ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

প্রতিবার বিদেশ থেকে ঢাকায় নেমেই একটা ধাক্কা খাই। প্রথম ধাক্কা খাই ইমিগ্রেশনের সামনে বেহাল ব্যবস্থাপনা দেখে। ধাক্কা খাই এইডস রোগীর মত জরাজীর্ন ডিউটিফ্রি শপের করুন দশা দেখে। তারপর ধাক্কা খাই ইমিগ্রেশন অফিসারদের অদক্ষতা, অসততা এবং অসভ্যতা দেখে। এরপর লাগেজ বেল্ট, কাষ্টমসের ধাক্কা খেতে খেতে আমি যখন বের হয়ে আসি, তখন আর অনুভূতি বলতে কিছু আর থাকে না।
ইমিগ্রেশন কাউন্টার নাকি মুদি দোকানের লাইন?

আচ্ছা বাংলাদেশ কি মদ খোরের দেশ? বিদেশ ফেরত বাংলাদেশি, বা এদেশে যারা বেড়াতে কিংবা কাজের জন্য আসেন, তাদের কি মদ ছাড়া আর কিছুই কেনার নেই?

মধ্যপ্রাচ্য হতে সরাসরি এবং ইউরোপ বা আমেরিকা হতে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে এবং এশিয়ার অন্যান্য গন্তব্য হতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে প্রতিদিন কতটি ফ্লাইট ঢাকায় আসে? ৫০ টি ? সংখ্যাটা আরও বেশি হতে পারে। আমি একটা সরল হিসাবের জন্য ৩০টি ধরে নিলাম। গড়ে ২৫০ টি আসন ধরে এই ৩০টি বিমানে প্রতিদিন ৭৫০০ যাত্রী ঢাকায় নামেন যাদের দুই হাত ভর্তি থাকে দুবাই, জেদ্দা, দোহা, মাস্কাট, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর এবং আরও অনেক দেশের বিভিন্ন বিমান বন্দরের ডিউটি ফ্রি শপের শপিং ব্যাগ। আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় দেখেছি – এসব শপিং ব্যাগের অধিকাংশই চকলেট, সাবান শ্যাম্পু আর কিছু উপহার সামগ্রী দিয়ে ভর্তি থাকে । এদের কেউই মদ আনেন না ।

ধারণা করছি প্রতিটি যাত্রী গড়ে ৫০ ডলারের ডিউটি ফ্রি সামগ্রী কেনেন? তাহলে ৭৫০০ যাত্রী প্রতিদিন বিদেশের ডিউটি ফ্রি শপে কত টাকা রেখে আসেন? বেশি না মাত্র ৩৭৫০০০ ডলার বা ২ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা ( বা এর কাছাকাছি)। ৩০ দিনে কত হয়, বছরেই বা কত টাকা হয় সেটা আর হিসাব নাই করলাম। ৫০ ডলারের জিনিস সাধারণ সময়ের হিসাব। ঈদ, পুজা-পার্বনের সময় ব্যাগ আরো ভারী হয়। প্রিয়জনের মুখে একটু হাসি ফোটাবেন এই আশায় আরও অনেক ডলার তারা বিদেশের ডিউটি ফ্রি শপে দিয়ে আসেন।

আচ্ছা, তারা এসব জিনিষ ঢাকা বিমান বন্দরের ডিউটি ফ্রি শপ থেকে কেনেন না কেন? দেখুন ঢাকা বিমান বন্দরের ডিউটি ফ্রি শপের অতি সাম্প্রতিক একটা ছবি। উত্তরটা নিজে নিজেই পেয়ে যাবেন।

ঢাকা বিমান বন্দর ডিউটি ফ্রি শপ

আগমনী লাউঞ্জে একটাই ছোট্ট ডিউটি ফ্রি শপের আউটলেট আছে, যেখানে শুধুই মদ বিক্রি হয়। অথচ বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা কেউ মদ কেনেন না। এমনকি শতশত বার এখান দিয়ে যাতায়াতের সময় শুধুমাত্র একবার কিছু চীনা নাগরিক ব্যাতীত অন্য কাউকে কখনও আমি মদ কিনতে দেখিনি।
২০১৪ সালে দুবাই ডিউটি ফ্রি শপের বিক্রয়ের পরিমান ছিল প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার। দুই বিলিয়ন ডলার বিক্রয় হলে লাভ কত মিলিয়ন? ডিউটি ফ্রি শপে ডিউটি বা খাজনা দিতে হয় না, কিন্তু তাই বলে কি ওরা বিনা লাভে জিনিষ বিক্রয় করে? সারা বিশ্বের সমগ্র ডিউটি ফ্রি’র শতকরা ৫ ভাগ বিক্রয় হয় দুবাই ডিউটি ফ্রি শপে। ধারনা করছি, এই দুই বিলিয়ন ডলারের উল্লেখযোগ্য যোগান দেয় মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী কিংবা ইউরোপ আমেরিকা হতে দুবাই হয়ে আসা বাংলাদেশিরা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, দুবাই ডিউটি ফ্রি শপে কিছু কেনা কাটা করে এরকম ভারতীয়, নেপালি কিংবা পাকিস্তানি নাগরিক আমি বলতে গেলে খুব কমই দেখেছি ।

দুবাই ডিউটি ফ্রি
ঢাকা বিমান বন্দরের ডিউটি ফ্রি শপের মালিক বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তো প্রতি মাসে নানান ছুতা ছাতায় বিদেশ ভ্রমনে যান এবং বিদেশ থেকে নিজেরাও ব্যাগ ভর্তি করে চকলেট, সাবান শ্যাম্পু আর উপহার সামগ্রী নিয়ে আসেন। কই তাদেরকি একবারও মনে হয় না যে আমরা কেন আমাদের ডিউটি ফ্রি শপকে আরও উন্নত করি না? যদি আমাদের ডিউটি ফ্রি শপকে আকর্ষনীয় করে ঢেলে সাজানো যেত, তাহলে প্রতি বছর বাংলাদেশ বিমান যে কোটি কোটি টাকা লোকসান দেয়, তার অনেকটাই উঠে আসতে পারতো । পাশাপাশি এদেশে নতুন আসা কোন বিদেশি বিমান বন্দরে নেমেই আমাদেরকে মদখোর জাতি হিসেবে ভাবতো না।

হায় সেলুকাস!