ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

কলকাতা ভিক্টোরিয়া প্যালেস, ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিক সৌন্দর্য্যের মিশেলে ১৯১৫ সালে গড়া তিন ভাই ব্রজেন্দ্র-উপেন্দ্র-যোগেন্দ্র মোহনের জমিদার বাড়িগুলো অযত্ন অবহেলায় আজ ধ্বংসের পথে। যেখানে কলকাতার স্থাপনা গুলো সে দেশের সরকারের তদারকিতে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের পদচারনায় মুখর সেখানে আমাদের দেশের একই ধরনের স্থাপনা গুলোর বেহাল অবস্থা। স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে কথা বলে জানা গেল এরশাদ সরকারের আমলে বিসিআরজি ডিগ্রী কলেজকে জমিদার বাড়ি তিনটি লিখিত ভাবে দেওয়া হয়। যদিও বর্তমানে বিসিআরজি ডিগ্রী কলেজের নতুন একটি ভবন তৈরী করা হয়েছে এবং কলেজের ক্লাস ঐ নতুন বিল্ডিং-এ নেওয়া হয়। এদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষ বর্তমানে উপেন্দ্র ভবনটি গ্রামীন ব্যাংক ও যোগেন্দ্র ভবনটি গ্রামীন কল্যাণকে ভাড়া দিয়েছেন যেখানে অফিস কাম ফ্যামেলি কোয়ার্টার হিসাবে তারা বাড়ি গুলো ব্যবহার করছেন। এছাড়া বজেন্দ্র ভবনটি কলেজের কিছু শিক্ষক পরিবার নিয়ে বিনা পয়সায় আরামে বসবাস করছেন। কিন্তু বাড়ি গুলোকে এমন ভৌতিক অবস্থা করে রাখা হয়েছে যেখানে বাড়িগুলোকে সামনে থেকে দেখলে বুঝার উপায় নেই এই বাড়ি গুলোতে কোন সুস্থ লোক থাকতে পারে। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেল আসল রহস্য। যদি সরকার বা প্রশাসন জানতে পারে এসব জমিদার বাড়িতে অবৈধ লোকজন বসবাস করছে তখন তাদের উচ্ছেদ করা হবে, তাই তারা কোন রকম পরিস্কার পরিচ্ছনতার ধারে কাছে যান না। আমাদের দেশে প্রত্নত্বাত্তিক বিভাগ নামে একটি অফিস আছে যারা এই সব জমিদার বাড়ির খোজ খবর রাখেন কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। হতে পারে বর্তমান বাড়ি গুলোর মালিক কলেজ কর্তৃপক্ষ তাই বলে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা গুলো এ ভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে? গ্রামীন ব্যাংক বা গ্রামীণ কল্যানকে অফিস বাড়া দিয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ কত টাকায় বা পান, ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা? এর চেয়ে দেশের প্রত্নত্বাত্তিক বিভাগ বাড়ি গুলো তাদের তদারকিতে নিয়ে সাটুরিয়ার বালিয়িটি জমিদার বাড়ির মতো সংস্কার করে টিকেটের ব্যবস্থা করলে তখন এই সুন্দর স্থাপনা গুলো রক্ষা হতো না? আমার মনে হয় দর্শনার্থীদের টিকেটের আয় থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষ গ্রামীন ব্যাংককে অফিস ভাড়া দিয়ে যা টাকা পান তার চেয়ে আরা বেশি টাকা আয় করতে পারতেন দর্শনার্থীদের টিকেটের টাকা থেকে। আশা করি দেশের প্রত্নত্বাত্তিক বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখবেন।


ছবি:- উপেন্দ্র ভবনের কারুকার্যময় মুকুট।

পাকুটিয়ার জমিদার ও জমিদার বাড়ীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ

বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার অর্ন্তগত নাগরপুর উপজেলা প্রাচীন লৌহজং নদীর তীরে অবস্থিত। নাগরপুর মূলতঃ নদী তীরবর্তী এলাকা হওয়ার কারনেই অতীতে নাগরপুরে গড়ে উঠে বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা কেন্দ্র। ব-দ্বীপ সদৃশ নাগরপুরের পূর্বে ধলেশ্বরী এবং পশ্চিম পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে যমুনা নদী। একসময় এই যমুনা নদীর মাধ্যমে নাগরপুর এলাকার সাথে সরাসরি কলকাতার দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কাজে যোগাযোগ ছিল। সলিমাবাদের বিনানইর ঘাট তখন খুবই বিখ্যাত ছিল। ইংরেজ আমলের শেষ দিকে এবং পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এই ঘাট থেকেই তৎকালীন বৃটিশ রাজাধানী কলকাতার সাথে মেইল স্টিমারসহ মাল এবং যাত্রীবাহী স্টিমার সার্ভিস চালু ছিল। ফলে নাগরপুরের সাথে রাজধানী কলকাতার একটি বানিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর এরই সূত্র ধরে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক মোঘল আমলের সূচনা লগ্নে নাগরপুরে সুবিদ্ধা খাঁ-র হাত ধরে নাগরপুরের বিখ্যাত ‘চৌধুরী’ বংশের আর্বিভাব ঘটে। আরো পরে সুবিদ্ধা খাঁ-র পথ অনুসরন করে পশ্চিম বঙ্গ কলকাতা থেকে আসেন রামকৃষ্ণ সাহা মন্ডল নামে একজন বিশিষ্ট ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাঁর জন্মস্থান বিষ্ণপুর, যাহা পশ্চিম বঙ্গের বাকুরা, মেদেনীপুর, বর্ধমান ও শাওতাল পরগনায় কিয়দংশ ও ছোট নাগপুরের অধিত্যক্তা ভূমির কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। রামকৃষ্ণ সাহা মন্ডল প্রথমে ছনকায় অবস্থান নেন পরর্বতীতে নদী ভাঙ্গনের কারণে হাড়িপাড়া হয়ে অপেক্ষাকৃত উচু ভূমি পাকুটিয়াতে তাঁর স্থায়ী বসতী স্থাপন করেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইংরেজদের কাছ থেকে ক্রয় সূত্রে মালিক হয়ে রামকৃষ্ণ সাহা মন্ডল পাকুটিয়ায় জমিদারী শুরু করেন। তাঁর ছিল দুই ছেলে বৃন্দাবন ও রাধা গোবিন্দ। রাধা গোবিন্দ ছিলেন নিঃসন্তান এবং বৃন্দাবন চন্দ্রের ছিল তিন ছেলে। এরা হলেন- ব্রজেন্দ্র মোহন, উপেন্দ্র মোহন ও যোগেন্দ্র মোহন। বৃন্দাবনের মেজছেলে উপেন্দ্রকে তাঁর কাকা নিঃসন্তান রাধা গোবিন্দ দত্তক নেন। ফলে উপেন্দ্র মোহন দত্তক সন্তান হিসাবে কাকার জমিদারীর পুরো সম্পদের অংশটুকু লাভ করেন। ১৯১৫ সালের ১৫ই এপ্রিল প্রায় ১৫ একর এলাকা জুড়ে তিন ভাইয়ের নামে উদ্ভোদন করা হয় একই নকশার পর পর তিনটি প্যালেস বা অট্টালিকা। পাকুটিয়া জমিদার বাড়িটি তিন মহলা বা তিন তরফ নামে পরিচিত ছিল। প্রতিটি মহলের রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য, লতাপাতার চমৎকার কারুকাজ গুলো মুগ্ধ করার মতো। প্রতিটি জমিদার বাড়ীর মাঝ বরাবর মুকুট হিসাবে লতা ও ফুলের অলংকরণে কারুকার্য মন্ডিত পূর্ণাঙ্গ দুই সুন্দরী নারী মূর্ত্তি এবং সাথে এক মূয়ূর সম্ভাষণ জানাচ্ছে অথিতিকে। এছাড়া দ্বিতীয় তলার রেলিং টপ বা কার্নিশের উপর রয়েছে পাঁচ ফুট পর পর বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য সুন্দর সুন্দর ছোট আকৃতির নারী মূর্ত্তি।

এই তিনটি স্থাপনাই অপূর্ব শিল্প সুষমামণ্ডিত। পাশ্চত্তীয় শিল্প সংস্কৃতি সমৃদ্ধ মনের মাধুরী মিশিয়ে স্থাপত্য মূল্যের এক অনন্য সৃষ্টি তাদের এই অট্টালিকা গুলো। তিনটি বাড়ীর সামনেই রয়েছে তিনটি নাট মন্দির। বড় তরফের পূজা মন্ডপের শিল্পিত কারুকাজ শতবছর পর এখনও পর্যটককে মুগ্ধ করে। জমিদার বাড়ির সামনে বিশাল মাঠ আর মাঠের মাঝখানে রয়েছে দ্বিতল নাচঘর।

প্রতিটি জমিদার বাড়ির রয়েছে নিজস্ব পাতকূয়া। জমিদার বাড়ির কাছাকাছি পশ্চিমে আছে উপেন্দ্র সরোবর নামে বিশাল একটি আট ঘাটলা পুকুর। এই তিন মহলার জমিদাররা প্রত্যেকেই ছিলেন প্রজানন্দিত। তাঁদের নিজেদের প্যালেস তৈরীর পর ১৯১৬ খ্রিঃ তাঁরা তাঁদের পিতা বৃন্দাবন এবং কাকা রাধা গোবিন্দের যৌথ নামে বৃন্দবন চন্দ্র রাধা গোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয় (বিসিআরজি) প্রতিষ্ঠা করেন। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কৃতি ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্টাতা উপচার্য এবং সাবেক মন্ত্রী ডঃ এ,আর মল্লিক, সাবেক প্রধান মন্ত্রী আতাউর রহমান খান এবং ভবা পাগলার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ । দেশ বিভাগের পরে তৎকালীন সরকার কর্তৃক পুরো সম্পদ অধিগ্রহণের পর জমিদারদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের নিদর্শন স্বরূপ ১৯৬৭ সালে এই সম্পদের উপর গড়ে তোলা হয় বিসিআরজি ডিগ্রী কলেজ।

পাকুটিয়া জমিদার বাড়ির ছবিব্লগ:


ছবি:- উপন্দ্রে ভবন উপর থেকে।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবন সামনের দিক।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের কারুকাজ।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের সামনের সিঁড়ি।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের নান্দনিক বারান্দা।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের পূর্ব বারান্দা।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের ২য় তলার বেলকেনী।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের পিছনের বারান্দা।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের বৈঠক খানা।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের রঙ্গিন জানালা।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের পশ্চিম আউটলুক।


ছবি:-উপন্দ্রে ভবনের দেয়ালের অবস্থা।


ছবি:-যোগেন্দ্র ভবনের সামনের দিক।


ছবি:-যোগেন্দ্র ভবনের বারান্দা।


ছবি:-যোগেন্দ্র ভবনের দেয়ালের কারুকাজ।


ছবি:- ব্রজেন্দ্র ভবনের সামনের দিক।


ছবি:- ব্রজেন্দ্র ভবনের পশ্চিম দিক।


ছবি:- নান্দনিক ব্রজেন্দ্র ভবন।


উপন্দ্রে ভবনের পিছন দিকে গ্রামিন ব্যাংকের বসবাসরত লোকদের কাপড় শুকানো।

সূত্র:- স্থানীয় অদিবাসী, ইন্টারনেট ও টাঙ্গাইল জেলা তথ্য বাতায়ন