ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

লিখবো না লিখবো না করেও শেষ পর্যন্ত এই বিষয়ে কলম ধরতে বাধ্য হলাম।
নারায়নগঞ্জে চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের পর পরই পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ঢাক ঢোল পিটিয়ে ফরমান জারী করা হল। এখন থেকে সাদা পোষাকে আর অভিযান পরিচালনা করবে না পুলিশ। খবরটি ভুক্ত ভোগী মানুষ এবং অপরাধী উভয়কেই আনন্দিত এবং উদ্বেলিত করেছে। আমরাও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি এই ভেবে যে, আর যাই হোক রাস্তায় চলতে গিয়ে যদি অপহৃত হয়ে যাই, তাহলে অন্ততঃ জানবো যে পুলিশ বা র‍্যাবের হাতে অপহৃত হই নি।

কিন্তু তারপরও সাদা পোষাকের অভিযান থেমে নেই।

১৩ মে ২০১৪ তারিখ ভোর রাত আনুমানিক ৪ টার দিকে ঢাকা থেকে একদল ডিবি পুলিশ কুষ্টিয়ার লালন শাহ সেতুর পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত গোল চত্ত্বরে অভিযান (!) চালিয়ে শফিকুল ইসলাম নামে একজন বালু ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে যায়। (প্রথম আলো ১৪ মে সংখ্যা) সাদা পোষাকে ডিবি পুলিশের এই অভিযানের খবর স্থানীয় থানার পুলিশ কিংবা তাদের কোন পদস্থ কর্মকর্তা জানতেন না। এলাকায় গুজব রটে যায় শফিকুল অপহৃত হয়েছেন। এর পর স্থানীয় পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায় সন্দেহভাজন তিনজনকে যাদের একজন সম্ভবত শফিকুলের বালুর আড়তের শ্রমিক। অপহরনের গুজবে শফিকুলের সমর্থকেরা (শফিকুল স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার চাচাত ভাই) পুলিশের হাতে আটক সন্দেহভাজন তিন জনের বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে ছাই করে দেয়। পুড়ে যায় বসতবাড়ী, জমানো টাকা আর মোটর সাইকেল। এরপর দুপুর সাড়ে বারটায় স্থানীয় পুলিশ জানায় ঢাকা থেকে ডিবি পুলিশ এসে তুলে নিয়ে গেছে শফিকুলকে। অভিযোগ – শফিকুল মাদক ব্যবসায়ী। গ্রেফতারের সময় তার কাছে ৫০০ বোতল (!) ফেন্সিডিল পাওয়া গেছে।

সবই বুঝলাম। কিন্তু কিছুই বুঝলাম না।

মাত্র ৫০০ বোতল ফেন্সিডিল ধরার জন্য দুইটি মাইক্রোবাসে করে ঢাকা থেকে ডিবি পুলিশকে কেন কুষ্টিয়ায় আসতে হবে? ঢাকা থেকে পাওয়া গোপন সুত্রের খবরে স্থানীয় ডিবি পুলিশ কিংবা স্থানীয় থানা কি এই অভিযান পরিচালনা করতে পারতো না? নাকি পুলিশের একই বিভাগের এক দল আরেক দলকে বিশ্বাস করে না?

যদি ঢাকার ডিবি পুলিশ কুষ্টিয়ার ডিবি পুলিশকে বিশ্বাস না করেন, তাহলে অভিযান শুরুর আগে কিংবা তারপর অন্ততঃ স্থানীয় থানা এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরকে অবহিত করা যেত না?

ফেন্সিডিল সহ আসামী ধরা পড়লে আলামত যেই থানার এলাকায় ধরা পড়েছে কিংবা যেই এলাকায় আসামী গ্রেফতার হয়েছে মামলা হবে সেই থানায়। তাহলে ফেন্সিডিল সহ ধরা পড়ার পর শফিকুলকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হল কেন? লালন শাহ সেতু যেই এলাকায় পড়েছে সেই থানায় নেয়া হল না কেন?

ঢাকায় নেয়া হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য? জিজ্ঞাসাবাদ কুষ্টিয়ায় করা যেত না?

যে কোন মামলায় কিংবা মামলা ছাড়া সন্দেহজনক ভাবে ৫৪ ধারায় কাউকে গ্রেফতার করা হলে গ্রেফতারের ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামীকে কোর্টে উপস্থিত করে ম্যাজিষ্ট্রেট এর কাছ থেকে তার পরবর্তী করণীয় ব্যাপারে দিক নির্দেশনা চাইতে হবে। শফিকুলকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ম্যাজিষ্ট্রেট এর কাছে হাজির করা হল না কেন?

ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় লালন শাহ সেতুর পশ্চিম প্রান্তে যেতে কমপক্ষে ৬ ঘন্টা সময় লাগবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী ঢাকায় তুরাগে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন আসামীকে ধরার পর তাদের তথ্য অনুযায়ী ডিবি পুলিশের দল কুষ্টিয়ায় গিয়ে শফিকুলকে গ্রেফতার করে। তুরাগে গ্রেফতারকৃত আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কমপক্ষে ১ ঘন্টা দরকার। তারপর দুইটি মাইক্রোবাস যোগাড় করা, তেল/গ্যাস ভর্তি করা— সব মিলিয়ে দরকার আরো কমপক্ষে এক ঘন্টা। মাসুদ সাহেবের গল্প অনুযায়ী ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হবার জন্য রাত বিরেতে শফিকুলকে একাকী ৫০০ বোতল ফেন্সিডিল নিয়ে গোল চত্ত্বরে কমপক্ষে ৮ ঘন্টা বসে থাকতে হবে। ভোর চারটায় গ্রেফতার হয়ে থাকলে শফিকুল আগের দিন রাত ৮ টা থেকে সেখানে বসে ছিল?

এটা তো RAB এর ক্রস ফায়ারের গল্পকেও হার মানাবে !!!!!

না শফিকুল আমার কেউ না। আমার বাড়ী ও কুষ্টিয়ায় নয়। আমি ফেন্সিডিল ব্যবসায়ীও নই। শফিকুলের কাছে ফেন্সিডিল ছিল কি ছিলনা তাও জানি না।
শুধু এটুকু জানি এবং বুঝি যে, গ্রেফতারের সময় শফিকুলের কাছে ফেন্সিডিল না পাওয়া গেলেও তার কাছ থেকে ৫০০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার দেখাতে ডিবি পুলিশের এক সেকেন্ড ও লাগবে না।

আরও জানি এবং বুঝি যে, ডিবি পুলিশের এই অপারেশন গল্পের মধ্যে অনেক অনেক কিন্তু আছে। আছে কিছু বাড়াবাড়ি। সেই বাড়াবাড়ির কারনেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল তিনটি ঘর, একটি মোটর সাইকেল সহ অসহায় মানুষের জমানো কিছু টাকা। শফিকুল একদিন জামিনে বের হয়ে আসবে, কুষ্টিয়ার স্থানীয় পুলিশের হাতে আটক তিনজনও হয়তো পুলিশকে খুশি না করেই ছাড়া পেয়ে যাবে। কিন্তু আগুনে পুড়ে সহায় সম্বলহীন হয়ে যাওয়া তিনটি পরিবারের কি হবে?

একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে ডিবি পুলিশের এই বাড়াবাড়িটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।