ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

গত ১১ মে ২০১৬ তারিখে মহা সমারোহে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। আশির দশকে আমার এসএসসি পরীক্ষার পর মানিকগঞ্জে মামার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানেই হঠাৎ একদিন সকালে দেখলাম আমার এসএসসি’র ফলাফল। কোন পূর্ব ঘোষনা নেই, কোন আড়ম্বর নেই, কোন কানাঘুষা এমনকি ফিসফাস নেই। পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়নি, কোচিং সেন্টার ছিল না। তবে প্রাইভেট পড়েছি। না আজ সেসব নিয়ে কোন গল্প বলতে আসিনি। প্রকাশিত এসএসসি’র ফলাফল অনুযায়ী আমার ছেলে এবং মেয়ে সকল বিষয়ে এ+ পেয়ে পাশ করেছে যেটাকে তারা অতি গর্বের সাথে “গোল্ডেন জিপিএ ৫” হিসেবে সবার কাছে জাহির করতে ব্যস্ত। গিন্নীও কম যান না। আমি যেহেতু নবম-দশম শ্রেণিতে পড়া কালীন পুরোটা সময় দেশের বাইরে ছিলাম, তাই ছেলে–মেয়ের এহেন কৃতিত্বে তাঁর ভূমিকাটুকুও তিনি স্বগৌরবে সবার কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করে চলেছেন দিনরাত। এটা তাঁর প্রাপ্য বৈ কি।
SSC Exam2
অনেক চেষ্টা-তদবির করে এসএসসি পরীক্ষার সময়টুকুতে আমি ছুটি নিয়ে দেশে ফিরে আসি। বাংলা পরীক্ষার আগে গভীর রাতে ছেলে-মেয়ের কাছে বন্ধুদের ঘন ঘন ফোন আর ভাইবার কল আসে। দু ভাই- বোন সেটা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে আর বার্তা আদান প্রদান করে। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কি হচ্ছে? তবে কিছু একটা হচ্ছে আন্দাজ করে জিজ্ঞেস করতেই সত্যবাদী ছেলে-মেয়ে ভয়ে ভয়ে জানিয়ে দিল বাংলার বহুনির্বাচনী অংশের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে এবং বন্ধুদের মারফত তারা সেটা পেয়ে গেছে। এর কিছুক্ষন পর সৃজনশীল অংশের কয়েকটি প্রশ্নও তারা পেয়ে গেল। আমি প্রচন্ড হতাশ এবং ক্ষুব্দ হলাম। একজন তথাকথিত আদর্শ বাবার মত প্রশ্ন ফাঁসের গুজবে কান না দিয়ে নিজেদের পড়া নিজেরা করে ভাল মত প্রস্তুতি নিতে বলে বিছানায় চলে গেলাম।
পরদিন পরীক্ষার হলে নিয়ে গেলাম। কেন্দ্রের মূল গেট খোলার আগে দুই-তিন শত ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে প্রায় সবাই ফিসফিস করে প্রশ্ন-উত্তর আদান প্রদানে ব্যস্ত হয়ে গেল। আমি বুঝলাম, প্রশ্ন ফাঁসের গুজবের ঢেউ জোরেশোরেই উঠেছে। যা’হোক, বেলা একটায় পরীক্ষা শেষ করে সবাই হাসি মুখে বাইরে এল। ছেলে -মেয়েরা আমাকে এড়িয়ে মায়ের কানে কানে বলে দিল গত রাতে পাওয়া প্রশ্ন হুবহু মিলে গেছে এবং বাংলা প্রথম পত্রে তারা নিশ্চিত ৮০-৯০ নম্বর পাবে। আমি দেখেও না দেখার ভান করলাম, শুনেও না শোনার ভান করলাম। (আমাদের সময়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পরীক্ষা দিয়েও বাংলায় ৬০-৬৫ তুলতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে )
SSC Exam3
দিন কয়েকের ভেতর আরো কয়েকটি পরীক্ষা হয়ে গেল এবং যথারীতি আরো কয়েকটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র অন-লাইনে ছড়িয়ে গেল। আমি এরকম কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে কয়েকটি টিভি চ্যানেলের বার্তা বিভাবে পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু কেউ টু শব্দটি করলো না। কারণ কেউ প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়ার ঘোষনা এলো। তাই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের হুবহু কপি হাতে পেলেও সেটা গুজব হতে পারে এবং গুজব ছড়ানোর দায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতে পারে এই ভয়ে সবাই চুপ করে থাকলেন। আমিও গুজব ছড়ানোর অপচেষ্টা থেকে বিরত থাকলাম। আমি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির সাজবো না। আমি যে কয়েকটি বিষয়ের প্রশ্ন পত্র দেখেছি, সেগুলো আমার ছেলে-মেয়েও দেখেছে। পিতা হিসেবে আমি শুধু একটি জিনিষ নিশ্চিত করতে চেয়েছি। ওরা শুধুমাত্র প্রশ্ন ফাঁসের আশায় বসে না থেকে নিজেদের প্রস্তুতিটা নিজ থেকেই ভাল মত নিয়ে তারপর যেন পরীক্ষার হলে যায়।
এবার পরীক্ষার হলের পরিবেশ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতাটা বর্ণনা করবো। ময়মনসিংহ শহরের নামকরা বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। শহরের ভেতরেই অখ্যাত এক স্কুলে তাদের সীট পড়েছিল। প্রায় প্রতিদিন লক্ষ্য করেছি, এমসিকিউ অংশের পরীক্ষা শুরু হবার ১৫-২০ মিনিট পর স্কুলের একজন শিক্ষক হন্ত দন্ত হয়ে এই কেন্দ্রে প্রবেশ করতেন। দুটি পরীক্ষার পর আমি আমার বাচ্চাদেরকে তাদের স্কুলের শিক্ষক কেন্দ্রে প্রবেশের ব্যাপারে জানতে চাইলাম। এই কেন্দ্রে একই রুমে আমার মেয়ের সহপাঠী একজন হাই প্রোফাইল পরীক্ষার্থী ছিল। হন্ত-দন্ত হয়ে আগমনকারী শিক্ষকের কাজ ছিল এমসিকিউ অংশের প্রশ্ন পত্র হাতে পাবার পর সেটার সমাধান বের করে এই হাই প্রোফাইল পরীক্ষার্থীকে সেটা জানিয়ে যাওয়া। এভাবে প্রতিদিন একজন না একজন শিক্ষক এসে সেই হাই প্রোফাইল পরীক্ষার্থীর এমসিকিউ অংশে ৪০ নম্বর নিশ্চিত করে যেতেন। মাঝখানে সুযোগ মত ঐ শিক্ষার্থীর আশে পাশে দু’য়েকজন সৌভাগ্যবতীও তাদের ৪০ নম্বর নিশ্চিত করে ফেলতো। SSC Exam
বায়োলজি পরীক্ষার ২৫-৩০ মিনিট আগে (যখন কেন্দ্রের গেট খোলা হয়নি, কিন্তু কেন্দ্রের ভেতরে প্রশ্ন পত্রের প্যাকেট খোলা হয়ে গেছে) আমি নিজ চোখে একজন শিক্ষককে (?) কেন্দ্রের বাইরে এসে তাঁর কাছে যারা প্রাইভেট পড়েছে তাদেরকে দাঁড়িয়ে সব এমসিকিউ প্রশ্ন এবং উত্তর প্রকাশ্যে বলে দিতে দেখেছি। আমি এ ব্যাপারে কেন্দ্র সচিবের কাছে অভিযোগ করেও কোন ফল পাইনি। কি ফল পাব যেখানে পুরো সিষ্টেমটাই কলুষিত হয়ে গেছে?
কেন্দ্র সচিবের কাছে অভিযোগ করে আমি কোন ফল পাইনি। কিন্তু আমার ছেলে মেয়ে সেটার প্রতিফল ভোগ করেছিল। হাত থেকে কলম ফেলে দেবার কারণে আমার মেয়েকে পরীক্ষার হলে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ১০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখে এবং গালাগালি করে এক পর্যায়ে হল থেকে বহিস্কারের হুমকি দেয়া হয়েছিল। আর আমার ছেলেকে তাঁর সীট পরিবর্তন করে সবার পেছনে একাকী একটি বেঞ্চে বসানো হয় যাতে সে আশে পাশে কারো কাছ থেকে কোন সাহায্য নিতে না পারে। শুধু তাই নয়, একাকী আলাদা বসার কারণে পরীক্ষা শেষ হলে তাঁর খাতাটাই আগে নিয়ে নিত। ফলে একটা শ্রেণী কক্ষে ৩০ -৪০ জন পরীক্ষার্থী থাকা অবস্থায় শেষ ঘন্টা বেজে গেলেও শিক্ষক কর্তৃক খাতা সংগ্রহের সময়টাতে ঐ কক্ষের সর্বশেষ পরীক্ষার্থী বাড়তি দুই-তিন মিনিট সময় পেত।
ইসলাম ধর্ম পরীক্ষার দিন সুকৌশলে সম্পূর্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের ভেতর শুধু মাত্র একটি রুমের সকল মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদেরকে “হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা”র প্রশ্ন ধরিয়ে দিয়ে সময় ক্ষেপন করা হয়েছে বলে শুনেছি। আর ঐ সময়ে ইসলাম ধর্মের প্রশ্ন পত্র নিয়ে আসার নাম করে কেন্দ্রের বাইরে থেকে এমসিকিউ’র প্রশ্নোত্তর তৈরী করে সেই বিশেষ সুবিধাভোগী ছাত্রী এবং তাঁর আশে পাশের সুযোগ সন্ধানীদেরকে দিয়ে দেয়া হয়ে ছিল। এরপর ঐ রুমের সকল পরীক্ষার্থীদেরকে এ বিষয়ে মুখ না খোলার জন্য নির্দেশও দেয়া হয়েছিল।
আমি সবচে বেশী ভয় পেয়েছি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা নিয়ে। এমনিতে ৩০-৪০ বছর আগে আমার নিজের প্রাকটিক্যাল পরীক্ষার অভিজ্ঞতা এখনও হুবহু মনে আছে। প্রাকটিক্যালে কি করলেন কি করলেন না, ভাইবাতে সঠিক উত্তর দিলেন কি দিলেন না এগুলো কেউ দেখতো না। আপনি যদি ক্লাসে প্রথম এক থেকে পাঁচ বা দশ জনের ভেতর থাকেন তাহলে আপনার ২৫ এ ২৫ সুনিশ্চিত। আর আপনি যদি রদ্দি মার্কা ছাত্র হন, তবে প্রাকটিক্যালে যতই কেরামতি দেখান না কেন, ভাইবার প্রশ্নোত্তর সবগুলি পারলেও আপনার কপালে ২৫ নম্বর জুটবে না। সুতরাং মাথার উপর বহিস্কারের হুমকি এবং বিনা কারণে সম্পূর্ন অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সীট পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা লাভের পর আমি সত্যি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু এ যাত্রায় খারাপ তেমন কিছু ঘটেনি। শুধুমাত্র ফিজিক্স এর প্রাকটিক্যাল সময় একটি’র জায়গায় ছেলেকে দুটি আলাদা প্রাকটিক্যাল করে দেখাতে হয়েছে। একই ক্লাসে একই নামে আরেক ছাত্রী থাকায় আমার মেয়ে বেনিফিট অব ডাউট নিয়ে পার পেয়ে গেছে।
আমি একটা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। যদি আমার ছেলে মেয়ের রেজাল্টে উলটা পালটা কিছু হয় তাহলে আমি স্কুলের প্রধান শিক্ষক, কেন্দ্র সচিব এবং দুর্নীতিবাজ শিক্ষক সহ অনিয়মের সাথে জড়িত সবাইকে অন্তত হাইকোর্টের দরজা পর্যন্ত টেনে আনবো। রেজাল্টে উলটা পালটা কিছু না হওয়াতে এখন আর সেই প্রয়োজনীয়তা নেই। আমাকে আপনারা স্বার্থপর বললে বলতে পারেন। কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, আমরা আসলে এরকমই। নিজের গায়ে আচড়টি না লাগা পর্যন্ত, বা আমাদের নিজেদের কেউ আঘাত না পাওয়া পর্যন্ত আমরা সাধারণতঃ প্রত্যাঘাত করি না, এমনকি প্রতিবাদও করি না। যাইহোক, এত সব ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতার পর ছেলে-মেয়ে “গোল্ডেন জিপিএ ৫” পাওয়াতে আমার আনন্দিত এবং আহ্লাদিত হওয়া উচিত কি উচিত না এটা নিয়ে সত্যি ঘোরের মধ্যে আছি।

নোটঃ ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে নেয়া