ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

মেনুঃ
১। ষ্টার ফ্রাইড কলি ফ্লাওয়ার (Stirr fried Cauliflower) : ৫০০/-
২। সিচুয়ান ষ্টাইল মিক্সড ভেজিটেবল (Schicuan Style Mixed Vegetable) : ৫০০/-
৩। এগ ফ্রাইড রাইস (Egg Fried Rice) : ৪৫০/-
৪। এগ- টমেটো স্যুপ (Egg Tomato Soup) : ৪৫০/-

গত ২২ জুলাই ২০১৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৮ টায় বনানীর ১১ নম্বর সড়কের একটা জাঁকজমকপূর্ণ চাইনিজ রেস্তোরাঁয় এটাই ছিল আমাদের চার জনের খাবারের মেনু। (পাশে দাম লিখে দিলাম)

Egg Fried Rice Mixed Vege

সাথে শুধুমাত্র পানি (মিনারেল ওয়াটার ১/২ লিটার করে ২ বোতল)। সেই ১ লিটার পানি এবং পরে ভ্যাট –টিপস মিলিয়ে সর্বমোট খরচ হল ২৭০০ /- । বলাই বাহুল্য যে এই ২৭০০ টাকায় যে পরিমান খাবার প্লেটে দেয়া হয়েছিল তাতে করে আমরা চারজনের কারো তৃপ্তি মেটেনি, পেট ভরেনি। সুতরাং বাসায় এসে আবার পরোটা ভেঁজে খেয়ে নিতে হয়েছিল।

আমি মোটামুটি ভালই রান্না-বান্না জানি। পরদিন কারওয়ান বাজারে গিয়ে ষ্টার ফ্রাইড কলি ফ্লাওয়ার রান্নার সকল উপকরণ কিনে আনলাম। সব উপকরণ বলতে শুধু ফুলকপি আর ক্যাপসিকাম । বাকি সব বাসায়ই ছিল। আমি উপকরণের নাম, পরিমান এবং আনুমানিক মূল্য দিয়ে দিলামঃ

ক। ফুলকপি ছোট – ২ টা – মূল্যঃ ৪০ টাকা
খ। রসুন (বড় আকারের) – অর্ধেক (প্রায় ৪ কোয়া) – মূল্য ৫ টাকা
গ। অয়েষ্টার সস – ১ টেবিল চামচ – মূল্যঃ ৮ টাকা
ঘ। ক্যাপসিকাম মাঝারী – ১ টা – মূল্যঃ ২৫ টাকা
ঙ। তেল ১ টেবিল চামচ – মূল্য ৩ টাকা
চ। কালো গোল মরিচ ১ চিমটি- মূল্য ৫ টাকা
ছ। চিনি ১ টেবিল চামচ – মূল্য ৩ টাকা
জ। লাল শুকনো মরিচ বড় আকারের ১ টা – মূল্য ২ টাকা
ঝ। লবন ১ চিমটি – মূল্য ১ টাকা
সর্বমোটঃ ৯২ টাকা !!!!!

মাত্র ৯২ টাকা খরচ করে তৈরী খাবারের দাম নেয়া হল ৫০০ টাকা !! আমি যেটা বাসায় রান্না করলাম সেটা স্বাদে এবং গুনে গুলশানের সেই রেষ্টুরেন্টের চেয়ে অনেক অনেক ভাল ছিল। এগ টমেটো স্যুপ নামে যেটা সার্ভ করা হল সেটা বানাতে খুব বেশী হলে ৪০ টাকা খরচ হতে পারে। বাসায় আমার রান্না করা ষ্টার ফ্রাইড কলি ফ্লাওয়ার এর ছবি দিয়ে দিলাম। (দয়া করে রেসিপি চাইবেন না)

20160711_202454

এবার আসল কথায় আসি। গেল ঈদের সময় ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি জেলায় পোষাকের দোকানে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে অতিরিক্ত মুনাফা’র দায়ে অসংখ্য ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে, অনেককে সতর্ক করা হয়েছে। অতিরিঙ্ক মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে সেই অভিযান কোথাও কোথাও পন্যের তথা কাপড় চোপড়ের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে না পারলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা ভোক্তাদের বাহবা কুড়িয়েছে। মানুষ স্বস্তি পেয়েছে, খুশী হয়েছে। ব্যবসায়ীরা নাখোশ হয়েছে, কোথাও কোথাও আন্দোলনের হুমকি দেয়া হয়েছে, অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাপড় বা পোষাক বিক্রেতারা বছরে মাত্র দুইবার অতিরিক্ত দাম হাঁকার সুযোগ পেয়ে থাকেন এবং এটা সত্য যে অনেক ব্যবসায়ী সারা বছর চেয়ে থাকেন কখন ঈদ আসবে যাতে একটু ভাল ব্যবসা করতে পারেন। তাই সর্বস্ব পুঁজি করে তারা এই দুই ঈদে ব্যবসায় নেমে পড়েন। সারা বছর যা লাভ করেন, এই দুই ঈদে তার চেয়ে কয়েকশত গুন বেশী মুনাফা করেন তারা। হয়তো এধরণের অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হলে ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা সবাই সচেতন হবে এবং ব্যবসায়ীদের মাঝে অতিরিক্ত মুনাফা করার আগ্রহ কমতে শুরু করবে।

আমার প্রশ্ন, ঢাকা, চট্টগ্রাম সিলেটের মত মেগাসিটি গুলোতে ফাস্ট ফুড, চাইনিজ রেস্তোরাঁ, বা কফি শপের নামে বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে খাবারের দামের নামে প্রতিনিয়ত মানুষের গলা কেটে নেয়া হচ্ছে তার বিরুদ্ধে অভিযান নেই কেন? খাবারের দোকানদারদের ঈদতো সারা বছর লেগে আছে। তাই সাকিব আল হাসান থেকে শুরু করে টিভি তারকা, সিনেমার নায়ক এমনকি চাকুরীরত/অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের সবারই পছন্দের অন্যতম ব্যবসা হল খাবারের দোকান। কোন মতে অভিজাত এলাকায় একটা খাবারের দোকান বা যাকে আমরা ভদ্র ভাষায় রেষ্টুরেন্ট বলি এরকম কিছু একটা খুলে নাও তারপর দুই হাতে টাকা কামাই কর। জঙ্গি হামলার আগে গুলশানের আলোচিত হলি আর্টিজান বেকারীর দৈনিক আয় কত জানেন? গুলশান -২ এর গ্লোরিয়া জিন্স কফি শপের মাসিক নীট মুনাফার পরিমান শুনলেও মাথা ঘুরে যাবে আপনার!

এক কাপ কফিতে কি এমন সোনা-দানা বা অমৃত মেশানো হয়? কাপুচিনো বলেন আর এসপ্রেসো কিংবা লাট্টে , এগুলো তৈরীর মূল উপকরণ আর তার পরিমানে তফাৎটা খুব সামান্যই। কিভাবে এক কাপ এসপ্রেসোর দাম ৩৫০ টাকা হয়? আমার অতি ঘনিষ্ট আত্মীয় যিনি রবি’তে (Robi-Axiata) আর তার স্ত্রী বাংলাদেশ বিমানে উভয়েই অতি উচ্চ বেতনে চাকুরী করেন তারাও উত্তরায় রেষ্টুরেন্ট খুলে বসেছেন। কারণ লাভের পরিমানটা প্রায় অসীমের কাছাকাছি। আপন বলেই তারা নিঃসংকোচে জানিয়েছেন যে, যে কফি তারা ১৬০ টাকায় বিক্রি করেন সেটা বানাতে খরচ পড়ে মাত্র ১৮ টাকা! প্রতি মাসে গড় বিক্রি চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা যার থেকে নীট মুনাফা আসে কমপক্ষে তিন লক্ষ টাকা! ৩৫০ টাকার এসপ্রেসো বানাতেও খরচ ১৮ টাকা হতে বাধ্য। নামে কফি শপ হলেও অন্যান্য অনেক খাবার তথা ফাস্ট ফুড বিক্রি করা হয়। সেগুলোর দামও আকাশ ছোঁয়া। ৫০-৬০ টাকায় তৈরী খাবারের দাম ৬৫০ টাকা! তাহলে মাসিক নীট মুনাফার পরিমান কল্পনা করে নিন।

তেজগাঁয়ে ঢাকা সেনানিবাসের জাহাংগীর গেটের কাছে অবস্থিত “ক্যাপটেন্স” যে মানের ও আকৃতির কেক ৭০০ টাকায় বিক্রি করে সেই একই মানের কিন্তু আকারে ছোট কেক গুলশানের “বেকারস” বিক্রি করে ১২০০ টাকা!! কেক বানাতে ময়দা, ডিম, চিনি, বাটার, বেকিং পাউডার আর এসেন্স বা সুগন্ধি ছাড়া আর কি কি উপকরণ লাগে? আমি শতকরা ১০০ ভাগ নিশ্চিত ১২০০ টাকার কেক বানাতে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা খরচ হতে পারে,৭০০ টাকার কেক বানাতেও একই খরচ। হয়তো এর চে’ কম বৈ বেশী নয়।

আসলে অতি দ্রূত মুনাফা তুলে নেয়ার প্রবণতা ছাড়াও এভাবে দাম বাড়িয়ে রাখার পেছনে মালিকদের আরেকটা মানসিকতা কাজ করে। সেটা হল খদ্দেরদের মধ্যে একটা শ্রেণী বিভাজন তৈরী করা। যুক্তি সংগত দাম রাখলে এসব খাবারের দোকানে আপনি আমি সহ সাধারণ যে কোন চাকুরীজীবি, ছোটখাট ব্যবসায়ী সহ অনেক আমজনতা ঢুকে যাবে। ঘুষ খোর, দুর্নীতিবাজ আমলা, লুটেরা রাজনীতিবিদ আর কর ফাঁকি দেয়া অসৎ ব্যবসায়ীদের নিয়ে বাংলাদেশে যে ভূয়া (Fake) একটা অভিজাত শ্রেণী গড়ে উঠেছে তারা এটা সইবে কেন? সুতরাং পাঁচ টাকার জিনিষ ৫০০ টাকায় বিক্রি কর। লাভও হলো, শ্রেণীগত আভিজাত্যটাও ঠিক থাকল। এক ঢিলে দুই পাখি।

পন্যের মূল্য বৃদ্ধি তথা অতি মুনাফাখোরীর বিরুদ্ধে যদি অভিযান বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতেই হয় তাহলে সবার আগে সেটা এসব তথাকথিত হাই-ফাই রেষ্টুরেন্ট , কফিশপ আর বেকারীর বিরুদ্ধে করা হোক ।