রতি ভরিতে তারা লাভ করছেন ১৪ হাজার, এবং খাদ মিশিয়ে ১৮ ক্যারেটকে ২২ ক্যারেট বলে চালিয়ে দিয়ে লাভ করছেন আরও প্রায় ৩-৪ হাজার টাকা। এভাবে প্রতি ভরিতে লাভ ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

এক কেজি স্বর্ন এনে অলংকার বানিয়ে বিক্রি করতে পারলে, আর পিছু ফিরে তাকাতে হবে না।

ঢাকায় স্বর্নের বার বিক্রি হয় তাঁতি বাজারে। কিন্তু পাঁচ- দশ গ্রাম বার আপনি কিনতে পারবেন না। কমপক্ষে ১০০ গ্রামের বার কিনতে পারেন যদি কোন বিক্রেতা রাজী হন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করা হবে আপনাকে। কেন কিনছেন, কিনে লাভ কি ইত্যাদি ইত্যাদি। বার না কিনে অলংকার কেনাই ভাল এটাও বুঝিয়ে বলবেন অনেকে। টেলিফোনে অনেক চাপাচাপি’র পর এক ব্যবসায়ী গতকাল রাজী হলেন কিন্তু ২৪ ক্যারেট মানের ১০০ গ্রাম স্বর্নের একটা বার এর দাম শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেংগে পড়েছিল । ৫,২০,০০০.০০ (পাঁচ লক্ষ বিশ হাজার টাকা) দাম চাইলেন তাঁতি বাজারের এক নামকরা ব্যবসায়ী। ঠিক ওই মুহুর্তে দুবাইয়ে ২৪ ক্যারেট স্বর্নের ১০০ গ্রাম ওজনের একটি বারের দাম তিন লক্ষ চব্বিশ হাজার টাকা!!!!

গতকাল কোন এক সময় ঢাকা বিমানবন্দরে ১০ কেজি স্বর্নের চোরাচালান ধরা পড়েছে। প্রতিদিন যা ধরা পড়ে তা হিমশৈলের চুড়া মাত্র। শতকরা ৯৯ ভাগই ধরা পড়ে না। ১০ কেজি সমান দশ হাজার গ্রাম। গড়ে এক গ্রামে ১৫০০ টাকা লাভ হলে দশ হাজার গ্রামে লাভ এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। অলংকার বানিয়ে ২২ ক্যারেটের নামে ১৬ ক্যারেট বা ১৮ ক্যারেট অলংকার বিক্রি করতে পারলে লাভ কমপক্ষে আড়াই কোটি টাকা!!!!!

অনেকে বলছেন বাংলাদেশে আনা স্বর্ন ভারতে চোরাচালান হয়ে যাচ্ছে। এটা আংশিক সত্য। ভারতে এই মুহুর্তে স্বর্নের দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশী, তারপর ও ঠিক যতটা বলা হচ্ছে, ততটা যাচ্ছে না বলেই আমার ধারণা। ভারতের বিমানবন্দর গুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এত কড়া যে, সেখানে স্বর্ন চোরাচালান করা বেশ কঠিন। তাই অনেক ভারতীয় চোরাচালানী/ ব্যবসায়ী বাংলাদেশকে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে বড় বড় অনেক চালান বাংলাদেশের বাজার ধরার জন্যই আনা হচ্ছে বলে আমি মনেকরি। কারন এখানেও লাভ অনেক।

আরেকটা কথা না বলেই পারছিনা। বাংলাদেশে এক দোকানের তৈরী অলংকার আরেক দোকানী কিনতে চান না। কেন? কারণ ওরা সবাই জানে, ২১-২২ ক্যারেটের নামে গ্রাহক কে যা দেয়া হচ্ছে তা কোন মতেই ২১-২২ ক্যারেট নয়। তাই কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। আবার যে দোকানের তৈরী অলংকার, সেই দোকানে বিক্রি করতে গেলেও আপনি বেকায়দায় পড়বেন। ধরুন ২২ ক্যারেটের ৩ ভরির গহনা আপনি বিক্রয় করতে গেলেন, দোকানীর উচিত আপনাকে ২২ ক্যারেট অনুযায়ী দাম পরিশোধ করা। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখবেন যে, প্রথমত তারা ২২ ক্যারেটের দাম দিতে রাজী হবেন, তারপর তিন ভরি থেকে আনুপাতিক হারে খাদ বাদ দিবেন (আপনি কেনার সময় খাদের দাম আর স্বর্নের দাম এক ধরে একত্রে ওজন করা হয়েছিল)। এরপর মজুরী বাদ দিয়ে আপনাকে একটা দাম অফার করা হবে। এরপর তিনি যখন এই অলংকার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করবেন তখন ২২ ক্যারেট হিসেবে খাদ ও আসল স্বর্নের একই দাম ধরে, একসাথে ওজন করে এবং সাথে মজুরী ধরে ক্রেতার কাছে বিক্রি করবেন। অর্থাৎ মজুরী থেকে দুইবার লাভ, ওজন ও খাদ থেকে দুইবার লাভ !!!!

জালিয়াতি কাহাকে বলে ও কত প্রকার শিখে গেলেন তো?

দুবাই তো অনেক দূর। কাছের দেশ থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়াতেও স্বর্নের দাম বাংলাদেশের চেয়ে কম। কখন ও কখন ও থাইল্যান্ডে স্বর্নের দাম দুবাই এর চেয়েও কিছুটা কম হতে পারে। ওইসব দেশে প্রতি ঘন্টায় স্বর্নের দাম উঠানামা করে। ঢাকা থেকে ব্যংকক আসা যাওয়ার বিমান ভাড়া (ট্যাক্স সহ) প্রায় ৩০ হাজার টাকা। আপনি পৃথিবীর যে কোন দেশ থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিনা ট্যাক্সে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত স্বর্নালংকার সাথে আনতে পারবেন। থাইল্যান্ড থেকেই যদি ২২ ক্যারেটের ২০০ গ্রাম অলংকার সাথে আনেন তাহলে ঢাকার যে কোন অলংকারের দোকানে সেটা বিক্রয় করলে যা লাভ হবে তা দিয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত আপনার বিমান ভাড়া এবং ব্যাংককে ৩-৪দিনের থাকা খাওয়ার খরচ উঠে যাবে এবং কিছু সাশ্রয় হবে।

আশা করি এতক্ষনে বুঝতে পারছেন বাংলাদেশে স্বর্ন চোরাচালান কেন এত আকর্ষনীয়?