ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

আমাদের প্রাণ প্রিয় বাংলাদেশ আজ শুধু মাত্র একটি গুণের অভাবে উন্নত মম শির বলে উঠে দাড়াতে পাচ্ছেনা আর তা হচ্ছে সততা ও দক্ষতা সমন্নয়। যে কারনে তৈরি হতে পারছেনা ভালো মানুষের প্রজন্ম। ভালো মানুষের প্রজন্ম ছাড়া কোন জাতি উন্নত মম শির বলে উঠে দাড়াতে পারে না।

ব্যক্তিজীবনের যত ধরনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা বা ডিগ্রি যাই থাকুক না কেন সততা যদি না থাকে তাহলে দক্ষতা কখনো সফলতা বয়ে আনতে পারে না। শুধুমাত্র দক্ষতা মানুষের সংগ্রহ ও ভোগের স্পৃহা বাড়ায়। শুধু দক্ষতা থাকলে দুর্দশা ও আসক্তি বাড়বে। কিন্তু সততাযুক্ত দক্ষতা সেবা ও দানের স্পৃহা বাড়িয়ে দেয়। সততার এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই হচ্ছে এটি দক্ষতা সৃষ্টি করে নিজেকে পরিণত করে অন্যের বিশ্বস্ততার কেন্দ্রবিন্দুতে। একজন মানুষের ভেতর থেকে যখন নৈতিক ও আত্মিক শক্তি জাগ্রত হয় তখন দক্ষতা আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি তাকে দক্ষ করে তোলে। আবার দক্ষতা আছে, কিন্তু সততা নেই- এমন হলে তা কল্যাণ বয়ে আনে না। কারণ সেক্ষেত্রে মানবিকতার দৃষ্টিকোণ লোপ পায় এবং দানবিকতার লোলুপ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। যেকোনো উপায়ে লাভবান হওয়ার বাসনায় সততাকে বিসর্জন দেয়ার মানসিকতা তৈরি হয়।

এ নিয়ে একটি ছোট গল্প আছে_ এক রাজা তার সুযোগ্য কন্যার জন্যে পাত্র সন্ধান করছেন। বিভিন্ন দেশ থেকে রাজপুত্ররা এসে উপস্থিত। যোগ্যতায় কেউ কারো চেয়ে কম নয়। রাজা জানালেন, তিনি তার কন্যার পাণিপ্রার্থী সকলের জন্যে একটি কাজের ব্যবস্থা করেছেন যিনি সেই কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারবে তার হাতেই তিনি তার কন্যাকে তুলে দেবেন। নির্দিষ্ট দিনে সকল রাজপুত্ররা এসে উপস্থিত হলেন। রাজা সবাইকে একটি করে গাছ দিলেন এবং জানালেন আগামী এক মাস এই গাছের যত্ন নিতে হবে। একমাস পরে এই গাছ নিয়ে রাজার দরবারে উপস্থিত হতে হবে এবং এবং যার গাছ সবচাইতে লম্বা হবে তিনিই হবেন বিজয়ী। সবাই যে যার মতো গাছের যত্ন নিতে লাগলো। নিয়মিত পানি, সার এমনি নানা পরিচর্যা। কিছুদিন পরে এক রাজপুত্র দেখলেন, গাছের যতই যত্ন নিচ্ছেন না কেন গাছ বাড়ছে না বরং মনে হচ্ছে গাছটি মৃত। অনেকে বুদ্ধি দিলো এই গাছটি পাল্টিয়ে অন্য গাছ নিতে। রাজপুত্র নিজের মতে অটল থাকলেন। এই গাছই তিনি মাস শেষ হবার পরে নিয়ে যাবেন। নির্দিষ্ট দিনে সবাই গাছ নিয়ে উপস্থিত হলেন। এক একজনের গাছ বেশ লম্বা হয়েছে। শুধু একজনের গাছ মৃত। রাজা সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই রাজপুত্রকেই বিজয়ী ঘোষণা করলেন যার গাছটি মৃত। রাজা জানলেন, তিনি প্রত্যেককে যে গাছ দিয়েছিলেন সেটি আসলে মরা গাছ ছিলো। একজন রাজপুত্র শুধু সেই গাছটি ফিরিয়ে এনেছেন এবং তিনিই শুধু সততার পরিচয় দিয়েছেন। বাকী সবাই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন। এবং সেই রাজপুত্রই রাজকন্যাকে পেলেন।

যখন কেউ আপনাকে দেখছে না তখন আপনার আচরণই সততার নিরূপক। কেউ দেখুক না দেখুক স্রষ্টা আপনাকে দেখছেন- এই দৃষ্টিভঙ্গি আপনার নৈতিক মূল্যবোধ দৃঢ় করবে। আবার সত্যের ব্যাপারে আপোসহীন হতে পারাই সততা। সৃষ্টিকর্তার ওপর অবিচল বিশ্বাস ও কর্মদক্ষতা ব্যক্তিকে আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী করে তোলে। সততা ভেতর থেকে একজন মানুষের নিরাপত্তা বোধকে বাড়িয়ে দেয়, যে কারণে এই শক্তির জোরে সে সকল সীমাবদ্ধতাকে জয় করতে পারে। সততা আর দক্ষতার সংমিশ্রণই হচ্ছে পরিপূর্ণ সফলতা অর্জনের উপায়। শুধু সৎ হলেই যেমন আপনি বসের নজর পাবেন না, ঠিক তেমনি দক্ষ হলেই প্রমোশন পাবেন না। যত উপরে উঠবেন, তত আপনাকে এই গুণ দুটি আয়ত্ত করতে হবে। শুধু আর্থিক লেনদেনেই সততা সীমাবদ্ধ নয়। সততা জীবনের সব ব্যাপারেই হতে পারে। আর্থিক ব্যাপারে যেমন, তেমনি হতে পারে পারিবারিক, পেশাগত, সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও। আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি তো?

কমিটমেন্টের ব্যাপারে ১০০% বিশ্বস্ততা সততার অন্যতম মাপকাঠি। শিক্ষার্থী হলে আমার প্রথম দায়িত্ব ক্লাসে প্রথম হবার জন্যে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালানো। কারণ ছাত্রজীবনে লেখাপড়াকে বাদ দিয়ে অন্য কিছুকে বেশি প্রাধান্য দিলে সেটা তার দায়িত্বে অবহেলা হিসেবে গণ্য হবে। কর্মজীবনে নিয়োগদাতা ও সেবা গ্রহীতাকে সঠিক সময়ে প্রাপ্য সেবা প্রদানে গাফিলতি করা- এ সবই হচ্ছে পেশার সাথে বিশ্বস্ততার অভাব। ভুক্তভোগীরা সবসময় এরকম পেশাদারিত্বের জন্য আড়ালে গালমন্দই করে। দক্ষতা কখনো সততা সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু সততা দক্ষতা সৃষ্টি করতে পারে। সততা ও দক্ষতার সমন্বয় একজন মানুষকে পরিণত করে অনন্য মানুষে। এজন্য প্রয়োজন আত্মনিমগ্ন হওয়া। আত্মনিমগ্ন হতে পারলে একজন মানুষ তার নিজের কাছেই জবাবদিহিতা করতে পারে, সচেতন হতে পারে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে। জাগ্রত করতে পারে তার সততা ও নিষ্ঠাবোধ। শুধু যে গুণটির অভাব এই জাতিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।