ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

ঘন ঘন সড়ক দূর্ঘটনায় আতঙ্কিত সারা দেশের মানুষ। মূহূর্তেই ঘটতে পারে দূর্ঘটনায়। যেতে পারে প্রাণ। এই দুশ্চিন্তায় নিশ্চিন্তে কেউ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। চলাচলের নেই বিকল্প কোনো ব্যবস্থা। ফলে বাধ্য হয়েই নিজের জীবনকে তুলে দিতে হয় অন্যের হাতে। গন্তব্যে পৌঁছাতে। কিন্তু যারা গন্তব্যে পৌঁছায় তারা সৌভাগ্যবান বটে আর পৌঁছাতে পারেনা তারা হতভাগা। জীবনে শেষ বারের মতোও দেখতে পারে না আপন জনদের প্রিয়মুখ। কোনো না কোনো রাস্তার ধারে, নয় তো ডোবায় আর না হলে বাঁচার প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকার পরেও প্রাণ হারাতে হয় কোনো অচেনা হাসপাতালের বেডে! কত ঘটবে আর সড়ক দূর্ঘটনা? আর কত মানুষকে মরতে হবে? কত জনকেই বা বরণ করতে হবে পঙ্গুত্ব? এ সকল প্রশ্নের উত্তর কারোই নেই জানা।

দূর্ঘটনা সংক্রান্ত বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের গবেষনা প্রতিষ্ঠান অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি বছরে মারা যায় প্রায় ১৫ হাজার, পঙ্গু হয় লক্ষাধিক। এআরআই’র পরিচালক হাসিব মোহাম্মদ এহসান জানান, প্রতিদিন সড়ক দূর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। ঠিক এই সময়ে সরকারের উচিৎ কার্যকরী ব্যবস্থাগ্রহণের মাধ্যম্যে দূর্ঘটনা কমিয়ে আনা। তিনি বলেন, যেহুতু একবারে সড়ক দূর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। তাই কর্তৃপক্ষের একটি লক্ষ নির্ধারণ করা। গত বছরে যতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে তার থেকে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমিয়ে আনা তাহলে এর ক্ষতির পরিমানও অনেকটাই কমে আসবে। তবে কি ভাবে সড়ক দূর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরিবহণের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল মানুষকেই ব্যপক সচেতন হতে হবে। এই মাধ্যমে একটু সামান্য ভুল মানেই সারা জীবনের কষ্ট, দুঃখ। তবে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অদক্ষ চালক, রাস্তার গাণিতিক ত্রুটি ও যাত্রীদের অসচেতনতা।

ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশন (ডাব্লুএইচও) এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতি বছর সারা বিশ্বে সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায় প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ আহত হয় প্রায় ৫ কোটি মানুষ। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিশ্বেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সড়ক দূর্ঘটনায় সব চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট অন রোড ট্রাফিক ইনজুরি প্রিভেনশন-২০০৪ এর মতে বিশ্বে প্রতি বছর রোড এক্সিডেন্টে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা যথাক্রমে ১.২ এবং ৫০ মিলিয়ন যার ৭০% ঘটে উন্নয়নশীল দেশে। বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর হিসাব অনুযায়ী ১৭ বছরে দূর্ঘটনা প্রায় ৭০ হাজার ৬’শ, নিহত ৫০ হাজার ৬’শতাধিক মানুষ। তাদের তথ্যানুযায়ী জুন ২০১০ পর্যন্ত দেশে মোট ১৪ লক্ষ ২৩ হাজার ৯৮২টি রেজিস্টার্ড গাড়ির বিপরীতে বৈধ লাইসেন্সের সংখ্যা ১০ লাখ (অবৈধ লাইসেন্স প্রায় ৫ লাখ)। তবে অবৈধ লাইসেন্স ব্যবহৃত এই গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না তার কোনো জবাব পাওয়া যানি বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০ বছর আগের রিকন্ডিশন গাড়িগুলো বাজেয়াপ্তের জন্য মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তবে তা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়ে মুখ খুলেনি মন্ত্রণালয়ের কেউ-ই। নিরাপদ সড়ক চাই এর চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ভোরের ডাককে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সর্ব প্রথম আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। ১৯৯২ সালের পাস হওয়া সংবিধানের ২৭৯ ধারায় সড়ক দুর্ঘটনার সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছর জেল, আর জরিমানা মাত্র এক হাজার টাকা। যা যথেষ্ট নয়। চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ট্রেনিং স্কুলের মাধ্যমে শিক্ষিত করতে হবে। প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো চালকই যেন ড্রাইভিং লাইসেন্স না পায় বা গাড়ি চালাতে না পারে সে দিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। সড়ক দূর্ঘটনা রোধে কি করণীয় বা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিষয়গুলো জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক এ অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। বতে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, কোনো ধরনের লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই প্রায় ৩৪ হাজার ড্রাইভার নিয়োগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিআরটিএ। যদি তা করা হয় তাহলে এটি হবে একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। এ সমস্ত অশিক্ষিত চালকের কারণেই দেশে দূর্ঘটনা বেড়েই চলেছে।

দুর্ঘটনার কারণগুলোর দিকে আরও নজর দিলে দেখা যায়- চালকের দক্ষতার অভাব, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, জনসাধারণ ও চালকের ট্রাফিক আইন না মানা, রাস্তাঘাটের পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাব, চালাকের গতিসীমা না মানা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, জনসাধারনের যত্রতত্র ও যখন তখন রাস্তা পার হওয়া, ফুট ওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা, অপরিকল্পিত নগায়ন, ডেসা ওয়াসা টেলিফোন লাইন স্থাপনে সমন্বয়হীনতা, অপর্যাপ্ত অপরিকল্পিত ও নিম্মমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তা নির্মান, রাস্তায় ডিভাইডারের অভাব, গাড়ি রাস্তায় বের করার আগে সঠিকভাবে ত্রুটি পরিদর্শন না করা, সময় নিয়ন্ত্রণ করে ট্রিপ মারার জন্য দ্রুত গাড়ি চালানো ইত্যাদি।

বিশেষজ্ঞদের মতে সড়ক দুর্ঘটনার ৪০-৪২টি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। তন্মধ্যে ৩৫টি কারণের প্রতিকার পেতে পয়সা নয় সদিচ্ছাই যথেষ্ট। অথচ সেই সদিচ্ছা টুকুই আমাদের গাড়ি চালকদের নেই।

সড়ক দূর্ঘটনা রোধের কল্পে পদক্ষেপ নিতে না পারলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে এই সংখ্যা অর্ধেক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে মানুষ মৃত্যুর তৃতীয় বৃহত্তম কারণে পরিণত হবে রোড এক্সিডেন্ট। বাংলাদেশ সড়ক দূর্ঘটনায় বছরে মৃত্যু ১২ হাজার, পঙ্গু হয় প্রায় ৩০ হাজার।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছরে গড়ে ঘটেছে ৪ হাজার ১’শ ৫২টি দূর্ঘটনা। প্রতিটি দূর্ঘটনায় গড়ে ২ লাখ টাকা ক্ষতি হলে প্রতি বছরে ক্ষতি হয় ৮৮ কোটি ০৫ লক্ষ ৮৮ হাজার ২’শ ৩৫ টাকা। ১৭ বছরে ক্ষতি হয়েছে ১৪১২০০০০০০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশে ১৯৮০ সালের চেয়ে ২০০০ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৪৩ শতাংশ আর একই সময়ে সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু ৪০০ শতাংশ বেড়েছে।