ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

তেল, চিনি আর ডাল সিন্ডিকেটের পর এবার বাংলাদেশের বাজারে সর্বশেষ সংযোজন গরু সিন্ডিকেট। গেল কোরবানি’র ঈদ উপলক্ষে যারা গরুর হাটে গিয়েছেন তাদের অনেকেই উপলব্দি করেছেন ঢাকা’র প্রায় সব গরুর হাট জুড়েই ছিল এই নতুন সিন্ডিকেট এর সরাসরি এবং ভয়াবহ আগ্রাসন। মজার কথা হল এই নতুন সিন্ডিকেটে এবার যোগ দিয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রিক কিছু টিভি চ্যানেল এর সাংবাদিক।

ঈদ এর সপ্তাহ খানেক আগে থেকে কিছু চ্যানেল সংবাদ প্রকাশ করে আসছিল যে এবার ভারত থেকে প্রচুর গরু আসছে এবং দাম ও কম। এরপর ঈদ এর বাজার অর্থাত্ গরু’র হাট জমে উঠতেই দেখা গেল হাটে তেমন গরু আসছে না। এসময়ে আবার ওই একই চ্যানেল গুলো বলতে থাকলো যে রাস্তায় জ্যাম এ অনেক গাড়ি আটকে আছে তাই হাটে গরু আসতে পারছে না। ৪-৫ তারিখ থেকে চ্যানেল গুলো কিভাবে সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার হয়ে আসে তার সচিত্র প্রতিবেদন প্রচার করতে শুরু করলো। (যেন এটা নতুন কিছু। ভারত থেকে গরু না এলে যে এতদিনে আমাদের সব গরু জাদুঘর এ স্থান পেত এটা চ্যানেল সাংবাদিকরা যেন জানেন না।) ফলে মান ইজ্জত বাঁচানোর জন্য গরু আসার উপর হটাত কড়াকড়ি আরোপ করে দিলেন সীমান্তের পাহারায় থাকা বিজিবি।

৬ তারিখ সন্ধ্যার পর আমি যখন গাবতলী’র হাটে তখন হাটের দক্ষিণ দিকে বেড়ী বাধ এর উপরে এবং পশ্চিমে অনেক গরু ছিল। ওই সময়ে এক টিভি সাংবাদিককে দেখলাম হাটের সামনের দিকে যেখানে তখন গরু নেই (এবং নতুন ট্রাক আসলেও ইচ্ছা করেই গরু নামতে দেয়া হচ্ছিল না) সেই দিকের ভিডিও ফুটেজ তুলে তার অফিসে পাঠাচ্ছেন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মত অনেক কাঁচা-পাকা সাংবাদিক প্রায় সব কটি টিভি চ্যানেলে বলে দিলেন যে ঢাকার হাটে গরু নেই। ব্যাস, আর যায় কোথায়। আতংকিত হয়ে ক্রেতারা বাড়তি দাম দিয়ে গরু কিনতে লাগলেন আর হাটের ইজারদাররা পকেট ফুলিয়ে ফপিয়ে নিতে লাগলেন। গরুর’ দাম যত বেশি, হাসলিও তত বেশি।

গাবতলি হাটে যখন গরু কমে গেল তখন গাবতলি’র আশে পাশে’র ১০-১৫ কিলোমিটার এর মধ্যে যত গ্রাম ছিল সব গ্রামের মানুষ যার বাড়িতে যত গরু, বাছুর আর গাভী ছিল সব এনে হাটে হাজির করেন আর সেগুলো খুব চড়া দামে বিক্রি হয়ে যায়। ৬ মাস বয়সী বাছুর অবলীলায় ২ বছর বয়স বলে চালিয়ে দিলেন বিক্রেতারা। কোরবানি বলে কথা। আরও মজার ব্যাপার হল, এই সুযোগে গাবতলি’র হাটে আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা দালালরা ১০ হাজার টাকার গরু ২০ হাজার টাকায় কিনে সেটা ৩০-৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। আমি দেখেছি এক দালাল একটা গাভী ৩৩ হাজার টাকায় কিনে ৫৫ টাকায় আমার সামনেই বিক্রি করেছে। অর্থাৎ এক বিক্রিতেই লাভ ২২ হাজার টাকা !!

আপনারা বিশ্বাস করবেন কি না জানিনা, এবারের গরু’র হাটে গরু নিয়ে যা হয়ে গেল তার পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন মূলত ইজারাদাররা। (বলাই বাহুল্য যে তারা প্রায় সবাই সরকারি দলের আশীর্বাদ পুষ্ট) তারাই লোক লাগিয়ে বাজারে কতগুলো ট্রাক আসবে সেটা নিয়ন্ত্রন করেছেন। আমি নিজে দেখেছি, আগারগাও হাটে যখন গরু কমে গেল তখন নতুন অনেক ট্রাক ভর্তি গরু এলেও সেগুলো নামতে দেয়া হয়নি। ফলে হাটে গরু’র সংখ্যা কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। সাভারের নবীনগর, জয়দেবপুর চৌরাস্তা সব জায়গায় সতর্ক প্রহরা ছিল ঢাকা’র ইজারাদারদের – যেন বেশী গরু আসতে না পারে। ঢাকা- টাংগাইল, ঢাকা-আরিচা এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সব ট্রাফিক জ্যাম গুলো কি তাহলে ইজারাদারদের কারসাজি? সত্যি হলে আমি একটুও অবাক হব না। এদেশে সবই সম্ভব।

ইজারাদার, আমদানিকারক/পাচারকারী, স্থানীয় দালাল, টিভি চ্যানেল আর সীমান্তে পাহারারত বিজিবি সবাই মিলে এবারের গরু সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। স্বাগতম হে মহান নতুন সিন্ডিকেট। এরপর আমাদের জন্য নতুন চমক নিয়ে নতুন কোন সিন্ডিকেট আসবে- তাই দেখার অপেক্ষায় রইলাম।