ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

ziaur_rahman_7_november_1975

আজ সুদূর পরবাসে বসে যখন এই লেখাটা লিখছি, তখন আজ থেকে ৪০ বছর আগে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের এই দিনগুলোতে (৪ -৭ নভেম্বর) সারা বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছিল। স্বাধীন বাংলার নব্য মীরজাফর খন্দকার মোশতাককে হটিয়ে খালেদ মোশারফ ক্ষমতা দখল করেছেন, কিন্তু ক্ষমতার বলয় পাকাপোক্ত করতে পারেননি। ঘটনাক্রমে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠকারী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গৃহবন্দী। সারা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট জুড়ে জাসদ নিয়ন্ত্রিত “বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার” গোপন, কিন্তু ব্যাপক তৎপরতা। আজকের তথ্যমন্ত্রী ইনু সাহেব হয়তো ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের আশে পাশে কোথাও। কর্নেল তাহেরও দৃশ্যপটে। গুমোট পরিবেশ। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

৭ নভেম্বর ১৯৭৫। “সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই, জেসিও’র ওপর অফিসার নাই”, “সৈনিক সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই” – হঠাৎ এরকম লোমহর্ষক স্লোগানে কম্পিত ঢাকা সেনানিবাস। স্লোগানের অগ্রভাগে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য এবং এজেন্টরা। বুঝে না বুঝে অনেক সাধারণ সৈনিকও যোগ দিয়েছে সেই দলে। বেশ কিছু নিরপরাধ অফিসারকে হত্যা করা হল। অনেকে ভয়ে পালিয়ে গেলেন। এর মধ্যেই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সহায়তায় জিয়ার অনুগত সৈনিকরা জিয়াকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে। মেজর জেনারেল খালেদ মোশারফ এবং তদীয় সঙ্গী উচ্চপদস্থ সেনা অফিসাররা ঢাকা ছেড়ে যাবার প্রাক্কালে বর্তমান শেরে বাংলানগরে ১০ ইষ্ট বেংগল রেজিমেন্টে আশ্রয় চাইতে গিয়ে সৈনিকদের হাতে নিহত হন। কর্নেল তাহেরের সমর্থনপুষ্ট জেনারেল জিয়া অতি অল্প সময়ের মধ্যে তার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে ফেলেন।

এর পরের ঘটনা সবারই জানা। হত্যা, ক্যু, পালটা ক্যু, বংগবন্ধু হত্যাকারীদের দায়ুমুক্তি, ‘৭১ এর পরাজিত শক্তিকে পূনর্বাসন, হ্যাঁ ভোট-না ভোট, সেনানিবাসে বসে সামরিক উর্দি পড়ে রাজনৈতিক দল জন্ম দেয়া, স্বাধীনতা বিরোধীদেরকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশীদার করা – সবশেষে পলিটিক্স কে ডিফিকাল্ট করে ফেলা – কী হয়নি? বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায়গুলো সেসময়ে  রচিত হয়েছিল যার খেসারত বাঙালি জাতিকে আজও দিতে হচ্ছে।

তবে এসবের কিছুই সম্ভব হতো না যদি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য ওঁত পেতে থাকা জাসদ এবং তার অনুগত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা জেনারেল জিয়ার মুক্তিতে এগিয়ে না আসতো। অবশ্য এসব করতে গিয়ে তারা পানি এতই ঘোলা করে ফেলেছিল যে, নিজেরাই সেই পানিতে পথ হারিয়ে জিয়ার শিকারে পরিনত হল। কর্নেল তাহের ফাঁসিতে ঝুললেন, ইনুসহ অন্যরা কারাবরণ করলেন। হায় সেলুকাস!

আমরা তখনও পুরনো ঢাকাতেই ছিলাম। যতদুর মনে পড়ে, ৭ই নভেম্বরের পর কোন একদিনের দৈনিক সংবাদপত্রে ট্যাংকের উপর উর্দি পড়া সাধারণ সৈনিকদের সাথে বেসামরিক পোষাকে বিজয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত হাসানুল হক ইনু সাহেবের ছবি ছাপা হয়েছিল।

কোন ঘটনা ঘটার ৫০ বছর পর নাকি তার প্রকৃত ইতিহাস রচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ এ জিয়ার উত্থানের পর এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ বছর পার হয়েছে। সে হিসেবে আরও দশ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে আমাদের। ইতিহাস যেভাবেই রচিত হোক না কেন, জিয়ার উত্থানের জন্য জাসদ এবং তার অনুগত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা কিছুতেই দায় এড়াতে পারবেন না। ইনু সাহেবদের মূল্যায়নের ভার কালের হাতেই ছেড়ে দিলাম।