ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

সারা দেশে বৈধ অবৈধ ২০ -৩০ লক্ষ রিক্সা চলে। এই রিক্সা গুলো বিভিন্ন পৌরসভা, সমিতি’র লাইসেন্স প্লেট নিয়ে চলে। প্রতিটি লাইসেন্স প্লেট বাবদ কেউ না কেউ কিছু টুপাইস কামিয়ে নিচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। আবার এই রিক্সা গুলো ভাড়া দিয়ে মালিকরা লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে থাকেন কিন্তু তাদের কোন আয়কর দিতে হয় না। বৈধ হোক কিংবা অবৈধ, সব রিক্সার জন্য মালিকের কাছ থেকে আয়কর নেয়া হোক। (আয়কর আর লাইসেন্স প্লেট দিয়ে রিকসাকে বৈধতা দেয়ার বিষয়টিকে একসাথে গুলিয়ে ফেলার প্রবনতা বন্ধ করা প্রয়োজন) ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং রাজশাহীর মত মেগা সিস্টিতে সেসব রিক্সাওয়ালা আছেন তাদের গড় মাসিক আয় ২৫-৩০ হাজার টাকা যেটা বছরে হিসেব করলে ব্যক্তি পর্যায়ে আয়করের সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু কোন রিক্সাওয়ালা আয়কর দেন না। তাদেরকে আয়করের আওতায় আনা হোক।
প্যাডেল চালিত রিক্সার পাশাপাশি সারা দেশে ১০-১৫ লক্ষ ব্যটারী চালিত রিক্সা চলে। এদের কোন লাইসেন্স নেই, নেই কোন আয়কর দেয়ার বাধ্যবাধকতা। বিভিন্ন সমিতির লাইসেন্স প্লেট নিয়ে এরা রাস্তা দাপিয়ে বেড়ায়। রাস্তা নষ্ট হচ্ছে, সরকার বিনা লাভে রাস্তা ঠিক করছে। বিভিন্ন সমিতি যদি টুপাইস কামিয়ে নিতে পারে, সরকারের ট্যাক্স নিতে অসুবিধা কোথায়? ব্যাটারী চালিত রিক্সা মালিক এবং চালক উভয়কেই আয়করের আওতায় আনা হোক।
সারা দেশের শহর, শহরের বাইরে অলি-গলিতে হাজার হাজার মুদি দোকান, ফার্মেসী, ফাষ্ট ফুডের দোকান এবং রেষ্টুরেন্ট – যারা শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই বছরের পর বছর ব্যবসা করে যাচ্ছে। এরকম অনেক মুদি দোকান, ফার্মেসী এবং ফাষ্ট ফুড দোকান কিংবা রেষ্টুরেন্ট এর মাসিক আয় লক্ষ টাকার উপরে। কিন্তু আয়কর কর্মকর্তাদের নজরে না পড়লে তাদের আয়কর দিতে হয় না। যারা আয়কর কর্মকর্তাদের নেক নজরে পড়ে যান, তারা প্যাকেজ ভ্যাট নামক একটা বিশেষ সুবিধার আওতায় ভ্যাট দিয়ে থাকেন, আয়কর নয়। জেলা, উপজেলা কিংবা পৌরসভাভিত্তিক অবস্থান এবং এর পাশাপাশি দোকানের আয়তন ভিত্তিক আয়কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে যেটা প্রতি বছর ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময়ই দিতে হবে।
নসিমন, করিমন, ভটভটি – এসব অবৈধ, কিন্তু দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেশের দেশের সব সড়ক-মহাসড়ক। এদের নেই কোন রেজিষ্ট্রেশন, লাইসেন্স কিংবা রুট পারমিট। একেকটা নসিমন, করিমন বা ভটভটি রাস্তায় নামাতে খরচ প্রায় ১ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা। মাসিক আয় এলাকা এবং সময় ভেদে ২০ হতে ৫০ হাজার টাকা। এগুলোর মালিক ও চালক উভয়কেই আয়করের আওতায় আনা হোক।
সারা দেশে ১০ লক্ষাধিক ইঞ্জিন চালিত দেশী নৌকা রয়েছে যেগুলো দিয়ে মানুষ এবং মালামাল পরিবহন করা হয়। এদের ও নেই কোন লাইসেন্স, ফিটনেস। কিন্তু দেশের সব নদীতে এরা চলাচল করছে, আয় করছে। এসব ইঞ্জিন চালিত নৌকাকে আয়করের আওতায় আনা হোক।
পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন পাহাড়ী ব্যবসায়ীকে (ব্যবসার আকার যাই হোক না কেন) কর দিতে হয় না। তাদের সবাইকে করের আওতায় আনা হোক। একশত টাকা হলেও কর দিতে হবে। দেশের ভেতরে কোন মৌসুমী ফল বা সবজি উৎপাদনকারী কৃষককে কর দিতে হয় না। অথচ প্রায়ই পত্রিকায় পড়ি অমুক কৃষক বা খামারী এক বছরে ব্যবসা করে চার –পাঁচ লক্ষ টাকা লাভ করেছেন। আয়কর কে দেবে? তাঁর কাছ থেকে আয়কর কে নেবে – এ প্রশ্ন কেউ করছে না।
দেশের মডেলিং এবং সাংস্কৃতিক জগতের মানুষ যারা, তাদের কার আয় কত, সেটা একটা রহস্য। তেমনি রহস্য ফুটবল এবং ক্রিকেট খেলোয়ারদের আয় নিয়ে। তাদের সবাইকে উৎসে কর প্রদানের মত ব্যবস্থার আওতায় আনা হোক।
প্রতি বছর কোরবানীর ঈদে যে পশুর হাট বসে সেখানে লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে ক্রেতারা গরু – ছাগল কিনে নেন। প্রতিটি বিক্রিত গরু-ছাগলের বিপরীতে ক্রেতা –বিক্রেতা উভয়কেই আয়করের আওতায় আনা হোক।

দুই ঈদ, পুজা এবং বড়দিনের সময় যেসব ক্রেতা বাজার থেকে অত্যধিক মূল্যবান পোষাক কেনেন, তাদের সবাইকে ক্রয় স্থলে উৎস করের আওতায় আনা হোক। মৌসুমী ফল এবং সবজি বিক্রেতা সবাই কর দেয়ার মত আয় করেন। সবাইকে করের আওতায় আনা হোক।

ঢাকা’র বিভিন্ন স্বনামধন্য স্কুল কলেজের (ভিখারুন্নেসা, হলিক্রস, মতিঝিল আইডিয়াল, রাজউক উত্তরা ইত্যাদি ইত্যাদি) অনেক শিক্ষক প্রতি মাসে কোচিং বাণিজ্য করে ২-৩ লক্ষ টাকা আয় করেন। এদের কেউ আয়কর দেন না। যদি কেউ দিয়ে থাকেন তাহলে সেটা ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রম মানুষেরা যে পরিমান আয়কর দেন সেটাও অতি নগন্য। কঠোর নজরদারীর মাধ্যমে তাদের সবাইকে আয়করের আওতায় আনা হোক। (ময়মনসিংহ জেলা স্কুলের নবম-দশম শ্রেণীতে যারা পদার্থ বিজ্ঞান কিংবা হাল আমলে বাংলা পড়ান, সেসব শিক্ষকের মাসিক আয় ১ লক্ষ টাকার উপরে। )

সরকারী প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা না হলে সাধারণতঃ বাধ্যতামূলক আয়কর দিতে হয়না। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা/কর্মচারির আয় করযোগ্য হয়ে যাবে। তাদের সবাইকে আয়করের আওতায় আনা হোক। সেবা প্রদানকারী সংস্থার যে সকল ক্ষেত্রে স্পীড মানি’র ব্যাপার আছে, সেখানে কর্মরত সবাইকে আয়করের আওতায় আনা হোক। না এটা স্পীড মানি নেয়াকে বৈধতা দেয়া নয়। কিন্তু যেহেতু বাড়তি আয় হচ্ছে, তাই আয়কর দিতেই হবে। (ভুমি অফিস, ওয়াসা, তিতাস, বিদ্যুৎ, রাজস্ব বিভাগ এবং থানা ইত্যাদি) এ আর রহমানের কনসার্ট দেখতে যারা এক হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা দামের টিকেট কিনেন, তারা কোন কর দেন না। এসব হাই প্রোফাইল দর্শককে টিকিটের মূল্যের উপর আলাদা ট্যাক্স দিতে হবে। ফ্যান্টাসী কিংডম, যমুনা ফিউচার পার্কে যারা এমিউজমেন্টের জন্য যাবেন তাদের সবাইকে ট্যাক্স দিতে হবে (যদি ইতোমধ্যে ভ্যাট এর আওতায় না থেকে থাকেন) ।
বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ বিদেশী আছেন যারা বৈধ-অবৈধভাবে এদেশে দীর্ঘদিন যাবত বসবাস করে আসছেন। এদের মধ্যে ভারতের অধিবাসী সব’চে বেশী (প্রায় ৫ লক্ষ) যারা ভ্রমন ভিসায় এসে এদেশে চাকুরী ব্যবসা ইত্যাদি পেশায় জড়িত আছেন। এরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসা – চাকুরী ইত্যাদি’র মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বেতন এবং লভ্যাংশ নিয়ে যাচ্ছেন, অথচ এরা সরকারকে কোন কর দেন না। এদের সবাইকে করের আওয়তায় আনতে হবে।
আগে ওয়েজ আর্নার বন্ডের লাভ করমুক্ত ছিল। এখন ১০-১৫% কর দিতে হয়। কিন্তু যারা বিদেশ থেকে টাকা এনে অন্যান্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন কিংবা ভোগে টাকা ব্যয় করছেন তাদেরকে কোন কর দিতে হচ্ছে না। বিদেশ থেকে আসা প্রতিটি রেমিটেন্স এর বিপরীতে আয়কর নেয়া হোক। কর প্রদানের রসিদ প্রদর্শন ব্যবতীত কোন প্রবাসী শ্রমিককে দেশে আসতে অথবা দেশের বাইরে যাওয়া বন্ধ করা হোক।
ব্যাক্তিগত গাড়ী’র ক্ষেত্রে আয়কর নেয়া হয় গাড়ীর সিসি’র উপর ভিত্তি করে। ফলে ২০০০ সিসি’র পুরনো, ভাঙ্গা টয়োটা আর একই সিসি’র নতুন বিএমডব্লিউকে একই পরিমান কর দিতে হয়। কেন? গাড়ির দাম এবং বাংলাদেশে এর বয়স ভিত্তিক হারে কর নেয়া হোক। নতুন এবং পুরনো, কমদামী এবং বিলাসবহুল অত্যাধুনিক গাড়ীর ট্যাক্স এক হতে পারে না। যেই পরিবারের একটি’র বেশী গাড়ী আছে, তিনি যে ট্যাক্স দিবেন আর আমি অতি কষ্টে একটা মাত্র গাড়ি কিনলাম, আমরা দুইজন একই হারে ট্যাক্স দেব কেন? একের অধিক গাড়ী মালিকেদেরকে গাড়ী প্রতি নির্দিষ্ট হারে (যেমন এক লক্ষ টাকা) কর দিতে হবে।
এখন প্রতিটি এনআইডি’র বিপরীতে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক সীম কার্ডের ব্যাপারে আইন করা হয়েছে। আমার প্রস্তাবনা, প্রতিটি এনআইডি’র বিপরীতে যতগুলো সীমের অনুমোদন দেয়া হোক না কেন, দুই বা তিনের অধিক সীমের ক্ষেত্রে প্রতিটি সীমের জন্য বাৎসরিক কমপক্ষে ১০০০ টাকা উৎসে আয়করের বিধান রাখা হোক।
বাস-ট্রাক-সিএনজি’র ফিটনেস থাকুক চাই না থাকুক, যেহেতু সেগুলো রাস্তায় চলছে, তাই এর মালিক এবং চালক উভয়কেই আয়করের আওতায় আনতে হবে। রাজনীতি এখন ব্যবসার সমার্থক। স্থানীয় কিংবা জাতীয় পর্যায়ে যারা নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেন তারা নির্বাচনী খরচের একটা হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়ে থাকেন। নির্বাচন বাবদ এই খরচের উপর ভ্যাট এবং নির্বাচিত প্রতিটি জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে ১০০ টাকা হলেও আয়কর আদায় করা হোক।
আসলে কখন কিভাবে এই কর আদায় করা হবে সেটা এনবিআর এর কাজ। তবে ব্যবস্থাটা এমন হতে হবে, যাতে সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।