ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

23_human-right-commission_Rally_310115_0001

প্রায় মাস দুই তিনেক হল চাকুরীর সুবাদে দেশের বাইরে সুদূর আফ্রিকা মহাদেশে এসেছি। ছবির মত সুন্দর দেশ – উগান্ডায় আছি। রাজধানি কাম্পালা থেকে প্রায়ই বাইরে যেতে হয়, দূর-দূরান্তে। সকাল-দুপুর সন্ধ্যা, দিন পেরিয়ে সপ্তাহ। সপ্তাহ পেরিয়ে মাস। তিন মাসের মাথায় প্রথম ছুটি মিলবে। তাই কিছুটা কমে বিমানের টিকিট পাওয়ার আশায় সেই ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কাতার এয়ার ওয়েজের টিকিট কিনে রেখেছি ৯৩০ ডলারে। ১২ ফেব্রুয়ারি এনটেবি-দোহা-ঢাকা কনফার্ম টিকেট।
ভালই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি – স্বপ্নের মত। জানুয়ারির শুরুর দিকে এক নেত্রী অবরোধের ডাক দিলেন। ভেবেছিলাম ২-৪ দিন বড় জোর ১-২ সপ্তাহ। না এখন দিন পেরিয়ে মাসও সমাপ্ত হতে চলল। দেশের খবর জানার একমাত্র উপায় অনলাইন সংবাদ পত্র, দেশে স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয় পরিজনদের কাছ থেকে পাওয়া খবরা খবর। মধ্য জানুয়ারীতে কেবল টিভি অপারেটরকে ডেকে বললাম বাংলা চ্যানেল লাগিয়ে দিতে। খরচ হল বেশ, কিন্তু ৬ টি বাংলা চ্যানেল দেখতে পারি এখন। কিন্তু সমস্যা হল কাকে বিশ্বাস করবো?

পত্রিকায়, টিভিতে সরকার বলছে, কিছুই হয়নি, দেশ ভালই চলছে, কয়েকদিনের ভেতরেই নাশকতাকারীরা পাকরাও হবে, দেশে শান্তি ফিরে আসবে। আবার ঐ একই পত্র-পত্রিকায়, টিভিতে দেখানো হচ্ছে জ্বালাও-পোড়াও-ভাংচুরের খবর। হাসপাতাল ফেরত অসুস্থ্য মা আর তার সন্তানকে পুরিয়ে মারা হচ্ছে, নিরপরাধ শত শত মানুষ এখানে সেখানে জ্বলে পুড়ে অংগার হচ্ছে। ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সেটা যতটা না রাজনীতি সচেতন মানুষের অবরোধ প্রিয়তায়, তার চে বেশী হয়েছে জ্বলে পুড়ে অংগার হয়ে যাবার ভয়ে। সরকার বাহাদুর বলছে – “সব কুচ ঠিক হ্যায়”। এর মাঝে পত্রিকা গুলো পরিসংখ্যান দিয়ে বলছে আগে কয়টি গাড়ি চলতো, এখন কয়টি চলে। স্ত্রী সন্তানকে রেখে এসেছি ঢাকার বাইরে। বাসায় মাস তিনেকের মাছ-মাংস কিনে রেখে এসেছিলাম। সেগুলি শেষের পথে। এখন চাল বাড়ন্ত। কিন্তু গিন্নী ভয়ে বাজারে যান না।

কাতার এয়ার ওয়েজ এর ফ্লাইট ঢাকায় নামবে রাত ৪ টায়। ভেবেছিলেম ইমিগ্রেশন শেষ করে ভোর পাঁচটা বা ছয়টার বাসে সোজা ময়মনসিংহ চলে যাব। এখন ভাবছি কিভাবে যাব?
বাস চলে কিনা জানিনা। চললেও পুড়ে মরার ভয়। রেলওয়ের টাইম টেবিল বলে কখনো কিচ্ছু ছিল না, এখন তো প্রশ্নই উঠে না। হেলিকপ্টার ভাড়া করার মত সামর্থ নেই। তাহলে কি করবো আমি এবং আমরা???

তাহলে দেশে আসবো কি আসবো না? জানিনা। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত এখন আমার সামনে, আমাদের সামনে। যখন জাতি হিসেবে আমাদের এগিয়ে যাবার সময়, তখন কারা যেন হায়েনার মত পিছু টেনে ধরে আমাদের।

ওরা তাদের সন্তানদের বিদেশের নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে – আমাদের সন্তানদের পুড়িয়ে মারে। ওরা আমাদের সর্বশান্ত করে সুইস ব্যংকে টাকা জমায়। ওরা আমাদের পাবলিক বাস পুড়িয়ে নিজেরা মার্সিডিজে চলে। ওরা আমাদের মাতৃভূমিকে রক্তাক্ত করে সেই রক্ত দিয়ে হোলি খেলায় মেতে ওঠে। ওরা অবরোধ নামের অভিশাপ দিয়ে আমাদের জীবন অভিশপ্ত করে দেয়।
হে বাঙালি জাগো। আর কতদিন চলবে এসব? আর কতকাল? সবাই জাগো। লাথি মেরে তাড়াও ওইসব হায়েনাদের। মুক্ত কর আমার স্বদেশ। নয়তো আর আমি দেশেই আসবো না।