ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বলা হয়ে থাকে এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী জিনিষটি হলো, “পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ”। এটা আক্ষরিক অর্থে ভর কিংবা ওজন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়নি। পুত্রহারা একজন পিতার বুকফাটা কষ্ট এবং সীমাহীন শোকের পরিমান বোঝাতে এই উপমাটি ব্যবহৃত হয়। এই কষ্ট এবং শোকের পরিমান বোঝার ক্ষমতা আমাদের কারোই নেই। যে পিতা তার জীবদ্দশায় নিজ প্রানপ্রিয় পুত্রের লাশ কাঁধে বহন করেছেন একমাত্র তিনিই জানেন এর “ভার” (ভর কিংবা ওজন অর্থে নয়) কতটুকু। মাত্র দু’দিন আগে খুন হলেন ব্লগার অভিজিৎ এর বইয়ের প্রকাশক জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপন। দীপনের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক পুত্র হত্যার বিচার চাননি।

আজকাল বাংলা স্যাটেলাইট চ্যানেল টিভি’র নিউজে কিংবা পত্রিকার পাতা উল্টালেই হর হামেশা খুন-খারাবির খবর। দেশের আনাচে কানাচে এখানে সেখানে অতি তুচ্ছ ঘটনা, সম্পত্তি কিংবা ক্ষমতার ভাগাভাগিতে খুন হচ্ছেন অনেকে। প্রতিটি খুনের পরপরই নিহতের নিকটাত্মীয়দের আহাজারি আর বিচার প্রার্থনার চিৎকার দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। ব্যতিক্রম বলতে গেলে এ বছরই দেখলাম। অভিজিৎ খুন হবার পর অধিক শোকে পাথর, তার পিতা অধ্যাপক অজয় রায়কে কাঁদতে দেখিনি। আর দেখলাম না অধ্যাপক কাসেমকে। পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তুটি কাঁধে নিয়েও অনেকটা শান্ত, ধীর স্থির এই পিতা। শোকে মুহ্যমান, ব্যাথায় কাতর অধ্যাপক অজয় রায় পুত্র হত্যার বিচার চেয়েছিলেন। কিন্তু অধ্যাপক কাসেম তাও চান নি। চেয়ে কি হবে? বিচার হবে? “আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যাঁরা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যাঁরা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। জেল ফাঁসি দিয়ে কি হবে?” – এই ছিল অধ্যাপক আবুল কাসেমের প্রতিক্রিয়া।

কতটুকু অসহায় হলে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছার প্রতি কতটুকু আস্থাহীন হলে সদ্য সন্তান হারানো একজন পিতা পুত্র হত্যার বিচার চাইতেও অনীহা বোধ করেন সেটা একজন বিবেকবান মানুষ বুঝলেও বুঝতে পারেন না ক্ষমতা আর শক্তি’র মোহে উম্মত্ত এবং অন্ধ আমাদের পলিটিশিয়ানরা। পারেন না বলেই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলতে পারেন, “‘একজন পুত্রহারা পিতা সন্তানের হত্যার বিচার চায় না—এটা বাংলাদেশে প্রথম। পৃথিবীতেও এমনটা আমি দেখিনি। এটার কারণ একটাই হতে পারে যে, পুত্র হত্যা হয়েছে তার বাবা অধ্যাপক সাহেব হয়তো ওই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। তারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেই উনি উনার দলের লোকজনদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান না।“

দীপন খুনের একদিন পর ব্লগার অভিজিৎ এর স্ত্রী বন্যাও জানিয়ে দিলেন, “দীপনের বাবার মতো আমিও বিচার চাইনা। আমি নিশ্চিত জানি টুটূলের স্ত্রী, দীপনের স্ত্রী, অনন্তের বোন, রাজিব, বাবু, নীলয়ের বন্ধুরাও আর বিচার চান না”। তার মানে দাঁড়াল এই যে – বন্যা, টুটুলের স্ত্রী, দীপনের স্ত্রী, অনন্তের বোন, রাজিব, বাবু, নীলয়ের বন্ধুরাও সব হানিফের ইংগিত করা “ওই” রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী।

রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম আসছিল না। নিজেকে জিজ্ঞেস করছিলাম, আমি কি এসব হত্যার বিচার চাই? উত্তরটা মন থেকেই পেয়ে গেলাম। না আমিও এই হত্যার বিচার চাই না। আমরা অনেকেই হয়তো লোক দেখানো এসব বিচার চাই না। সুতরাং আমি এবং আপনারা যারা এসব হত্যার বিচার চান না তারা সবাই “ওই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী”। হানিফ সাহেব ভেংগে না বললেও আমি স্পষ্টতঃ জানি ওই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী বলতে উনি জামায়াতের কথাই বুঝিয়েছেন। তাই মোদ্দা কথা হল হানিফের ভাবনায় অধ্যাপক আবুল কাসেম, বন্যা আহমেদ, দীপনের স্ত্রী ডাঃ রাজিয়া, টুটুলের স্ত্রী, আমি – আপনি সহ আমরা অনেকেই জামায়াতি। চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী তার ফেইসবুক পেইজে আসলে ঠিকই লিখেছেন, “এই এমন এক নিদান কাল যখন কারো কারো গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের সাথে না মিললে, এমনকি সন্তানহারা পিতাকেও প্রকারান্তরে খুনের সহযোগী বানিয়ে ফেলা যায়।”

মাথায় ভর্তি গোবর – একথা বলে আমরা অনেককে গালাগালি করলেও মনে রাখতে হবে সেই গোবর একটি উৎকৃষ্ট মানের সার। এটাও সত্যি যে গোবর তখনই সারে রুপান্তরিত হয় যখন এটাকে মাটিতে প্রয়োগ করা হয়। মাটির মত মানব মস্তিস্ককেও উর্বর করবে এরকম ভাবনায় গোবরকে যখন হানিফ সাহেবের মত মানুষদের মস্তিস্কে প্রয়োগ করা হয় তখন সেটা উর্বরতো হয়ই না, বরং মাথায় যা ও একটু ঘিলু ছিলো সেটাকেও পচিয়ে দেয়। পচা যে কোন জিনিষই দুর্গন্ধ ছড়ায়। সারা দেশ, সামাজিক মিডিয়া এমনকি বিদেশ বিভূঁইয়ে বসেও আমি সেই দুর্গন্ধ টের পাচ্ছি। ইয়াক…থুঃ…