ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

নির্ধারিত পোশাক কেনার সময় লম্বা হাতা ব্যবহারের সুবিধা তুলে নেয়ার আদেশের কথা শুনে ভিকারুননিসার অধ্যক্ষার কাছে সে সুযোগ বহাল রাখার নিবেদন নিয়ে সাক্ষাৎ করেন অধিকারহারা সন্তানের পক্ষ থেকে এক পিতা। ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষের কাছে অধিকারহারা সন্তানের পক্ষ থেকে এক পিতার খোলা চিঠি অবলম্বনে এই সংকলিত কলাম।

“” পাঁচ-ছয় বছর ধরে আমাদের মেয়ে গুলো স্কুলের পোশাকে লম্বা হাতা ব্যবহার করে আসছে। এবার নির্ধারিত পোশাক কেনার সময় লম্বা হাতা ব্যবহারের সুবিধা তুলে নেয়ার আদেশের কথা শুনে অধ্যক্ষার কাছে সে সুযোগ বহাল রাখার নিবেদন নিয়ে সাক্ষাৎ করি। আমার সে আবেদন ব্যর্থ হয়। আমরা জানি না কিভাবে, কখন ও কার নির্দেশে এ সুবিধা রহিত করা হলো। এই মৌখিক রহিতকরণ নির্দেশ তার একক, না পরিচালনা পর্ষদের­ তাও আমরা জানি না।

“লম্বা হাতার বিরুদ্ধে প্রথম ‘যুক্তি’ ছিল, পর্দা ‘মনের ব্যাপার’। অতএব আমার মেয়ের লম্বা হাতা জামা পরা বা না পরার গুরুত্ব নেই। মন ‘সাদা’ রাখলে পর্দা করার প্রয়োজন পড়ে না।” শরীর ঢাকলে নারীদের সামাজিক সুরক্ষা লাভ করা যায়। পর্দা করতে বাধা দিলে উভয়েরই ক্ষতি। যেহেতু আমার মেয়ে স্বেচ্ছায় পর্দা করতে ইচ্ছুক, তাই তাকে এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আর সাদা মনের কথা আদৌ যুক্তিসঙ্গত কি না, তা কেবল তথ্যের ভিত্তিতেই বিচারযোগ্য। সাদা মনের খোলা হাওয়ার সভ্যতার গুরু যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের জরিপের বরাতে পত্রিকায় দেখলাম, ২০০৭ সালে সে দেশে ১৮ শতাংশ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে কলেজছাত্রী ১৬ শতাংশ। কই সাদা মন তো তাদেরকে এত ভয়াবহ নিগ্রহ থেকে বাঁচাতে পারেনি। উল্লেখ্য, এটা সব দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নিগ্রহের মাত্রা। সুতরাং নারী নিগ্রহের অপরাধ কমাতে কথিত সাদা মন-না ইসলামি পোশাক, কোনটি বেশি কার্যকর।

পরের ‘যুক্তি’ হলো- “লম্বা হাতা জামার লম্বা অংশটুকুর জন্য শ্রেণীতে মানসিক ও কায়িক যে চাপ ছাত্রীদের ওপর পড়ে, তা থেকে আমার মেয়েকে অব্যাহতি দিয়ে তার কল্যাণ কামনা করছেন।” আমার মেয়ের কল্যাণ কামনা করায় আমি প্রীত ও কৃতজ্ঞ। তবে সবার মানসিক গঠন ও চাপের স্পর্শকাতরতা সমান নয়। যারা বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনে নিজেদের সংস্কৃতির ওপর আস্খার সঙ্কটে ভোগে, তারা কখনোই নিজস্ব সংস্কৃতির পোশাকে স্বত:স্ফূর্ত বা চাপমুক্ত থাকতে পারে না। তাদেরকেই হাতার লম্বা অংশটুকু হীনম্মন্যতার ক্লেদে মানসিক চাপে ভোগায়। আত্মপরিচিতি সচেতন সন্তানেরা কখনো নিজেকে বিড়ম্বিত ভাবে না, বরং গর্বিত হয়।

শেষ ‘যুক্তি’- “প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পোশাক নীতি আছে। অতএব ভিকারুননিসার ‘লম্বা হাতাবিরোধী’ পোশাক নীতি যাদের পছন্দ নয়, তারা অন্য স্কুলের দ্বারস্খ হতে পারে। ভিকারুননিসার ‘হাতানিরপেক্ষ’ পোশাক নীতি কবে, কোথায়, কার দ্বারা বাধ্যতামূলক ‘খাটো হাতায়’ রূপান্তরিত হলো, তা আমাদের জানা নেই। ঊর্ধ্বাকাশে ফরিয়াদ করে বলতে হয়, হে আমাদের প্রভু! ক্ষমতা তোমার কাছ থেকে আসে; নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তো কেবল তোমারই।

সব সময় যুক্তিতে মুক্তি মেলে না। মাঝে মাঝে ভক্তিতেও মেলে। আমার বিশেষ নিবেদন, আর্য-দ্রাবিড়, পাঠান-মুঘল, হিন্দু-মুসলমান সব স্রোতধারার মানুষ নিয়ে এ দেশের হৃদয় বহুমাত্রিক সমাজের ধারণাকে আত্মস্থ করেছে। তাই একমাত্রিক ও চরম পন্থার ‘কেবলই খাটো হাতা’ নীতি ত্যাগ করে এত দিনের প্রচলিত, বহুমাত্রিক ‘যার যেমন খুশি’ নীতিতে ফিরে গেলে দোষ কোথায়?

ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ কি কেবলই ইট-পাথরের দালানের নাম? দীর্ঘ ঐতিহ্য, শ্রম, সাধনা ও আত্মগৌরব লালিত এক মহান প্রতিষ্ঠান। নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী, স্নেহে ভরা শিক্ষক, অমিত মেধার অধ্যবসায়ী ছাত্রী এবং উদ্যমী অভিভাবকদের আর্থিক ও নৈতিক সহযোগিতায় গড়া এ মহান মহীরুহ। এর সুনাম, সম্পদ সবই একটা সম্মিলিত আমানত। আমার মেয়ে এবং আমি সে আমানতের গর্বিত অংশীদার। তাই সবার কাছে আমার আবেদন, ক্ষুদ্র হলেও আমার মেয়ে উপেক্ষণীয় নয়। যে কোনো ছাত্রীর ‘লম্বা হাতা’ জামা পরার এত দিনের অধিকার ফিরিয়ে দিন। পিতৃব্যরা কি সন্তানের অধিকার কেড়ে নিতে পারেন? আমার বিশ্বাস­ নিশ্চয়ই না।””

[ সংকলিত কলাম: ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষের কাছে অধিকারহারা সন্তানের পক্ষ থেকে এক পিতা খোলা চিঠি অবলম্বনে]

ছবি সমগ্র:

ছবি: লন্ডনের একটি স্কুলে অমুসলিম শিক্ষার্থীদের মাঝে ধর্মীয় অধিকার হিজাব অক্ষুণ্ণ রেখে মুসলিম ছাত্রীরা


ছবি: লন্ডনে একটি স্কুলে বাংগালী মুসলিম ছাত্রীকে সাইকেল শেখাচ্ছেন অমুসলিম একজন ক্রিড়া শিক্ষক


ছবি: এমনকি কর্মজিবী হিসাবে ধর্মীয় অধিকার হিজাব অক্ষুণ্ণ রেখে বাংগালী মুসলিম নারী তাও আবার পুলিশ (ইংল্যান্ড পুলিশ)


ছবি: মাথা ঢেকেছেন কিন্তু মগজ ঢাকেননি