ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

(দৃশ্য -১), স্থান ফার্মগেট, ঢাকা। কিছুদিন আগের ঘটনা। একটা কাজে ফার্মগেট এলাকায় গিয়েছিলাম। বেলা তিনটা, ভ্যাপসা গরম আবহাওয়া। নিজেই ড্রাইভ করছিলাম। সামনে ছোট্ট একটা জটলা বেঁধে গেল। রিক্সা চালকের সাথে এক যাত্রীর তীব্র বাদানুবাদ। গ্রীন রোড-পান্থপথের সংযোগ মোড় থেকে দরদাম ঠিক না করেই আনন্দ সিনেমা হল পর্যন্ত এসেছেন। রিক্সাওয়ালা ভাড়া চাচ্ছে ২৫ টাকা, যাত্রী ১৫ টাকার বেশী দিতে রাজী না। এদিকে রাস্তায় জ্যাম লেগে যাচ্ছে এদের কারণে। কৌতুহলী অনেকে আপোষ রফার জন্য রিক্সাওয়ালাকে ২০ টাকা নিয়ে রাস্তা ছেড়ে দিতে বলছে। সে কিছুটা মন নরম করলেও যাত্রীর সাফ কথা – ১৫ টাকা। পেছনের পকেট হাতড়িয়ে মানিব্যাগ থেকে ১০ টাকা ও ৫ টাকার একটা করে নোট বের করে রিক্সাওয়ালার হাতে যেই না ধরাতে গেলেন, রেগে মেগে রিক্সাওয়ালা যাত্রীর মুখের ওপর নোট দুটি ছুঁড়ে দিয়ে বললো, “আমি কি আপনের কাছে ভিক্ষা চাইছি নাকি?” বলেই হন হন করে রিক্সা ঘুড়িয়ে নিয়ে চলে গেল। জ্যাম ছুটে গেল। আমিও তাড়াতাড়ি গাড়ী ঘোরালাম।

(দৃশ্য -২), স্থানঃ গুলশান কাঁচাবাজার। বাজারে ঢোকার মুখেই কয়েকটি ফলের দোকান। বলাই বাহুল্য এখানে দাম একটু বেশী রাখা হয়। সাহেব সুবারা আসেন বাজার করতে। তাদের কাছে তো আর কম রাখা যায় না। যেদিনের কথা বলছি সেদিন শুক্রবার। সকাল দশটার একটু বেশী। ভদ্র মহিলা হাড়ি ভাংগা আম কিনতে এসেছেন। আগেই দাম দর করেছেন। পাঁচ কেজি আম নেবার পর ৬০০ টাকা দিলেন। বিক্রেতা চেয়েছিলেন ৮০০ টাকা। কেজি ১৬০ টাকা দর। কেমন করে যেন মুহুর্তেই দু’জন গলা চড়ালেন। ছোটলোক বলে গালি দিতেই বিক্রেতা রেগে প্রতি উত্তর দিলেন “আপা ভিক্ষা লাগবো না, মাগনা লইয়া যান।“

(দৃশ্য -৩)। স্থানঃ পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়। ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রতিদিন (দিনের বেলা) সর্বোচ্চ ৮০টি লরিতে জ্বালানি পরিবহন এবং সমান সংখ্যক খালি লরি একই দিনে নির্ধারিত সড়ক ব্যবহার করে আসামে ফেরত যাওয়ার সুবিধা দেয়া-নেয়ার সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পূর্বে আলোচনায় বসেছে দুই দেশ। চুক্তি যে হবেই, সেটা পূর্ব নির্ধারিত। এ মুহুর্তে তাই আলোচনার বিষয়, এহেন ট্রানশিপমেন্টের মাশুলের হার নির্ধারন করা। আলোচনা সফল হলে বাংলাদেশ সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং ভারতের পক্ষে ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক সমঝোতা স্মারকে সই করবেন। মেঘালয় হয়ে ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে ভারতের আসাম থেকে ত্রিপুরা সড়ক (এনএইচ ৪৪) যোগাযোগ অনুপযোগী হয়ে পড়ায় মানবিক কারণে প্রতিবেশী দেশের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে জ্বালানি পরিবহনে (ট্রানশিপমেন্ট) বাংলাদেশ নিজ ভূখণ্ড ব্যবহারের ‘সাময়িক’ ওই সুযোগ দিচ্ছে। ভারতের প্রস্তাব মতে, মেঘালয়ের ডাউকি (তামাবিল-জাফলং) সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়ে ডিজেল, কেরোসিন, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসসহ জ্বালানিবাহী ভারতীয় লরিগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। সিলেট শহরের পূর্ব প্রান্তের শাহপরান বাইপাস দিয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ-রাজনগর সড়ক ধরে মৌলভীবাজার শহরের চৌমুহনা হয়ে লরিগুলো শমসেরনগর চাতলাপুর (কৈলাশর) সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়ে ত্রিপুরায় পৌঁছাবে। ট্রানশিপমেন্টের জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নির্ধারিত প্রায় ১৪০ কিলোমিটার ওই সড়ক ব্যবহারে কৌশলগত ভাবে বাংলাদেশ কিলোমিটার প্রতি/টন মাত্র ৫ (পাঁচ) টাকা মাশুল দাবী করে। কিন্তু বন্ধুত্বের পাল্টা দাবীতে ভারত কিলোমিটার প্রতি/টন মাত্র ১ টাকা হারে দিতে রাজী হয়। আলোচনার এক পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে প্রধান আলোচনাকারী ভারতের প্রতিনিধি দলের প্রধানকে বলে বসেন, “ভিক্ষা লাগবো না, মাগনা লইয়া যান”।

বর্নিত তিনটি দৃশ্যের মধ্যে প্রথম দুটি সত্যি হলেও তৃতীয় ঘটনাটি আমার কল্পিত। ট্রানশিপমেন্টের জন্য নির্ধারিত প্রায় ১৪০ কিলোমিটার ওই সড়ক ব্যবহার করতে ভারত বাংলাদেশকে কিলোমিটার প্রতি/টন ১ টাকা ০২ পয়সা হারে মাশুল দেয়ার শর্তে গত ১৮ আগষ্ট ২০১৬ তারিখে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

তেল পরিবহনের জন্য সব চে’ ছোট লরির প্রতিটি একবারে প্রায় ৩০০০ গ্যালন বা ১১০০০ লিটার জ্বালানী বহন করতে পারে। সে হিসেবে ৮০ টি লরিতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১১০০০ লিটার/লরি হিসেবে ভারত ৮,৮০,০০০ (আট লক্ষ আশি হাজার লিটার)জ্বালানী নিতে পারবে। বর্তমানে ভারতীয় লরি গুলোকে একই গন্তব্যের জন্য আমার জানা মতে ৩০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয় যার পুরোটাই পাহাড়ী, বন্ধুর পথ।

যেহেতু এটা সমঝোতা চুক্তি, সুতরাং এটার প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে চাইলে আপনারা প্রথম দুটি দৃশ্য ভাল করে পড়ুন।