ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময় ঢাকাতে থাকলেও যুদ্ধের স্মৃতি খুব একটা মনে নেই। ৪ -৫ বছরের একটা শিশু’র স্মৃতি ভান্ডারে সেসব থাকার কথাও না। শুধু খন্ডিত কিছু ঘটনা মনের গহীনে উঁকি মেরে যায় কখনও কখনও। মনে আছে কোন এক রাতে বাবা, মা আর অন্য দুই ভাই বোন মিলে পায়ে হেঁটে বহুদুর গিয়ে নৌকায় চড়ে কোথাও যাচ্ছিলাম। পথে রাস্তায় আর নদীতে অসংখ্য লাশ। বড় হবার পর মা বলেছিলেন এপ্রিল মাসে আমরা ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনা সেটা। আবার মাস খানেক বাদে ঢাকায় ফিরে এসেছিলাম। ফিরে আসার কথা মনে নেই। মনে আছে কোন এক ভোরে ঢাকার আকাশে শত শত বিমানের গর্জন। ০৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর পর ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিমান আক্রমনের সেই দৃশ্যও কিছুটা মনে আছে। এরপর আবারও আমরা ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ নানা বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলাম। তখন ভারতীয় বিমান বাহিনীর সাথে আকাশ যুদ্ধে একটা পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত হয়। পাইলট প্যারাস্যুট দিয়ে নেমে আসে, আর হাজার হাজার মানুষ সেই পাইলটকে জীবিত ধরে নিয়ে আসে। হায়েনার বাচ্চাটার প্রায় ঝাপসা ছবি মনে আছে। ধরার পর তাকে বেদম পিটিয়ে হাত-পা বেঁধে পাশের নদীতে ফেলে দেয়া হয়। নদী তীরে নানার হাত ধরে আরও অনেক গ্রামবাসীর সাথে সেই দৃশ্য উপভোগ করেছিলাম।

এরপর স্মৃতিরা আবারও ঝাপসা হয়ে যায়। যখন স্কুলে পড়ি তখন জেনারেল জিয়ার শাসনকাল। ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখায় কোথাও “পাক হানাদার বাহিনীর” কথা লিখা থাকতো না। লেখা হতো শুধু হানাদার বাহিনী। বড় হতে হতে যখন কলেজে পড়ি তখন আস্তে আস্তে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন বই, পত্র-পত্রিকার লেখা পড়তাম। স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতাম। স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদ যখন বাংলার মসনদে, তখনও ইতিহাস বিকৃতই থেকে গেছে। “পাক হানাদার বাহিনী” লিখতে আমাদের তৎকালীন অনেক ইতিহাসবিদের খুব লজ্জা হতো । তেমনি পাক হানাদারদের এদেশীয় দোসরদের কর্মকান্ড কিংবা নাম লিখতেও তাদের লজ্জা হতো। অবশ্য সাড়ম্বরে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালনের কোন কার্পন্য ছিল না। বিজয় দিবসের আগে ১৪ নভেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও যা জেনেছি সেটা পত্র পত্রিকায়। তাই অনেকটা অন্ধকারে ছিলাম। অন্ধকারে ছিল ওই সময় আমার মত বেড়ে উঠা অনেক কিশোর-যুবক। কখনও জানিনি পাকিস্তানি হায়েনাদের দোসর রাজাকার-আলবদর –আল শামস এর সেই কুত্তা গুলির নাম। জানতে পারিনি ওদের বীভৎসতার কথা। ডিসেম্বর মাস এলে টিভিতে মাঝে মাঝে নাটকে ওদের খন্ডিত কিছু কর্মকান্ড তুলে ধরা হতো। কিন্তু সেটা ছিল অত্যন্ত নগন্য। “ভাসুরের নাম” নেয়া হত না।

এরপর হঠাৎ করে একদিন কিভাবে যেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সাথে পরিচয়। কোন একটা লেখায় এই স্বর্নগর্ভা মা আর তার পরিবার বিশেষ করে শহীদ রুমী’র কথা পড়লাম। তারও অনেক পরে কিনেছিলাম ৭১’এর দিনগুলি। তখন বোধ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। টানা দুই রাতে পড়ে শেষ করেছিলাম সেই বই। তারপর থেকে বুকে মোচর দেয়া কষ্ট। নীরবে নিভৃতে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়েছি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জন্য। মনে হত আমি যদি রুমী হতে পারতাম।

Rumi

নব্বই দশকের শেষের দিকে (ঠিক খেয়াল নেই) আনিসুল হকের “মা” উপন্যাস পড়ি। উপন্যাস তো নয়, এ আরেক সন্তান হারা মায়ের আত্মবলিদানের গল্প। সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা উপন্যাস পড়তে পড়তে অনেকবার চোখের জল ফেলেছি। আর মনে মনে শপথ নিয়েছি যদি ওই হায়েনার বাচ্চাগুলি’র এদেশীয় দোসরদের কখনও হাতে পেতাম, তাহলে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতাম। রুমি-বদি-আজাদ-জুয়েল এরা তখন আমার স্বপ্নের নায়ক।

“মা” উপন্যাস পড়তে পড়তেই নিজেকে জিজ্ঞেস করতাম, কারা সেই গুপ্ত ঘাতকের দল? কারা সেই আল বদর, আল-শামস? কোথায় হারিয়ে গেল ওদের নেতা-কর্মীরা? এই স্বাধীন বাংলার মুক্ত বাতাসে ওদের শ্বাস নেয়ার অধীকার কে দিল?

তখনও আমি চৌধুরী মুইনুদ্দিন আর আশরাফুজ্জামানের নাম শুনিনি। তবে জামাত শিবিরের গো-আজম, মুজাহিদ, নিজামী, শাহ আজিজ, আলীম, সাকাচৌ সহ আরও অনেক রাঘব বোয়ালের রোমহর্ষক কর্মকান্ডের অসংখ্য ঘটনা পড়ে শিউরে উঠতাম। অবাক বিস্ময়ে ভাবতাম এরা এখনও বেঁচে বর্তে আছে কিভাবে? মুক্তিবাহিনীর ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য সহ জানা-অজানা অসংখ্য মুক্তিসেনা, নিরপরাধ বুদ্ধিজীবী, আর স্বাধীনতাকামী অসংখ্য মানুষের প্রান নিয়ে রক্তের হোলি খেলার অন্যতম ফিল্ড কমান্ডার চৌধুরী মুইনুদ্দিন আর আশরাফুজ্জামানের নাম আমি জেনেছি খুব বেশী দিন হয়নি। কখনও ভাবিনি সত্যি সত্যি আওয়ামী লীগ এদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারবে। কখনো ভাবিনি কসাই কাদের, মুজাহিদ, সাকাচৌ আর কামারুজ্জামানের মত ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেখে যেতে পারবো।

Muin3

এই মুহুর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকি হায়েনাদের দোসর যতগুলি খুনী, জেলে কিংবা জেলের বাইরে বেঁচে আছে তাদের সব গুলিকে ফাঁসিতে কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডে দিলেও আমার মন ভরবে না। নিজামী সহ পাইপলাইনে থাকা বাকী হায়েনাগুলিকে যদি ফাঁসির বদলে গায়ের চামড়া ছিলে লবন, মরিচ মেখে জ্বলন্ত আগুনে বারবিকিউ করে নেড়ি কুত্তা দিয়ে খাওয়ানো হয়, তারপরও আমার মন শান্ত হবে না পুরোপুরি। আমি চাই চৌধুরী মুইনুদ্দিন আর আশরাফুজ্জামানের ফাঁসি। আমি চাই ওদের কাটা মুন্ডু।

Ashra now1

কে এই চৌধুরী মুইনুদ্দিন? একাত্তরের মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত কখনো দিনের আলোয়, কখনও রাতের অন্ধকারে ঢাকার রাজপথ, অলি গলি দাপিয়ে বেড়িয়েছে এই রাজাকার। বৃহত্তর নোয়াখালী জেলায় জন্ম নিয়েছিল এই আল-বদর ফিল্ড কমান্ডার। বর্তমান বয়স প্রায় ৬৭। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট এই রাজাকার ১৯৭১ সালে পেশায় ছিল সাংবাদিক। এই সাংবাদিকতা পেশার আড়ালে সে আল-বদরের পক্ষে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাওয়া মানুষের নাম-পরিচয় সরবরাহ, অপারেশনের সময় তাদের কাংখিত টার্গেটের বাড়ী চিনিয়ে দেয়াসহ নিজ হাতে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে। ডিসেম্বরের ১০ থেকে ১৫ তারিখে এই ঘৃণিত রাজাকারের কারণে হারিয়ে যায় অসংখ্য বুদ্ধিজীবী। মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের পরপর গা ঢাকা দিয়ে হাওয়া হয়ে যায় মুইনুদ্দিন (সম্ভবত পাকিস্তানে গিয়ে তার মনিবদের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল) এরপর ১৯৭৩ সালে সে লণ্ডনে যায়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব নিয়ে ইষ্ট লন্ডনে বিরাট মুসলমান নেতা বনে গিয়ে স্ত্রী আর চার পুত্র কন্যা নিয়ে সুখে শান্তিতে (?) আছে। যুক্তরাজ্যের উপর মহলেও তার বেশ ভাল যোগাযোগ। কোন এক অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস এর পাশেও তাকে দেখা যায়! হায় সেলুকাস। আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রাজাকারকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ডের রায় দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাজ্যের সাথে বাংলাদেশের বন্দী বিনিময় চুক্তি না থাকা এবং তাদের আভ্যন্তরীন নিয়মের জন্য (মৃত্যুদণ্ড হবার আশংকা থাকলে যুক্তরাজ্য কাউকে তাদের দেশ থেকে বের করে দেয় না) এই রাজাকারকে কখনই ফাঁসির দড়ি দেখতে হবে না!

Muinuddin 4

আশরাফুজ্জামান খান। ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এই যুদ্ধাপরাধী ছিল আরেক “কসাই কাদের”। ডায়রিতে লিখে রাখা নাম ধরে ধরে ১৯৭১ সালের অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হয় নিজ হাতে হত্যা করে নয়তো আল-বদরের অন্যান্য কিলিং স্কোয়াড দিয়ে হত্যা করায়। স্বাধীনতার পর, ৩৫০ নম্বর পূর্ব নাখালপাড়ার বাসা থেকে আশরাফুজ্জামানের হাতে লেখা ডায়রিটি উদ্ধার করা হয় যেখানে অনেক বুদ্ধিজীবীর নাম লেখা ছিল যাদেরকে ডিসেম্বরের ১০ থেকে ১৫ তারিখে বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। আশরাফুজ্জামানের গাড়ির চালক মফিজুদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী আশরাফুজ্জামান ওই সময়ে মুনীর চৌধুরী, ডঃ আবুল খায়ের, গিয়াসউদ্দীন আহমেদ, রসিদুল হাসান, ডঃ ফজলুল মহী এবং ডঃ মুর্তজাকে নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করে লাশগুলো রায়েরবাজার আর মিরপুরের শিয়ালবাড়ী বধ্যভূমিতে ফেলে রাখে। এছাড়া শহীদ রুমী, আজাদ, জুয়েল সহ অসংখ্য তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের এবং মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক মানুষগুলিকে হত্যায়ও তার সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে। স্বাধীনতার পর সে পাকিস্তানে তার মনিবদের কাছে পালিয়ে গিয়ে কিছুদিন রেডিও পাকিস্তানে কাজ করে। এরপর সে চলে যায় আমেরিকাতে এবং বর্তমানে সে Queens branch of Islamic Circle of North America (ICNA) এর প্রধান। মোট ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ মুক্তিযুদ্ধের সময় চালানো গনহত্যার দায়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মুইনুদ্দিনের পাশাপাশি আশরাফুজ্জামানেরও ফাঁসির রায় হয়েছে। পাকি’দের অকৃত্তিম বন্ধু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের দেশে তাদের আশ্রয়ে থাকায় এই যুদ্ধাপরাধীকেও হয়তো ফাঁসির দড়িতে ঝুলানো সম্ভব হবে না।

আর এই দুই রাজাকারকে ফাঁসির দড়িতে না ঝুলানো পর্যন্ত, কিংবা ওদের চামড়া ছিলে লবন-মরিচ দিয়ে মাখানো শরীর ঝলসিয়ে বারবিকিউ করার পূর্বে কাটা মুন্ডু দুটি দিয়ে যতক্ষন না আমি ফুটবল খেলতে পারছি, ততক্ষন আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে না। শহীদ রুমী, আজাদ, জুয়েল এবং মুনীর চৌধুরী সহ শহীদ অন্যান্য সকল বুদ্ধিজীবী আর মুক্তিপাগল সেসব তরুণ, কিশোর, যুবকের আত্মাও শান্তি পাবে না।