ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

“এতক্ষণে” –অরিন্দম কহিলা বিষাদে
“জানিনা কেমনে আসি লক্ষণ পশিল
রক্ষঃপুরে ! হায়, তাত, উচিত কি তব
এ কাজ, নিকষা সতী তোমার জননী,
সহোদর রক্ষশ্রেষ্ঠ ? –শূলী-শম্ভূনিভ
কুম্ভকর্ণ ? ভ্রাতৃপুত্র বাসব বিজয়ী ?
নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে ?

অসাধারণ এই কাব্য এবং তার স্রষ্টার সাথে পরিচয় হয়েছিল প্রায় তিন যুগ আগে। কটকটে-খটখটে ভাষা বা তার অমিত্রাক্ষর ছন্দ তখন ভাল লাগেনি। স্কুলে এ ভাষার স্বাদ আস্বাদন করিয়ে দেয়ার জন্য যতটুকু মুন্সিয়ানার দরকার, সেই মাপের শিক্ষকও ছিলেন না। শুধু পরীক্ষায় পাশ করার জন্য যতটুকু দরকার ততটুকুই পড়েছি।

তারপরও কেন জানিনা অমিত্রাক্ষর ছন্দ বিশেষ করে মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রতি আমার ভালবাসাটা ঐ সময়েই গড়ে ওঠে। সেই ভালবাসার টানে ছুটে গিয়েছিলাম যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে। মধুসুদনের জন্মস্থান। এটি এখন ইউনিয়ন। পিতা রাজনারায়ন দত্ত ছিলেন জমিদার। প্রত্নতাত্বিক অধিদপ্তর এখন জমিদার বাড়িটির দায়িত্ব নিয়েছে। ছিমছাম-সুন্দর। একটু দুরে কপোতাক্ষ নদ। এই নদকে নিয়ে তিনি লিখেছিলেন তার অসাধারণ কবিতা – “কপোতাক্ষ নদ”

সতত, হে নদ তুমি পড় মোর মনে
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।
সতত যেমনি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া মন্ত্র ধ্বনি তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।
বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দলে
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মেটে কার জলে?

কপোতাক্ষ নদ এখন

 

 

কপোতাক্ষ নদের তীরে ছোট একটা পার্কের ভেতরে একটা কাঠবাদাম গাছ যেখানে কবি ৭ দিন (মতান্তরে ১৪ দিন) তাবু গেঁড়ে বাস করেছিলেন। একদিকে চরম অর্থকষ্ট অপরদিকে মাতৃভূমির টানে ফিরে এসেছিলেন সাগরদাঁড়িতে। কিন্তু খৃষ্টধর্ম গ্রহন করার অপরাধে সমাজপতিরা তাকে গ্রামে প্রবেশ করতে দেয়নি। পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছিলেন প্রয়াত বাবা রাজ নারায়ন দত্তের চতুর্থ স্ত্রী। পাছে সব সম্পত্তি হাত ছাড়া হয়ে যায়। কাঠবাদাম গাছটির গোড়া বাঁধানো, এখানে সেখানে ফাটল ধরে গেছে।
এই সেই কাঠবাদাম গাছ যার নীচে তাবু গেঁড়ে বাস করেছিলেন কবি

 

 

 

কপোতাক্ষ নদ এই ভরা বর্ষায়ও খুব চওড়া নয়, খুব জোর ১০০ মিটার হতে পারে। আমার দাদা বাড়ী মেঘনা’র পারে। বর্ষায় এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। সেই তূলনায় কপোতাক্ষকে বড় খাল বলা যেতে পারে। অথচ এরই মধ্যে মধুসূদন কি রূপ খুঁজে পেয়েছিলেন, ভাবতেও পারি না।
পার্কের উল্টো পার্শ্বে একটা ডাকবাংলো, লাইব্রেরী আছে নীচতলায়। মধুসূদনের প্রকাশিত সব বই, নাটক, উপন্যাস এখানে আছে। এখানে সেখানে অনেক গুলো কবিতা পাথরে খোদাই করে কংক্রিটের স্তম্ভে বাধাই করে রাখা। বাইরে নদীর ঘাটের দিকে চলা রাস্তার পার্শ্বে কবি’র বিশাল এক ভাস্কর্য। অপূর্ব মনোরম পরিবেশ।

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

 

 

 

জামিদার বাড়িটির যত্ন-পরিচর্যার মান উন্নতমানের না হলেও খুব একটা আশাহত হই নি। বাঁধানো পুকর ঘাট আজও সুন্দর, পরিপাটি। কে বা কারা যেন বাড়িটির এক কোনায় একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছে বহু আগে। পুরো এলাকা জুড়ে একমাত্র বেমানান যা চোখে পড়লো – সেটা ঐ প্রাইমারি স্কুল। জমিদার বাড়ির উল্টো দিকে মধুসূদন একাডেমী মাঠে প্রতি বৎসর জানুয়ারী মাসে মধু মেলা বসে। লক্ষ – লক্ষ লোকের সমাগম হয় সেই মেলায়।

এলাকার লোকজন খুব আন্তরিক যা আজকাল সচরাচর দেখা যায় না। হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের এক গৃহস্তের বাড়ীতে উপস্থিত হলাম। উদ্দেশ্য “চুইঝাল” গাছ চেনা। যশোর-সাতক্ষীরার এ অঞ্চলে একটা প্রখ্যাত মসলা গাছের নাম চুইঝাল। বাড়ীতে মাঝবয়সী গৃহিনী ছিলেন। আমাকে আর আমার স্ত্রী-সন্তানদের দেখে প্রথমে কি ভেবেছিলেন জানিনা। আমরা উদ্দেশ্য খুলে বলতেই একেবারে আপন মায়ের মতন যত্নে চুইঝাল গাছ দেখালেন, চেনালেন আর এর বিস্তারিত ব্যবহার সম্মন্ধে বললেন। এক বেলা খাওয়ার জন্য খুব করে অনুরোধ করলেন। আমার চোখে পানি এসে এসে গেল। অনুরোধ রাখতে পারি নি, কারণ তাড়াতাড়ি যশোরে ফিরতে হবে।
এখানে এসে অনেক কিছু দেখেই অবাক হয়েছি, ভাল লেগেছে। কেশবপুর থেকে সাগরদাঁড়ির পথে পথে যত মাইল ফলক আছে সেখানে পথের দূরত্ব লেখা হয়েছে দশমিক ব্যবহার করে, যেমন “সাগড়দাড়ি ৫.৬ কিলোমিটার”, এর পরেরটায় ““সাগড়দাড়ি ৪.৬ কিলোমিটার”।

আবার আরেকদিন অনেক সময় নিয়ে সাগরদাঁড়ি বেড়াতে আসবো – সেভাবেই কথা দিয়ে এসেছি মধুসুদন লাইব্রেরীর লাইব্রেরিয়ানকে। মধুসূদন দত্তের জীবনের অনেক না জানা কথা জানতে বাকি থাকলো তার কাছে।