ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

বিভিন্ন স্তরে জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম চালু থাকলেও ৮৩ শতাংশ প্রসবই হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সেবার বাইরে। অর্থাৎ অদক্ষ দাইয়ের হাতে। ফলে মাতৃ মৃত্যুর হার কমলেও ঝুঁকিতে থাকছেন প্রসূতি মা ও শিশু। শুধু তাই নয়, যারা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রসূতি সেবা নিতে যাচ্ছেন, তারাও সঠিক সেবা পান না এমন অভিযোগেরও অন্ত নেই। এসব বিবেচনায় নিরাপদ মাতৃত্ব বাংলাদেশে এখনও নিশ্চিত হয়নি।

প্রসূতি মা ও শিশুদের চিকিৎসার ব্যাপারে বিভিন্ন সময় সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বর্তন কর্মকর্তারা বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে আসছে। অবশ্য সরকার বলছে, যদিও অনেক প্রসূতি মা এখনও সেবা নিচ্ছেন না। তারপরও মাতৃ মুত্যু উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমেছে। তবে সরকারের সেবার পরিধি বাড়াতে হবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব হুমায়ুন কবীর টেলিফোনে বলেন, ‘সরকার একদিকে সেবার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে মানুষকে আরও সচেতন করার কাজ করছে। মানুষ সচেতন না হলে এক্ষেত্রে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য সরকার বেশ কিছু নতুন কার্যক্রম হাতে নিতে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘কার্যক্রমের জনবল যেমন বাড়াতে হবে তেমনি তাদের আরও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।’

২০১০ সালের বাংলাদেশের মাতৃস্বাস্থ্য সেবা ও মাতৃ মৃত্যু জরিপ অনুসারে, এক লাখ জীবিত শিশু জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাচ্ছেন ১৯২ জন মা। ২০০১ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৩২০। অন্যদিকে বেসরকারি হিসেবে মা হতে গিয়ে দেশে প্রতি ২০ মিনিটে মারা যাচ্ছেন একজন প্রসূতি। অর্থাৎ প্রতিবছর ১২ থেকে ১৫ হাজার প্রসূতির মৃত্যু হচ্ছে। প্রসূতি মায়ের মারা যাওয়ার সংখ্যা কমছে, বিষয়টি ইতিবাচক হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দশ বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা কমেছে মাত্র ১২৮। তাছাড়া আরও দুঃখজনক হচ্ছে, ১৯২ জন মা এখনও জীবন হারাচ্ছেন। তাছাড়া প্রায় ১৬ শতাংশ মা প্রসবকালীন জটিলতায় কোনো সেবা পান না। প্রায় একই চিত্র প্রসব পরবর্তী সেবার ক্ষেত্রেও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি জরিপের মাধ্যমে জানা যায়, অপুষ্টিজনিত মাতৃ মৃত্যুর ২০ ভাগই ঘটে রক্তক্ষরণ ও রক্তস্বল্পতার জন্য। যার অন্যতম কারণ আবার কিশোরী মাতৃত্ব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ এক জরিপ অনুসারে ৮৩ শতাংশ মা সন্তান প্রসব করান বাড়িতে অদক্ষ দাইয়ের হাতে। গত বছর আন্তর্জাতিক নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের নারীদের দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির হার প্রায় শতকরা ৩২। এছাড়া খাবারের অপর্যাপ্ততা, অপুষ্টি এবং সচেতনতার অভাবে ঘটছে প্রসূতি মায়ের মৃত্যু। প্রসূতি চিকিৎসক সূত্রে জানা যায়, মাতৃ মৃত্যু হার প্রতিরোধ করতে চাইলে, দেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে আরও বাড়াতে হবে। অপরদিকে প্রসূতিরা যাতে দক্ষ প্রসব সেবা পান, সেদিকেও নজর দিতে হবে। সেই হিসেবে বাল্যবিবাহ বা কম বয়সে বিয়ে বন্ধ করা দেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভব নয়। তাই যাতে কম বয়সে বাচ্চা না নেয়, সেজন্য তাদের সচেতন করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রজনন স্বাস্থ্য কর্মসূচির তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের সবকটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ৬২ জেলা হাসপাতাল, ৪০১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৭০টি মা ও শিশু কেন্দ্রসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম সেবা চালাচ্ছে।

এদিকে গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, যারা প্রসূতিসেবা নিতে বিভিন্ন হাসপাতালে আসছেন, তারা এবং তাদের সঙ্গে আসা পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়-স্বজনদের বেশিরভাগই সরকারের প্রসূতিসেবা কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন না। স্বাস্থ্য সচিব বলেন, ‘আমাদের জোর দিতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসূতিসেবার দিকে। তবে সব মাকেই যে সেবা নিতে হাসপাতালে যেতে হবে তেমনটি ঠিক নয়। তারপরও আমাদের জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম থেকে গর্ভবতী মায়েরা যাতে সুবিধা নেন, তার জন্য সামজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।