ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

 

সিরিয়াকে বুঝতে, প্রাক গৃহযুদ্ধ থেকে যুদ্ধোত্তর আসাদ শাষন -১

সিরিয়ার স্বাধীনতা

যদি শুধুমাত্র শিক্ষিত সিরিয়ানদের কথাও ধরা হয় তাহলেও দেখা যায়, সিরিয়ান জাতীয়তাবাদ নাগরিক আবেগের নিমিত্তে সন্তুষ্টজনক হলেও সেটা আসলে কোন সাংগঠনিক নীতি হিসেবে গ্রহনযোগ্য উপাদান স্বরুপ প্রমানিত হয় নি। যার ফলে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নিয়ন্ত্রনের বিষয়টি সামাজিক প্রেক্ষাপটে উদ্দিপনার সৃষ্টি করলেও নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রনের বিষয়টা সিরিয়ান নাগরিক সমাজ সম্পুর্ন ভাবে উপলব্ধি করতে ব্যার্থ হয়।
ভিনদেশি ফ্রান্স সৈন্যদের সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করার পরের বছরগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থানের স্বৈরাচারী নেতারা সিরিয়ান জাতীয়তাবাদ নিয়ে বাগড়ম্বর পুর্ন বক্তৃতা দিয়ে চললেও সত্যিকার অর্থে তাদের সমর্থক গোষ্ঠি তথা সমগ্র সিরিয়ানদেরকেই একটি সুন্দর, শান্তিপুর্ন, প্রগতিশীল জীবন এনে দিতে ব্যার্থ হয়।
অবেশেষে ১৯৫৮ সালে দেশের একমাত্র শক্তিশালী, গতিময় ও সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে বিবেচিত সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেশটিকে প্রতিবেশী দেশ মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসেরের হাতে তুলে দেয়। সিরিয়ান নাগরিক সমাজে গামাল প্রশংসিত ও বিশ্বাসযোগ্য আরব নেতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। উল্লেখ্য গামাল আব্দেল নাসের মিশরীয় সমাজকে তখন এক নতুন প্রগতির ছোঁয়ায় নিয়ে আসতে সফল হন। তাঁর প্রেসিডেন্সিতে মিশরের সাধারন মানুষ শিক্ষা, আবাসন ও স্বাস্থ্য খাতে এমন পরিসেবার আওতায় চলে আসে যা তাদের জীবনে এর আগে আর কখনই ঘটেনি। সিরিয়ানরা এই ভেবে বিশ্বাস ও আশায় বুক বাঁধে যে, মিশর যে কিনা বরাবরই আরব বিশ্বে সর্দার হিসেবে বিবেচিত ও গামাল আব্দেল নাসের যাঁর হাতে মিশর আধুনিক মিশরে পরিনত হচ্ছে তাদেরকে একটা স্থিতিশীল জীবনের দিশা দেবে। সুতরাং পরবর্তী সাড়ে তিন বছরের জন্য সিরিয়া ইউনাইটেড আরব রিপাবলিকের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
এদিকে সিরিয়ানরা তাদের একটি উন্নত ও সুসংগঠিত জীবনের আশায় নিজেদেরকে মিশরের হাতে সঁপে দিলেও অপরপক্ষে গামাল আব্দেল নাসের আদতে সিরিয়া সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। যদিও গনমাধ্যমের দৃষ্টিতে বিষয়টি এমন ছিল না। সেটা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন নাসের সেনাবাহীনিকে রাজনীতি থেকে প্রত্যাহার ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গনভোটের আয়োজন সহ এমন কিছু অগ্রহনযোগ্য শর্তাদি উল্লেখ করেন যাতে মিশরের সাথে একীভুত থাকা সিরিয়ান সেনা নেতৃত্ব ভিন্নমত পোষন করেন। ফলস্বরুপ ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং ১৯৬১ সালে সিরিয়ানরা পুনরায় তাদের নিজস্ব সংস্থানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একজন সিরিয় হওয়ার অর্থ কি হতে পারে তারা সেই মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি হয়।
যারা মুলত সিরিয় নাগরিক হিসেবে নিজেদের পরিচিতি পায় তারা বেশিরভাগই ছিল আরবী বলা সুন্নি মুসলমান সম্প্রদায়। যেহেতু ঐতিহাসিক ভাবে বৈশ্বিক সফলতা আরবী বলা মুসলিম সেনাবাহিনী বা আমলাতন্ত্রের হাত ধরেই আসতে থাকে সেহেতু সিরিয় সমাজে আর সমস্ত এশীয় সাম্রাজ্যের অধিবাসীদের মতই ইসলাম ধর্ম গ্রহন ও আরবী ভাষায় কথা বলা তাদের কাছে একটি বিশেষ আকর্ষনীয় বিষয় ছিল। যারা কিনা ইতিমধ্যেই এই সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি তাদের কাছে বিষয়টি তখনও পর্যন্ত আকর্ষনীয়ই বিবেচিত হয়ে আসছিল। তখনকার সিরিয় সমাজের প্রতি ১০ জনের ৭ কিংবা ৮ জনই ছিল আরব মুসলমান। ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদের প্রভাবে তখন সিরিয় পরিচয়ের সংজ্ঞা হিসেবে আরব মুসলমান হয়ে ওঠায় ছিল সিরিয়দের মুখ্য বিবেচ্য বিষয়।
এখানে ব্যাতিক্রম ছিল প্রতি ১০ জনের বাকি ২ কি ৩ জন যারা বিষয়টিকে একই দৃষ্টিকোন থেকে দেখছিল না। তারা পূর্ববর্তী অটোম্যান সাম্রাজ্যের সময়কাল থেকেই স্বয়ংসম্পুর্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বসবাস করে আসছিল। তারা বেশিরভাগ সিরিয় নগরী ও শহরগুলোর কোল ঘেঁষে তাদের বসতি গড়ে তুলেছিল।
জাতীয়তাবাদীরা এই বৈচিত্রতাকে তাদের প্রাথমিক দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে এবং পুরো সিরিয় জনগোষ্ঠিকে একটি একক রাজনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোতে একত্রিত করন কে তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহন করে।
কিন্তু জাতীয়তাবাদীরা মতাদর্শগত কারনে গভীরভাবে বিভক্ত ছিল। প্রধান ইসলামিক আন্দোলন এর নেতৃত্বদানকারী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড মনে করত জাতি হিসেবে সিরিয়া পরিচিত হবে শুধুমাত্র আরব সুন্নি (অথবা গোঁড়া) মুসলমানদেরকে নিয়ে। অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যারা পূর্ববর্তী অটোম্যান সাম্রাজ্যের আমল থেকেই রক্ষিত বা আশ্রিত সম্প্রদায় হিসিবে পরিগন্য হয়ে আসছে তারা ছাড়া অন্য কোন মুসলমান গোত্রের বা সম্প্রদায়ের কোন স্থান সিরিয়াতে হবে না। এই ধারনা ও বিশ্বাস কে নীতি হিসেবে নিয়েই তারা লড়াই করে আসছিল।
আরো রক্ষণশীল, সমৃদ্ধিশালী, এবং পশ্চিমা জাতীয়তাবাদীদের বিশ্বাস ছিল যে, না, কোন ধর্মীয় বিষয় বস্তুর উপর ভিত্তি করে নয়, একটি জাতিসত্তা নির্মিত হতে হবে একটি এলাকার ভিত্তিতে। যেটা একক রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদ(আরবীঃ বাতেনিয়া) হিসেবে পরিচিত। মুলত সিরিয়া রাষ্ট্র নির্মাণে এই একক রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদই মুখ্য ভুমিকা পালন করে।
দুঃখজনক ভাবে জাতীয়তাবাদীদের এই অংশও জাতি হিসেবে সিরিয়দের সফলতায় নেতৃত্ব দিতে ব্যার্থ হয়। তাদের ব্যার্থতা অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের পুনঃসঙ্গায়নের পথ খুলে দেয়। একক রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদের পথ থেকে সরে এসে সমগ্র আরব (আরবীঃ কওমিয়া) বা লোক জাতীয়তাবাদের যে প্রাচীন ধারনা সেই কওমি জাতীয়তাবাদ এর ধারনা সামনে আসে। সিরিয়ার বাথ পার্টি এই ধারনা জনসম্মুখে নিয়ে আসে। তাদের মতে সিরিয়াকে একটি আলাদা জাতি রাষ্ট্রা হিসেবে চিন্তা না করে এটিকে সমগ্র আরব দুনিয়ার অংশ হিসেবে এবং ঘরোয়া ভাবে নিজেদের একটি একত্রিত, সুসংগঠিত ও ধর্মনিরপেক্ষ এবং অন্তত আংশিকভাবে পশ্চিমা রাষ্ট্র হিসেবে চিন্তা করতে জনগনকে উৎসাহী করার প্রয়াস শুরু হয়। বাস্তবে এটি ছিল খুবই কঠিন একটা কাজ। কেননা প্রভাবশালী মুসলমান সম্প্রদায় শুরুতে ফ্রেঞ্চ অপশাষন ও পরবর্তীতে ঘরোয়া দাঙ্গা হাংগামা এবং পুনরায় বৈদেশিক হস্তক্ষেপের কারনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে সিরিয় ইহুদিদেরকে প্রকৃত ও সম্ভাব্য অবিশ্বস্ত এবং পক্ষত্যাগী হিসিবে অভিহিত করে।
এদিকে সিরিয় রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়াতে ও প্রভাব বিস্তার করতে শক্তিশালী ও আমেরিকান মদদপুষ্ট ইসরায়েল পুরো বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়কালে ভুমিকা রাখতে থাকে।
১৯৪৮ সাল থেকে সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে নিয়মিত যুদ্ধ শুরু হয়। এটা এমন একটা সময়ে যখন কিনা এই দুই রাষ্ট্র তাদের পুর্ন স্বাধীনতাই অর্জন করে উঠতে পারেনি। তারা একাধিকবার যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটায় ১৯৬৭ সালে ও ১৯৭৩ সালে। সীমান্ত অঞ্চলে সংঘর্ষ, সাময়িক যুদ্ধ বিরতি, অঘোষিত হানাহানি দুই দেশের মধ্যে লেগেই থাকে। ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরাইল সিরিয়ার প্রায় ১২০০ স্কয়ার কিঃমিঃ (৪৬০ স্কয়ার মাইল) যা গোলান হাইটস নামে পরিচিত নিজেদের দখলে নিয়ে রাখে। যেটা পরবর্তিতে ১৯৮১ সালে নিজেদের রাষ্ট্রে সংযুক্তি হিসেবে ঘোষনা দেয়। যদিও তাদের এই ঘোষনার বৈধতা দিতে আমেরিকা ও অন্যান্য রাষ্ট্র অস্বীকার করে তবুও ইসরায়েল তাদের ২০ হাজার নাগরিক কে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করায়।
এদিকে গোপন শান্তি আলোচনা অব্যাহত থাকে যদিও তা কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ঘোষনা করা হলেও দুই দেশের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধ এখনো পর্যন্ত চলমান।

আসাদ শাষন

সিরিয় রাষ্ট্রের অনুভুত দুর্বলতা এবং সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশৃংখলার এক ধরনের প্রত্যুত্তর হিসেবেই ১৯৭০ সালে প্রথম আসাদ শাষন প্রতিষ্ঠিত হয়। হাফেজ আল আসাদ, বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পিতা এই শাষন প্রতিষ্ঠা করেন। হাফেজ আল আসাদ যার জন্ম একটি সাধারন সিরিয় পরিবারে এক সময় ছাত্র নেতা হিসেবে বাথ পার্টিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি সিরিয়ান এয়ার ফোর্সের লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে সিরিয়ার সামরিক অভ্যুত্থান যার মাধ্যমে সিরিয়ার বাথ পার্টি দেশটির উপর সামরিক নিয়ন্ত্রন আনতে সক্ষম হয় আসাদ কে সিরিয়ান এয়ার ফোর্সের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়। ১৯৬৬ সালের ঘটা আরেকটি অভ্যুত্থানের পর তিনি সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ঠিক এই সময় থেকেই তিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সাধারন সিরিয় নাগরিকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে আসাদ তৎকালীন সিরিয় সেনাবাহিনীর প্রধান সালাহ জাদিদ কে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করে সিরিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহন করেন এবং পরের বছর ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। আসাদ ক্ষমতায় আসার পরপরই সিরিয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে জোর দেন এবং সিরিয়রা তাদের জীবনের সর্বপ্রথম আধুনিক স্কুল, সড়ক যোগাযোগ ব্যাবস্থা ও হাসপাতাল এর পরিসেবার আওতায় আসেন। এ সমস্ত জনকল্যান মূলক পদক্ষেপ আসাদ সরকার কে স্থিতিশীল করে তোলে। আসাদ সোভিয়েত আদলের সিঙ্গেল পার্টি পুলিশি রাষ্ট্রের ছক অনুসরন করেন।
আসাদ পরিবার মুলত আলাউয়ি(ওরফে নুসাইরি) সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে উঠে আসে। যাদের সংখ্যা প্রতি ৮ জন সিরিয় নাগরিকে ১ জন ও প্রতিবেশী তুরস্ক ও লেবননে প্রতি মিলিয়নের এক চতুর্থাংশ।
আলাউয়িরা যারা মুলত মুসলমান শিয়া সম্প্রদায়ের একটি উপধারা নিজেদেরকে ইহুদিদের মত ঈশ্বর কতৃক নির্বাচিত মনে করে। পক্ষান্তরে গোঁড়া মুসলমানরা তাদের কে ধর্মদ্রোহী হিসেবে বিবেচনা করে। পূর্ববর্তী অটোম্যান জামানার বহুতত্ব বাদে এটা কোন ধর্তব্য বিষয় ছিল না। কিন্তু যেহেতু সিরিয়রা একটা নিজস্ব পরিচয়ের জন্য লড়াই করছিল ও সামাজিক বৈষম্যকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করেছিল এবং সংখ্যালঘুদের বিদেশীদের সাথে আঁতাতের ভয়ে ভীত ছিল সেহেতু সকল সংখ্যালঘুদের তা হোক আলাউয়ি বা ইহুদি বা খৃষ্টান তাদের সবাইকেই সমান ভাবে বিপদাপন্ন করে তুলেছিল।
সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষ বাথ পার্টি আসাদের জন্য ছিল একটি স্বাভাবিক পছন্দ। একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে তার ও তার মত আরো অনেকের আবির্ভাব এর বিষয়টাকে কাটিয়ে ওঠার উপায় ও সিরিয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অনৈক্য সমাধানের দিক নির্দেশনা খোঁজার বিষয়টি পার্টি আসাদের সামনে তুলে ধরে। সময়ের পাতা উল্টিয়ে দেখা যায় আসাদ সাগ্রহে তা কাজে লাগায় এবং অবশেষে নিজেই পার্টির নেতা হয়ে ওঠে। ফলে সিরিয়া বিষয়ক এর পরবর্তী ঘটনাগুলো বুঝতে আমাদের এই বাথ পার্টির প্রতিও নজর দেয়া দরকার।
পুনরূজ্জীবন বা পুনরুত্থান (আরবীতে বাথ) পার্টির উৎস ফ্রান্সে। দুইজন তরুন সিরিয়ান একজন খৃষ্টান ও অপরজন একজন সুন্নি মুসলমান যারা তখন প্যারিসে লেখাপড়া করছিল একই সাথে ফ্রান্সের জাঁকজমকে আকৃষ্ট হয় ও সিরিয়ার দুর্বলতা দেখে আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তারা একই সাথে ফ্রান্সের মত হয়ে উঠতে এবং ফ্রান্সকে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করতে চাইত। তারা দুজনেই বিশ্বাস করত তাদের জাতির ভবিষ্যত, ঐক্য ও সমাজতন্ত্রের মধ্যেই নিহীত।
মাইকেল আফলাক ও সালাহ্‌ বিতার এর মতে পরাজয়ের শক্তিগুলো ছিল ফ্রান্সের নিপীড়ন, সিরিয়দের পশ্চাত্পদতা এবং একটি রাজনৈতিক শ্রেনী যারা কিনা সময়ের দাবিকে পরিমাপ করতে অক্ষম।
সর্বপোরি যে কোন মুল্যে অনৈক্য কে পরাস্ত করা। ধনী ও গরিবের মধ্যেকার ফাঁক ও মুসলমান আর সংখ্যালঘুদের মধ্যেকার ফাঁক পুরন করতে একটি পরিবর্তিত সংস্করনের সমাজতন্ত্র ও একটি পরিবর্ধিত ধারনার ইসলাম দ্বারা সেতুবন্ধন গড়ে তোলার চেষ্টা তারা প্রস্তাব করেন। তাদের দৃষ্টিকোন থেকে ইসলাম কে ধর্মীয় ভাবে বিবেচিত না হয়ে বরং রাজনৈতিক ভাবে এবং আরব জাতির প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হতে হবে। তাই যে সমাজব্যাবস্থা তৈরি করতে তারা ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তারা দাবি করেন সেই সমাজ হবে আধুনিক, অন্যান্য আরো বিষয়ের সাথে মহিলাদের সমতা, ধর্মনিরপেক্ষ ও ঐতিহ্যগত জাতিগত ধারনাকে অগ্রাহ্য করে আরব সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।
সংক্ষেপে তারা তাই প্রস্তাবনা করেন যা ছিল ইতিমধ্যেই শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধনশীল মুসলিম ব্রাদারহুডের মতাদর্শ ও উদ্দ্যেশ্যের ঠিক বিপরীত।
মুসলিম ব্রাদারহুডের মত বাথ পার্টিও ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সমর্থ হয়।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম আর পল্ক বর্ননা করেন:
“ছাত্র হিসেবে আমি নিজে যখন প্রথমবারের মত ১৯৫০ সালে সিরিয়া ভ্রমন করি তখন সেখানকার ছাত্র আন্দোলন যে কতখানি তেজস্বী ছিল, কতখানি ঐকান্তিক এবং উগ্রভাবে তারা যে একটি জাতীয় ভুমিকা পালন করছিল তা দেখে আমি বিস্মিত হয়ে যাই “।
হাফেজ আল আসাদ ছিল বাথ পার্টির প্রথমদিক কার সংগৃহীত ছাত্র সৈনিকদের মধ্যে অন্যতম যারাই আসলে পরবর্তীতে বাথ পার্টিতে পরিগনিত হয়। অল্পকিছুদিনের মধ্যেই আসাদ পার্টির কাজে তার আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে লোকাল হিরো ওঠেন। “দ্য স্ট্রাগল ফর সিরিয়া” গ্রন্থের লেখক প্যাট্রিক সিল এর লেখা অনুযায়ী একজন বাথ কর্মী বর্ননা করেনঃ “সে পার্টির বলিষ্ঠ কন্ঠস্বরে পরিনত হয়। রাজপথে পার্টির মতাদর্শ প্রচার ও রক্ষায় বিশেষ ভুমিকা রাখতে থাকেন। সে ছিল আমাদের কমান্ডোদের একজন”
তার অসীম সাহসিকতার মুল্যও তাকে দিতে হয়েছিল। একবার তিনি মরতে মরতে প্রানে বেঁচে যান যখন একজন মুসলিম ব্রাদারহুড কর্মী তাকে ছুরিকাঘাত করে।
সেই প্রজন্মের আরো অনেকের মতই হাফেজ আল আসাদ প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলো এমনকি বাথ পার্টির চেয়েও সেনাবহিনীর উপর ভরসা করেন ও আশা করেন সেনাবাহিনীই তাদের জাতিকে একিভুত করতে সফল হবে। তিনি ব্যগ্র চিত্তে পড়াশুনা শুরু করেন এবং একজন জঙ্গী বৈমানিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন।
কিন্তু তিনি খুব দ্রুতই উপলব্ধি করতে থাকেন যে সামরিক শক্তি আসলে ক্ষমতার একটা উপাদান মাত্র। এটাকে রাজনৈতিক ধারনা এবং সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত করতে হবে। সুতরাং অলদিনের মধ্যেই তিনি তার সামরিক সংশ্লিষ্টতাকে পার্টিতে তার ভুমিকা পালনে কাজে লাগাতে শুরু করেন।
যা তাকে অবধারিতরুপে সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং কতিপয় ষড়যন্ত্রে ( যা ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ এর মধ্যে সিরিয় রাজনৈতিকদের ও সামরিক কর্মকর্তাদের নিযুক্ত করে ) জড়িয়ে ফেলে।
এই গোলকধাঁধা থেকে উদ্ভূত হয়ে তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও কৌশলের সাথে ১৯৭১ সালে নিজেকে বাথ পার্টির নেতৃত্বে নিয়ে যান এবং রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোতে কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। পরবর্তিতে এই বছরেই এক গনভোটের মাধ্যমে তিনি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
তার বেঁচে থাকা প্রায় একটি অলৌকিক ঘটনা ছিল। কিন্তু তিনিও সিরিয়দের মৌলিক জাতিগত সমস্যা ও সমাজে ইসলামের ভুমিকা নিয়ে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দিতে ব্যার্থ হন।
এই সমস্যা যা কিনা অত্যান্ত্য দুঃখজনক ও তিক্ততার সাথে আজকের সিরিয়াতেও পরিলক্ষিত হয়, ১৯৭৩ সালে আসাদ সরকার নতুন সংবিধান প্রনয়ন কালে সামনে চলে আসে। ফ্রান্স কতৃক শাষিত ঔপনিবেশিক আমলের সংবিধানে ছিল যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হবে অবশ্যই একজন মুসলিম। যদিও হাফেজ আল আসাদ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে আত্নোৎসর্গ করেছিলেন তবুও তিনি মুসলিম মতামত পূরণ করার অন্তত দুটি প্রচেষ্টা নেন।
প্রথমবার, আগের সংবিধানের একজন মুসলিম প্রেসিডেন্ট হওয়ার শর্তটাকে প্রতিস্থাপিত করতে যেয়ে তিনি ইসলাম শব্দটাকে নিয়ে আসেন সাথে যোগ করেন “ইসলাম, যা কিনা একটি প্রেমের ধর্ম, প্রগতিশীল ও ন্যায় বিচারের ধর্ম ও সবার জন্য সমতা”
পরবর্তীতে দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় সে একজন সম্মানিত জুরিসকাউন্সিলরের ব্যাবস্থা করেন (সে আবার সিরিয়া থেকে নন, তিনি আসেন লেবানন থেকে এবং তিনি একজন সুন্নিও নন ছিলেন একজন শিয়া) একটি ফতোয়া ইস্যু করার জন্য যে আলাউয়ী রা আসলে ধর্মদ্রোহী নয় বরং প্রকৃতই শিয়া মুসলমান। আলাউয়িদের ধর্মদ্রোহীতার বিষয়টা নিছকই একটা ধর্মতত্ত্ব ছিলনা। বস্তুত আলাউয়িরা ছিল বেদুইন দস্যু যাদেরকে হত্যা করা প্রশংসনীয় বিষয় হিসেবে আরব অঞ্চলে বিবেচিত হত। যা আবারো আজকের সিরিয়ায় নিকট অতীতে আমরা দেখেছি।
ঘটনাপ্রবাহের অপরপক্ষে মুসলিম ব্রাদারহুড ছিল উন্মক্ত। ভয়ংকর বিদ্ধংসী ও হিংস্র। ফলস্বরুপ সারা দেশে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে হামা নগরীতে। পরবর্তী কিছু বছর বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার মধ্য দিয়ে আসাদ এই অসন্তোষ দমিয়ে রাখতে সমর্থ হন। তার নেয়া পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল খাদ্য দ্রব্যে ভর্তুকি প্রদান ও ইতিমধ্যেই নাগরিক সমাজে অপছন্দনীয় হয়ে ওঠা রাজনৈতিক পুলিশকে নিয়ন্ত্রন। কিন্তু মৌলিক সমস্যার কোন সমাধান হয়নি। মুসলিম ব্রাদারহুড ও অন্যান্য অসন্তুষ্ট বিচ্ছিন্ন কিছু দল আসাদ সরকারের উপর সংগঠিত সন্ত্রাসী হামলা চালাতে থাকে। তার কিছু ঘনিষ্ট সহযোগীকে তারা হত্যা করতে সক্ষম হয় এবং সরকারী স্থাপনা এমনকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরে গাড়ি বোমা হামলা করে। হাফেজ আল আসাদ কে হুমকি দেয়া হয়েছিল এই বলে যে, সে শীঘ্রই মিশরের আনোয়ার সাদাতের (মুসলিম সন্ত্রাসী দ্বারা নিহত) পথ অনুসরণ করে কবরে যাবে। দামেস্ক নগরীকে অবরুদ্ধ করা হয়। ফ্রেঞ্চ কলোনী থাকার সময় ঔপনিবেশিক শাষক গোষ্ঠির সাথে লড়াইয়ের সময় যেটা প্রায়ই করা হত। চুড়ান্তভাবে ইসলামিক গোষ্ঠিগুলো সারাদেশে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে হাফেজ আল আসাদের শাষনকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। মুসলিম ব্রাদারহুডকে দমনের জন্য তাদের শক্ত ঘাঁটি হামা শহরে পাঠান একদল সেনাকে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয় মুসলিম গেরিলা নেতারা একটি গনবিপ্লবের সংকেত দেয়। দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মত। রাতারাতি নগরী “কোন বন্দি নয়(no-prisoners)” স্লোগানে ও বিদ্রোহে পুর্ন হয়ে ওঠে। হাফেজ আল আসাদের সরকার তখন টিকে থাকার জন্য ধুঁকছে। প্যাট্রিক সিল যনি এসমস্ত ঘটনা প্রবাহ প্রত্যক্ষ করেন তার বইতে লিখেছেনঃ আতংক, ঘৃনা ও ঝরে যাওয়া এক নদী রক্ত কোন রকম সাময়িক যুদ্ধ বিরতির সম্ভাবনাকে ধুয়ে মুছে নিয়ে যায়। এক ভয়ানক ও নৃশংস বর্বরতা নগরীর উপর দিয়ে বয়ে যায়। ইসলাম ও বাথ পার্টির মধ্যেকার শত্রুতা, সুন্নি ও আলাউয়িদের মধ্যেকার শত্রুতা, দেশ ও নগরীর মধ্যেকার শত্রুতা পুরনো বহু স্তরে জন্ম নেয়া, ঘৃনা, ক্রোধ ও শত্রুতা তাৎক্ষনিক ভাবে বয়ে যাওয়া অনিয়ন্ত্রিত এই নৃশংস প্রতিযোগীতার পেছনে মুখ্য ভুমিকা পালন করে। লম্বা সময় ধরে চলা এই দাঙ্গায় বহু নাগরিক কে জবাই করা হয়। যে সমস্ত জেলা গুলোতে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে তার সবগুলো থেকে ভয়ঙ্কর ও অগুনিত নৃশংসতার খবর আসতে থাকে। সরকারী বাহিনীগুলোও মারাত্নক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ধ্বংসস্তুপের-আকীর্ণ রাস্তায় গ্রেনেড হামলায় তারা অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও সাঁজোয়াযান হারায়। কমপক্ষে পাঁচ হাজার থেকে দশ হাজার মানুষ এই দাঙ্গায় প্রান হারান।
এরপর আসাদ বিপুল বিক্রমে সেনাবাহিনী দিয়ে হামা নগরীতে হামলা করেন। ১৯৮২ সালের এই আক্রমনে হামার যা অবস্থা হয় তা ছিল অনেকটা ২০০৪ সালের আমেরিকা কতৃক আক্রমনের শিকার ইরাকে ফাল্লুজা নগরীর মত। একরের পর একর এলাকা ইট সিমেন্টের ধ্বংশস্তুপের গাদার নিচে চাপা পরে।
ঠিক এর পর থেকেই স্ট্যালিনগ্রাদে জার্মান আক্রমনের পর যেভাবে পুনর্গঠন শুরু হয়, তেমনি ভাবে হাফেজ আল আসাদ নগরী পুনর্গঠনের কাজ হাতে নেন। চমকপ্রদ ধারাবাহিক কিছু পদক্ষেপে আসাদ যে কোন মুল্যে হামা থেকে নুড়ি পাথরের ধ্বংশস্তুপ অপসারনের নির্দেশ দেন। নতুন আধুনিক হাইওয়ের কাজ শুরু করেন, গঠন করেন নতুন স্কুল ও হসপিটাল, নতুন পার্কও স্থাপন করে জনগনের জন্য উন্মুক্ত করে দেন, এবং সম্পুর্ন অপ্রত্যাশিত এক মৈত্রীর স্বারক হিসেবে দুটি বিশাল ও সৌন্দর্যমন্ডিত মসজিদ নির্মান করেন।
এ পর্যায়ে এসে হাফেজ আল আসাদ ক্ষমতে গ্রহনের পর থেকে তার আজ অবধি চর্চিত রাজনৈতিক যে দর্শন তা স্পষ্ট করে দেন। আর তা হলো সিরিয় নাগরিকদের সাহায্য করা এবং তাদের একটি উন্নত জীবনের লক্ষে কাজ করা। শুধু যে বিষয়টা নাগরিকদের করতে হবে তা হলো তার শাষন কে চ্যালেঞ্জ না করা। তার চিন্তা চেতনা ও কর্মকান্ড, তার কঠোর ও প্রায়শই তার একচেটিয়া ও অমানবিক ভাবে ক্ষমতার চর্চা তাকে বিভিন্ন একনায়ক ও জোর করে ক্ষমতা দখল করে রাখা শাষক ও শাষক পরিবার, পার্টি শাষকদল, যেমন চীনা, ইরানিয়ান, রাশিয়ান, সৌদি আরবিয়ান, ভিয়েতনামি ও আরো সমমনা শাষনের সাথে তুলনীয় করে তোলে।
এই সমস্ত অন্যান্য শাষকগোষ্ঠির মত আসাদও তার লোকজনের মাঝে বৈদেশিক সমস্যা সৃষ্টিকারীদের সাথে আঁতাত দেখতে পান। এ ধরনের আঁতাতের চেষ্টা বলতে গেলে কলোনিয়াল রুল যেসব যায়গায় ছিল প্রায় প্রত্যেক জায়গারই একটি রাজনৈতিক ও আবেগী ঐতিহ্যের চর্চা হিসেবে চিহ্নিত। এই ধরনের কর্মকান্ড প্রায় প্রত্যেকটি কলোনিয়াল শাষন উত্তর কালে ঐ সমস্থ স্থানের এক দুঃখজনক বাস্তবতা হলেও পশ্চিমা সমাজ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নয় বললেই চলে। অথচ বাস্তবতা এই যে পশ্চিমা রাজনীতৈক ও বিভিন্ন সরকারী এজেন্সী কতৃক সম্পাদিত এহেন কুট চাল বা পদক্ষেপ আজকের দুনিয়ার যখন অনেক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর অফিসিয়াল দলিলাদি প্রকাশিত করা হচ্ছে সেসব দলিলে এর প্রমান মেলে এবং এগুলো যাচাই করা সম্ভব।
হাফেজ আল আসাদ কোন গোপন তথ্য ফাঁসের অপেক্ষায় বসে থাকেনি। তার গোয়েন্দা দপ্তর গুলো ও বৈদেশিক সংবাদপত্রগুলো তার সরকারকে পরাভূত ও ধ্বংশ করে দেয়ার জন্য আভ্যন্তরীন রক্ষনশীলদের, তেল বিক্রি করা আরব ধন কুবের দেশ গুলোর, আমেরিকার ও ইসরাইলের নেয়া ডজন খানেক পদক্ষেপ সম্পর্কে আগাম সতর্ক করে দেয়।
তার সরকারের লোকজন বেশির ভাগই নিযুক্ত ছিল বিভিন্ন কুট চাল, মিথ্যাচার ছড়িয়ে দিতে ও ধন সম্পদের লোভে প্ররোচিত। কিন্তু এগুলোর কোনটাই তত গুরুত্ব হাফেজ আল আসাদের কাছে পায় নি যতটা পেয়েছিল ১৯৮২ সালের হামা নগরীর উত্থানের সময় চালানো হামলায় উদ্ধার করা প্রায় ১৫,০০০ বিদেশি মেশিন গান। সাথে জর্ডান ও সি আই এ’র কাছ থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত প্যারামিলিটারি যুদ্ধবন্দি। উল্লেখ্য এরকম বৈদিশিক শক্তি কতৃক ট্রেনিং প্রাপ্ত প্যারামিলিটারির কথা যা আজকের সিরিয়াতেও আমরা দেখেছি। পশ্চিমাদের শাষন পরিবর্তনের খেলা যা সম্পর্কে হাফেজ আল আসাদ এত দিন বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে শুনে আসছিল তার উপাদানের উপস্থিতি নিজ দেশ সিরিয়ায় দেখে এ সম্পর্কে একরকম নিশ্চিত হয়ে যান। সে নিশ্চিত ভাবে মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসেরেরের উপর হওয়া হত্যা চেষ্টা ও মোহাম্মাদ মোসাদ্দেকের ইরানী শাষনের পতনের পেছনে সি আই এর ভুমিকা সম্পর্কে অবগত ছিল।
হাফেজ আল আসাদ বিশ্বার করত তার দল বাথ পার্টি তাকে রক্ষা করবে। এক সময়ে সেটাও ব্যার্থ হবার উপক্রম হয়। যখন বাথ পার্টি সিরিয়া এবং ইরাক দুই দেশেরই সরকারী দল(যদিও নামে মাত্র) তখন এর নেতারা খুব তিক্ততার সাথে একে অপরের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। যার বেশির ভাগই ছিল দুই নেতার মধ্যে ব্যাক্তিগত তিক্ততা, কিন্তু সেটাই ঐ সময়ে দুই দেশের জন্যই সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক হয়ে ওঠে। ইরাকে ১৯৫৮ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনের শাষন কাল শুরু হয়। এদিকে সিরিয় রা ইসরাইলের পরে ইরাক কেই তাদের দ্বিতীয় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে।
ইতিমধ্যেই ১৯৮০ সালে ইরান ইরাক যুদ্ধ শুরুরু সময় আসাদ ইরানের পক্ষ নেয়। ইরানের প্রতি হাফেজ আল আসাদ সমর্থন নিশ্চিত করেন তখন ই যখন তিনি জানতে পারেন আমেরিকা ইরাক কে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতি মুহুর্তের তথ্য সরবরাহ করছে একই সাথে যে বিষাক্ত গ্যাস এ্যটাক ইরাক ইরানের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছে তার রাসয়নিকও আমেরিকাই সরবরাহ করছে। আসাদ এটাকে যে কোন ভাবে সাদ্দামের সি আই এ এজেন্ট হয়ে ওঠার প্রমান স্বরুপ গ্রহন করে। সাদ্দাম হাফেজ আল আসাদের কাছে রাক্ষস হিসেবে বিবেচিত হয় যেমনটা পরবর্তিতে খোদ আমেরিকার কাছে বিবেচিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে কুয়েত আক্রমনের সময়। সে সময় আসাদেরও আমিরিকার নেতৃত্বে সাদ্দাম বিরোধী যৌথ বাহিনীকে সমর্থন দেয়ার ব্যাখ্যা উপরোল্লিখিত ঘটনা প্রবাহ থেকে কিছুটা পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় আসাদ শাষন শুরু হয় যখন হাফেজ আল আসাদ বিগত ২০০০ সালে মারা যান। হামা নগরীর যুদ্ধ পরবর্তি নেয়া পিতার পদক্ষেপের মতন বাশার আল আসাদ শুরুতেই বিরোধীদের প্রতি কিছু বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্তিমুলক পদক্ষেপ নেয়। যার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুড কে পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করার সুযোগ দেয়া এবং শত্রু বিদ্ধস্ত লেবানন থেকে সিরিয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া।
কিন্তু যখন বাশার পিতার মতই এক গনভোটের মাধ্যমে তার শাষনের বৈধতা পেতে চেষ্টা করে তখনই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সে তার পিতার স্বৈরাচারী ও কতৃত্বপুর্ন ক্ষমতার পথেই হাঁটছেন। সেই একই দর্শনের পুনারাবৃত্তি ঘটান, “যে তোমার জীবন তুমি ব্যাক্তিগত ভাবে চালাও, যেভাবে খুশি নিজেকে সম্পদশালী গড়ে তোল কোন সমস্যা নেই, কিন্তু আমার শাষন কে চ্যালেঞ্জ জানাতে এস না”।
তবে এটা লক্ষ্যণীয় যে, এই দুই আসাদের শাষনামলেই সিরিয়া প্রভুত উন্নতি সাধন করে। সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক এর তথ্য অনুযায়ী সিরিয়ার চলমান এই গৃহযুদ্ধের শুরুর আগ পর্যন্ত মাথাপিছু আয় ছিল ৫০০০ ইউএস ডলার। যা জর্ডানের মাথাপিছু আয় থেকে প্রায় সমান এবং পাকিস্তান ও ইয়েমেন মাথাপিছু আয়ের মোটামুটি দ্বিগুন এবং আফগিনাস্তানের মাথাপিছু আয়ের পাঁচ গুন। যদিও এই আয় ছিল লেবানন, তুরস্ক ও ইরানের তুলনায় তাদের তিন ভাগের এক ভাগ।
ইউ এন এর তথ্য মতে, ২০১০ সালে ক্রুদ্ধ প্রকৃতির দৌর্দন্ড প্রতাপের খরার কারনে তাদের মাথাপিছু জিডিপি কমে এসে দাঁড়ায় মাত্র ২৯০০ ইউএস ডলারে। ২০০৮ সাল যখন খরার শুরুর দিক, সিরিয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। সামাজিক বিষয়ে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় প্রায় ৯০ শতাংশ সিরিয় শিশুরা স্কুলে যায় এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করে। প্রতি ১০ জনে শিক্ষিতের হার ৮ থেকে ৯ এর মধ্যে। এ সমস্ত সামাজিক মাপ কাঠিতে সিরিয়াকে অনায়াসে সৌদি আরব ও লিবিয়ার সাথে তুলনা করা যায় যদিও তাদের কর্ম সংস্থানের হার এই দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম তবুও। খুবই গুরুত্বপুর্ন একটা বিষয় যেটাতে বাশারের শাষন নুন্যতম সফলতা পায়নি তা হল, সিরিয়ার জন্ম নিয়ন্ত্রন। যেটা ইতিপুর্বেই উল্লেখিত হয়েছে যে সংস্থানের তুলনায় চাহিদার ভারসাম্যহীনতার একমাত্র ও প্রধান কারন।
পিতার মত বাশার ভোটের মাধ্যমে তার শাষনের বৈধতা চাইলেও দৃশ্যত সে কোন জন সমর্থন পাওয়ার চেষ্টাও করেনি এবং নিশ্চিত ভাবেই পায় নি, একই সাথে অনুষ্ঠেয় ভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর গ্রহনযোগ্য অংশগ্রহনও নিশ্চিত করার কোন উপায় বের করতে ব্যার্থ হয়। যদিও তার শাষনের প্রতি বৈদেশিক বৈরিতার এটাই একমাত্র বড় কারন হিসেবে বিবেচিত হলেও এটা সিরিয়দের কাছে ততটা মুখ্য নয় যতটা ইসলামের দাবী ও আলাউয়ীদের নতুন ভুমিকার মধ্যেকার শুন্যস্থান পুরনে কোন পন্থা খুঁজে পেতে তার ব্যার্থতার গুরুত্ব দাবি করে। সিরিয়ার আভ্যন্তরীন বিষয় ও সমাজে এর একটি ব্যাপক প্রভাব পড়ে। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহনের ঘাটতি, জন দাবীকে ভয় পাওয়া ও যে কোন বিষয়কে পুলিশি মাপকাঠিতে বিবেচনা করায় মুলত বাশার আল আসাদ এক জন স্বৈরাচারী শাষক হিসেবেই দিনকে দিন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে।

গৃহযুদ্ধ পূর্বক সিরিয়ার বৈদেশিক সম্পর্ক

বুশ প্রশাষন ২০০২ সাল নাগাদ একটি বিরোধী সিরিয় নীতি প্রনয়নের সংকেত দেয় যখন খোদ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সিরিয়াকে এক্সিস অফ ইভিল বা শয়তানের অক্ষ শক্তি হিসেবে সিরিয়াকে অভিহিত করে। শুরু হয় সিরিয়া বিরোধী গোপন কর্মকান্ড। পরবর্তী বছরে বুশ সিরিয়ার প্রতি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয় যেটা সে ২ বছর পর বাস্তবে রুপ দান করে।
২০০৩ সালে ইসরায়েল দামেস্কের ঠিক বাইরেই অবস্থিত একটি ফিলিস্তিনী শরনার্থী শিবিরে বিমান হামলা চালায় যেটাতে তারা আমেরিকান বিমান ব্যাবহার করে। পরবর্তী ধারাবাহিক হামলা গুলো যা সিরিয় সশস্ত্র বাহিনী প্রতিরোধ করতে ব্যার্থ হয়, এটাই ছিল তার শুরু। আমেরিকান কংগ্রেস কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয় যখন তারা সিরিয়া একাউন্টিবিলিটি এ্যাকট পাশ করায় এবং সিরিয়াকে সন্ত্রাসে মদদ দেয়া এবং রাসায়নিক অস্ত্র বানানোর চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করে।
একই সময়ে উত্তেজনা প্রশমনে কুটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। ২০০৬ সালে ইরাক ও সিরিয়া তাদের বন্ধ থাকা পারস্পরিক কুটনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করে। ২০০৭ সালে জেষ্ঠ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আমেরিকান কর্মকর্তারা বেসরকারীভাবে স্বীকৃতি স্বরুপ দামেস্ক পরিদর্শন করেন। অপরদিকে সিরিয়া রক্ষনশীল আরব দেশগুলোকে নিয়ে অনুষ্ঠিত একটি আরবলীগের অধীবেশনের আয়োজন করে যেখানে তারা রক্ষনশীল দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ইতি ঘটানোর ইচ্ছা পোষন করে।
কিন্তু উইপন অব মাস ডিস্ট্রাকশন এর ইস্যুতে খুব শিঘ্রই এসমস্ত রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্জিত ভাবমুর্তিকে বিনষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে সিরিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্কের প্রশ্নে আমেরিকা তখন অবধি বিতর্কিত একটি অভিযোগ সিরিয়ার বিরুদ্ধে আনা অব্যাহত রাখে যে, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে উত্তর কোরীয়া একটি পারমানবিক অস্ত্রাগার নির্মান করছে। এবং এই অভিযোগের সুত্র ধরেই ইসরাইল ২০০৭ এ আবারো সিরিয়ায় বোমা হামলা করে। কিন্তু মাস ছয়েক পরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকাজি বাশার কে প্যারিসে আমন্ত্রন জানায় এবং পুনরায় কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অনুরোধ করে।
পরবর্তিতে উত্তেজনা আবারো প্রশমিত হয় যখন মার্কিন উচ্চ লেভেলের কর্মকর্তারা সিরিয়া পরিদর্শনে যায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১০ সালে সিরিয়াতে রাষ্ট্রদুত পাঠায়। যদিও ৩ মাস পরেই মার্কিনীরা আবারো সিরিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যার মুল উদ্দ্যেশ্য ছিল তেল রপ্তানীর মাধ্যমে আয় হওয়া সরকারী রাজস্বের হার কমানো এবং বাশারের শাষনের বিরুদ্ধে জনরোষ বৃদ্ধি করা। কিন্তু পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতি এবং কর্মকান্ড এখনো পর্যন্ত সিরিয়াতে কোন সফলতা দেখেনি, কেননা এখনো পর্যন্ত সিরিয় শাষনে কোন পরিবর্তন আসেনি। আর আজ পর্যন্ত সিরিয়াকে নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেউই কোন সুনির্দিষ্ট বা স্থিতীশীল নীতি গ্রহন করতে পারেনি।

ছড়িয়ে পড়ল গৃহযুদ্ধ

চার বছরের টানা বিদ্ধংসী খরা যা ২০০৬ সালে শুরু হয়েছিল যা কমপক্ষে ৮০০,০০০(আট লক্ষ) কৃষক পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়। পাশাপাশি বন্ধ করে দেয় তাদের সারা জীবনের জীবন জীবিকার অবলম্বন।
সেন্টার ফর ক্লাইমেট এ্যন্ড সিকিউরিটির তথ্য অনুযায়ী কম পক্ষে ২০০,০০০(দুই লক্ষ) পরিবার স্রেফ তাদের জমিজমা পরিত্যাগ করে ভিন্ন উপায়ে জীবন যাপনের পথ খুঁজতে গৃহত্যাগ করে বেরিয়ে যায়। কিছু অঞ্চলে চাষাবাদ সংক্রান্ত সকল কর্মকান্ড স্থগিত হয়ে যায়। অন্যান্য জায়গায় শতকরা ৭৫ ভাগ জমি নিষ্ফলা হয়ে পড়ে। পাশাপাশি শতকরা ৮৫ ভাগ পশুসম্পত্তি হয় অনাহারে নয় তৃষ্ণায় মারা যায়। হাজার হাজার কৃষক হাল ছেড়ে দিয়ে জমি জমা ভিটা মাটি ত্যাগ করে নিকটবর্তী নগরী ও শহরতলী গুলোতে জড়ো হতে থাকে এক প্রকার প্রায় অস্তিত্বহীন কাজের খোঁজে ও ভয়াবহ ভাবে সরবরাহ কমে যাওয়া খাবারের খোঁজে। বাইরের পরিদর্শক বিশেষ করে ইউ এন এর বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেন প্রতি ১০ মিলিয়ন প্রত্যন্ত গ্রামবাসীদের মধ্যে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন বাসিন্দা চরম মাত্রার দারিদ্র সীমায় পৌঁছে যায়।
কাজ ও খাবারের খোঁজে যখন সিরিয়রা নগর ও শহরগুলোতে দলে দলে ভীড় করছিল তখন তারা দ্রুতই উপলব্ধি করে যে তাদের শুধু যে একে অন্যের সাথে দুর্লভ কাজ ও খাবারের জন্য প্রতিযোগীতা করতে হবে শুধু তাই নয়, সেখানে বসবাস করে আসা বিদেশী শরণার্থীরাও উপস্থিত।
উল্লেখ্য সিরিয়াতে ইতিমধ্যেই প্রায় সিকি মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় আড়াই লক্ষ ফিলিস্তিনী ও প্রায় এক লক্ষ ইরাকি শরনার্থী হিসেবে আশ্রিত ছিল। পূর্বের অবস্থাশালী কৃষকেরা ফুটপাথের হকার ও ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ যোগাড় করে নেয়ার মত ভাগ্যবান হলেও অন্যেরা শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্যই লড়াই করছিল। সময়ের আবর্তনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়া ছিল অবধারিত।
মুখ্য বিষয় ছিল বেঁচে থাকা। ইউ এন ফুড এ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের জেষ্ঠ্য কর্মকর্তা (যিনি পরবর্তিতে ইউএস এইডের প্রোগ্রাম ফর হেলপ চালুর উদ্যোগ নেন) সেই অবস্থাকে অভিহিত করেন একটি উপযুক্ত ঝড়ের সময় হিসেবে। ২০০৮ এর নভেম্বরে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে সিরিয়া সামাজিক ধ্বংশের মুখোমুখি। তিনি উল্লেখ করেন সিরিয়ার কৃষি মন্ত্রী প্রকাশ্যে বিবৃতি দেন যে টানা খরার কারনে সিরিয়া যে সামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুকি দাঁড়িয়েছে দেশ হিসেবে তা সামাল দেয়া তা তাদের সাধ্যের বাইরে।
কিন্তু তার এই আবেদন পশ্চিমাদের কালা হয়ে যাওয়া কানে পৌঁছাতে ব্যার্থ হয়। উইকিলিক্সের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া তখনকার এক তার বার্তায় প্রকাশিত হয় যে, ইউএস এইডের ডিরেক্টর মন্তব্য করেন “আমি প্রশ্ন উত্থাপন করছি যে আমরা কি আমাদের লিমিটেড রিসোর্স এখন এই আবেদনের পরিপ্রক্ষিতে প্রদান করতে পারি?”
ইউএস এইড পারুক আর নাই পারুক, সিরিয় সরকার যেন বিপর্যয়ের চুড়ান্ত দেখারই প্রস্তুতি গ্রহন করে চলেছিল। বিশ্ব বাজারে গমের উর্দ্ধ মুল্যে প্রলোভিত হয়ে তারা তাদের কৌশলগত গমের রিজার্ভ ২০০৬ সালেই বিক্রি করে দেয়। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার এর তথ্য অনু্যায়ী পরবর্তীতে ২০০৮ সাল এবং বাকি পুরো খরা মৌসুমে সিরিয়াকে তার জনগোষ্ঠিকে বাঁচিয়ে রাখতে যথেষ্ট পরিমান গম আমদানী করতে হয়েছিল।
এদিকে আগেই বলেছি হাজার হাজার ভীত, রাগান্বিত ক্ষুধার্ত প্রাক্তন কৃষকেরা দলে দলে সিরিয় নগর ও শহরতলীতে ভীড় করছিল। ভাবার্থে তারা শুস্ক খড়কুটো যোগাড় করছিল যা আসলে আগুন ধরার জন্য যেন একেবারে তৈরীই ছিল। স্ফুলিংগের প্রথম দেখা পাওয়া যায় ২০১১ সালের ১৫ই মার্চে দক্ষিনপশ্চিমের দারা শহরে। যেখানে একটি ছোট দল ভীড় করছিল তাদেরকে সাহায্য করতে ব্যার্থ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। তাদের সাথে সাক্ষাত দুরের কথা নিদেন পক্ষে তাদের অভাব অভিযোগ শোনার পরিবর্তে সরকার তাদেরকে বিপর্যয়কারী ও সরকারের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। হামার শিক্ষা আসাদ প্রশাষনের প্রতিটা সদস্যের মনেই সর্বাগ্রে কাজ করছিল। সেই সময় বিচক্ষন ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের অভাবেই হামা তাদেরকে দেখিয়েছিল নাগরিক বিদ্রোহ।
সুতরাং বাশার তার বাবার দেখান পথেই অগ্রসর হয়। সে সেনাবাহিনীকে এই সমস্ত প্রতিবাদকারীদের কঠোর ভাবে দমনের নির্দেশ দেয়। আর সেনাবাহিনী যা কিনা অনেকদিন ধরে নিষ্ক্রিয়তা ও ইসরাইলের সাথে পূর্ববর্তী মোকাবেলাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে পরাজয় ও অপদস্থ হওয়ার কারনে একধরনের হতাশায় ভুগছিল, জনগনের উপরে তীব্র আক্রোষের সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের এই হিংসাত্নক পদক্ষেপ জন মানষে এক বিরুপ পতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তাদের এ্যাকশন সম্পুর্ন ভাবে ব্যাকফায়ার করে। সারাদেশে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মত। সরকার বরাবরের মত সেনাবাহিনীর শক্তি দিয়েই তাদের দমন করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। কিন্তু তারা ব্যার্থ হয়। সুতরাং সেই থেকে আজকের দিন পর্যন্ত যা কিনা শুরু হয়েছিল খাবার আর পানির ইস্যু নিয়ে তা ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইস্যুতে রুপ নেয়।

গৃহযুদ্ধ আকৃতি নেয়

আমরা সিরিয় সরকার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি, কেননা এটা আমাদের আশেপাশের আর সমস্ত দেশের মতই ক্ষমতাসীন একটি সরকার, কিন্তু আমরা বিদ্রোহিদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানিনা। শত শত হাজার হাজার দল উপদল রয়েছে, তাদের মধ্যে আবার দলাদলি রয়েছে, তারা নিজেদেরকে ব্রিগেড বলে দাবি করে, এমনকি যখন তাদের জনা ১২ লোককেও এক সাথে পাওয়াগেছে তখনো তারা তাদেরকে ব্রিগেড বলে দাবি করে। কিছু পর্যবেক্ষনকারীর বিশ্বাস সেখানে আসলে প্রায় ১০০০ এর উপর ব্রিগেড রয়েছে। একটি গোনায় আনার মত ব্যাপার এই যে সেখানে পার্ট টাইম এবং ফুল টাইম বিদ্রোহি মিলে প্রায় এক লক্ষ যোদ্ধা রয়েছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধে, বিদ্রোহিরা পারস্পরিক সমঝোতায় প্রতিকূল দলে বিভক্ত ছিল। এই বিষয়টাই তাদেরকে পরাজিত করাটা অনেক কঠিন করে তুলেছিল এমনকি তাদেরকে চুক্তিবদ্ধ করতে নিযুক্ত করাটাও ছিল একটি দুরুহ কাজ। আফগানিস্তানে রাশিয়া প্রায় সব যুদ্ধেই জয় লাভ করে এবং তাদের দেশের প্রায় সব এলাকা বিক্ষিপ্তভাবে দখল করে নেয়, কিন্ত কখনই কোন নেতৃত্বকে চিহ্নিত করতে পারেনি যাদের সাথে তারা চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে আলাপ আলোচনা চালাতে পারে। বস্তত এমনকি যখন রাশিয়ানদের সাথে আফগানরা ফাইট করছে তখনও তারা নিজেদের মধ্যে নিয়মিত লড়াই চালাত টেরিটরি, দখলে রাখতে, অর্থ ও অস্ত্রশস্ত্র কবজা করতে। চোরাচালানের পথগুলোর দখলে রাখার জন্য লড়াই ত ছিলই, আর গোত্রগত ঘৃনা আরো পুষে রাখা অনেক কিছুই তাদের নিজেদের মধ্যেকার এই লড়াই উস্কে দিত।
ফলাফল স্বরুপ বিশাল বৈদেশিক সাহায্য সহযোগীতা পাওয়া সত্বেও তারা কখনো রাশিয়াকে পরাজিত করতে পারেনি। আমরা খেয়াল করলে দেখব সেই একই প্যাটার্ন সিরিয়াতেও পুনারাবৃত্তি ঘটান হয়েছে। এখানে যুদ্ধ এখন এমন এক অচলঅবাস্থার সৃষ্টি করেছে কোন দলই আসলে সেখানে টিকতে পারবেনা তা যতই বাইরের শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে অনুদান, অস্ত্রশস্ত্র ও ধন সম্পদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হোক না কেন।
আফগানিস্তানে বিদ্রোহিদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার প্রধান ও বড় কারন ছিল গোত্রগত। তাজিকস, তুর্কমেন, হাজারাস, পশতুন এরা মারাত্নক মরনশীল বিপদের মুখে থেকেও একে অন্যের সাথে তিক্ত্যতার সাথে মারামারি, হানাহানি ও খুনোখুনি তে লিপ্ত ছিল।
সিরিয়াতে সিরিয় বিদ্রোহিদের বুঝতে হলে আমাদের সতর্কভাবে কারন ও বিষয়বস্তুর ওপর নজর দিতে হবে এবং এসবের মুল ভিত্তি হল ধর্ম।
আসাদ প্রশাসন চলার সময়, ইসলামের ব্যাখা একটি সুগভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এই বিষয়টি শুধু সিরিয়ার প্রেক্ষাপটের জন্য সত্য ছিল না বরং বিষয়টা বোঝা, অনুশিলন করা এবং পদক্ষেপে নেয়ার বিষয়টা পৃথিবির আরো অন্যান অঞ্চলে ঘটে চলছিল। বিশেষ করে বৈদেশিক এসব নিতীর কারনে প্রভাবিতদের মধ্যে ছিল ইরাকী যুবা পুরুষ ও নারীরা, আফগানিস্তান, লিবিয়া, চেচনিয়া, চাইনিজ তুর্কেস্তান(এখন জিনজিয়ান) এবং মিশর।লক্ষাধিক সুন্নিমুসলিম সমগ্র আফ্রিকা ও এশিয়া এবং এমনকি কিছু শিয়া মুসলিমও মিশরিয় গোঁড়া ধর্মত্তত্ববিদ সাঈদ কুতব এর লেখায় উৎসাহ ও উদ্দিপনা খুঁজে পেয়েছিল। তাদের নিজ নিজ দেশের সরকার গুলো সুবিধাজনক ভাবে ইসলাম দ্বারা বিন্যস্ত থাকুক বা না থাকুক অনেকেই এই পরিবর্তিত ব্যাখ্যাগুলোর মধ্যে পশ্চিমা ধাঁচের আধুনিকতার সাথে এক ধরনের সমঝোতা বা পশ্চিমাকরন কে রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল ও ধর্মীয় ভাবে অনৈতিক হিসেবে বিবেচিত করছিল। তার উপর ঐ সমস্ত অমুসলিম শাষকদের শাষিত অঞ্চলগুলোকে যেমন রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত চেচনিয়া, চায়নার কলোনী জিনজিয়াং এসব জাগাগুলতে তারা নিপিড়িত ছিল। অনেকেই যারা পশ্চিমে বাস করত তারা ভেবে নেয়া শুরু করল যে সাঈদ কুতুবের প্রকাশ্য তাচ্ছিল্ল্য “যে তাদের আধ্যাত্মিকতা এবং সংবেদনহীন বস্তুবাদের অভাব রয়েছে” তা তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যার সাথে মিলে গেল। অন্যরা অসহনীয় খ্রিস্টান দেশে তাদের বিরুদ্ধে সব সাধারণ বৈষম্যের মিল খুঁজে পেতে শুরু করে দিল। ফলে হাজার হাজার যুবা বিদেশী মুসলমানেরা সিরিয়াতে এটাকে তাদের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিচেচিত করে (আরবীঃ ফি সাবিলিল্লাহ্‌) লড়াই করার জন্য ভীড় করা শুরু করল।
ইতিমধ্যে সিরিয়াতে যেখানে অনেক মুসলমান আসাদ প্রশাষন কে গ্রহনযোগ্য মনে করে এবং এমনি তাদের অনেকে অনেক জৈষ্ঠ্য পদে যোগ দেয়, বাকিরা তাদের আলাউয়ী এবং খৃষ্টানদের সহযোগী মনে করে, এমনকি তাদের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং তাদের সাথে মুসলমানদের অকপট ভাবে অংশগ্রহনযোগ্যতা কে বিরোধিতার চোখে এবং অসমর্থনযোগ্য বলে ধরে নিতে থাকে।
আসলে এখানে যেটা ঘটে চলছিল, তা হল দুটি বৃহৎ দল সিরিয়রা এবং বিদেশীরা এবং তাদের লক্ষ এমন ভাবে বেড়ে উঠে তাদেরকে দুই ভাগে ভাগ করল যা অনেকটা সেই আরব জাতীয়তাবাদের সময় হয়েছিল।সিরিয়দের দৃষ্টি সিরিয়ার দিকেই কেন্দ্রিভুত ছিল যে তারা আসাদ প্রশাষন কে উৎখাত করবে ঠিক যেমন তাদের পিতামহরা করেছিল, ফ্রান্স কে তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করে নিজেদের একটি দেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। তাদের জাতীয়তাবাদ ছিল একক দেশ কেন্দ্রিক।
অপর পক্ষে বিদেশী জিহাদিষ্টদের চেতনা সিরিয়ার নব্য জাতিয়তাবাদীদের মত সিরিয়ার চেয়েও বিস্তৃত অঞ্চলের প্রতি কেন্দ্রিভুত করতে গুরুত্বারোপ করে। তাদের মতে এটা সেই লোক জাতীয়তাবাদ, যা শুধু মাত্র আরব দুনিয়ার জন্যই নয় বরং ইসলামের এক বিশাল সুবিস্তৃত অঞ্চল, যা পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করে। তারা যার জন্য লড়ছে তা হল একটি পুনর্গঠিত ইসলামি দুনিয়া, একটি দার উল ইসলাম বা একটি নতুন খিলাফত।
পশ্চিমাদের কাছে এটা পুরোপুরি পরিস্কার ভাবে ধরা পড়ে, তারা একহিসেবে খুশিই হয়, কেননা বিদ্রোহীদের মধ্যেই আরেক দল বিদ্রোহী রয়েছে। এটা এমন একটা বিষয় যেটা রাশিয়ার প্রেক্ষাপটে আলোচনা করলে দেখা যায়, ষ্ট্যালিন কম্যুনিজমকে একটি একক রাষ্ট্র কেন্দ্রিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়ছিলেন, অপরদিকে ট্রটস্কি চেয়েছিলেন এটিকে একটি বিশ্ববিপ্লবে পরিনত করতে।
আসলে এখানে এসমস্ত দুর্বোধ্য বা তাত্ত্বিক আলোচনা করার আর কোন অবকাশ নেই, এখন প্রধান গুরুত্বপুর্ন বিষয় হচ্ছে হিংসা, হানাহানি, নৃশংসতার ভয়াবহতাকে গুরুত্বের সাথে উপলব্ধি করা এবং মৌলিক বিষয় হবে যদি কোনরকমের চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি বা এমন কোন ধরনের ব্যাবস্থার দিকে যাওয়া যা লম্বা সময় স্থায়ী হবে।
কোন সন্দেহই নেই যে তারা(বিদ্রোহীরা) তাদের মধ্যে যতই ভিন্ন মত পোষন করে থাকুক(যেটা তারা অবশ্যই করে), সকল বিদ্রোহী দলগুলো সিরিয়ার আজকের এই সঙ্ঘর্ষ কে একটি মৌলিক ধর্মীয় ইস্যু হিসেবেই দেখে আসছে। বিশেষ করে যারা সিরিয়ার বাসিন্দা তাদের জন্য এই লেখায় আগেও পয়েন্ট আউট করা হয়েছে, এই যুদ্ধ আসলে গোত্রীয় জটিলতায় একটি ধর্মীয় ইস্যু নিয়ে যুদ্ধ।
কিছু বাইরের পর্যবেক্ষনকারী ইতিমধ্যে মতামত দিয়েছেন এটা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধ। যা বাস্তবে আসলে মোটেই তা নয়। যদি সত্যি সত্যি এমনটা হয়েও থাকে তবে এখন পর্যন্ত তারা এই যুদ্ধে তাদের উপস্থিতি জানান দিতে সক্ষম হয় নি।
১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকের জাতীয়তাবাদ ও সমাজবাদের মত ইসলাম এখন পর্যন্ত কার্যকরী একটা ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রকাশ ঘটাতে পারেনি। একজন মহান আরবী ইতিহাসবিদ যেটাকে বলেছেন এভাবে যে “তাদের মুখগুলোকে একদিকে ঘোরাতে পারেনি” ।
অন্যান্য গেরিলা যুদ্ধগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিদ্রোহীরা একে অপরের মাঝে বিভিন্ন ছোট, বড় বিভ্রান্তিকর নানা দল উপদলে বিভক্ত। আফগানিস্তানে তারা একে অন্যের সাথে এলাকা দখল, অস্ত্র দখল, নেতৃত্ব ইত্যকার বিষয় নিয়ে খুবই তীব্র ভাবে লড়াই করত যেমনটা তারা তাদের শত্রুদের সাথে করত। আর তাদের এই নানা দলে উপদলে বিভক্তি তাদের কে হারানো অসম্ভব করে তুলেছিল। এটাই রাশিয়ানরা মোকাবিলা করে আফগানিস্তানে। আর এখানেও বিষয়গুলো সেদিকেই গড়াচ্ছে। যদিও এই সমস্ত বিদ্রোহী দল গুলো জাতীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রন রাখতে অক্ষম কিন্তু তারা আসলে সেই লক্ষেই অগ্রসর হচ্ছে।
এদিকে আরো গোঁড়া মৌলবাদি দল আল নুসরাহ্‌ যেটার নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের কর্মকান্ড দেখে মনে হচ্ছে তারা গেরিলা যুদ্ধ নিয়ে রিতিমত চর্চা করেছে, এটার উপর পড়াশোনা করেছে। অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ের সাথে তারা যুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধ জয় করার চাইতে যুদ্ধ ক্ষেত্রে কিভাবে বেঁচে থাকতে হবে সেটা বেশ ভাল ভাবে রপ্ত করেছে। গেরিলারা যে সমস্ত এলাকায় লড়াই করে বা যে সমস্ত এলাকা নিয়ন্ত্রন করে সে সমস্ত এলাকার জন সমর্থন তাদের জন্য খুবই জরুরী। কেননা তারা তাদের কে দরকারী জিনিষগুলো সরবরাহ করে। এটা অনেকটা ঐ এলাকায় বিকল্প সরকার ব্যাবস্থার মতই। বিদেশী মিডিয়াগুলোর রিপোর্টার এখন পর্যন্ত যা তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছে তাতে দেখা যাচ্ছে আল নূসরাহ্‌ ব্রিগেড, সিরিয়াতে লড়াইরত প্রধান জিহাদী ধর্মীয়গোষ্ঠিগুলোর অন্যতম আর সমস্ত ইসলামী যোদ্ধা যারা মধ্য প্রাচ্যে একটি খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষে যুদ্ধ করছে তাদের লক্ষকে উপেক্ষা করে এবং তারা এখনো পর্যন্ত তাদের নীতিতে অটল থেকে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় প্রচুর গমের মজুদ, কল কারখানা, তেল ও গ্যাস ফিল্ড, বহু লুট করা সরকারী গাড়ি ও বিশাল অস্ত্রাগার এর উপর পুর্ন নিয়ন্ত্রন লাভ করেছে।
তারা স্থানীয় শাদাদী জনগনকে কি ধরনের সেবে দিচ্ছেন সে বিষয়ে আল নূসরাহ্‌ এর এক কমান্ডার সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন, তিনি জানান প্রথমত খাদ্য সরবরাহ। প্রতিদিন ২২৫ বস্তা গম কে ভানিয়ে রুটি বানানো হয় তারপর রুটিগুলো কে সেঁকে আশেপাশের সব প্রতিবেশী জনগোষ্ঠিকে একটি বিশেষ দলের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হয়। তারপর সেখানে আছে বিনামুল্যে পানি ও বিদ্যুতের ব্যাবস্থা। যা সারাদিন শহরটিতে যোগান দেয়া হয়। এছাড়াও সেখানে আছে আল নূসরাহ্‌ হেলথ কেয়ার সার্ভিস। এই স্বাস্থ্য সেবা একটি ছোট্ট ক্লিনিক থেকে দেয়া হয়। এখানে যারা সেবা নিতে আসে তাদের সবাইকেই সেবা দেয়া হয়। আগত রোগীরা আল নূসরাহ্‌কে সমর্থন করে কি করেনা সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে সেটা বিবেচনায় নেয়া হয় না। আর পরিশেষে সেখানে রয়েছে হুকুম এবং দ্রুত সুষ্ঠ বিচারের আশ্বাস। যা শরিয়াহ্‌ আইন মোতাবেক ও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের মাধ্যমে করা হয়।
সমস্ত পর্যবেক্ষকগনই একমত হয়েছেন যে বিদেশী নিয়ন্ত্রিত ও বিদেশীদের নিয়ে গঠিত বিদ্রোহী দলগুলোই বেশি সুসঙ্গত, সঙ্গঠিত ও কার্যকরী। এটা আসলেও অবাক করে দেয়ার মত ব্যাপার বটেই যে এ সমস্ত যোদ্ধাদের বলার মত কোন কমন ভাষা নেই এবং তারা বিভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আসা মানুষ। এক একটি অপারেশনে অংশ নেয়া একটি দল গঠিত হচ্ছে একাধারে চেচেন, তুর্কী, তাজিক, পাকিস্তানী, ফ্রেঞ্চ, মিশরীয়, লিবীয়, তিউনিশীয়ান, সৌদি আরবীয়ান, এবং মরক্কো থেকে আগত যোদ্ধাদের দ্বারা।
অপরপক্ষে বিভিন্নদেশের সরকারগুলো যারা কিনা এই একই পদক্ষেপ এর জন্য যার যার দেশে এদেরকে কারারুদ্ধ করত তারা এদের অর্থ ভান্ডারে দেদারসে অর্থের যোগান দিয়ে যাচ্ছে, সাথে যোগান দিয়ে চলেছে অস্ত্র ও সাহায্য করার আরো যেসব মাধ্যম রয়েছে সেসব মাধ্যমে। এই তালিকা যথেষ্টই বড় এবং এর গঠনও বিস্ময়কর। এই তালিকায় রয়েছে তুরস্ক, রক্ষনশীল আরব রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরব, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের প্রচ্ছন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করার লম্বা ইতিহাস রয়েছে। একই সাথে তারা সেখানে নিজেদের নিযুক্ত করেছে মিথ্যাচার করতে, গুপ্তচরবৃত্তি করতে এবং অংশ নিয়েছে বিভিন্ন কুটচালে। স্বভাবতই বিদ্রোহীরা যে ধরনের সহযোগীতা পেয়ে আসছে সেগুলো কে বরাবরই অপর্যাপ্ত বলে এলেও সরকারগুলো এটিকে যুদ্ধের একটি ভার্চুয়াল নীতি বলেই বর্ননা করে আসছে। বস্তুত তারা দুপক্ষই সঠিক। অন্য দেশের সরকারগুলো বিদ্রোহীদের এমন মাত্রায় সাহায্য সহযোগীতা করেনি যে, যাতে করে বিদ্রোহীরা এই যুদ্ধে জিতে যাওয়ার মত পর্যায়ে চলে যেতে পারে আবার একই সাথে এমন এক পরিস্থিতি তৈরী করতে সমর্থ হয়েছে যাতে বাইরের কোন দেশ এখানে নিজেকে জড়াতে পারে, বর্তমান স্থানীয় সরকার কে উৎখাত করতে পারে বা যে কোন আমেরিকান বা ইউরোপিয়ান প্রশাষন এটাকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যুদ্ধও বলতে পারে।
এ ধরনের গোপন হস্তক্ষেপ, আসলে এখন যেটা প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ যা দুই ধরনের ভিত্তিতে সমর্থনযোগ্য হতে পারে। এক, বর্তমান সিরিয় শাষন একটি স্বৈরশাষন, পশ্চিমা মান অনু্যায়ী এটা নিসন্দেহে একটি স্বৈরাচারী সরকার। এমনটা ঘটে থাকুক বা না থাকুক যে এই সরকার জনগনের উপর গ্যাস হামলা করেছে, কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই প্রমানিত যে প্রচলিত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে হাজার হাজার সিরিয় নাগরিককে হত্যা করেছে। সিরিয় অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস এর তথ্য অনুযায়ী বিদ্রোহীরা কম পক্ষে ২০,০০০ এবং হতে পারে প্রায় ৩০,০০০ সরকারী সৈন্য কে হত্যা করেছে, পক্ষান্তরে বিদ্রোহীদের হতাহতের সংখ্যা এর দ্বিগুণ। এবং দুই পক্ষই এসমস্ত হত্যাকান্ডে চুড়ান্ত নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে।
যদিও একটা বিষয় এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য তা হল, বিভিন্ন দেশের সরকারকে নিয়ে পশ্চীমাদের এই যে চর্চিত মানদন্ড, তা আসলে খুবই উঁচু মার্গের বাছাইকৃত পন্থায় এ যাবৎ কাল চর্চিত হয়ে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক ডজনেরও বেশী একই ধরনের স্বৈরাচারী সরকারদের সাথে আন্তরিক ও দু-পক্ষের জন্যই লাভজনক এমন সম্পর্ক বছরের পর বছর ধরে উপভোগ করে আসছে। আরো অবাক করা বিষয় সেই সব দেশই বেশি করে সিরিয়ার সরকার পরিবর্তনে আগ্রহী।
আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরী দাবি করেছেন যে বিদ্রোহীদের সামান্য একটা অংশ যেটা সে মনে করে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশের মত আসলে তার মতে ব্যাড গাইজ। কিন্তু পর্যেবেক্ষনকারীরা যারা আসলে দৃশ্যপটে রয়েছে তারা এর মানে করে যে, তার মানে এই ব্যাড গাইজ দের সংখ্যা আসলে ১৫০০০ বা ২০০০০, আর যারা আসলেই সত্যি সত্যি খুব ই খারাপ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর মত সংগঠনের মতে এই কুকর্মকারীরা আসলে সবাই বিদেশী যোদ্ধা নয়, স্থানীয় সিরিয়রাও এতে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। একটি ভিডিওতে দেখা যায় একটি বিদ্রোহী কমান্ডার একজন সেনার হার্ট চিবিয়ে খাচ্ছে যাকে সে মাত্রই হত্যা করেছে। আরেকটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, একদল বন্দি সেনাকে খুন করা হচ্ছে যারা মাথা নীচে ও পা উপরে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে।
এগুলো আসলে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। জেষ্ঠ্য বিদ্রোহীরা জনসম্মুখে হুমকি দিয়ে রেখেছে যে শিঘ্রই দেশটির প্রধান গোত্রগত সংখ্যালঘু আলাউয়িদের উপর একটি গনহত্যা চালান হবে। সিরিয়ার সে সমস্ত ঘটনা আজ ঘটে চলেছে তা ১৬ ও ১৭ শতাব্দীতে ইউরোপে চলা ধর্ম যুদ্ধের হত্যাকান্ড ও নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ব্রিটিশ সাংবাদিক জোনাথন স্টিলে কে একটি গ্রামের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক কমান্ডার(যে কোন সরকারী সেনাও নয় আবার কোন বিদ্রোহীও নয়) একবার এক বর্ননায় বলে যে, সে এমন সব হামলা প্রত্যক্ষ করেছে যে একবার এক হামলার পর, একটি গাছে একটি বাচ্চার শুধু মাথা ঝুলে থাকতে দেখে, আরেক বার একই রকম একটি হামলার পর সে দেখতে পায় একটি মহিলার মৃত দেহ যা কোমর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাশাপাশি দুটি আপেল গাছ থেকে দুটি আলাদা অংশ ঝুলে রয়েছে। সত্যি বলতে কি এটা কল্পনা করাও কঠিন যে এসমস্ত দৃশ্য থেকে কি পরিমান ঘৃনা একটি মানুষের মনে জন্মাতে পারে।
হস্তক্ষেপের দ্বিতীয় সমর্থনের ভিত্তি হতে পারে যে সিরিয় সরকারের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগঃ অবৈধ রাসায়নিক মারনাস্ত্রের ব্যাবহার। এটা খুবই মারাত্নক অভিযোগ। যদিও সন্দেহ থেকেই যায় যে কে আসলে এই মারনাস্ত্র ব্যাবহার করেছে, সরকার নাকি বিদ্রোহীরা ? এবং আরো গুরুত্বপুর্ন ভাবে এমনকি যদিও এটা আসলেই মারাত্নক ও ভয়ংকর এবং যে কারনে এটাকে এখন অবৈধ হিসেবে ধরা হয়, অনেক রাষ্ট্র (আমেরিকা, ইসরাইল, মিশর ও ইরাক) এটাকে ব্যাবহার করেছে। যত মারাত্নকই হোক না কেন হলেও এটা ব্যাবহৃত হয়েছে সিরিয়ার ধ্বংসযজ্ঞের একটা সামান্য অংশে। সিরিয় সমাস্যার ৯৯ শতাংশ ক্ষয় ক্ষতি ও সমস্ত জান মাল সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত যা হয়েছে তা প্রচলিত অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাবহারেই হয়েছে। সুতরাং রাষায়নিক অস্ত্রের ব্যাবহার বন্ধ করা আসলে কোন কাজেই আসবে না, না তা যুদ্ধ বন্ধ করবে না তা একটা আপষ মিমাংসার অনুকুল পরিবেশ তৈরী করবে।

যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতি

সিরিয়ার সম্পদ এর সমানুপাতে সিরিয় গৃহযুদ্ধের ক্ষয় ক্ষতি এক কথায় অপরিমেয়। এবং অবশ্যই এই ক্ষয় ক্ষতি অব্যাহত কেননা যুদ্ধ এখনো চলমান। আমরা যা করতে পারি তা হলো অনুমান। একটি অনুমানে পরিমান এমন আসে যে সিরিয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত উর্দ্ধে ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এর ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছে। সমস্ত নগরীগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়কার স্ট্যালিনগ্রাদ অথবা বার্লিনে পরিনত হয়েছে। দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষ সিরিয়া ত্যাগ করেছে আর চার মিলিয়নেরও বেশি মানুষ অভ্যন্তরীন শরনার্থীতে পরিণত হয়েছে।
আমরা হয়ত আর ভাল অনুমান করতে সমর্থ হব যদি আমাদের দৃষ্টি সিরিয়া থেকে সরিয়ে পার্শ্ববর্তী লেবাননের দিকে তাকাই, সিরিয় শরণার্থীদের চাপ তাদেরকে কি বাড়তি প্রভাবে ফেলেছে আসুন দেখা যাক। সিরিয়াতে চলা যুদ্ধ এখন পর্যন্ত এই ছোট দেশটাকে ৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতির মুখে ফেলেছে, বেকারত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। প্রায় এক মিলিয়ন লেবানিজ কে বিশ্ব ব্যাংক গরীব হিসেবে ঘোষনা করেছে। আরো প্রায় ১৭০,০০০ লেবানিজ দ্রারিদ্রসীমায় নিমজ্জিত হওয়ার পথে রয়েছে। লেবাননে সিরিয় শরনার্থীদের সংখ্যা কম পক্ষে এক মিলিয়ন ছাড়িয়েছে।
জর্ডানের দিকে দেখলে দেখা যাবে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সেখানে শরণার্থী শিবিরে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধ মিলিয়ন। একটি শরণার্থী শিবিরে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ। এবং সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছে জর্ডানের পঞ্চম জনবহুল নগরী। প্রায় সমপরিমান আশ্রয় নিয়েছে তুরস্কে। আর বিশেষ করে কুর্দিরা যারা সিরিয় বিদ্রোহীদের কাছ থেকে প্রচ্ছন্ন গনহত্যামুলক হামলার মুখোমুখি হয়েছে তারা পাড়ি জমিয়েছে ইরাকে।
সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, সিরিয়ায় ছিল শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল। ফিলিস্তিন ভূ-খন্ডে ইসরাইলি আগ্রাসনের কারনে প্রায় অর্ধ-মিলিয়ন ফিলিস্তিনী আশ্রয় নেয় সিরিয়ায়। এর পরে লেবানন ইসরায়েল যুদ্ধের সময় প্রায় এক লক্ষ লেবানিজ শরণার্থীও তাদের পথ অনুসরন করে। পরবর্তীতে আমেরিকা ইরাক আক্রমনের সময় উর্দ্ধে দুই মিলিয়ন শরণার্থী ইরাক থেকে সিরিয়ায় আশ্রয় নেয়। এবং তাদের প্রায় অর্ধেক ছিল খৃষ্টান। সিরিয়ায় যুদ্ধ যখন আরো রক্তাক্ত আকার ধারন করে এবং গোঁড়া মুসলমান কতৃক খৃষ্টান ও শিয়া মুসলিমদের হত্যা শুরু হয় তখন আবার প্রায় দুই লক্ষ শরণার্থী ইরাকে ফিরে যায়। এই সমস্ত শরণার্থী খাতেই সিরিয় সরকারের রাষ্ট্রিয় সম্পদের একটি বড় অংশ ব্যায় হত। এই সংখ্যাগুলোর মতই বিষাদময় আরো কিছু বিষয় সিরিয়াকে কেন্দ্র করে গত এক শতক জুড়েই ঘটতে থাকে, দরিদ্র দেশ হিসেবে সিরিয়া তার সবচে গুরুত্বপুর্ন সম্পদগুলো হারায়, আর তা হলো সিরিয়ার পেশাদার চিকিৎসক ও আরো অন্যান্য পেশাদার মানুষ যারা কিনা অনেক কষ্ট করে ও অনেক উচ্চমুল্যে উচ্চ শিক্ষাগ্রহন করেছিল। গনতন্ত্রের নিরীখে সিরিয়া সরকার যতই নিন্দনীয় হোক না কেন, তারা শুধু যে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা আর শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসছিল তা নয়, তারা সিরিয়াকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও সার্বজনীন রাষ্ট্র হিসেবে রক্ষনাবেক্ষন করে আসছিল।

সিরিয়ার যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল

সিরিয়ার এই যুদ্ধে অর্থনৈতিক ক্ষয় ক্ষতির পরিমান যাই হোক না কেন, তার থেকে বেশি ক্ষতি সাধন যা করেছে তা পুরো সিরিয় প্রজন্মের উপর প্রত্যক্ষ্য একটি মানসিক আঘাত। তারা হয় তাদের বাড়ি ঘর জীবন জীবিকা সব হারিয়েছে না হয় হারিয়েছে সঙ্গী সিরিয়দের উপর বিশ্বাস। অন্যান্যরা আর কিছু হোক আর না হোক যুদ্ধকালীন তারা কি করেছে না করেছে এই সংক্রান্ত পীড়াদায়ক স্মৃতির কাছে ভুগতে থাকবে। তুলনা হয়ত তুচ্ছ ও অর্থহীন, তবুও সিরিয়ায় যা হয়ে চলেছে তা আমাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নানজিং এ জাপানী কষাইগিরি আর ১৯৯৪ সালে ঘটে যাওয়া রুয়ান্ডার হুতু-তুতসী কোন্দল এর গনহত্যাকেই মনে করিয়ে দেয়।
সংক্ষেপে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কে নাম মাত্র মানব সভ্যতার ছদ্মবেশী মোড়ক যার সাথে আমরা সভ্য দুনিয়ার সবাই লেপ্টে থাকতে চাই, সেখান থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে পাশবিকতার এক অনন্য মাত্রায় এনে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। এটা যেন চিরস্থায়ী অসীম অসহনীয় এক যুদ্ধ যেখানে প্রতিটি মানুষ প্রতিটি মানুষের বিরুদ্ধে। আবশ্যিক ভাবে জীবন সেখানে হবে দুর্ভাগ্যময়, কদর্য, নিষ্ঠুর পশুবৎ ও বর্বর এবং সংক্ষিপ্ত। কিভাবে এই সব অপরাধীরা ও ঘটনার যারা নির্মম শিকার সেই নিরীহ নাগরিকগন তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে সেটা হবে সিরিয়া ও অন্যত্রের আগামী প্রজন্মের দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু জরুরী এক প্রশ্ন। বর্তমান দুনিয়ার প্রতি পাঁচ কিংবা চার জনে একজন মুসলমান, নারী, পুরুষ ও শিশু মিলিয়ে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন। পৃথিবীর জনসংখ্যার তাদের পুরো অংশ এখন সিরিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে । সেখানে কি হয় তার একটা ক্ষুদ্র তরঙ্গ এশিয়া ও আফ্রিকায় একটা সম্ভ্যাব্য প্রভাব ফেলবে। তাই যদিও এটি একটি ছোট ও গরীব দেশ, কিন্তু বাস্তবতার নিরীখে, সিরিয়া এখন বিশ্ব সম্পর্কের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আসুন আমরা দেখার চেষ্টা করি, সিরিয়াতে সম্ভ্যাব্য কি কি ঘটনা ঘটতে পারে,
প্রথমত, যুদ্ধ চলমান থাকতে পারে, এখন এখানে একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং বাহ্যিক শক্তিগুলো তাদের কর্মকান্ড অব্যাহত রাখতে পারে। এখন পর্যন্ত আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, বিদ্রোহীগোষ্ঠিগুলোর পেছনে তারাই প্রধান সমর্থক। তাদের সহযোগীতা সহ বা সহযোগীতা ছাড়া, এমন সম্ভাবনা আছে কি যে যুদ্ধ আপনা আপনিই স্তিমিত হয়ে পড়বে, যখন সেখানকার সব যোদ্ধা ও যুদ্ধের শিকার নিরীহ নাগরিক কেউ আর অবশিষ্ট থাকবে না ? যদিও এখনকার ভয়াবহ হারেও সেটা ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যারা টিকে আছে তারা এক সময় ক্ষ্যান্ত দেবে ? আমার সেরকম মনে হয় না। আর কি হতে পারে ? বৈদেশিক যোদ্ধাদের প্রবাহ এক সময় কমে আসবে ? কমে আসবে শরণার্থীদের প্রবাহও? আর কি ? আর কি সম্ভাবনা আছে এই যুদ্ধের ? বিদ্রোহীরা একটি জলন্ত ধর্মবিশ্বাস নিয়ে লড়ছে, সুতরাং তারা তাদের অনুপস্থিতিতে কোন চুক্তি মেনে নেবে না, যা তারা ইতিমধ্যেই ঘোষনা দিয়ে দিয়েছে, আমি আসলে এটার কোন শেষই দেখতে পাচ্ছি না।
দ্বিতীয়ত, যদি সিরিয় সরকার টিকে যায় তবুও কোনরকম বাইরের শক্তির সাহায্য ছাড়া বিশেষ করে বিদ্রোহীগোষ্ঠিগুলোর দেশের বাইরে থেকে প্রাপ্ত সব ধরনের সহযোগীতার ইতি ঘটান ছাড়া তাদের কে দমন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। আমরা এমনতর ঘটনার ঠিক বিপরীত চিত্রও ইতিহাসের সাক্ষ্য অনু্যায়ী কল্পনা করতে পারি। আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখতে পাই গেরিলা যোদ্ধারা লম্বা সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে ও তাদের প্রতিপক্ষকে ক্লান্তির চরমে পৌঁছে দিতে পারে। তাদের বেঁচে থাকার চাহিদা খুব সামান্য।
তৃতীয়ত, আজকে ভ্লাদিমির পুতিন যখন সিরিয়া যুদ্ধে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেখানে আই এস ও বিদ্রোহীগোষ্ঠিগুলোর আস্তানায় যেভাবে একের পর এক বিমান হামলা করে চলেছে সেক্ষেত্রে এটা অনুমেয় যে আসাদ সরকার ধীরে ধীরে তার নিয়ন্ত্রন বাড়াবে। তবে আবারো পুরো দেশের ওপর তার নিয়ন্ত্রন আদতেও আসবে কিনা বা কবে নাগাদ আনতে পারবে তা এখনই স্পষ্ট করে বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। অপরপক্ষে পুতিনের এহেন কর্মকান্ডে ন্যাটো জোট বদ্ধ দেশগুলো যারপরনাই অসন্তোষ প্রকাশ করে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে পুতিনের পদক্ষেপও এখানে যথেষ্ট মাপ জোঁক করেই নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এই চলমান যুদ্ধ শেষের কোন ইংগিত আসলে পুতিনের হস্তক্ষেপও নিশ্চয়তা দিয়ে আমাদের দেখাতে পারছেনা। দেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলো কাদের নিয়ন্ত্রনে থাকছে সেটাই এখানে দেখার বিষয়। কেননা এই মুহুর্তে সিরিয়ার একমাত্র অর্থ উপার্জনকারী খাত হচ্ছে এই তেল ও গ্যাস নির্ভর ইন্ডাষ্ট্রি। সেটা এই মুহুর্তেই দামেস্ক ভিত্তিক সরকারের হাতে যাচ্ছে কিনা সেটা সময়ই বলে দেবে।
আর সমস্ত বিষয়গুলো যেমন আই এস বা তাদের স্থাপিত খিলাফত তার কি হবে সেটাও এখন প্রায় অনিশ্চিত। তবে এটা নিশ্চিত বিদ্রোহী দখলীকৃত এলাকাগুলো আরো মৌলবাদি মুসলিম অধ্যুষিত ইসলামিক সমাজে পরিনত হবে। বিদ্রোহীরা যেটাকে এখনই একটি খিলাফত হিসেবে চিহ্নিত করছে হতে পারে তারা উত্তর পশ্চিম ইরাকে তাদের সহযোগীদের নিয়েই এটাকে আরো জোরদার ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করবে। তবে এটা নিশ্চিত যে যদিও লড়াই কমে যায় তবুও এটা একেবারে শেষ হবে না, ইরাক এবং আফগানিস্তানে আমেরিকানদের জন্য এটা যেভাবে তিক্ত যুদ্ধের রুপ নিয়েছে, হয়ত কিছুটা সেভাবেই এটা চলতে থাকবে। আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান রাজনীতিবিদেরা যে যাই বলে চলুক ও আশা করে থাকুক না কেন, লড়াই চালাতে হলে ময়দানে তাদেরকেও থাকতে হবে। এবং নিকট অতীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেখেছে ইরাক যুদ্ধ কিভাবে তাদেরকে দেউলিয়া করে দিয়েছিল। ইরাক ও আফগান যুদ্ধের মত সিরিয়ার যুদ্ধও তাদের উপর একটা পাল্টা আঘাতের প্রভাব ফেলবে। তুলনামুলক ভাবে একটি ছোট বিষয় এ সমস্ত ধারাবাহিক ঘটনা প্রবাহের প্রভাব হিসেবে আমাদেরকে ভাবায় তা হল, কুর্দিদের সাথে তুরস্ক, ইরাক ও ইরানের কি সম্পর্ক দাঁড়ায় তা। সিরিয়াতে মৌলবাদিরা যা ইতিমধ্যেই শুরু করেছে তা হলো গোত্রগতভাবে তাদের সমাজকে পরিস্কার করা, যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে, তারা চাইবে কুর্দি প্রধান এলাকাগুলো থেকে তাদের উচ্ছেদ করে পার্শ্ববর্তী ইরাক ও তুরস্কে পাঠিয়ে দিতে। এই দুই দেশ যারা আর কোন কুর্দিকে স্থান দিতে রাজী নয় তারা তাদের এই অবস্থান এ অনড় থাকবে এবং উদ্বাস্তদের প্রবাহ থামাতে সচেষ্ট হবে। সীমান্ত সংঘর্ষ অনুমেয় এবং এটা আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব আরো বাড়াবে পাশাপাশি আভ্যন্তরিন উত্তেজনাও বাড়াবে। বাস্তবে এই ধরনের সমস্যা এখনই ঘটতে শুরু করেছে, যেটা আমরা প্রায়ই তুরস্কের সীমান্তে বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলোর সাথে তুরস্ক সেনারক্ষীদের সাথে ঘটতে দেখছি। একইরকম ভাবে লেবানন, জর্ডান ও ইসরাইলের সীমানাগুলোতেও উত্তেজনা বাড়বে এবং যা অবধারিত ভাবে প্রতিটি দেশে অভ্যন্তরীনভাবেও প্রভাব ফেলবে। মৌলবাদীরা খুবই উগ্রভাবে লেবানন এবং জর্ডানের সরকার এর বিরোধীতা করে। তাদের মতে এই সরকারগুলো পশ্চিমাদের পুতুল সরকার হিসেবে কাজ করে। এই সরকারগুলো খুবই ঠুনকো ভাবে ভারসাম্যতা বজায় রেখে চলেছে। আর রয়েছে সুযোগ সন্ধানী ইসরাইল। যারা নিত্য নতুন পরিস্থিতির সুযোগ নেবে এবং তাদের ইতিমধ্যেই পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনীদের বিতাড়িত করার গৃহীত নীতি নিয়ে আরো অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করবে। তাই খুবই সীমিত প্রভাব নিয়ে যদি কথা বলি তাহলে বলতে হবে দিন যত যাবে মধ্য প্রাচ্য নিয়ে অশান্তি ততই বাড়তে থাকবে।
পরিশেষে আমরা সিরিয়দের জীবন কোথায় যেয়ে ঠেকতে পারে তার বিচার ভার সময়ের হাতেই ছেড়ে দিলাম। তবে মনুষ্য সৃষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থ ও সেই স্বার্থ বজায় রাখার হীন অপচেষ্টায় মানবতার এহেন পরাজয় আর পাশবিকতার এহেন নগ্ন উল্লাস ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সিরিয়া আমাদেরকে বারংবার মনে করিয়ে দেবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
//এনামুর রেজা।
আইটি প্রফেশনাল।
বিঃদ্রঃ বানান ভুল মার্জনীয়।