ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আজ বাবা দিবস। কি লিখবো ভেবে পাচ্ছি না খুব কষ্ট হচ্ছে। অনেক কষ্ট…. আজ বুঝতে পারি তুমিই আমাদের অনন্ত অন্তিম কান্না, ধীরে ধীরে থেমে যাওয়া নিঃশব্দ বাঁশি, তুমিই আমাদের শেষ অশ্রু জল।”
প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালবাসা কোন দিবসের উপর নির্ভর করে না। তবুও দিবসগুলো আমাদের অন্তত কিছু ভাললাগা স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, কিছু অমূল্য সময়কে মনে করিয়ে দেয়, যা কেটেছে ঐ প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। বাবা দিবস বলে কখনও কোন দিবস পালন করিনি। বিশেষ কোন আয়োজন হয়নি। বাবাকে গলা জড়িয়ে বলা হয়নি, “বাবা তোমাকে ভালবাসি”।

সৎ, পরিশ্রমী এবং দায়িত্ববান ছিলেন আমার পিতা। অভিজ্ঞতা তাকে অনেক বেশী বাস্তববাদী হতে সাহায্য করেছে। হতাশা তাকে কখনও বিষন্নতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়নি। দীর্ঘজীবি, দৃঢ়চেতা,সুদর্শন ও দক্ষ পুরুষ ছিলেন আমার পিতা।

কোরানিক জ্ঞান ও হাদিসের ব্যাখ্যার উপর তার পান্ডিত্য ও দখল ছিল ঈর্ষনীয়। পৃথিবীতে সম্ভবত এমন কোন পেশা নেই যেখানে পেশার শুরু থেকে আমৃত্যু সহাবস্থানে থাকা যায়। পরিবারের চেয়েও অধিক সময় কাটে ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে। সেই পেশায় থেকে আমার পিতা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে পেশা চালিয়ে গেছেন। মৃত্যুর পর মানুষের নশ্বর দেহ মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু কৃতির মধ্য দিয়ে মরনের পরেও অমরত্ব লাভ করা যায়। আমার পিতা সেটাই নিজের পেশায় সৎ থেকে দেখিয়ে গেছেন। ন্যায়পরায়ন ও মহৎ চিন্তা ধারার ব্যক্তি বলেই তিনি নিজের এবং সন্তানদের জন্য আর্থিক কিছু চিন্তা করে যাননি। তিনি নিজেই বলতেন তোমরা একজন আদর্শবান পিতার ভাল সন্তান। এই পরিচয় একজন সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রায় সময় বলতেন আমার জীবনী শক্তি প্রায় শেষ হবার পথে। আমার মৃত্যুর পর তোমরা আমাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখবে। বছরের পর বছর অতিক্রান্ত হবে। তবুও আমার পিতা বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে। গত ৯ ই ফেব্রুয়ারী ২০১৪ ইং শিক্ষককূলের একজন উজ্জল নক্ষত্রের প্রস্থান ঘটল। যে মাটিতে আমার পিতার জন্ম সেই মাটিতে আমার পিতা ফিরে গেলেন। “তোমার র্কীতির চেয়ে তুমি যে মহৎ/তাই তব জীবনের রব/পশ্চাতে যায়/ কীর্তিরে তোমার/” জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্ক অমোঘ। দুনিয়ার কোন শক্তিশালী রাজন্যবর্গ ও দ্বিগি¦জয়ী বীর কেউই মৃত্যুকে রোধ করতে পারেননি।
আমার বাবাকে ছোটবেলা থেকে দেখেছি সমাজ, সভ্যতা, ধর্মীয় জ্ঞান থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু আমাদের সকল ভাইবোনকে হাতে ধরে ধরে শেখাতেন। সময় খুব কম পেতেন, প্রতিদিন আব্বু যখন উনার স্কুলের উদ্দেশে ঘর থেকে বের হতেন, আমরাও স্কুলের জন্য রেডি হতাম। আবার যখন বাড়ি ফিরতেন তখন আমরাও স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতাম। আব্বা আবার বিকেলে বাজারে যেতেন। অনেক সময়ই আব্বুর ঘরে ফেরার আওয়াজ পেলে আমি জেগে উঠতাম। যে কোন বিশেষ দিন, যেমন ২১ ফেব্রুয়ারী, ১৬ ডিসেম্বর, শবে বরাত, ইত্যাদি দিনগুলোতে আব্বা বড় মাছ, মাংস নিয়ে আসতেন। আদর এবং শাসনের দ্বৈত রুপ দেখেছি আমার বাবার মধ্যে।

 

Screenshot 2016-02-07 23.45.16
আমার বাবা ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় তিনি সাংগঠনিক কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সবাই ধরে নিয়েছিল যে আব্বা আর জীবিত ফিরবেন না। কিন্তু তিনি ফিরেছিলেন বিজয়ীর বেশে। আমার দাদার কাছে শুনেছি, আব্বা খুব রাগী ছিলেন ছোটবেলা থেকেই। কোথাও কোন অন্যায় উনি সহ্য করতেন না। মৃত্যুকে কখনও ভয় করতেন না। অনেক অস্রধারী সন্ত্রাসীকে উনি খালি হাতে পিটিয়েছেন। জীবনে উনি কোন নেশা করেননি। হারাম উপায়ে উপার্জন থেকে সর্বদা দূরে থেকেছেন। ছোটবেলা থেকেই প্রচুর পরিশ্রম করেছেন পরিবারের জন্য। ছোট ভাইকে, বোনদেরকে মানুষ করেছেন, নিজের পায়ে দাড়াতে শিখিয়েছেন। উনার সততা এবং পরিশ্রমের জন্য উনি এখনও আমাদের গ্রামের বিভিন্ন জেনারেশনের কাছে আদর্শ স্বরুপ।
আমাদের সকল ভাইবোনকে আব্বা সেই সব কিছুই না চাইতে দেবার চেষ্টা করেছেন, যেটা উনি ছোটবেলায় পাননি। আব্বা মেধাবী ছাত্র ছিলেন, কিন্তু পারিবারিক কিছু কারনে গ্রাজুয়েশন করতে পারেননি। কিন্তু আমাদেরকে উনি লেখাপড়ার কোন বিষয়ে কখনও কমতি রাখেননি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, ধন সম্পদ মানুষকে বড় করে না, মানুষ তার মনের সমান বড়। সবসময় সবাইকে সমান দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। মানুষের যে কোন সমস্যায় এগিয়ে যাওয়াতে আব্বা সবসময় উৎসাহ দিতেন । মাঝে মাঝে আমি মনে মনে ভাবি যে, আমি কি আব্বার মত হতে পারব? পরমুহুর্তে চিন্তা আসে, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমি পারব না, এটা হতেই পারে না।
আপনি আমাদের গর্ব আব্বা। কোন বিশেষ দিনের জন্য আপনার প্রতি শ্রদ্ধা বরাদ্দ থাকবে না। আপনি আমাদের মনের মণিকোঠায় থাকবেন সর্বক্ষণ। সামনাসামনি হয়ত কখনও বলা হয়নি। কিন্তু পরোক্ষ ভাবে বলছি, “আব্বা, আপনাকে আমি খুব ভালবাসি।“

আব্বা আপনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আপনার অনেক কথা-ই হয়তো রাখতে পারিনি। কথা দিচ্ছি আব্বা জীবনে কখনো আপনার আদর্শের বাহিরে চলবো না, না, না, না।।