ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পূর্ব ভারতের অন্যতম বৃহৎ এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২০১৪ সালে পূর্নাংগ রুপ পায়। প্রাকৃতিক গ্যাস ভিত্তিক এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সর্বমোট উৎপাদন ক্ষমতা ৭২৬.৬ মেগাওয়াট। মোট দুইটি ইউনিটের মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিপনন করার পর একটি রাজ্যের বাড়তি প্রায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশ প্রতি ইউনিট সাড়ে ৬ টাকা দরে কিনে নিচ্ছে ।

পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে প্রায় চার – পাঁচ বছর আগে এই পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য অত্যন্ত ভারী সরঞ্জামাদি আমাদের দেশের উপর দিয়েই বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এজন্য বাংলাদেশ – ভারত নৌ এবং রোড ট্রান্সজিট চুক্তি সই (কিংবা নবায়ন ঠিক মনে নেই) করা হয়েছিল। ভারত থেকে বড় বড় বার্জে করে সেসব ভারী যন্ত্রপাতি প্রথমে আশুগঞ্জে আনা হয়। এরপর আমাদের নিজেদের টাকা খরচ করে আশুগঞ্জে বিশেষ জেটি, এরপর আশুগঞ্জ থেকে ব্রাম্মনবাড়িয়া হয়ে আখাউড়া পর্যন্ত রাস্তা বানিয়ে এই সরঞ্জাম ভারতে নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। এই রাস্তা বানাতে গিয়ে ব্রাম্মনবাড়িয়ার অদুরে তিতাস নদের উপর সেতু বানানোর পরিবর্তে বাঁধ দিয়ে একটি জীবন্ত নদকে হত্যা করা হয়। অনেক লেখালেখির পর আবার আমাদের নিজেদের টাকায়ই নদীর উপর নির্মিত সেই বাঁধ (রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত) নদের মাঝ বরাবর একটু খানি কেটে নদের পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। তবে এর মধ্যে যা হবার হয়ে গিয়েছিল। তিতাস নদটি মরে গিয়েছিল। আমরা আমাদের বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে একটা বহমান নদকে হত্যা করেছিলাম। আশুগঞ্জে বিশেষ জেটি নির্মান, আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রাস্তা নির্মান এবং সংস্কার এর জন্য ব্যয়কৃত অর্থের কথা না হয় বাদই দিলাম।

কী নির্মম পরিহাস! আজ সেই পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ বেশ উচ্চ মূল্যে আমাদেরকে কিনে নিতে হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ উদার না হলে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পক্ষে কোনদিনও এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তৈরী করা সম্ভব হতো না। আমাদের দেশের ভেতর দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায়, শত কোটি টাকা খরচ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ভারী সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে যেতে দিয়ে আমরা উদারতা দেখিয়েছি, বন্ধুরা কিন্তু এর সামান্য প্রতিদান দেখানোর আগ্রহের কথাও প্রকাশ করলেন না। আমি বলছি না যে তারা তাদের বিদ্যুৎ আমাদেরকে বিনা মূল্যে দিয়ে দিবেন, কিন্তু বাংলাদেশ এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারী সরঞ্জামাদি নিয়ে যাবার জন্য যে পরিমান অর্থ ব্যয় করেছিল, সেটাকে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব হিসেবে বিবেচনা করে ব্যবসায়িক দিক থেকে চিন্তা করলে আমরা লাভবান হতাম।
পালাটানা কেন্দ্রের ৭২৬ মেগাওয়াটের মধ্যে অরুনাচল ২২, আসাম ২৪০, মনিপুর ৪২, মেঘালয় ৭৯, মিজোরাম ২২, নাগাল্যান্ড ২৭ আর ত্রিপুরা রাজ্য কিনে নেয় ১৯৬ মেগাওয়াট। আরো ৯৮ মেগাওয়াট অবিক্রিত আছে। এর মধ্যে ত্রিপুরার ১৯৬ মেগাওয়াট থেকে ১০০ মেগাওয়াট তারা বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করে দিল। অথচ এটা তাদের বাড়তি বিদ্যুৎ যার কোন চাহিদা এখন পুর্যন্ত ত্রিপুরায় তৈরী হয়নি। তাই বাড়তি এই বিদ্যুৎ আরো সুলভ এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যেই বাংলাদেশ কিনে নিতে পারতো। আরো অনেক কমমূল্যে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ পেতে পারতো, পাওয়া উচিত ছিল। অথচ এখন কে লাভবান হলো?
এই লেখাটা পর্যালোচনার জন্য জমা দেয়ার পর জানতে পারলাম, পালাটানার অবিক্রিত সেই ৯৮ মেগাওয়াটও বাংলাদেশের কাছে বিক্রির পাঁয়তারা চলছে। আর পরীক্ষিত বন্ধুদের এহেন প্রস্তাব নিশ্চয়ই আমরা লুফে নেব? বিদ্যুৎ এমন একটা জিনিস যেটা জমিয়ে রাখা যায় না। একটি জেনারেটর একবার ঘুরা শুরু করলে তার উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটাই উৎপাদন করবে। যদি সেটা ব্যবহৃত না হয় তাহলে এটা অপচয় হতে থাকবে। পালাটানার এখন সেই অবস্থা। কেউ কিনে নিলে তাদের লাভ, না কিনলে পরোক্ষ ক্ষতি। সুতরাং এমন বেকায়দা অবস্থা থেকে আমরাই তাদেরকে পরিত্রান দিতে পারি। বন্ধুত্বের মূল্য বলে একটা কথা আছে না? প্রয়োজন হলে সাড়ে ৮ টাকায় সেই বিদ্যুৎ আমরা কিনে নেব, তবুও বন্ধুর ক্ষতি হতে দেব না। এটাই প্রকৃত বন্ধুত্বের সংজ্ঞা।

তথ্য সুত্রঃ
১। https://en.wikipedia.org/wiki/ONGC_Tripura_Power_Company
২। http://bangla.bdnews24.com/economy/article1086060.bdnews