ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

গতকাল খুব জরুরী কাজে গুলশানের অফিস থেকে ধানমন্ডি যাওয়ার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভাড়া দাবী করার পরেও একটি ক্যাবে উঠি। কিছু দুর যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম ড্রাইভার খুব একটা সুবিধার না। বেশ কয়েকবার নিয়ম লঙ্ঘন করে সে ওভার টেক করলো কয়েকটি গাড়িকে, তারপর মহাখালী আমতলী মোড়ে গিয়ে দেখালাম গাড়ী পুরোপুরি টার্ন নিতে পারছে না। খুব ভয় পেয়েছিল। পরে আমি ওকে প্রশ্ন করাতে আসল খবর বের হয়ে আসলো।


মাসুদ রানার অসুস্থ আগুনে পোড়া দুই আঙ্গুল বিশিষ্ট বাঁকা হাত।


ছবি:- মাসুদ রানার বাম হাত যে হাতটি আমাদের ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রায় সময় গাড়ির গিয়ারে রাখতে হয়।

মাসুদ রানা ২০/২২ বৎসরের একটি ছেলে। ৭/৮ বৎসর আগে গাইবান্ধা থেকে জীবিকার জন্য ঢাকায় এসে লালকুঠি,মিরপুর মাজার রোডে অবস্থিত “সুইস ক্যাবে” গাড়ী সার্ভিসিং এর হেলপার হিসাবে কাজ শুরু করেন এবং অবশেষে কাজ শিখে নিজেকে মিস্ত্রি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ছোট বেলায় এক অগ্নিকান্ডে সে তার ডান হাতের তিনটি আঙ্গুল হারান এবং হাতটি বৃদ্ধা আঙ্গুল ও তর্জনী নিয়ে কব্জির পরে চামড়ার সাথে ৯০ ডিগ্রী কোণ করে লেগে আছে। এতে বুঝা যায় সে স্বাভাবিক ভাবে কব্জি ঘোরাতে পারে না। অর্থাৎ তার ডান হাতের আঙ্গুল দুটো বাঁকা হয়ে কব্জির সাথে ফিক্সড হয়ে আছে, তাই তার কব্জি ঘুরাতে অসুবিধা। আমি মাসুদ রানাকে প্রশ্ন করলাম তোমার এই হাত নিয়ে তো তুমি ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার কথা নয়…তাহলে তুমি কিভাবে ঢাকার এই ব্যস্ত সড়কে গাড়ী চালাও। তখন সে বলল ট্রাফিক পুলিশকে টাকা দিয়ে এবং নিয়মিত স্ব-ইচ্ছেয় কেইস খেয়ে খেয়ে। স্ব-ইচ্ছেয় কেইস খাওয়ার ব্যাপারটি আমার কাছে বেশ অবাক করা বিষয় মনে হলো। কেউ কি স্ব-ইচ্ছেয় গাড়ী নিয়ে কেইস খায়? মাসুদরানাকে এর কারন জিজ্ঞাসা করাতে সে বলল, স্যার রাস্তায় গাড়ী বের করলে ট্রাফিক পুলিশ লাইসেন্সের অজুহাত দেখিয়ে ২০০/৩০০ টাকা আদায় করে তারপর ছেড়ে দেয়। ধরেন আমি দিনে যদি দুই বার ট্রাফিক পুলিশের কাছে ধরা খেয়ে ৪০০/৫০০ টাকা দিয়ে দিই তাহলে মাসে আমার ট্রাফিক পুলিশকে ঘুষ বাবাদ দিতে হবে প্রায় ১৫,০০০ টাকা। কিন্তু আমি যদি মাসে দুটো কেইস খায় তাহলে আমার খরচ হবে ১০০০ টাকা। জিজ্ঞাসা করলাম এটা কি ভাবে? ও বললো একবার কেইস খাইলে ৫০০ টাকা দিতে হয় গাড়ীর কাগজপত্র ছাড়িয়ে আনতে এবং সেই কেইসের মেমো দেখিয়ে ১৫ দিন বিনা ঘুষে রাস্তায় গাড়ী চালানো যায়। অর্থাৎ কেইস খাওয়ার পর কেইস মেমোটি দেখালে আর কাউকে ঘুষ দিতে হয় না এটা একটি বিশেষ সুবিধা। আর এই সুবিধাটি করে দিয়েছেন বিআরটিএ-র পরিবহণ নীতি এবং আর এর সুযোগ নিচ্ছেন এ রকম হাজারো লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভার। যা আমাদের মতো যাত্রীদের জন্য জীবন মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ। মাসুদরানা একজন শাররীক প্রতিবন্ধি হওয়া স্বত্ত্বেও ঢাকার ব্যস্ততম সড়কে যাত্রীদের প্রাণহাতে নিয়ে গাড়ী চালাচ্ছেন। যদিও সে তার শাররীক যোগ্যতা অনুসারে গ্যারেজে মেক্যানিকসের কাজ করতে পারে..কিন্তু অসাধু গাড়ী ব্যবসায়ীদের লোভের কারণে আজ তার হাতে ব্যস্ত নগরীর গাড়ী উঠে এসেছে। তার বাম হাত গিয়ারের কাজ নিয়ে যখন ব্যস্ত থাকে তখন অসুস্থ ডান হাতটি কিভাবে একটি মোড়ে স্টিয়ারিং ঘুরাবে একবার ভেবে দেখেছেন কি? মাসুদরানার ডান হাত পুরো একটি মোড় ঘুরানোর পক্ষে কোন মতেই উপযুক্ত না, কারণ তার হাতটি আগুনে পুড়ে কব্জির সাথে লেগে আছে…যেটির স্বাভাবিক মোভমেন্ট করা সম্ভব নয়।

ছবি:- “সুইস ক্যাব” কোম্পানীর এই গাড়ী চলে লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভার দিয়ে।

এটাই আমাদের দেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স নীতি এবং গরু, ছাগল চেনা ড্রাইভারদের বিনা পরীক্ষায় ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার দেশ। বিআরটিএ-র এই নীতি এবং ট্রাফিক পুলিশের ঘুষ প্রীতি আজ আমাদের দেশের সড়ক দূর্ঘটনাকে বৃদ্ধি করছে নিঃসন্দেহে। “সুইস ক্যাব” নামক প্রতিষ্ঠানটির ১০০/১৫০টি ক্যাব আছে এবং বেশীর ভাগ ড্রাইভাদের কোন বৈধ লাইসেন্স নেই। মাসুদরানার মতে শুধু “সুইস ক্যাব” না ঢাকার বেশীর ভাগ ক্যাব ড্রাইভাররা এই ভাবে ঢাকার ব্যস্ত সড়কে গাড়ী চালাচ্ছে। একবার ভেবে দেখুন কি ভয়ন্কর অবস্থায় আমাদের পরিবহণ ব্যবস্থায়। তাহলে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা আর দেবে কে?

ছবি:- মাসুদরানার গাড়ীর নাম্বার প্লেট।

দুঃখিত মাসুদরানা তোমার পঙ্গুত্ব নয়, আমাদের বিআরটিএ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার মানষিক পুঙ্গুত্বই আমাকে সব চেয়ে বেশী ভাবিয়ে তুলেছে। জানি তুমি চাকুরী হারালেও যেহেতু তোমার গাড়ী মেরামতের কাজ জানা আছে তুমি তা দিয়ে তোমার জীবিকা ভালভাবেই নির্বাহ করতে পারবে, কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কথাও তোমাকে একবার ভাবতে হবে একজন মানুষ হিসাবে, বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে।