ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

সমস্যাটি নতুন নয়। প্রায় ৬০ বছর আগে সৃষ্ট। ১৯৫১ থেকে ২০১১ সাল। দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অবরুদ্ধ হাজারিবাগ সহ আশপাশের অনেক এলাকা। বিষিয়ে উঠেছে ১০ কিলোমিটার আয়তনের এই এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন। কি দিন? কি রাত? একটি সেকেন্ডও ট্যানারির দুর্গন্ধ মুক্ত নিশ্বাস গ্রহণ করতে পারেনা এই এলাকার মানুষ। অব্যবস্থাপনার ফলে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে শিকারীতলা ও কালুনগর এলাকা। পুরো এলাকার বেশি ভাগ স্থানেই নর্দমার ঢাকনা নেই। রাস্তার উপর স্তূপাকারে রয়েছে আবর্জনা। সড়ক দখল করেই চলছে গাড়ি থেকে চামড়া নামানোর কাজ। মানুষ সৃষ্ট চরম অব্যবস্থাপনার চরম দুর্ভোগ মেনে নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে এ এলাকার মানুষদের। কিছুই করার নেই তাদের। কে নালিশ করবে? বা নালিশ কার কাছে করবে? আর নালিশ করলেও বিচার করবে কে? পুরোপুরি নিরূপায় ও অসহায় হয়ে পরেছে হাজারিবাগ এলাকার মানুষ।

গত কয়েক দিন যাবৎ হাজারিবাগ ট্যানারি এলাকায় সরেজমিন যা দেখা গেল তা নিজের চোখে না দেখলে লেখাটি পড়ে বানানো কাহিনীও মনে হতে পারে। হাজারিবাগের প্রতিটি সড়ক, ট্যানারির ভিতর ও বাহিরসহ সকল স্থানেই চোখে পড়ে অবহেলা ও অবজ্ঞার সুস্পষ্ট ছাপ। শেরে বাংলা নগর রোডে অধিকাংশ নর্দমায় ঢাকনা নেই। ট্যানরিগুলোর বর্জ্য ও পঁচা চামড়ার তীব্র দুর্গন্ধ নাকে আসে। রাস্তার উপর স্তুপ আকারে পড়ে আছে পশুর পরিত্যাক্ত চামড়া। আশপাশের দোকানীদের কাছ থেকে জানা গেল, গত কয়েক দিন ধরেই এগুলো স্তুপ আকারে পড়ে আছে। ডিসিসির এই এলাকার ড্রেনগুলোর গভীরতা প্রায় ৫ ফিট। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে এগুলোকে পরিষ্কার করা হয় না। ফলে কঠিন বজ্য ও কাঁদায় পরিপূর্ণ হয়ে গভীরতা কমে এসেছে প্রায় এক ফিটেরও কমে। ফলে পাঁচ ফিট উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ট্যানারির বর্জ্যের দুর্গন্ধে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ট্যানারির দুর্গন্ধে সব চেয়ে বেশি সমস্যা হয় এই এলাকার শিক্ষার্থীদের। ৪৮ নং হাজারিবাগ ওয়াডেটিতে প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে ১১টি। মাদ্রাসা ১২। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীরাও দুর্গন্ধের শিকার। একজন অবিভাবক জানান, ’ আমরা নিম্ন বিত্ত মানুষ। কোনো রকমে দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকি। আমাদের সন্তানদের অসুবিধার চিত্র কারো নজরে পড়েনা। টাকা নেই তাই এই স্কুলেই ভর্তি করিয়েছি। এখন রুমন ক্লাস টু তে পড়ে। দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য বছরের বেশি ভাগ সময় ছেলে অসুস্থ থাকে। জানি না ভবিষ্যৎ কি? তবে এখানে লেখা পড়ার কোনো পরিবেশ নেই।’ সালমা আক্তার নামে এই অভিভাবকের সাথে কথা বলার সময় তার মুখে অসহায়ত্বের ছাপ ছিল। অবশেষে সন্তানকে কোলে নিয়ে কেঁদেই ফেললেন তিনি। তবে সালমার মতো এই এলাকার অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানই এই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই একই সমস্যা। এই ওয়ার্ডের ৩০টি মসজিদ ও ৬টি মন্দিরেও ধর্মপ্রাণ মানুষেরা দুর্গন্ধ থেকে রেহাই পায় না। এছাড়াও ৪৭ ও ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের অনেক এলাকা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এই দুর্গন্ধের হাত থেকে রেহাই পায়নি। অসহনীয় দুর্গন্ধে এই এলাকাতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান অনেক কষ্ট কর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে প্রাসাদের ন্যায় গড়ে ওঠা ট্যানারিগুলোর ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় ঠিক মতো মনোনিবেশ করতে পারেনা বলে জানালে মরিয়ম আইডিয়াল একাডেমি এন্ড হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শেখ আব্দুছ ছাত্তার। ট্যানারি এলাকার বসবাস করা রিক্সা চালক, ট্যানারি শ্রমিকসহ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের একমাত্র অবলম্বন এই প্রতিষ্ঠানটির ছাত্র-ছাত্রীদের পরিবেশ দুষণ ও দুর্গন্ধের কারনে বছরের অনেক সময়ই অসুস্থ থাকতে হয়। তবে প্রধান শিক্ষক জানান, আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। তবুও কিছুই করার নেই। এ সকল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সকল ত্যাগ শিকার করছি। তবে হাজারিবাগ এলাকার শিকারি তলা ও কালুনগর এলাকা দুটি পুরোপুরি বসবাসের অযোগ্য। কালুনগরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ট্যানারির বর্জ্যের স্রোত প্রবাহ। এই এলাকায় পানিতে, বাড়ির দেয়ালে এমনকি রাস্তায়ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পশুর হাড়ের পোকা। দিনের পর দিন কেবল এগুলো কেবল বংশ বৃদ্ধি করেই চলেছে। নিধনের জন্য কেউ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ঠিক এমনি পরিবেশে কাজ করছেন রানা। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর। মাত্র ৭ দিন হলো কাজে যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ২ দিনই অসুস্থ ছিলেন। পা ও হাতের চামড়া পুরোপুরি ঝলসে গেছে। তবুও উপায় নেই। টাকার প্রয়োজন। সব কিছু সহ্য করে কাজ করতে হবে।

রানার মতো এমন অসহায় এলাকার স্থায়ী বাসিন্দারা। বৃষ্টিতে চলাফেরা করতে নানান রোগে ভুগছেন। তবে এই এলাকায় গ্রীল, রড, টিন কোনোটিই বেশি দিন টেকসই করেনা। মরিচা পরে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষোভ ও পরিতাপের সাথে এমটি জানালেন এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা জাবেদ। তিনি বলেন, তিন বছরে একাধিক বার ঘরের চালার টিন কিনতে হয়েছে তাকে। তবে টিন, রড নষ্ট হবার কারণ সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ জানান, ট্যানারি এলাকা থেকে সব সময়ই কারখানাগুলোর ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। চামড়া প্রসেসিং করতে যে সকল উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার হয় সেগুলো পানিতে মিশে জলীয় বাষ্প হয়ে টিন বা লোহার সাথে দ্রুত বিত্রিয়া সম্পন্ন করে। ফলে এই এলাকার লোহা বা টিন জাতীয় জিনিস দ্রুত নষ্ট হয়।

***
ফিচার ছবি: Bruno Valentin and Julien Pannetier/Zeppelin/LightMediation